Home Blog Page 47

পুরানের দেব দেবী – মা মনসা 

পুরানের দেব দেবী – মা মনসা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবী মনসা একদিকে যেমন লৌকিক দেবী অন্যদিকে পুরানে এমনকি মহাভারতেও তার উল্লেখ রয়েছে|মনসার স্বরূপ ও তার উৎপত্তি এবং পরিচয় নিয়ে একাধিক শাস্ত্রে কিছু পরস্পর বিরোধী তত্ব উপস্থিত রয়েছে|আজকের পর্ব দেবী মনসা কে নিয়ে।

 

মা মনসা হিন্দুধর্মের লৌকিক সর্পদেবী। মধ্যযুগের লোককাহিনী বিষয়ক মনসামঙ্গল কাব্যের প্রধান চরিত্র। সর্পদেবী হিসেবে মনসার প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় হিন্দু ধর্মগ্রন্থ অথর্ববেদে। পুরাণে তাঁকে ঋষি কাশ্যপ ও নাগ-জননী কদ্রুর কন্যা বলা হয়েছে।পুরান অনুসারে শিব বিষপান করলে মনসা তাঁকে রক্ষা করেন সেই থেকে তিনি বিষহরি নামে পরিচিতা হন।

 

মনসা মঙ্গলকাব্যে তাঁকে শিবের কন্যা বলা হলেও, পুরাণ অনুসারে তিনি ঋষি কশ্যপের কন্যা।পুরা কালে সর্প ও সরীসৃপগণ পৃথিবীতে কলহ শুরু করলে কশ্যপ তাঁর মন থেকে মনসার জন্ম দেন। ব্রহ্মা তাঁকে সর্প ও সরীসৃপদের দেবী করে দেন। মনসা মন্ত্রবলে বিশ্বের উপর নিজ কর্তৃত্ব স্থাপন করেন। শিব তাঁকে কৃষ্ণ-আরাধনার উপদেশ দেন। মনসা কৃষ্ণের আরাধনা করলে কৃষ্ণ তুষ্ট হয়ে তাঁকে সিদ্ধি প্রদান করেন এবং প্রথামতে তাঁর পূজা করে মর্ত্যলোকে তাঁর দেবীত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।

 

মহাভারতে মনসার বিবাহের উল্লেখ রয়েছে। ঋষি জগৎকারু এক প্রচণ্ড তপস্যায় রত ছিলেন। তিনি প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে বিবাহ করবেন না। একদা তিনি দেখতে পান যে একদল লোককে গাছে উলটো করে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এঁরা ছিলেন তাঁরই পূর্বপুরুষ। তাঁদের সন্তানেরা তাঁদের শ্রাদ্ধাদি সম্পূর্ণ না করায় তাঁদের এই দুঃখজনক অবস্থা হয়েছিল। তাঁরা জগৎকারুকে বিবাহ করার উপদেশ দিয়ে বলেন যে তাঁর পুত্রই শ্রাদ্ধাদি সম্পূর্ণ করে তাঁদের দুঃখ থেকে মুক্তি দিতে পারবে। বাসুকী জগৎকারুর সঙ্গে নিজ ভগিনী মনসার বিবাহ দেন। আস্তিক নামে তাঁদের একটি পুত্রসন্তান হয়। আস্তিক তাঁর পূর্বপুরুষদের মুক্তি দেন। রাজা জনমেজয় সর্পজাতির বিনাশার্থে সর্পনিধন যজ্ঞ শুরু করলে আস্তিকই নাগদের রক্ষা করেন।

 

আবার মনসাবিজয় কাব্য থেকে জানা যায়, বাসুকীর মা একটি ছোটো মেয়ের মূর্তি নির্মাণ করেছিলেন। শিবের শিবের ক্রিপায় এই মূর্তি থেকেই মনসার জন্ম হয় এবং পরবর্তীতে বাসুকী তাঁকে নিজ ভগিনীরূপে গ্রহণ করেন। বাসুকী তার কাছে গচ্ছিত বিষের ভান্ডার মনসাকে দেন যা পরবর্তীতে মনসার শক্তির উৎস হয়ে ওঠে|

 

পুরান উৎস হলেও গ্রাম বাংলায় মানুষ সাপের অত্যাচার থেকে বাঁচাতে মনসা পুজো শুরু করে এবং ধীরে ধীরে মনসা হয়ে ওঠেন লৌকিক দেবী।

 

আবার পরের পর্বে অন্য এক পৌরাণিক দেবতার প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনায় ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরানের দেব দেবী – হনুমান

পুরানের দেব দেবী – হনুমান

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজকের পর্বে আপনাদের জানাবো রূদ্র
অবতার হনুমান সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য|

হনুমানের পিতার নাম ছিল কেশরী, মায়ের নাম ছিল অঞ্জনা। হনুমানের পালক পিতা হলেন পবন দেবতা|রাক্ষস বাহিনীর অত্যাচার থেকে ধরিত্রীকে মুক্ত করতে তথা ভগবান রামের সেবা ও রাম নাম প্রচারের জন্যই রুদ্র অবতার হনুমানের আবির্ভাব।

পুরানের একটি ঘটনা অনুসারে একদা দশানন রাবণ কৈলাশে পাহারারত নন্দীকে ব্যাঙ্গ করলেন বানর বলে|ক্ষিপ্ত হয়ে নন্দী রাবণকে অভিশাপ দিলেন এক বানরের হাতেই রাবণ আর তার কূল ধ্বংস হবে|এই অভিশাপই পরবর্তীতে সত্য হয়েছিলো। রাবনের পতনের বড়ো ভূমিকা নিয়েছিলেন হনুমানজি।

শুধু রামায়ণ নয়। হনুমানজী দ্বাপর যুগেও ছিলেন।এমনকি মহাভারতেও তার উল্লেখ রয়েছে মনে করা হয় কুরুক্ষে যুদ্ধে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের রথের ধ্বজা হিসেবে ছিলেন। তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায়।কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেছেন। হনুমানজীর অনুরোধে শ্রীকৃষ্ণ রামচন্দ্রের রূপ ধারণ করে হনুমানকে একবার দর্শন দিয়েছিলেন।
শাস্ত্র মতে হনুমান চার যুগে অমর অর্থাৎ তিনি আজও স্বশরীরে এই পৃথিবীতে বিরাজমান।

বজরংবলী অষ্ট সিদ্ধির অধিকারী। অর্থাৎ আটটি দুর্লভ ক্ষমতা রয়েছে তার। আবার তার স্মরণাগত দের গ্রহ রাজ শনিদেব কোনো ক্ষতি করেন না কারন রাবনের কারাগার থেকে তিনি শনিদেবকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং শনিদেব খুশি হয়ে তাকে এই বর দিয়েছিলেন।

অনেকেই মনে করেন বজরংবলী ব্রহ্মচারী। অবিবাহিত।একথা আংশিক সত্য,পুরান অনুসারে হনুমান বিবাহিত এবং তার সন্তানও রয়েছে|

সূর্যদেব ছিলেন হুনুমানের শিক্ষক, তিনি হনুমানকে নবনিধীর শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু নবম সূত্রটি কেবল মাত্র বিবাহিত দের জন্যে তাই বিবাহ করা বাধ্যতামূলক ছিলো।এই কারনে শিবের আশীর্বাদে শুভ্রলা নামে একটি কন্যা সৃষ্টি হয় এবং হনুমানের সাথে তার বিবাহ হয় তবে বিবাহের পরের মুহূর্তেই শুভ্ৰলা অদৃশ্য হয়|এই ভাবে বিবাহিত হয়েও ব্রহ্মচারী রয়ে গেলেন হনুমান|অন্ধ্রপ্রদেশের একটি মন্দিরে হনুমান তার স্ত্রী শুভ্ৰলার সাথে একত্রে পূজিত হন|

শাস্ত্র মতে হনুমানের একটি পুত্রও ছিলো যার জন্ম হয়ে ছিলো অদ্ভুত ভাবে, লঙ্কা অভিযানের সময়ে হনুমানের শরীরের এক ফোঁটা ঘাম পড়েছিলো সমুদ্রে এই ঘামের বিন্দু থেকে জন্মান হনুমান পুত্র মকরধজ|

রূদ্র অবতার হনুমানের চরনে প্রনাম জানিয়ে আজকের এই বিশেষ পর্ব শেষ করছি।পরের পর্বে আরো এক পৌরাণিক দেবতার কথা লিখবো।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরানের দেব দেবী – ইন্দ্রদেব

পুরানের দেব দেবী – ইন্দ্রদেব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

দেবতাদের আরাধ্য দেবতা যেমন মহাদেব তেমনই দেবতাদের রাজা হলেন ইন্দ্র। ইন্দ্র আসলে একটি বিশেষ পদাধিকারী দেবতা যিনি স্বর্গের প্রশাসক।
আজ এই পর্বে দেবরাজ ইন্দ্র এবং তার অস্ত্র বজ্র নিয়ে লিখবো।

অসুর দের মধ্যে এক ভয়ঙ্কর অসুর ছিলো বৃত্যাসুর যার সাথে ভীষণ যুদ্ধ হয়েছিলো দেবরাজ ইন্দ্রের|এই যুদ্ধের সাথে জড়িত বজ্র নির্মাণের ইতিবৃত্ত|

ত্রিশিরাকে বধ করলে তার পিতা ত্বষ্টা ত্রুদ্ধ হয়ে ইন্দ্রকে বিনষ্ট করার জন্য অগ্নিতে আহুতি দিয়ে বৃত্রাসুরকে উৎপন্ন করেন। বহুকাল যুদ্ধ করেও বিত্রাসুরকে পারাজিত করতে পারলেন না দেবতারা|অবশেষে ঋষিরা বৃত্রকে ইন্দ্রের সঙ্গে সন্ধি করার প্রস্তাব দিলে বৃত্র সব শুনে বললেন যে, তিনি তাতে রাজি আছেন। কিন্তু ঋষিদের কথা দিতে হবে যে, শুষ্ক বা আদ্র্র বস্তু দ্বারা, প্রস্তর কাষ্ঠ বা অস্ত্রশস্ত্র দ্বারা, দিবসে বা রাত্রিতে ইন্দ্র অথবা অন্যদেবতারা ওঁকে বধ করতে পারবেন না। ঋষিরা তাতে রাজি হলে সন্ধি স্থাপিত হল।অর্থাৎ দেবতা দের সব অস্ত্র সস্ত্র বৃত্যাসুর কে বধ করার ক্ষমতা হারালো|

এদিকে ক্রমে বৃত্যাসুর যখন অত্যাচারি হয়ে উঠতে লাগলো এবং এক সময় তাকে বধ করা ছাড়া আর কোনো উপায় রইলো না, কিন্তু অস্ত্র নেই | তখন ঋষিরা একটা উপায় বাতলালেন | কোনো ত্যাগী এবং তেজময় সন্যাসীর অস্থি থেকে অস্ত্র তৈরী করে বৃত্যাসুর কে বধ করতে হবে

ত্যাগের জন্য সদা প্রস্তুত সেই বৈদিক ঋষি হলেন দধীচি | ভগবত্‍ পুরাণ অনুযায়ী তিনি অথর্বন ঋষি ও চিতির পুত্র ছিলেন তিনি|দেবতারা দধীচীর কাছে তার অস্থি চাইলেন | এই অনুরোধ শুনে দধীচি নামক এই মহামুনি সাধক আত্মত্যাগ করতে রাজি হন। দধীচিকে হত্যা করা হয় এবং তার দেহের হাড় দিয়ে বৃত্তাসুরকে হত্যার জন্য ইন্দ্রের জন্য একটি বিশেষ বজ্র তৈরি করা হয়|তার পর ইন্দ্র ও বৃত্তাসুরের মধ্যে ভীষণ যুদ্ধ হলো |অবশেষে সেই বজ্র দিয়ে ইন্দ্র বৃত্যাসুর কে যুদ্ধে পরাজিত করেন এবং হত্যা করেন |

বজ্র মূলত অনন্ত শক্তি ও অসীম দৃঢ়তার প্রতীক যা দেবরাজ ইন্দ্রকে কঠোর হাতে স্বর্গ রাজ্য পরিচালনা করতে এবং দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন করতে সাহায্য করে। এছাড়া ইন্দ্রের বাহন ঐরাবত অত্যন্ত শক্তিশালী যে সর্বদা ইন্দ্রের সাথে থেকে দুষ্টের দমন করতে সাহায্য করে।

আগামী পর্বে আবার অন্য এক দেবতার কথা
নিয়ে ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পিতৃ দোষ এবং মহালয়া অমাবস্যা

পিতৃ দোষ এবং মহালয়া অমাবস্যা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আগের পর্বে বলেছি পিতৃদোষ থাকলে কয়েক প্রজন্ম ধরে সেই পরিবারের নানা সমস্যার মুখে পড়তে পারে। জ্যোতিষ শাস্ত্র এবং বাস্তু শাস্ত্র মতে কিভাবে পিতৃ দোষ নির্ধারিত হয় সেই নিয়ে আজকের পর্বে লিখবো।

১. কোষ্ঠির নবম কক্ষ দেখে জানা যায় যে জাতক পূর্বজন্মের কোন পুণ্য সঙ্গে নিয়ে এসেছে। কোষ্ঠির নবম কক্ষে রাহু, বুধ বা শুক্র অবস্থান করলে বুঝতে হবে কোষ্ঠিতে পিতৃদোষ রয়েছে।

২. কোষ্ঠির দশম কক্ষে অশুভ বৃহস্পতির উপস্থিতি অভিশাপ স্বরূপ। বৃহস্পতি অভিশপ্ত হলেও পিতৃদোষ দেখা দেয়।

৩. কোনও জাতকের জন্মছকের সপ্তম কক্ষে বৃহস্পতি থাকলে, তা আংশিক পিতৃদোষ হিসেবে গণ্য হয়।

৪. লগ্নে রাহু থাকলে পিতৃদোষের দিকে ইঙ্গিত করে। আবার চন্দ্রের সঙ্গে কেতু ও সূর্যের সঙ্গে রাহু থাকলেও পিতৃদোষ হতে পারে।

৫. কিছু কিছু ক্ষেত্রে পঞ্চম স্থানে রাহু থাকলেও পিতৃদোষ দেখা যায়।

৬. জন্মছকে সূর্যের ওর যদি শনি, রাহু ও কেতুর দৃষ্টি থাকে বা এদের যুতির দ্বারা সূর্য প্রভাবিত হয়, তা হলে জাতকের কোষ্ঠিতে পিতৃ ঋণের পরিস্থিতি উৎপন্ন হয়।

বাস্তু শাস্ত্র মতেও পিতৃ দোষের আলাদা ব্যাখ্যা আছে।

৮. বাড়ির উত্তর ও ঈশান কোণ সঠিক না-থাকলেও তা পিতৃদোষের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিছু খেত্রে জাতক বা জাতিকার বর্তমান অবস্থা বিচার করেও বলা যায় সে সে পিতৃ দোষে দুষ্ট।

৯. জাতকের গ্রহ, নক্ষত্র, বাড়ির বাস্তু সঠিক থাকা সত্ত্বেও ক্রমাগত আর্থিক সমস্যা, শারীরিক সমস্যা এবং বিবাহে বিলম্ব হলে ধরে নেয়া যায় পিতৃ দোষ এই দুর্ভোগের কারন।

১০. পূর্বপুরুষ বা কোনও সদস্যের রোগ যদি আপনার হয়ে থাকে, তা হলে তা পিতৃদোষ হিসেবে গণ্য হয়।

১১. পৈতৃক ঋণ থাকলে বা কোনো অদৃশ্য শক্তি আপনাকে ক্রমাগত সমস্যায় ফেললে তাও পিতৃদোষ হিসেবে বিবেচিত হয়।

পিতৃ দোষের একাধিক কারন গুলোর মধ্যে পূর্বজন্মে কোনও ধর্ম বিরোধী কাজ অন্যতম যেমন গো হত্যা বা অশাস্ত্রীয় খাদ্য গ্রহণ ইত্যাদি।

আবার কোনও জাতক বা জাতিকা যদি তার পূর্বপুরুষের ধর্ম ত্যাগ করে দিয়ে থাকে বা কুল ধর্ম এবং কুলদেব-দেবীর ত্যাগ করে দেয়, তা হলেও পিতৃদোষ লাগতে পারে। একাধিক জন্ম পর্যন্ত তা পিছু ছাড়ে না।

পিতৃ পক্ষের অবসানে শুরু হবে দেবী পক্ষ। মহালয়া অমাবস্যায় আমাদের পূর্বপুরুষের আত্মা আমাদের চিরতরে সমস্ত অশুভ প্রভাব থেকে মুক্তিদিতে উপস্থিত থাকবেন মর্ত লোকে। এই দুর্লভ তিথিতে পিতৃ দোষ সহ সবরকম গ্রহদোষ থেকে মুক্তি পেতে পারেন শাস্ত্র মতে গ্রহ দোষ খন্ডনের মাধ্যমে।

দেখা হবে পরের পর্বে। ফিরে আসবো অন্য
একটি শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পিতৃ দোষ এবং তার ব্যাখ্যা 

পিতৃ দোষ এবং তার ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ভাদ্রপদ মাসের শুক্ল পক্ষের পূর্ণিমা তিথি থেকে পিতৃপক্ষের সূচনা ধরা হয় এবং পিতৃ পক্ষ শেষ হয়ে দেবী পক্ষ শুরু হয়। মহালয়ায়।

 

জ্যোতিষ ও তন্ত্র জগতেও এই প্রিতৃ পক্ষের বিশেষ মাহাত্ম আছে। বিশেষ করে যাদের জন্মছকে পিতৃ দোষ আছে তারা এই সময়ে তন্ত্র মতে গ্রহ দোষ খণ্ডন করালে পিতৃ দোষ থেকে দ্রুত এবং

চিরতরে মুক্তি পাবেন।বিশেষ করে বিয়ের আগে বা পরে পিতৃদোষের প্রতিকার অবশ্যই প্রয়োজন নাহলে বিবাহিত জীবনে সমস্যা আসে।

 

শাস্ত্র মতে পিতৃপক্ষে তীর্থযাত্রা গিয়ে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করার রীতির গুরুত্ব অপরিসীম। কারন মনে করা হয় ওই পিতৃ পক্ষ থাকা কালিন

আমাদের পূর্বপুরুষের আত্মা তাদের পরিবারের সদস্যদের আশীর্বাদ দিতে মর্ত্যে আসেন। তাদের আশীর্বাদে জীবনের সব দুঃখ কষ্ট দুর হয়।

 

পিতৃ দোষের জন্য বা সহজ ভাবে বললে পূর্বপুরুষ দের কৃত কর্ম বা অভিশাপ সবাইকেই ভোগ করতে হয়। শুধু মানুষ নয় ভগবানের অবতাররাও নানা দুঃখ কষ্ট ভোগ করে থাকেন। শ্রী রাম কেও রাজ্য ছেড়ে অরণ্যে দিন কাটাতে হয়েছে। পরশুরামকে যুদ্ধ বিগ্রহে লিপ্ত হতে হয়েছে।শ্রী কৃষ্ণকে বিরহ সহ্য করতে হয়েছে। মহাপ্রভু কে লাঞ্চিত হতে হয়েছে। সবই হয়েছে গ্রহের ফেরে। তাই গ্রহ দোষ খণ্ডন এবং শাস্ত্র মতে প্রতিকারের বিধান সর্বজনগ্রাহ্য।

 

 

আগেই বলেছি পূর্ব পুরুষদের পাপ বা তাদের অভিশাপ থেকে সৃষ্টি হয় পিতৃ দোষ যা কয়েক প্রজন্ম পর্যন্ত ভোগাতে পারে।

 

শাস্ত্রে পিতৃদোষের ৭টি প্রধান কারণ উল্লেখ আছে এবার আসুন জেনে নিই সেগুলি কি কি

 

১. বাড়ির পিতৃপুরুষ বা বড়রা পারিবারিক পুরোহিত বা ধর্ম পরিবর্তন করে থাকলে।

 

২. বাড়ির পাশের কোনও মন্দিরে ভাঙচুর হলে বা অশ্বত্থ গাছ কাটা হলে।

 

৩. পূর্বজন্মে আপনি কোনও পাপ করে থাকলে বা মা-বাবাকে কষ্ট দিলে।

 

৪. আপনার পূর্বপুরুষরা কোনও পাপ করে থাকলে, যার ফল আপনাকে ভোগ করতে হচ্ছে।

 

৫. আপনি এমন কোনও পাপকর্মে লিপ্ত আছেন, যার ফলে আপনার পূর্বপুরুষরা আপনার প্রতি রুষ্ঠ হয়ে রয়েছেন।

 

৬. কিছু ব্যক্তি সব সময় নিজের মা-বাবা বা সন্তানকে দূষতে থাকেন, কষ্ট দেন।

 

৭. গোরু, কুকুর বা কোনও নির্দোষ জন্তুকে কষ্ট দিলে।

 

এছাড়াও কয়েকটি গ্রহ গত অবস্থান কেও পিতৃ দোষ হিসেবে দেখা হয় সেগুলি নিয়ে আগামী পর্বে আলোচনা করবো। থাকবে পিতৃ দোষ নিয়ে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরানের দেব দেবী – গরুড়দেব 

পুরানের দেব দেবী – গরুড়দেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রীজাতক

 

পুরানে দেবতা অসুর ও মানুষের পাশাপাশি কিছু অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন অদ্ভুত প্রাণীর ও উল্লেখ আছে|গরুড় দেব এদের অন্যতম|তিনি স্বয়ং ভগবান বিষ্ণুর বাহন|তিনি মহাবীর, তার প্রশ্নের উত্তরে সৃষ্টি হয়েছে গরুড় পুরান|তবে সব থেকে বেশি যে বিষয়টা আলোচিত হয় তা হলো গরুড়ের সাথে সাপেদের প্রবল শত্রুতা|কিন্তু কেনো এই শত্রুতা আর কবে তার সূচনা হলো।এসব জানার আগে গরুড়ের আসল পরিচয় ও স্বরূপ জানা প্রয়োজন।

 

গরুড় কশ্যপ মুনির সন্তান। কশ্যপের অনেক স্ত্রী ছিলেন। বিনতা তাঁদের অন্যতমা। এই বিনতার দুই পুত্র: গরুড় এবং অরুণ। কশ্যপের আর এক স্ত্রীর নাম কদ্রু। তাঁর অনেক সন্তান, সবাই সাপ। সৎ মায়ের অত্যাচার গরুর কে তার ভাইদের শত্রুতে পরিণত করে।এখানেই পারিবারিক ভাবে গরুড় ও সাপেদের শত্রুতার সূত্রপাত।পরবর্তীতে বিষ্ণু গরুড় কে তার বাহন হিসেবে নির্বাচন করেন।তার পেছনেও আছে এক রোমাঞ্চকর পৌরাণিক ঘটনা।

 

পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে গরুড়ের একবার অমৃতর খুব প্রয়োজন হয়ে পড়ে । অমৃত আছে দেবতাদের কাছে। গরুড় দেবলোকে অভিযান করলেন। দেবতাদের যুদ্ধে হারিয়ে অমৃতের ভাণ্ড নিয়ে গিয়ে দিলেন বিষ্ণুর কাছে। কিন্তু নিজে সেই অমৃত পান করলেন না। এই সংযম ও ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে বিষ্ণু গরুড়কে বর দিতে চাইলেন। গরুড় অমৃত চাইলেন না, কিন্তু অমরত্ব চাইলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে প্রার্থনা করলেন যে, তিনি বিষ্ণুর রথের উপরে থাকতে চান। বিষ্ণু তাঁর সেই প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন। সেই থেকে গরুড় বিষ্ণুর বাহন।

এই ভাবে তিনি বিষ্ণুর কৃপা এবং অমরত্ব

দুটিই লাভ করলেন|

 

বিষ্ণুর আশীর্বাদে অমর হয়ে অমৃতের ভাণ্ডটি নিয়ে গরুড় আবার ডানা মেললেন, সেটি যথাস্থানে রেখে আসতে হবে। দেবরাজ ইন্দ্র অমৃত কেড়ে নেওয়ার জন্য চড়াও হলেন বজ্র দিয়ে আঘাত করলেন গরুড় কে । গরুড় তো অমর, কিন্তু দেবরাজের অস্ত্র বলে কথা, তার ওপর দধীচীর সম্মানও রক্ষণীয়, অতএব গরুড় তাঁর দেহের একটি পালক নিক্ষেপ করলেন, অর্থাৎ যুদ্ধে অক্ষত থাকলেন না তিনি। ইন্দ্র তাতেই সন্তুষ্ট হয়ে তাঁকে বন্ধু করে নিলেন|

 

আবার নাগেদের সঙ্গেও বিষ্ণুর একটা সম্পর্ক আছে। নাগকুলে সবচেয়ে প্রসিদ্ধ হলেন অনন্তনাগ বা শেষনাগ। বিষ্ণু তাঁর ওপর শয়ন করেন। অনন্তনাগ যখন নিজের দেহটি পাকিয়ে ফেলেন, তখন সময় পিছন দিকে যায়, ব্রহ্মাণ্ডের লয় হয়। তিনি যখন পাক খোলেন, সময় এগিয়ে যায়, ব্রহ্মাণ্ডের আবার সৃষ্টি হয়|এই নাগও আবার পরম বিষ্ণু ভক্ত অর্থ্যাৎ দুই বিষ্ণু ভক্তের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা বা মৃদু শত্রুতা কিছু অস্বাভাবিক নয়|

 

প্রাকৃতিক ভাবে গরুড়ের সাথে নাগেদের সম্পর্ক খাদ্য ও খাদকের |গরুড়ের প্রধান খাদ্য সাপ তাই গরুড় কে সাপেরা ভয় পাবে এটাই স্বাভাবিক|প্রাকৃতিক নিয়মে এরা একে অপরের শত্রু|

 

গরুড় ও সাপেদের শত্রুতা নিয়ে শাস্ত্র গুলিতে একাধিক ঘটনার বর্ণনা আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য রামায়ণ এর একটি ঘটনা যখন রাম সেনা নাগ পাশে আবদ্ধ তখন তাদের উদ্ধার করতে আসে স্বয়ং গরুড় দেব | তার আসার পর সকলে নাগ পাশ থেকে মুক্ত হয়ে আবার রাবন সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ন হয়।আবার গরুড় যখন নিজের গতির জন্য অহংকারী হয়ে উঠেছিলেন তখন বিষ্ণুর আদেশে হনুমান গতিতে গরুড়কে পরাস্ত করে তাকে সঠিক দিশা দেখিয়েছিলেন।

 

আবার পর্বে অন্য এক পৌরাণিক দেবতা এবং

তার সাথে জড়িত একাধিক পৌরাণিক ঘটনা নিয়ে ফিরে আসবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরানের দেবদেবী – বরুন দেব

পুরানের দেবদেবী – বরুন দেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবতাদের উৎস তিন রকমের বেদে উল্লেখিত বৈদিক দেবতা,পুরানে উল্লেখিত পৌরাণিক দেবতা এবং আঞ্চলিক ভাবে লৌকিক কারনে উঠে আসা লৌকিক দেবতারা|এই ধারাবাহিক লেখায় পর্বে পর্বে আলোচনা করবো একেকজন দেবতা বা দেবী নিয়ে যারা মুলত পুরান থেকে উৎপত্তি লাভ করেছেন আজকের পর্বে পৌরাণিক এবং বৈদিক দেবতা বরুনদেব|

 

প্রাচীন বৌদ্ধ ধর্মেও বরুন দেবের উল্লেখ রয়েছে, এছাড়া পার্সি ধর্মে ও জৈন ধর্মে তিনি ভিন রূপে পূজিত হন এবং সিন্ধি দের ঝুলেলাল কেও বরুনের একটি রূপ বলেই মনে করা হয়|আধুনিক ব্যাবহারিক জ্যোতিষ শাস্ত্র, বিশেষ করে পাশ্চাত্য জ্যোতিষ শাস্ত্রে একটি গ্রহ হিসাবেও বরুন দেব অবস্থান করছেন|আবার বাস্তু শাস্ত্র অনুসারে বরুন দশদিকের একটি দিকের অধিকর্তা তাই তাকে সন্তুষ্ট রাখলে বাস্তুর কল্যাণ নিশ্চিত|

 

বৈদিক দেবতাদের মধ্যে প্রাচীনতম হলেন বরুন দেব, বেদে অসংখ্য শ্লোক রয়েছে তার উদ্দেশ্যে, তিনি কাশ্যপ ঋষি ও অদিতির পুত্র|সম্পর্কে ইন্দ্র, পবন এবং অগ্নি দেব তার সহদর|তার বাসস্থান হিসাবে সমুদ্রকে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তার বাহন মকর|এই জন্য অনেকেই তাকে জলের দেবতা মনে করেন|বরুন দেবের অস্ত্রর নাম বরুণাস্ত্র ও তার সঙ্গিনী বারুনী|তার মন্ত্র হিসাবে বেদে একটি মন্ত্র ও রয়েছে তা হলো ওঁম বরুনায় নমঃ|বরুন দেব আবার বশিষ্ঠর জনক|

 

রামায়নে লঙ্কা অভিযানের সময় রাম বরুন দেবকে রাস্তা দিতে বলেন বরুন দেব সাড়া না দেয়ায় বান নিঃক্ষেপ করতে গেলে তিনি রামকে দেখা দেন এবং লঙ্কা যেতে সাহায্য করেন।

 

আগামী পর্বে অন্য কোনো পৌরাণিক দেবতা নিয়ে বলবো |পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরানের দেবদেবী – অগ্নিদেব

পুরানের দেবদেবী – অগ্নিদেব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ঋগ্বেদ অনুসারে মানুষ ও ভগবানের মধ্যে বার্তাবাহকের কাজ করেন অগ্নি। তিনি হলেন যজ্ঞের রাজা। অগ্নি ছাড়া কোনও ধর্মীয় কাজই সম্পূর্ণ হয় না।হোম যজ্ঞ সবেতেই অগ্নি অপরিহার্য।
আজকের পর্বে জানাবো অগ্নি দেবের মাহাত্ম।

হিন্দুধর্ম অনুসারে আগুন হলেন একজন দেবতা, অগ্নিদেব। ঋগবেদের প্রথম মন্ত্রেই আগুনের উপাসনা করা হয়েছে।ঋগবেদের প্রথম অধ্যায়ের ৯টি শ্লোক অগ্নির উদ্দেশ্যে নিবেদিত। ঋগবেদের সকল মণ্ডলেই আগুনের উপাসনা করা হয়েছে।
অগ্নিকে অগ্রণী অর্থাত্‍ প্রথম হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। হিন্দুধর্মে যে অষ্টবসু অর্থাত্‍ আট দেবতার কথা বলা আছে, তার মধ্যে প্রথম হলেন অগ্নি।

একবার অগ্নির প্ররোচনায় পুলোমা নামে এক রাক্ষস সন্ন্যাসী ভৃগুর স্ত্রীকে অপহরণ করে।
ভৃগুর অভিশাপে অগ্নি সর্বগ্রাসী হয়ে যায়।

অগ্নির অর্থ হল যা সর্বদা ঊর্ধ্বমুখী। আগুনের শিখা সব সময় উপর দিকে মুখ করে থাকে। হিন্দুধর্মে আগুনের বিশেষ মাহাত্ম্য রয়েছে। আগুন সবকিছু পরিশুদ্ধ করতে পারে।আবার কেউ অন্যায় করলে তাকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার রয়েছে অগ্নির। অগ্নিদেব তাই দণ্ডাধীশ নামেও পরিচিত। ঋগ্বেদ অনুসারে অগ্নির পিতা শক্তি। অনেক জায়গায় অবশ্য বলা হয়েছে যে তিনি ঈশ্বরের মুখ থেকে সৃষ্টি হয়েছেন। তাঁর স্ত্রী হলেন ঋষি কাশ্যপের কন্য়া স্বহা। তাঁর তিনি পুত্র- পাবক, পাবমান ও সূচী।

আগুন সব সময় উর্ধ্বগামী। সেই কারণে মৃতদেহ আগুনে দাহ করা হয় এবং যজ্ঞ হোক বা আরতি, কোনও শুভ কাজ আগুন ছাড়া সম্পূর্ণ হয় না। সারা বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডে চার স্থানে অগ্নি বিদ্যমান। প্রথম আগুন হল সূর্য, যা আকাশে অবস্থিত। দ্বিতীয় আগুন হল বিদ্য়ুত্‍, যা মহাশূন্যে অবস্থিত। তৃতীয় আগুন হল সাধারণ আগুন, যা মর্ত্যে অবস্থিত। এবং চতুর্থ আগুন হল অগ্নুত্‍পাত, যা পাতালে অবস্থিত।

ব্যাবহারিক দিক দিয়ে আগুনের পাঁচটি রূপ সবথেকে বিখ্যাত। সেগুলি হলো যথাক্রমে

যজ্ঞাগ্নি: অর্থাত্‍ যজ্ঞের আগুন। এই আগুন ঈশ্বরের উপাসনা করে মানুষের কল্যানের জন্য ব্যবহার করা হয়।

ভোজাগ্নি: আগুনের এই রূপ ব্য়বহার করা হয় খাদ্য প্রস্তুত করতে হয়। অনেক বাড়িতে আগুনকে খাদ্য দেওয়ার জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে খাবারের প্রথম টুকরো আগুনে নিক্ষেপ করার রীতি প্রচলিত আছে।

জঠরাগ্নি: আগুনের এই রূপ মানুষকে কাজ করার জন্য উত্‍সাহ দেয়।

দেবাগ্নি: এই আগুন অশুভকে নাশ করে এবং কোনও কিছুর শুভ সূচনা করে। দাবানল বা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে যে আগুন লাগে, তাকে দেবাগ্নি বলা হয়। মহাভারতে বলা আছে অগ্নিদেবের একবার প্রচণ্ড বদহজম হয়ে গিয়েছিস। সেই জ্বালা তিনি শ্রীকৃষ্ণ ও অর্জুনের সাহায্যে খাণ্ডব বন দহন করে নির্বাপিত করেন। খাণ্ডব দহনের পর সেই স্থানে ইন্দ্রপ্রস্থ নির্মাণ করে পাণ্ডবরা।

পঞ্চম রূপে আগুন মানব শরীরকে মৃত্যুর পর দাহ করে পঞ্চভূতে মিলিয়ে দেয়।

সব আগুনের উৎসই অগ্নি দেব স্বয়ং তার অধীনের থাকে আগুনের সর্বগ্রাসী ক্ষমতা।

পরবর্তী পর্বে পুরানের অন্য এক দেবতা বা দেবী কে নিয়ে আলোচনা করবো। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরানের দেব দেবী – বাস্তু দেবতা 

পুরানের দেব দেবী – বাস্তু দেবতা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাস্তু শাস্ত্রের জন্ম হয়েছে পুরান

থেকে কারন বাস্তুদেবতার উৎপত্তি এই পুরানেই লিপিবদ্ধ হয়েছে এবং বাস্তু দেবতার পূজার্চনার ব্যাপারে একটি মজার ঘটনার উল্লেখ মেলে মৎস্য পুরানে ।

 

একটি পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী অনেকদিন আগে অন্ধক নামে এক অসুরের সাথে দেবাদিদেব মহাদেবের অনেক বছর ধরে যুদ্ধ হয় এবং অবশেষে মহাদেব অসুরকে বধ করেন ।

শিব যখন অসুরকে বধ করেন তখন তার শরীর নির্গত ঘাম থেকে এক দেবতার জন্ম হয় যিনি মৃত অন্ধকাসুর এবং তার যোদ্ধা গণের সমস্ত রক্ত পান করেন । কিন্তু তবুও তার খুদা শান্ত না হওয়াতে তিনি দেবাদিদেব মহাদেবের তপস্যা করেন । মহেশ্বর তপস্যাতে তুষ্ট হয়ে বর প্রদান করেন আর সেই বর পেয়ে তিনি ভূলোকে এসে সমস্ত প্রাণীদের খেতে শুরু করেন। তার এই ভয়ঙ্কর রূপ দেখে দেবতা, দানব, রাক্ষস এবং সমস্ত প্রাণী আতঙ্কিত হয়ে পরম পিতা ব্রহ্মাকে স্মরণ করেন । ব্রহ্মদেব তখন তাকে পেট পেতে উপুড় হওয়ার পরামর্শ দেন এবং ব্রম্হার পরামর্শ মেনে তিনি তাই করেন । এরপর ব্রম্হার পরামর্শ অনুযায়ী দেবতারা সেই ক্ষুদার্থ দেবতার পেটের ভেতর বিভিন্ন অংশে গিয়ে বসলেন।

 

ব্রহ্মা তখন তাকে বর দিলেন যে তিনি বাস্তু দেবতা রূপে সর্বত্র পূজিত হবেন । নতুন বাস ভবনের নির্মাণের আগে যদি কেউ তোমাকে বাস্তুদেবতা বলে মেনে পুজো করে এবং অন্নদান করে তাহলে তুমি তাকে সুখ সমৃদ্ধি দিয়ে ভরিয়ে তুলবে কিন্তু যদি কেউ তোমার পুজো না করে নতুন ঘরে বসবাস শুরু করে তবে তুমি তাকে ভক্ষণ করতে পারবে, এমনকি তাকে লাঞ্ছনাও দিতে পারবে ।আজও এই নীতি মেনেই ভারতবর্ষে বাস্তু পূজা হয় এবং বাস্তু দেব কে সন্তুষ্ট করা হয়।

 

সেই থেকে বাস্তু দেবতা আমাদের প্রত্যেকের গৃহে অবস্থান করছেন। তাকে সন্তুষ্ট রাখতে পারলেই বাস্তু হবে ত্রুটিমুক্ত এবং সুখ সমৃদ্ধিতে পরিপূর্ণ। অন্যথা হলেই বাস্তু দেবের রোষের মুখে

পড়তে হয়ে।

 

আবার পরের পর্বে অন্য এক পৌরাণিক দেবতার কথা নিয়ে ফিরে আসবো। থাকবে অনেক রোমাঞ্চকর পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পুরানের দেব দেবী – বিশ্বকর্মা

পুরানের দেব দেবী – বিশ্বকর্মা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ সারা বাংলা তথা সারা দেশে
মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হবে বিশ্বকর্মাপূজা|
আসুন আজকের এই পবিত্র দিনে জেনে নেই দেব শিল্পী বিশ্বকর্মার আধ্যাত্মিক স্বরূপ ও তার সাথে জড়িত কিছু পৌরানিক ঘটনা|

বিশ্বকর্মা মূলত বৈদিক দেবতা|ঋগ বেদ সহ একাধিক ধর্ম গ্রন্থে এবং রামায়ন মহাভারতের মত মহাকাব্যে উল্লেখ রয়েছে বিশ্বকর্মার|তিনি ব্রহ্মা সৃষ্টি কর্মের অন্যতম সহযোগী|সৃষ্টির একদম আদি লগ্ন থেকে বিভিন্ন সৃষ্টি কর্মের মাধ্যমে তিনি জগৎ নির্মাণের কাজে যুক্ত|বিশ্বকর্মার পুত্র বিশ্বরূপকে ইন্দ্র বধ করেছিলেন এবং ইন্দ্র ও বিশ্বকর্মার শত্রুতাও দেখা দিয়েছিলো|যদিও নিজের কর্তব্যে সদা অবিচল বিশ্বকর্মা এবং নিজের সৃষ্টিকর্মে সর্বদা মগ্ন তিনি|

আমাদের সনাতন ধর্মে ভগবান বিষ্ণু তার সৃষ্টি কর্মের এক একটি গুরু দায়িত্ব তুলে দিয়েছেন এক একজন দেবতার উপর যেমন বাণিজ্যর ভার দেবী লক্ষীর উপর, শিক্ষা ও সংস্কৃতির দায়িত্ব স্বরস্বতীর আবার প্রতিরক্ষার দায়িত্বে রয়েছেন দেবী দূর্গা|এদের মধ্যে বিশ্বকর্মা হলেন স্থাপত্য ও নির্মাণের দেবতা|তিনি দেব শিল্পী|

পুরান অনুসারে দেবগুরু বৃহস্পতির একমাত্র বোন যোগসিদ্ধার পুত্র বিশ্বকর্মা এবং তাঁর বাবা অষ্টম বসুর শ্রেষ্ঠ বসু প্রভাস। আবার ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বলা আছে, প্রজাপতি ব্রহ্মার নাভিকোষ থেকে বিশ্বকর্মার উৎপত্তি।বিশ্বকর্মার স্ত্রীর নাম ঘৃতচী।

বিশ্বকর্মা চতুর্ভুজ এবং তাঁর বাহন হাতি। পুরাণ মতে, বিশ্বকর্মা মহাবীর তাকে বহন করার জন্য প্রয়োজন প্রচুর শক্তি তাই জগতের অন্যতম বলশালী প্রাণী হাতিকে তার বাহন রূপে
নির্বাচিত করা হয়েছে।

পুরান ও অন্যান্য শাস্ত্রে বর্ণিত একাধিক অস্ত্র, ও গুরুত্বপূর্ণ বস্তুর প্রধান কারিগর বিশ্বকর্মা|বিষ্ণুর সুদর্শন চক্র, কুবেরের পুস্পক রথ, শিবের ত্রিশূল
পরশুরামের ধনুক, ইন্দ্রের প্রথম বজ্র এসবই বিশ্বকর্মার সৃষ্টি|রাবনের লংকা নগরী, কুবেরের অলোকা পুরী,এমনকি পুরীর বিখ্যাত জগন্নাথ বিগ্রহও বিশ্বকর্মার স্বহস্তে নির্মিত|

যখনই দেব লোকে কোনো বিশেষ স্থাপত্য বা দৈব নিদর্শন সৃষ্টির প্রয়োজন হয় ডাক পড়ে বিশ্বকর্মার|কখনো নিরাশ করেন না বিশ্বকর্মা|নিজের অলৌকিক শিল্প সত্ত্বা ও কঠোর পরিশ্রমের দ্বারা নির্মান করেন একের পর এক শিল্প কর্ম তথা স্থাপত্য শিল্পের সর্বশ্রেষ্ঠ নিদর্শনগুলি|

বিশ্বকর্মা পুজো নিষ্ঠা সহকারে পালন করেন দেশের শিল্পীরা, শ্রমিকরা এবং স্থাপত্য শিল্পের সাথে যুক্ত শ্রমিকেরা|আজ ভাদ্র সংক্রান্তি তার পুজোর দিন। সবাইকে জানাই বিশ্বকর্মা পুজোর শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন।

ফিরে আসবো ধারাবাহিক এই আলোচনার পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে।থাকবে অন্য
এক দেবতা বা দেবীর কথা।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।