রামনবমীর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
আজ রাম নবমী। দীর্ঘ টানা পোড়েন এবং আইনি জটিলতার পরে রাম লালা তার জন্ম ভূমিতে বিরাজমান হয়েছেন। এই মুহূর্তে সারা দেশ জুড়ে শ্রী রাম কে নিয়ে ব্যাপক উৎসাহ এবং উদ্দীপনা চোখে পড়ছে তবে এতো কিছুর মাঝে শাস্ত্রকে ভুলে গেলে চলবেনা। আজ আপনাদের রাম নবমীরে শাস্ত্রীয় এবং আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা জানাবো।
শ্রী রাম ছিলেন সূর্য্য বংশীয় রাজা দশরথের অস্বমেধ যোগ্য লব্ধ যেষ্ঠ পুত্র। শৈশব থেকেই তিনি রাজধর্ম পালন করছেন কারন রামের যখন চোদ্দ বছর বয়স তাকে ঋশি বিস্বামিত্র রাক্ষস দের হাত থেকে যজ্ঞ রক্ষা করার জন্য দশরথের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে যান। সেই থেকে শুরু হয় তার দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন যা শেষ হয় রাবন বধের মধ্যে দিয়ে।
বিভিন্ন যুগে ভগবান বিষ্ণু বিশ্ব সংসারের সকল মানুষকে ন্যায়পরায়ণতার ও সত্যের পথ প্রদর্শন করতে মিথ্যার উপর সত্যের জয় প্রতিষ্ঠা করতে
নানা অবতার রূপে আমাদের ধরিত্রী তে অবতরণ করেন|ত্রেতা যুগে রাম ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রূপে জণ্মেছিলেন।সনাতন ধর্মে যতজন ভগবানের অবতার আছেন তাদের মধ্যে রামকে এক কথায় সর্বশ্রেষ্ঠ বলা যায়।
তিনি ন্যায় এবং সুশাসনের প্রতীক। তার জীবন এবং দর্শন ভারতের আদর্শ। আজ তার তার জন্ম তিথিকেই আমরা রাম নবমী রূপে পালন করি।রাম নবমী পালন করার মূল উদ্দেশ্য হল অধর্মকে নিক্ষেপ করে ধর্মকে স্থাপন করা। মন্দ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তির সূচনা করা।ভগবান রামের উল্লেখ যে শুধুমাত্র প্রাচীন হিন্দু গ্রন্থে পাওয়া যায় তা নয়, জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থেও ভগবান রামের উল্লেখ আছে। বিশ্বের বহু দেশেই রামের মন্দির আছে,ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম রাম মূর্তি|শ্রী রাম সততার প্রতীক, ত্যাগের প্রতীক,অসত্যর উপর সত্যর জয়ের প্রতীক|রাজ ধর্ম পালন করতে তিনি যে আত্মত্যাগ করেছেনতা এক দৃষ্টান্ত|রাম নামকে বলা হয় কলিযুগের সব অন্ধকারকে দূর করে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান অস্ত্র|
শাস্ত্রমতে এই রাম নবমী উপলক্ষ্যে ধার্মিক ব্যক্তিরা সমগ্র দিন জুড়ে বৈদিক মন্ত্র পাঠ করেন। সমগ্র দিনজুড়ে ভক্তিমূলক গান গাওয়া বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয় বইগুলি থেকে পাঠ করে শোনাবার রীতি আছে| এই দিনটিতে রাম কথার বর্ণনা করে, রাম কাহিনী পড়ে সহজেই বিষ্ণুর কৃপা লাভ করা যায়, অনেকে মন্দিরে যান, অনেকে বাড়িতে রামের মূর্তিতে পূজা করেন। বহু স্থানে সূর্য দেবকে জল প্রদান করে সূর্য দেবতার আশীর্বাদ গ্রহণ করা হয় আজকের দিনে|
এই কলি যুগে রাম নাম মুক্তির পথ। শুধু মাত্র নাম জপের মাধ্যমে অসাধ্য সাধন হতে পারে। পুরানে আছে দস্যু রত্নাকর শুধু রাম নাম জপ করে সব পাপ থেকে মুক্ত হয়ে ঋষি বাল্মীকিতে রূপান্তরিত হয়ে ছিলেন।
সবাইকে জানাই রাম নবমীর শুভেচ্ছা। ফিরে আসবো আগামী দিনে। শিব সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে আলোচনায়। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
রামনবমীর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা
দেবী অন্নপূর্ণার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা
দেবী অন্নপূর্ণার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা
বিশেষ পর্ব
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
আজ দেবী অন্নপূর্ণার পূজা|আজকের এই বিশেষ পর্বে দেবী অন্নপূর্ণার রূপ এবং তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা করবো।
তিথি মেনে চৈত্র মাসের শুক্লাপঞ্চমী তিথিতে অন্নপুর্ণার পুজা করা হয়। সাধারণত কালী বা জগদ্ধাত্রী পুজোর মতই তান্ত্রিক মতে এই
পুজো হয়ে থাকে।
শাস্ত্র মতে দেবী অন্নপূর্ণা মূলত দ্বিভূজা আবার চতুর্ভূজা রূপেও কোথাও কোথাও তার পুজো দেবীর গায়ের রঙ উজ্জ্বল গৌর বর্ণ। দেবীর বামহাতে সোনার অন্নপাত্র। ডানহাতে চামচ বা হাতা।মাথায় বিরাজিত অর্ধচন্দ্র। তিনি ক্ষুধার্ত মহাদেবকে অন্নদান করছেন স্মিতহাস্যে তার এক পাশে শ্রী ও অন্য পাশে ভূমি|এই হলো দেবীর শাস্ত্রে উল্লেখিত রূপ আবার দেবীকে একা শান্ত এবং সৌম রূপে পদ্মাসনে বিরাজিতা রূপেও দেখা
যায়।
সনাতন ধর্মে দেবী অন্নপূর্ণার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অপরিসীম|অন্নদামঙ্গল কাব্য রচিত হয়েছে দেবীর মহিমা কীর্তন করে। আবার প্রাচীন তন্ত্রসার গ্রন্থে দেবীর পূজা পদ্ধতি রয়েছে।
দেবী অন্নপূর্ণা সম্পর্কে অনেকে মনে করেন যে তিনি গ্রিক ও রোমান দেবী ‘অন্নোনা’র রূপান্তর। প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যর ধ্বংসাবশেষ থেকে দেবীর যে মূর্তি পাওয়া যায় তাতে তার বামহাতে শিঙ্গা আর ডানহাতে তুলাদণ্ড।যদিও এই মতবাদ যুক্তি গ্রাহ্য নয় কারন। দেবী অন্ন পূর্ণা হাজার হাজার বছর থেকে সনাতন ধর্মে পূজিতা হয়ে আসছেন। তিনি শস্যর দেবী রূপে প্রাচীন হরপ্পা সভ্যতায় পূজিতা ছিলেন।
আবার গ্রাম বাংলায় তিনি লৌকিক দেবী। ভালো ফসল পাওয়ার জন্য এবং সংসারে স্বচ্ছলতা প্রার্থনা করে বঙ্গদেশে সাধারণ মানুষ অন্নপূর্ণার পুজো করেন অগ্রহায়ণ মাসের নবান্নের সময়। এটি প্রাচীন পুজো যা পরবর্তীকালে কাশীতে অনুপ্রবেশ করেছিল প্রবাসী বাঙালিদের মাধ্যমেই।
তীর্থ ক্ষেত্র কাশীতে দেবী অন্নপূর্ণার বিখ্যাত মন্দির রয়েছে। সেখানে প্রতি বছর ধুমধাম করে অন্নপূর্ণা পুজো হয়ে থাকে। এই মন্দিরে অন্নকূট উত্সব বিখ্যাত।
দেবী অন্নপূর্ণাকে প্রনাম জানিয়ে আজকের পর্ব শেষ করলাম। ফিরে আসবো শিব সংক্রান্ত আলোচনা নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
বাংলার অন্নপূর্ণা পুজোর ইতিহাস
বাংলার অন্নপূর্ণা পুজোর ইতিহাস
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
আসন্ন অন্নপূর্ণা পুজো উপলক্ষে দেবী অন্নপূর্ণার পুজোর মাহাত্ম ও তার ইতিহাস নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা করছি। আজ বঙ্গ দেশে দেবী পুজোর ইতিহাস নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আপনাদের সামনে রাখবো।
বাংলায় বর্তমানে দূর্গা পুজো এবং কালী পুজো প্রধান ধর্মীয় উৎসব হলেও এক কালে অন্নপূর্ণা পুজোর বেশ চল ছিলো মূলত বনেদি জমিদার বা রাজ পরিবার গুলোতেই এই পুজো হতো। সেই ভাবে অন্নপূর্ণা পূজা বারোয়ারী পুজোর রূপ পায়নি। তবে অন্নপূর্ণা পুজোর ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ এবং তাৎপর্য পূর্ণ।
দেবী অন্নদার কৃপা প্রাপ্ত হয়ে ভবানন্দ মজুমদার জাহাঙ্গীরের কাছে রাজা উপাধি লাভ করেছিলেন।তিনিই দেবী অন্নপূর্ণার পুজো বঙ্গদেশে প্রচলন করেছিলেন। তিনি ছিলেন কৃষ্ণনগরের মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র রায়ের পূর্বসুরী। তাকেইবাংলার অন্নপূর্ণা পুজোর সূচনা করার কৃতিত্বদেয়া হয়
তবে বহু আগেথেকেই বিভিন্ন শাস্ত্রে বঙ্গদেশে দেবী অন্নপূর্ণার পুজোর উল্লেখ আছে।অন্নদামঙ্গলকাব্যে দেবী পুজোর বিষয়ে অনেককিছুই লেখা আছে।
শোনাযায় নবাব মুর্শিদকুলি খাঁয়ের কাছে নির্ধারিত দিনে কর বা রাজস্ব মেটাতে না পেরে দুর্গাপুজোর সময় মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র মুর্শিদাবাদে কারারুদ্ধ হন। সেই সময়ে দেবী অন্নপূর্ণা রাজাকে স্বপ্নে দর্শন দিয়ে অন্নপূর্ণা পুজোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। মহারাজা কৃষ্ণ চন্দ্র মুক্তি পেয়ে সেই আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে ছিলেন।
আবার অনেকে মনে করেন এই পুজো এসেছিল কাশী থেকে কারন বাংলার সঙ্গে কাশীর যোগ বহুকালের এবং কাশী হল মা অন্নপূর্ণার প্রধান অধিষ্ঠানক্ষেত্র।
বাংলায় দেবী অন্নপূর্ণার একটি মন্দির রয়েছে বেহালার বড়িশায়। সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবারের এক নিঃসন্তান সদস্য তার স্ত্রীর কাসিবাস আটকাতে নিজের জমিদারিতেই তৈরী করে দেন অন্নপূর্ণার মন্দির যা আজও স্বমহিমায় বিরাজমান।পরবর্তীতে বাংলার প্রখ্যাত কিছু রাজ পরিবার এবং জমিদারদের হাত ধরে তৈরী হয় বেশ কিছু অন্নপূর্ণা মন্দির।যার মধ্যে রয়েছে ব্যারাকপুরে রানী রাসমণির পরিবারের অন্নপূর্ণা মন্দির যার কথা আগের পর্বে বিস্তারিত ভাবে আলোচনা করেছি।
একসময় রাজা বা জমিদার বাড়ির অন্দর মহল ছাড়িয়ে সাধারন গৃহস্ত বাড়িতেও শুরু হয় দেবী আরাধনা। সেখানে তিনি লৌকিক দেবী। সমৃদ্ধি এবং অন্নের দেবী।ঘরের মেয়ে দুর্গারই যেনো আরেকটি রূপ দেবী অন্নপূর্ণা।
দেবী অন্নপূর্ণার পুজো সংক্রান্ত আরো
অনেক শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা ও তথ্য নিয়ে ফিরে আসবো
আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
বিশেষ পর্ব – রানী রাসমণির অন্নপূর্ণা মন্দির
বিশেষ পর্ব – রানী রাসমণির অন্নপূর্ণা মন্দির
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
আসন্ন অন্নপূর্ণা পূজা উপলক্ষে আগামী তিন দিন দেবী অন্নপূর্ণার মাহাত্ম এবং বাংলার একটি প্রাচীন এবং বিখ্যাত অন্নপূর্ণা মন্দির নিয়ে লিখবো।
রানী রাসমণি তার দক্ষিনেশ্বর মন্দিরের জন্য বেশি জনপ্রিয় হলেও তার পরিবারে দেবী অন্নপূর্ণার পুজোর প্রচলন ছিলো এবং একটি অন্নপূর্ণা মন্দিরও তারা নির্মাণ করিয়ে ছিলেন।
ব্যারাকপুরের অবস্থিত এই অন্নপূর্ণা মন্দির নির্মিত হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরের মন্দির নির্মাণের বেশ কয়েক বছর পরে। মথুরমোহন বিশ্বাসের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতেই জগদম্বা তৈরি করেছিলেন এই মন্দির।
এই অন্নপূর্ণা মন্দির নির্মাণের সাথে জড়িত আছে এক অলৌকিক ঘটনা। একবার রানি রাসমণি
তাঁর জামাই মথুরমোহন বিশ্বাস সহ অন্যান্য আত্মীয়স্বজন নিয়ে জল পথে কাশীযাত্রা করেছিলেন। যাত্রা শুরুর দিন রাতেই রানীমা দেবীর স্বপ্নাদেশ পান যে কাশী না গিয়ে গঙ্গার পাড়েই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে তাঁর নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করা হোক। রানি কাশীযাত্রা স্থগিত করে ফিরে আসেন। নানা কারণে সেবার মন্দির তৈরী হয়নি ।তারমধ্যে তৈরী হয়ে যায় দক্ষিনেশ্বর মন্দির।এদিকে অন্নপূর্ণা-দর্শন না হওয়ায় মথুরমোহনের মনে মনে ইচ্ছে ছিল দেবী অন্নপূর্ণার মন্দির প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় তা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ করেন তাঁর স্ত্রী রানি রাসমণির ছোটো মেয়ে জগদম্বাদেবী। তৈরী হয় তার মায়ের স্বপ্নদেশ পাওয়া অন্নপূর্ণা মন্দির।
এই অন্নপূর্ণা মন্দির টি ন’টি চূড়াবিশিষ্ট নবরত্ন
শৈলীর মাতৃমন্দির, ছ’টি আটচালার শিবমন্দির, দু’টি নহবতখানা, নাটমন্দির, ভোগের ঘর, গঙ্গায় স্নানঘাট ইত্যাদি তৈরি হয়েছিল।অন্নপূর্ণা মন্দিরটি দেখতে অবিকল দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের মতো।মন্দিরের গর্ভগৃহে অধিষ্ঠিত শিব ও অন্নপূর্ণার বিগ্রহ অষ্টধাতুর। মাতৃমূর্তি দক্ষিণমুখী।পাশে ভিক্ষা পাত্র হাতে শিব।যেমন টা শাস্ত্রে বর্ণিত আছে তেমনই।
অন্নপূর্ণা মন্দিরের তোরণদ্বারের ওপর স্থাপিত রয়েছে এক সিংহমূর্তি। যা নিয়ে সেকালে ব্রিটিশরা আপত্তি করে ছিলো কারণ ব্রিটিশদের দাবি ছিল, সিংহ তাদের রাজশক্তির প্রতীক। বিবাদ গড়ায় আদালত পর্যন্ত। তবে আইনি লড়াইয়ে জয় হয়েছিল রাসমণির পরিবারের। হার মানে ইংরেজরা।
ব্যারাকপুরে অন্নপূর্ণা মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে ছ’টি শিবমন্দির।মন্দিরের পাশেই বাঁধানো গঙ্গার ঘাট আছে যা রানি রাসমণি ঘাট নামে পরিচিত।
শোনা যায় এই ঘাটে ঠাকুর স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ
স্নান করেছিলেন।
দেবী অন্নপূর্ণাকে নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলতে থাকবে। ফিরে আসবো
আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব কথা – শিব ধাম কৈলাশ
শিব কথা – শিব ধাম কৈলাশ
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
আজকের পর্ব শিব ধাম কৈলাশ নিয়ে।
শাস্ত্রে কৈলাস পর্বতকে শিবের ‘লীলাধাম’ বলা হয়েছে কারন শিব এবং তার সহধর্মিনী দুর্গা ও কার্তিক গণেশ সহ শিবের সকল অনুসারী ভক্তরা কৈলাসে বাস করেন|
এই কৈলাশ নিয়ে রয়েছে অনেক লোক কথা আছে অনেক কিংবদন্তী। তার কতোটা সত্য কতোটা কল্পনা তা বিচার করা খুব কঠিন। তবে একথা সত্য যে কৈলাশ হিন্দু এবং বৌদ্ধদের মধ্যে অত্যন্ত পবিত্র এবং রহস্যময় এক স্থান।
প্রতি বছর বহু মানুষ মানস সরোবর যাত্রা করেন। তবে কৈলাস পর্বতের শৃঙ্গে এখনও পর্যন্ত কেউ উঠতে পারেননি। একটি নির্দিষ্ট পয়েন্টের পর যাওয়া সেখানে নিষিদ্ধ। শোনা যায় ঠিক পিরামিডের আকারের এই পাহাড়ে অনেক প্রাচীন গুম্ফা ও গুহা রয়েছে। যেখানে দেখা মিলতে পারে বৌদ্ধ ও হিন্দু সন্ন্যাসীদের। এই সন্ন্যাসীরা লোকচক্ষুর আড়ালে বহু বছর ধরে তপস্যা করে চলেছেন।
ভৌগোলিক ভাবে কৈলাস পর্বতকেই পৃথিবীর কেন্দ্র বলা হয়ে থাকে।অনেকে বলে থাকেন কৈলাস পর্বত থেকে ফেরার পরে হঠাত্ করে চুল ও নখ বেশ কিছুটা বড় হয়ে যায়। আবার কথিত আছে, একবার কয়েকজন সাইবেরিয়ান পর্বতারোহী কৈলাস পর্বতের নিষিদ্ধ এলাকায় প্রবেশ করেছিলেন। সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বয়স কয়েক দশক বেড়ে যায় এবং এর এক বছর পরেই বয়সজনিত কারণে মৃত্যু হয় তাঁদের|এসবই অবশ্য প্রচলিত জনশ্রুতি বা কিংবদন্তী।
একটি ব্যাখ্যা অনুসারে সময়ের ধরা বাঁধা গন্ডির বাইরে অবস্থিত এই পর্বত তাই এখানে নিদ্দিষ্ট এরিয়ার বাইরে নিষিদ্ধ জায়গায় যাওয়া মানে প্রকৃতির বিরুদ্ধে যাওয়া । তাই এই সব হয়।
তিব্বতি লোককথা অনুযায়ী, মিলারেপা নামে এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী একবার কৈলাস পর্বতের শীর্ষের কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে তিনি সবাইকে সাবধান করে দেন যে ঈশ্বরের বাসস্থানে না যাওয়াই ভালো। মানস সরবোর ছাড়াও কৈলাস পর্বতের নীচে রয়েছে আরও একটি অপরূপ সুন্দর হৃদ রাক্ষস তাল।প্রায় পনেরো হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত মানস সরোবর বিশ্বের উচ্চতম মিষ্টি জলের হৃদ। আরও একটি আশ্চর্যের বিষয় যত জোরেই হাওয়া থাকুক এই মানস সরোবরের জল সবসময়ই শান্ত কিন্তু রাক্ষসতালের জল সব সময় অশান্ত থাকে।
বিখ্যাত এক রাশিয়ান চিত্রকার বহুকাল এই অঞ্চলে কাটিয়ে তার অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেছিলেন, তার কথায় কৈলাসের আসেপাশে শাম্বালা নামের একটি রহস্যময় রাজ্য আছে। সেখানে শুধু উচ্চ কোটির তপস্যিরা বসবাস করেন|এই শাম্বালাই অনেকের মতে জ্ঞান গঞ্জ
যেখানে উচ্চ কোটির সাধু মহাত্মারা বাস করেন।
বেশ কিছু বছর আগে আরো একটি রাশিয়ান অভিযাত্রী দল কৈলাশ অভিযানে গেছিলো তারা ফিরে এসে জানায় যে কৈলাশের আশেপাশে
বহু অলৌকিক ঘটনা ঘটে।যেমন রাতের নিশ্তব্দতায় পাহাড়ের ভিতর থেকে একটি আজব ফিসফিস এর শব্দ আসে। একবার নয় বহু বার এমন অভিযান হয়েছে এবং সবাই স্বীকার করেছেন যে কৈলাস পর্বতের চারিদিকে একটি অপার্থিব এবং অলৌকিক শক্তির স্রোত বয়ে চলে|
আমার মতে যেখানে বাস করেন স্বয়ং মহাদেব সেই স্থান ঘিরে রহস্য ও অলৌকিক ঘটনা ঘটবে সেটাই স্বাভাবিক
সামনেই অন্নপূর্ণা পুজো ফিরে আসবো আগামী পর্বে থাকবে দেবী অন্নপূর্ণাকে নিয়ে শাস্ত্রীয়
আলোচনা।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব অবতার – হনুমান
শিব অবতার – হনুমান
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
শিবের সর্বাধিক জনপ্রিয় এবং পৌরাণিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন অবতার বা অংশ হলেন হনুমান।আজকের পর্বে আপনাদের জানাবো রূদ্র
অবতার হনুমান সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য|
কবিরাজ তুলসীদাস হনুমানের সাক্ষাৎ দর্শন লাভ করার পর হনুমান চালিসা রচনা করে ছিলেন। তার কথায় ” শঙ্কর সুমন কেশরী নন্দন ” অর্থাৎ হনুমান কেশরী পুত্র এবং শিবের অংশ রূপে তার জন্ম। হনুমানের মায়ের নাম ছিল অঞ্জনা। হনুমানের পালক পিতা হলেন পবন দেবতা|রাক্ষস বাহিনীর অত্যাচার থেকে ধরিত্রীকে মুক্ত করতে তথা ভগবান রামের সেবা ও রাম নাম প্রচারের জন্যই রুদ্র অবতার হনুমানের আবির্ভাব।
পুরানের একটি ঘটনা অনুসারে একদা দশানন রাবণ কৈলাশে পাহারারত নন্দীকে ব্যাঙ্গ করলেন বানর বলে|ক্ষিপ্ত হয়ে নন্দী রাবণকে অভিশাপ দিলেন এক বানরের হাতেই রাবণ আর তার কূল ধ্বংস হবে|এই অভিশাপই পরবর্তীতে সত্য হয়েছিলো। রাবনের পতনের বড়ো ভূমিকা নিয়েছিলেন হনুমানজি।
শুধু রামায়ণ নয়। হনুমানজী দ্বাপর যুগেও ছিলেন।এমনকি মহাভারতেও তার উল্লেখ রয়েছে মনে করা হয় কুরুক্ষে যুদ্ধে অর্জুন ও শ্রীকৃষ্ণের রথের ধ্বজা হিসেবে ছিলেন। তিনি সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি শ্রীকৃষ্ণের ইচ্ছায়।কিন্তু ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সেবা করেছেন। হনুমানজীর অনুরোধে শ্রীকৃষ্ণ রামচন্দ্রের রূপ ধারণ করে হনুমানকে একবার দর্শন দিয়েছিলেন।শাস্ত্র মতে হনুমান চার যুগে অমর অর্থাৎ তিনি আজও স্বশরীরে এই পৃথিবীতে বিরাজমান।
বজরংবলী অষ্ট সিদ্ধির অধিকারী। অর্থাৎ আটটি দুর্লভ ক্ষমতা রয়েছে তার। আবার তার স্মরণাগত দের গ্রহ রাজ শনিদেব কোনো ক্ষতি করেন না কারন রাবনের কারাগার থেকে তিনি শনিদেবকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং শনিদেব খুশি হয়ে তাকে এই বর দিয়েছিলেন।
একবার শত্রুঘ্ন ও রাজা বীরমণির মধ্যে ভয়ানক যুদ্ধ হয়। রাম ভক্ত হনুমান বীরমণির সেনার সংহার শুরু করে দেন। রাজা বীরমণিকে মহাদেব তার রাজ্য রক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন তাই মহাদেবকে বাধ্য হয়ে তার নিজের অবতারের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামতে হয়। শ্রী রামের হস্থক্ষেপে সে যাত্রায় যুদ্ধ থামে এবং হনুমানের পরাক্রমে খুশি হয়ে শিব তাকে আশীর্বাদ করেন।শিব এবং তার অবতারের মধ্যে এই যুদ্ধ পুরানে বেশ বিরল ঘটনা।
অনেকেই মনে করেন বজরংবলী ব্রহ্মচারী। অবিবাহিত।একথা আংশিক সত্য,পুরান অনুসারে হনুমান বিবাহিত এবং তার সন্তানও রয়েছে|
সূর্যদেব ছিলেন হুনুমানের শিক্ষক, তিনি হনুমানকে নবনিধীর শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন কিন্তু নবম সূত্রটি কেবল মাত্র বিবাহিত দের জন্যে তাই বিবাহ করা বাধ্যতামূলক ছিলো।এই কারনে শিবের আশীর্বাদে শুভ্রলা নামে একটি কন্যা সৃষ্টি হয় এবং হনুমানের সাথে তার বিবাহ হয় তবে বিবাহের পরের মুহূর্তেই শুভ্ৰলা অদৃশ্য হয়|এই ভাবে বিবাহিত হয়েও ব্রহ্মচারী রয়ে গেলেন হনুমান|অন্ধ্রপ্রদেশের একটি মন্দিরে হনুমান তার স্ত্রী শুভ্ৰলার সাথে একত্রে পূজিত হন|
শাস্ত্র মতে হনুমানের একটি পুত্রও ছিলো যার জন্ম হয়ে ছিলো অদ্ভুত ভাবে, লঙ্কা অভিযানের সময়ে হনুমানের শরীরের এক ফোঁটা ঘাম পড়েছিলো সমুদ্রে এই ঘামের বিন্দু থেকে জন্মান হনুমান পুত্র মকরধজ। পিতার ন্যায় তিনিও ছিলেন অত্যন্ত
শক্তিশালী যোদ্ধা।
শিব সংক্রান্ত আরো অনেক তথ্য নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বগুলিতে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব কথা – দেবী অন্নপূর্ণা ও মহাদেব
শিব কথা – দেবী অন্নপূর্ণা ও মহাদেব
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
সামনেই দেবী অন্নপূর্ণারে পুজো।তিনি অন্নের দেবী, সুখ ও সমৃদ্ধির দেবী|মর্তে দেবীর আবির্ভাবের সঙ্গে মহাদেবের গভীর সম্পর্ক রয়েছে আজ সেই পৌরাণিক ঘটনা আপনাদের জানাবো।
পুরাণ মতে দেবী পার্বতীর সঙ্গে দেবাদিদেবের মতবিরোধে দেবী কৈলাস ত্যাগ করলে মহামারি, খাদ্যাভাব ঘটে। ভক্তগণকে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দেবাদিদেব ভিক্ষার ঝুলি নিজ কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু দেবীর মায়ায় ভিক্ষারও আকাল ঘটে। তখন দেবাদিদেব শোনেন কাশীতে এক নারী সকলকে অন্ন দান করছেন। দেবীকে চিনতে মহাদেবের একটুও দেরি হয় না। মহাদেব দেবীর কাছে ভিক্ষা গ্রহণ করেন ও অন্ন ভিক্ষা নিয়ে তার ভক্তদের খাদ্যাভাব থেকে রক্ষা করেন|
এরপর মহাদেব দেবীর একটি মন্দির নির্মাণ করেন কাশীতে এবং সেই থেকে তিনি কাশীর অধিষ্টাত্রী দেবী তার কৃপায় কাশিতে ইচ্ছা থাকলেও অনাহারে থাকা যায়না, প্রত্যেক কাশী বাসির অন্নদানের ভার দেবী অন্নপূর্ণার|
সবই ছিলো শিব এবং দেবী মহামায়ারে লীলা যার মধ্যে দিয়ে এক চৈত্র মাসের শুক্ল অষ্টমীতে দেবী অন্নপূর্ণা আবির্ভুতা হয়ে ছিলেন কাশীধামে। যে কাশী নগরী মহাদেবের ত্রিশূলের উপর অবস্থিত এবং মহাপ্রলয় ও যে কাশীরে ক্ষতি করতে অক্ষম সেই কাশীর সব কাশী বাসি প্রতিটি ভক্তের ভালো মন্দের দায়িত্ব স্বয়ং মহাদেব দেবী অন্নপূর্ণার হাতে অর্পণ করেছেন।
অন্নদাত্রী দেবী অন্নপূর্ণার আরেকনাম অন্নদা
তিনি দেবী দুর্গার আরেক রূপভেদ।মূলত দ্বিভূজা বা চতুর্ভূজা । গায়ের রঙ লালচে। দ্বিভূজা দেবীর বামহাতে সোনার অন্নপাত্র। ডানহাতে চামচ বা হাতা।মাথায় বিরাজিত অর্ধচন্দ্র। তিনি ক্ষুধার্ত মহাদেবকে অন্নদান করছেন স্মিতহাস্যে তার এক পাশে শ্রী ও অন্য পাশে ভূমি। শাস্ত্রে আছে দেবী অন্নপূর্ণা যে গৃহে নিত্য পূজিত হন সেই গৃহে মহাদেবের আশীর্বাদ থাকে দিবো সব অভাব
দুর হয়।
আবার ফিরে আসবো শিব মহিমা নিয়ে। থাকবে শিব সংক্রান্ত আরো একটি
পৌরাণিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব অবতার – পিপলাদ
শিব অবতার – পিপলাদ
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
সনাতন ধর্মে যেমন বিষ্ণুর দশ অবতারের উল্লেখ আছে তেমনই দেবাদিদেব মহাদেবের একাধিক অবতার ও আছে|নানা অবতারের রূপ ধারণ করে বারবার পৃথিবীতে অবতীর্ণ হয়েছেন মহাদেব। পুরাণ থেকে তাঁর মোট উনিশটি অবতারের কথা জানা যায়|যদিও বিভিন্ন সময়ে শিব বিশেষ বিশেষ কারণে আরো কিছু রূপে
অবতীর্ণ হয়েছেন।
আজ শিবের একটি বিশেষ অবতার পিপলাদ বা পিপ্পল্লাদ সম্পর্কে জানবো।পিপলাদ একজন তেজদীপ্ত ব্রহ্ম ঋষি ছিলেন এবং তাকে সাক্ষাৎ শিবের অবতার রূপেই বিবেচনা করা হয়।
ত্যাগের মূর্ত প্রতীক সাধু দধিচি ও তাঁর স্ত্রী স্বর্চার সন্তান পিপলাদ হিসেবে জন্মগ্রহণ করেছিলেন শিব। শৈশবে পিসি দধিমতির কাছে পালিত হয়েছিলেন তিনি। প্রবল পরাক্রমী ছিলেন পিপলাদ|এই পিপলাদ ও গ্রহ রাজ শনির মধ্যে একবার বিবাদ দেখা দেয়|
বড় হয়ে যখন পিপলাদ জানতে পারেন যে তাঁর বাবাকে সমস্যায় ফেলেছিলেন শনি। ক্ষুব্ধ পিপলাদ শনিকে অভিশাপ দিলে স্বর্গ থেকে পতন হয় শনির। দেবতারা এসে পিপলাদের কাছে শনির হয়ে ক্ষমাভিক্ষা করলে পিপলাদ শনিকে ক্ষমা করে দেন এবং বলেন যে শনির দৃষ্টি যার ওপর পড়বে, তিনি শিবের পুজো করলে শনির দশারে অশুভ প্রভাব কেটে যাবে। শুধু তাই নয় তিনি শনি দেবের থেকে এই প্রতিশ্রুতিও আদায় করে নেন যে যে ১৬ বছর বয়সের আগে কোনো বালকের কোনো ক্ষতি শনিদেব করতে পারবেন না।
আজও জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে শিবের পুজো করলে ও শিব কৃপা লাভ করলে শনি গ্রহের কু প্রভাব থেকে মুক্তি লাভ হয় এবং এই আস্থার মূলে আছেন মহর্ষি পিপলাদ।
সমগ্র চৈত্র মাস ধরে শিব মহিমা এবং শিবের একাধিক এমন অবতার ও শিব মন্দিরের ইতিহাস আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। ফিরে আসবো
আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব তীর্থ – ছাব্বিশ শিব মন্দির
শিব তীর্থ – ছাব্বিশ শিব মন্দির
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
এর আগে আপনাদের বাংলার একশো আট শিব মন্দিরের কথা বলেছি। বাংলার বিভিন্ন স্থানে এমন অনেক প্রাচীন শিব মন্দির আছে যেখানে একটি দুটি নয় একত্রে একাধিক শিব মন্দির এবং শিব লিঙ্গের সমাহার লক্ষ্য করা যায়।
আজ আপনাদের নবাবী আমলে গড়ে ওঠা এমন এক প্রাচীন শিব মন্দিরের ইতিহাস জানাবো
যেখানে একসাথে ছাব্বিশটি শিব মন্দির আছে।
এবং এটাই এই শিব মন্দিরের বিশেষত্ব।
কিভাবে এই ছাব্বিশ শিব মন্দির তৈরী হয় এবং কে করেন এই ঐতিহাসিক নির্মাণ সব তথ্য আপনাদের সামনে উপস্থাপন করবো।
অভিভক্ত বাংলা বিহার উড়িষ্যায় পলাশী যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে নবাব বংশের সূর্য যখন অস্তমিত তখন সেই সময়ে এক শ্রেণীর মানুষ ব্রিটিশদের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করে প্রচুর ধন সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন। তাদের মধ্যে অনেকেই পরে হয়ে ধনী জমিদার রূপে আত্মপ্রকাশ করেন
এমনই এক উঠতি জমিদার ছিলেন রামহরি বিশ্বাস যিনি ব্রিটিশ কোম্পানির হয়ে দেওয়ানী করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করেন। দানবীর ও ধর্মীয় কাজে উৎসাহী হিসাবে নাম হয় তার।
তিনি এক সময়ে খড়দায় বিরাট এক প্রাসাদ
নির্মাণ করে বাস করতে শুরু করেন। এই জমিদার ছিলেন শিব ভক্ত। তিনি খড়দায় তার প্রাসাদের কাছে বারোটি আটচালা শিব মন্দির
প্রতিষ্ঠা করেন।
পরবর্তীতে ১৮০৩ সালে জমিদার রামহরি
বিশ্বাস মারা যাওয়ার পর তাঁর দুই পুত্র প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাস ও জগমোহন বিশ্বাস জমিদারি দেখা শোনা করতেন তারাও ছিলেন ধার্মিক।ব্রিটিশ আমলে তীর্থযাত্রীদের তীর্থ কর দিতে হতো। জগমোহন বিশ্বাস এককালীন দু লক্ষ টাকা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ঘরে জমা দিয়ে সেই কর চিরদিনের মতো মুকুব করিয়ে দেন।
প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাসের তন্ত্র চর্চার অভ্যাস ছিল।পাশাপাশি শিবের উপাষক ছিলেন। তিনি পিতার তৈরি দ্বাদশ শিবমন্দিরের পরে আরও চোদ্দটি আটচালার শিব মন্দির তৈরী করেন। সেই নিয়ে খড়দহতে তাদের জমিদারিতে মোট ছাব্বিশটি মন্দির স্থাপিত হয়।একত্রে ছাব্বিশ শিব মন্দির নিঃসন্দেহে সেই সময়ে এক নজীর বিহীন
ঘটনা ছিলো।
জনশ্রুতি আছে প্রাণকৃষ্ণ বিশ্বাস তাদের শিব মন্দিরে শ্রীক্ষেত্র পুরীর মতো একটি ‘রত্নবেদী’ প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। সেই জন্য তিনি
আশি হাজার শালগ্রাম শিলা ও কুড়ি হাজার বাণলিঙ্গ সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু ১৮৩৫
সালে অকাল প্রয়াণের পর সেই প্রক্রিয়া
অসম্পূর্ন থেকে যায়।
আজও বাংলার এই ঐতিহাসিক শিব মন্দির একটি অপূর্ব পুড়াতাত্ত্বিক এবং ধর্মীয়
নিদর্শন হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে স্বমহিমায়।
ফিরে আসবো এমনই কোনো এক প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক শিব মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
শিব অবতার – নটরাজ রূপ
শিব অবতার – নটরাজ রূপ
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
গোটা চৈত্র মাস ধরে ঠিক করেছি শিবের বিভিন্ন রূপ, শিব কে নিয়ে নানা পৌরাণিক ঘটনা এবং বাংলার প্রাচীন শিব মন্দির গুলি নিয়ে আলোচনা করবো।আজকের পর্ব শিবের নটরাজ রূপ নিয়ে|
পূরাণে কথিত আছে, শিব যখন ক্ষিপ্ত হন তখনই তার এই নটরাজ রূপ প্রকাশ্যে আসে, শিবের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ ঘটে এই নৃত্যরত নটরাজ রূপের মাধ্যমে|শিবের একশো টি নামের মধ্যেও আছে নর্তক ও নিত্যনর্ত নাম দুটি|
শিল্প কলা বিশেষত নৃত্যের সঙ্গে শিবের গভীর সম্পর্ক রয়েছে|কথিত আছে নৃত্য ও সঙ্গীত শিবের সৃষ্টি, তিনিই এই নৃত্যকলার প্রবর্তক| তাই তার আরেকনাম নটরাজ।শিবের সব থেকে প্ৰিয় দুটি নৃত্যের নাম হল তাণ্ডব ও লাস্য| তাণ্ডব ধ্বংসাত্মক এবং পুরুষালি নৃত্য ও লাস্য হলো তাণ্ডবের নারীসুলভ বিকল্প যার মধ্যে লুকিয়ে আছে সৃষ্টির আনন্দ| তাণ্ডব ও লাস্য নৃত্য যথাক্রমে ধ্বংস ও সৃষ্টির প্রতীক|।
আবার পুরান মতে গজাসুর এবং কালাসুর নামক দুই ভয়ঙ্কর অসুরকে নিধন করার পর শিব নটরাজ রূপে তান্ডব নৃত্য নেচে ছিলেন।
সমগ্র ভারতে বিশেষ করে দক্ষিণ ভারতে নটরাজ বেশে শিবের মূর্তি অত্যন্ত জনপ্রিয়। তিনি সব শিল্পীর পরম শ্রদ্ধেয় তার আশীর্বাদ নিয়ে অনেক শিল্পীই তার নৃত্য অনুষ্ঠান আরম্ভ করেন|অনেকেই শিবের নটরাজ মূর্তি বাড়িতে সাজিয়ে রাখেন, এক্ষেত্রে বাস্তু শাস্ত্র মতে নৃত্যরত শিবের মূর্তি রাখলে ঘরে পজেটিভ শক্তির মাত্রা মারাত্মক বেড়ে যায় তাই সর্বদা একজন বাস্তুবিদের পরামর্শ মেনে নটরাজ মূর্তি গৃহে রাখা উচিৎ।
আজকের পর্বে নটরাজ রূপ নিয়ে এইটুকুই, আবার ফিরবো পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।