Home Blog Page 15

বীর হনুমান এবং দশানন রাবন

বীর হনুমান এবং দশানন রাবন

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

হনূমান জয়ন্তী উপলক্ষে আজ থেকে শুরু করছি রূদ্রঅবতার বজরংবলীকে নিয়ে কয়েকটি পর্বে ধারাবাহিক আলোচনা।আজ লিখবো হনুমান এবং দশানন রাবনের সম্পর্ক এবং এই দুই
চরিত্রকে ঘিরে কিছু পৌরাণিক ঘটনা নিয়ে।

একবার কৈলাসে নিজের আরাধ্য দেবাদিদেব মহাদেবের দর্শন করতে গিয়ে অহংকারী রাবন
শিবের অনুচর নন্দীকে বানররুপী বলে ব্যঙ্গ করেন এবং অপমান করেন।সেই অপমানে রেগে গিয়ে নন্দী রাবনকে এক বানর দ্বারা পরাস্ত হওয়ার অভিশাপ দেন। পরবর্তীতে হনুমান রাবনের পতনের অন্যতম কারন হন। অর্থাৎ এই পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুসারে রাবনকে দেয়া নন্দীর অভিশাপ সত্যি করতে হনূমানের আবির্ভাব বলাই যায়।

রাবন এবং হনুমান দুই চরিত্রই শিবের সাথে গভির সম্পর্কযুক্ত। রাবন যেমন শিবের শিষ্য এবং শিবের ধ্যান করে তার আশীর্বাদ পেয়ে বলবান হন তেমনই হনুমান স্বয়ং শিবের অংশ। রূদ্র অবতার।
রামায়নের কালে দুই শিব ভক্ত হয়ে ওঠেন একে অন্যের শত্রু। হনূমান থাকেন ন্যায়ের পক্ষে। সত্যর পক্ষে অন্য দিকে রাবন ছিলেন অন্যায় এবং অধর্মর পক্ষে।

শক্তিতে রাবন অতীব বলশালী হলেও হনূমানের ন্যায় ক্ষমতাবান সে যুগে কেউ ছিলোনা। তিনি একাই রাবনকে পরাস্ত করে মা সীতা কে উদ্ধার করতে পারতেন। কিন্তু এই কাজ প্রভু শ্রী রামের কর্তব্য তাই তিনি রামের সেবায় তার দাস হয়ে রয়ে যান।

রাবন পুত্র মেঘনাথ যখন জন্ম গ্রহণ করেন তখন|রাবন চেয়েছিলেন সব গ্রহরা তার অনুকূলে থাকবেন|এমন ভাবে তারা অবস্থান করবেন যাতে মেঘনাথ হবেন অমর ওঅপরাজেয়|
নিজের ক্ষমতার অপব্যাবহার করে রাবন সব গ্রহদের বন্দী করলেন।এমনকি নিজ অহংকার প্রকাশ করতে তিনি গ্রহদের নিজের সিংহাসনে পৌঁছানোর সিঁড়ির ধাপ রূপে ব্যবহার করতেন।
তাদের মাথায় পা রেখে এগিয়ে যেতেন।
স্বর্ণ লঙ্কা জ্বালিয়ে দেয়ার সময় হনূমান গ্রহদের বন্দী দশা থেকে মুক্তি দেন। রাবনের অহংকারের পতন ঘটান।

আগামী পর্বে হনুমান এবং শনি দেবের সম্পর্ক নিয়ে আলাদা করে লিখবো । জানাবো জ্যোতিষ শাস্ত্রে বজরংবলী কেনো এতো গুরুত্বপূর্ণ। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম্য – পঞ্চকেদার রহস্য

শিব মাহাত্ম্য – পঞ্চকেদার রহস্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম কেদারনাথ মন্দিরের চারপাশে রয়েছে আরো চারটি প্রাচীন শিব মন্দির এবং এই পাঁচটি শিব মন্দিরকে একত্রে বলা হয় পঞ্চকেদার।আজকের পর্বে জানাবো কি এই

পঞ্চ কেদার এবং কিভাবেই বা সৃষ্টি হয় এই

পঞ্চ কেদারের।

 

পঞ্চ কেদারের রহস্য জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে সেই মহাভারতের যুগে।পাণ্ডবরা কৌরবদের পরাজিত করার পর যুদ্ধের সময় তাদের দ্বারা করা ব্রাহ্মন হত্যার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে দেবাদিদেবের স্মরণ নিতে তারা প্রথমে কাশীতে যান।শিব কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মৃত্যু এবং অসততার জন্য গভীরভাবে বিরক্ত ছিলেন তাই পাণ্ডবদের দেখা না দিয়ে নন্দীর রূপ ধারণ করেন এবং গাড়ওয়াল অঞ্চলে লুকিয়ে থাকেন। কাশীতে শিবকে না পেয়ে পাণ্ডবরা গাড়ওয়াল হিমালয়ে চলে যান। ভীম গুপ্তকাশীর কাছে একটি ষাঁড়কে ঘুরে বেড়াতে দেখে তার স্বরূপ উপলব্ধি করেন তৎক্ষণাৎ তিনি ষাঁড় রুপী মহাদেবকে বল পূর্বক ধরতে চেষ্টা করেন তবে লেজ আঁকড়ে ধরার সাথে সাথে বীর বিক্রমে হিমালয়ের দুর্গম অঞ্চলে অদৃশ্য হয়ে গেলো সেই বিশালাকৃতি ষাঁড় রুপী মহাদেব।

পরে কিছু অংশে আবার আবির্ভূত হলো। পাঁচটি স্থানে প্রকাশ পেলো এই রূপ। এই পাঁচটি স্থানকেই একত্রে পঞ্চ কেদার বলা হয়।

 

কেদারনাথে কুঁজ,বাহুগুলি তুঙ্গনাথে, মুখ রুদ্রনাথে, নাভি এবং পেট মধ্যমহেশ্বর এবং লোমগুলি কল্পেশ্বরে প্রকাশিত হয়েছিল।

পাণ্ডবরা এই স্থানে পাঁচটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।সেই মন্দিরই পঞ্চ কেদার ধাম রূপে আজও বিরাজমান।

 

প্রতিটি শিব ভক্তের মনের সুপ্ত বাসনা থাকে দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের পাশাপাশি এই পঞ্চকেদার দর্শন করে মহাদেবের আশীর্বাদ লাভ করার।শাস্ত্র মতে পঞ্চ কেদার দর্শন করলে মনোস্কামনা পূর্ণ হয় এবং জন্ম মৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ হয়।

 

পাঁচটি মন্দিরে পাঁচজন প্রধান পুরোহিত রয়েছেন এবং তারা এক বছরের জন্য পালাক্রমে প্রধান সেবক হিসেবে কাজ করেন।বছরের একটি দীর্ঘ সময়ে বরফে ঢাকা থাকে এই স্থান। তাপ মাত্রা হিমাংকের নিচে নেমে যায়।তবে এই দুর্গম স্থান হওয়া সত্ত্বেও বহু ভক্ত আসেন প্রতি বছর শিব পুজো করতে।

 

আসন্ন হনুমান জয়ন্তী উপলক্ষে ফিরে আসবো বজরংবলী সংক্রান্ত শাস্ত্রীয় আলোচনা নিয়ে আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব মাহাত্ম্য

শিব মাহাত্ম্য

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

চৈত্র মাস কে বলা হয় শিবের মাস।আর কিছুদিন পরেই নীল কণ্ঠ রূপে পূজিত হবেন মহাদেব।
আজ আপনাদের শিবের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত কিছু বিষয়ের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা এবং অন্তর্নিহিত গুরুত্ব সম্পর্কে লিখবো।

শিবের নীলাভ শরীরের ও অন্তর্নিহিত অর্থ আছে।আকাশ অন্তহীন শিবও তেমনি অন্তহীন। নীলাভ শরীর অন্তহীন আকাশের মতই শিবের অন্তহীনতাতথা অসীমতার প্রতীক।শিবের আরেক নাম নীলকণ্ঠ।

শিব গঙ্গাধর নামেও পরিচিত কারন শিব তার জটায় গঙ্গা কে স্থান দিয়েছেন এবং তার ভয়ংকর গতি থেকে পৃথিবীকে রক্ষা করেছেন।
গঙ্গা নিষ্কলুষ জ্ঞানের প্রতিনিধিত্ব করে।
যখন শিবের মতই আমাদের হৃদয় স্থির হয়
তখনই পরম জ্ঞান লাভ হয়।

সাপ হচ্ছে কুলকুণ্ডলীনি শক্তির প্রতীক।আবার সর্প মানে ভয় বা আতঙ্ক। যিনি ভয় কে গলায় জড়িয়ে রাখেন তিনি ভয় যার অঙ্গের ভূষণ তিনি দেবাদিদেব মহাদেব।

শিবের অঙ্গে ভষ্ম থাকে এটা জীবনের অনিত্যতাকে স্মরন করিয়ে দেয়। এটা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমাদেরও একদিন ভষ্মে পরিণত হতে হবে। এই ভস্ম শিবের খুবই প্ৰিয়।

শিবকে চন্দ্রমৌলি ও বলা হয় কারন শিবের জটায় থাকে চন্দ্র চন্দ্র সর্বদাই মনের সাথে সম্পর্কিত। এটি জীবনের সকল পরিস্থিতিতে সুখী থাকা এবং মনের উপর নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতার প্রতীক।
স্বয়ং শিব এই চন্দ্র কে ধারণ করেন অর্থাৎ তিনি মন এবং মানসিক শক্তির নিয়ন্ত্রক।

ডমরু শিবের অসীম তথা উন্মুক্ত চিন্তাচেতনার প্রতীক।আবার তন্ত্র শাস্ত্র মতে এই ডমরু থেকেই তন্ত্রের জন্ম হয়েছে।

শিব প্রকৃতির তিনগুন নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন সত্ত রজ এবং তম গুন।ত্রিশূল তারই প্রতীক। তিনি এটির মাধ্যমে সকলকে নিজ নিজ ধর্ম পালনে উৎসাহিত করে থাকেন। আবার সৃষ্টি এবং ধ্বংশ এই ত্রিশূলের মাধ্যমেই হয়।এই ত্রিশূলই তিনি দিয়েছিলেন মা দুর্গাকে অসুর নিধন করার জন্য।

শিবকে নিয়ে রহস্যর শেষ নেই।চৈত্র মাস জুড়ে থাকছে শিব নিয়ে নানা তথ্য। পৌরাণিক ঘটনা এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

রামনবমীর শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন

রামনবমীর শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ রাম নবমী। আজকের এই বিশেষ পর্ব শ্রী রামকে উৎসর্গ করবো এবং আপনাদের রাম নবমীর শাস্ত্রীয় ও আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা জানাবো।

 

বিভিন্ন যুগে ভগবান বিষ্ণু বিশ্ব সংসারের সকল মানুষকে ন্যায়পরায়ণতার ও সত্যের পথ প্রদর্শন করতে মিথ্যার উপর সত্যের জয় প্রতিষ্ঠা করতে

নানা অবতার রূপে আমাদের ধরিত্রী তে অবতরণ করেছেন।ত্রেতা যুগে রাম ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রূপে জণ্মেছিলেন।

 

শ্রী রাম ছিলেন সূর্য্য বংশীয় রাজা দশরথের অস্বমেধ যোগ্য লব্ধ যেষ্ঠ পুত্র। শৈশব থেকেই তিনি রাজধর্ম পালন করছেন কারন রামের যখন চোদ্দ বছর বয়স তাকে ঋশি বিস্বামিত্র রাক্ষস দের হাত থেকে যজ্ঞ রক্ষা করার জন্য দশরথের কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে যান। সেই থেকে শুরু হয় তার দুষ্টের দমন এবং শিষ্টের পালন যা শেষ হয় রাবন বধের মধ্যে দিয়ে।

 

শ্রী রামের জীবন এবং দর্শন ভারতের আদর্শ। আজ তার তার জন্ম তিথিকেই আমরা রাম নবমী রূপে পালন করি।রাম নবমী পালন করার মূল উদ্দেশ্য হল অধর্মকে পরাস্ত করে ধর্মকে স্থাপন করা।মন্দ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তির সূচনা করা।শ্রী রাম নিজেই শুভ শক্তির প্রতীক। ন্যায়ের প্রতীক।সনাতন ধর্মে যতজন ভগবানের অবতার আছেন তাদের মধ্যে রামকে এক কথায় সর্বশ্রেষ্ঠ বলা যায়।রাম নামকে বলা হয় কলিযুগের সব অন্ধকারকে দূর করে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান অস্ত্র|

 

ভগবান রামের উল্লেখ যে শুধুমাত্র প্রাচীন হিন্দু গ্রন্থে পাওয়া যায় তা নয়, জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থেও ভগবান রামের উল্লেখ আছে। বিশ্বের বহু দেশেই রামের মন্দির আছে,ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম রাম মূর্তি|

 

শাস্ত্রমতে এই রাম নবমী উপলক্ষ্যে ধার্মিক ব্যক্তিরা সমগ্র দিন জুড়ে বৈদিক মন্ত্র পাঠ করেন। সমগ্র দিনজুড়ে শাস্ত্র পাঠ পাঠ করা হয় বহু ধার্মিক স্থানে।এই দিনটিতে রাম কথার বর্ণনা করে, রাম কাহিনী পড়ে সহজেই বিষ্ণুর কৃপা লাভ করা যায় বলে বিশ্বাস।আপনারাও আজ শাস্ত্র মতে রাম নবমী পালন করুন। প্রভু শ্রী রামকে প্রনাম করুন। নিজের মনোস্কামনা জানান। শ্রী রামের কৃপায় জীবনের সব অন্ধকার দুর হবে।

সবাইকে জানাই রাম নবমীর শুভেচ্ছা।

 

ফিরে আসবো আগামী দিনে। শিব সংক্রান্ত পৌরাণিক বিষয় নিয়ে আলোচনায়। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

অন্নপূর্ণা পূজার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

অন্নপূর্ণা পূজার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আগামী কাল অন্নপূর্ণা পূজা। আজ অন্নপূর্ণার পূজার ঠিক আগের দিনে দেবী অন্নপূর্ণা সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শাস্ত্রী তথ্য আপনাদের সামনে তুলে ধরবো। যার মধ্যে দিয়ে দেবী অন্নপূর্ণার পুজোর আধ্যাত্মিক গুরুত্ব আপনারা উপলব্ধি করতে পারবেন।

 

চৈত্র মাসের শুক্লাষ্টমী তিথিতে দেবী অন্ন পূর্ণার আবির্ভাব হয় কাশিতে। এই তিথিতেই প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হয়। শাস্ত্র মতে দেবী অন্নপূর্ণার আশীর্বাদে সংসার থেকে সব অভাব দূর হয়|নিষ্ঠাভরে দেবীর আরাধনায় সংসার হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ|

 

সনাতন ধর্মে দেবী অন্নপূর্ণা অন্নের দেবী, সুখ ও সমৃদ্ধির দেবী|দেবী অন্নপূর্ণা দুর্গার আরেক রূপভেদ।মূলত দ্বিভূজা বা চতুর্ভূজা । গায়ের রঙ লালচে। দ্বিভূজা দেবীর বামহাতে সোনার অন্নপাত্র। ডানহাতে চামচ বা হাতা।মাথায় বিরাজিত অর্ধচন্দ্র। তিনি ক্ষুধার্ত মহাদেবকে অন্নদান করছেন স্মিতহাস্যে তার এক পাশে শ্রী ও অন্য পাশে ভূমি|

 

বাংলায় পৌরাণিক দেবী হওয়ার পাশাপাশি লৌকিক দেবী হিসেবে অন্নপূর্ণা পুজো জনপ্রিয়তা লাভ করে মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রের মাধ্যমে। তিনি মহা সমারোহে তাঁর রাজত্ব কালে অন্নপূর্ণা পুজোর প্রচলন করেন।

 

বর্তমানে বাংলার বিভিন্ন স্থানে অন্নপূর্ণা পূজো হয়ে থাকে এবং তন্ত্র ও শাক্ত উভয় মতেই হয়ে থাকে দেবীর পূজা।প্রাচীন তন্ত্রসার গ্রন্থে দেবীর পূজা পদ্ধতি রয়েছে, আবার অন্নদামঙ্গল কাব্য রচিত হয়েছে দেবীর মহিমা কীর্তন করে|সব মিলিয়ে সনাতন ধর্মে দেবী অন্নপূর্ণার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অপরিসীম।

 

সবাইকে জানাই অন্নপূর্ণা পুজোর শুভেচ্ছা।

ফিরে আসবো আগামী দিনে রাম নবমী উপলক্ষে একটি বিশেষ পর্ব নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

রানী রাসমণির পরিবারের অন্নপূর্ণা পূজো

রানী রাসমণির পরিবারের অন্নপূর্ণা পূজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সাধারণত বাংলার বনেদি বাড়ির পূজো বা জমিদার বাড়ির পূজো কথা উঠলেই দুর্গা পূজো বা কালী পূজো নিয়ে আলোচনা হয়। তবে এক কালে বাংলার কিছু বনেদি বাড়িতে জাঁকজমক পূর্ণ ভাবে দেবী অন্নপূর্ণার পূজো হতো এবং রানী রাসমণির পরিবারের অন্নপূর্ণা পূজো ছিলো তাদের মধ্যে অন্যতম।আজ অন্নপূর্ণা পুজোর প্রাক্কালে রানী রাসমণির অন্নপূর্ণা মন্দির এবং অন্নপূর্ণা পূজো নিয়ে লিখবো।

 

ব্যারাকপুরের অবস্থিত রানী রাসমণির অন্নপূর্ণা অন্নপূর্ণা মন্দির। এই মন্দির নির্মিত হয়েছিল দক্ষিণেশ্বরের মন্দির নির্মাণের বেশ কয়েক বছর পরে।

 

এই মন্দির নির্মাণের সাথে জড়িত অলৌকিক কাহিনীটি হলো এইরকম – ১৮৪৭ সালে রানি রাসমণি তাঁর জামাই মথুরমোহন বিশ্বাস সহ অন্যান্য আত্মীয় স্বজন নিয়ে জল পথে কাশীযাত্রা করেছিলেন। যাত্রা শুরুর দিন রাতেই রানীমা দেবীর স্বপ্নাদেশ পান যে কাশী না গিয়ে গঙ্গার পাড়েই মন্দির প্রতিষ্ঠা করে তাঁর নিত্যপুজোর ব্যবস্থা করা হোক। রানি কাশীযাত্রা স্থগিত করে ফিরে আসেন। নানা কারণে সেবার মন্দির তৈরী হয়নি ।তারমধ্যে তৈরী হয়ে যায় দক্ষিনেশ্বর মন্দির।এদিকে অন্নপূর্ণা-দর্শন না হওয়ায় মথুরমোহনের মনে মনে ইচ্ছে ছিল দেবী অন্নপূর্ণার মন্দির প্রতিষ্ঠা করার। কিন্তু তাঁর জীবদ্দশায় তা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত তাঁর সেই স্বপ্ন পূরণ করেন তাঁর স্ত্রী রানি রাসমণির ছোটো মেয়ে জগদম্বাদেবী। তৈরী হয় তার মায়ের স্বপ্নদেশ পাওয়া অন্নপূর্ণা মন্দির।

 

মন্দির টি ন’টি চূড়াবিশিষ্ট নবরত্ন মাতৃমন্দির, ছ’টি আটচালার শিবমন্দির, দু’টি নহবতখানা, নাটমন্দির, ভোগের ঘর, গঙ্গায় স্নানঘাট ইত্যাদি তৈরি হয়েছিল।অন্নপূর্ণা মন্দিরটি দেখতে অবিকল দক্ষিণেশ্বরের ভবতারিণী মন্দিরের মতো।

মন্দিরের গর্ভগৃহে অধিষ্ঠিত শিব ও অন্নপূর্ণার বিগ্রহ অষ্টধাতুর। মাতৃমূর্তি দক্ষিণমুখী।পাশে ভিক্ষা পাত্র হাতে শিব।

 

অন্নপূর্ণা মন্দিরের তোরণদ্বারের ওপর স্থাপিত রয়েছে এক সিংহমূর্তি। যা নিয়ে সেকালে ব্রিটিশরা আপত্তি করে ছিলো কারণ ব্রিটিশদের দাবি ছিল, সিংহ তাদের রাজশক্তির প্রতীক। বিবাদ গড়ায় আদালত পর্যন্ত। তবে আইনি লড়াইয়ে জয় হয়েছিল রাসমণির পরিবারের।

 

ব্যারাকপুরে অন্নপূর্ণা মন্দির প্রাঙ্গণে রয়েছে ছ’টি শিবমন্দির।মন্দিরের পাশেই চাঁদনি রীতির গঙ্গার ঘাট আছে যা রানি রাসমণি ঘাট নামে পরিচিত। শোনা যায় এই ঘাটে ঠাকুর স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণ স্নান করেছিলেন।

 

মথুরমোহন বিশ্বাসের ইচ্ছাকে বাস্তবায়িত করতে জগদম্বা দ্বারা এই মন্দির রানী রাসমণি এবং তাঁর পরিবারের দেবী অন্নপূর্ণার প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভক্তিকে আজও বহন করে চলেছে।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে। দেবী অন্নপূর্ণা সংক্রান্ত আরো কিছু শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী অন্নপূর্না এবং কাশী ধাম

দেবী অন্নপূর্না এবং কাশী ধাম

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আগামী ২৬ এ মার্চ মা অন্নপূর্ণার পূজা। আজ থেকে আগামী দুদিন দেবী অন্নপূর্ণা প্রসঙ্গে শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক আলোচনা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করবো।দিন প্রথম দিন দেবী অন্নপূর্ণার কাশী ধামের সম্পর্ক নিয়ে লিখবো।

 

কাশীকে শিবের নগরী বলা হলেও কাশী আসলে অন্নপূর্ণা দেবীর স্থান। কাশীর অধিস্টাত্রী দেবী হলেন অন্নপূর্ণা।পুরান মতে এক চৈত্র মাসের শুক্ল অষ্টমীতে দেবী অন্নপূর্ণা আবির্ভুতা হয়ে ছিলেন কাশীধামে|তার আবির্ভাব নিয়ে একটি পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় শাস্ত্রে।

 

পুরাণ মতে দেবী পার্বতীর সঙ্গে একবার দেবাদিদেবের কোনো কারণনে গুরুতর মতবিরোধে দেখা দিলে দেবী কৈলাস ত্যাগ করেন। সাথে সাথে ভয়ানক মহামারি, খাদ্যাভাব দেখা দেয়।ভক্তগণকে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দেবাদিদেব ভিক্ষার ঝুলি নিজ কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু দেবীর মায়ায় ভিক্ষারও অভাব ঘটে। তখন দেবাদিদেব শোনেন কাশীতে এক নারী সকলকে অন্ন দান করছেন। দেবীর লীলা বুঝতে পারেন মহাদেব। মহাদেব দেবীর কাছে ভিক্ষা গ্রহণ নিতে কাশীতে আসেন। দেবী তাকে অন্ন ভিক্ষা দেন। সেই অন্ন ভিক্ষা নিয়ে তার ভক্তদের খাদ্যাভাব থেকে রক্ষা করেন মহাদেব।

 

ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়। দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়ার আরেক রূপ দেবী অন্নপূর্ণা সুখ সমৃদ্ধি ও অন্নর দেবী। তার উপস্থিত থাকলেই সংসারে বা জগতে সুখ সমৃদ্ধি থাকে। তার অনুপস্থিতি ঘটলেই দেখা দেয় অশান্তি, অভাব এবং দারিদ্রতা।

 

দেবীর কাছে ভিক্ষা গ্রহণের পর মহাদেব দেবীর একটি মন্দির নির্মাণ করেন কাশীতে এবং সেই থেকে তিনি কাশীর অধিষ্টাত্রী দেবী।

পুরান মতে শিবের ত্রিশূলে অবস্থিত কাশী ধাম দেবী অন্নপূর্ণার আবাস তাই কেউ কাশীতে অভুক্ত অবস্থায় থাকেন না। কাশীতে সবার ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং মা অন্নপূর্ণা।

তিনি অন্নদাত্রী।তাই অন্নদাত্রী দেবী অন্নপূর্ণার আরেকনাম অন্নদা।

 

শাস্ত্র মতে কাশী শাস্বত এবং সর্বকালীন। কাশী মহা প্রলয়ের পরেও বিরাজমান থাকবে।স্ব মহিমায় কাশীধামে বিরাজ করবেন দেবী অন্নপূর্ণা।

কাশী ধামে যারা তীর্থ করতে যান বাবা কাল ভৈরব, বিশ্বনাথ এবং অন্নপূর্ণার দর্শন করলে তবেই কাশী যাত্রার সম্পূর্ণ ফল লাভ হয় বলে বিশ্বাস।

 

দেবী অন্নপূর্ণার পুজোর পর দরিদ্রকে অন্ন দান করলে জীবন থেকে সব অভাব দূর হয়।

দেবী অন্নপূর্ণা কতৃক মহাদেবকে অন্নদানের ছবি বা মূর্তি যে গৃহে থাকে সেই অন্নর অভাব হয়না বলেও শাস্ত্রে আছে।

 

আসন্ন অন্নপূর্ণা পূজো উপলক্ষে চলতে থাকবে এই বিশেষ ধারাবাহিক পর্বগুলি। ফিরে আসবো আগামী পর্বে দেবী অন্নপূর্ণা সংক্রান্ত আরো অনেক শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক আলোচনা নিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – বজ্রেশ্বর

শিব অবতার – বজ্রেশ্বর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

চৈত্র মাস শিবের মাস। চৈত্রর অবসান এবং বৈশাখের আগমন হয় নীল পুজোর মাধ্যমে যা শিবেরই রূপ। শিবের অনেক রূপ অনেক অবতার। সেই অবতারগুলি নিয়েই এই ধারাবাহিক আলোচনা। আজকের পর্বে লিখবো শিবের বজ্রেশ্বর অবতার

 

বজ্রেশ্বর হলেন ভগবান শিবের একটি উগ্র যোদ্ধা অবতার, যিনি অসুরদের পরাজিত করে ধর্ম রক্ষা করেন।

 

পুরাকালে যখন অসুররা দেবতা দের যজ্ঞ বেদী আক্রমণ করতেন তাদের যজ্ঞ বন্ধ করে দেবতাদের ক্ষমতা খর্ব করতে তখন বজ্রেশ্বর রূপে অবতীর্ণ হয়ে শিব অসুর নিধন করে দেবতাদের রক্ষা করেন। তাদের পূজো বজায় রাখেন।

 

তাই এই রূপে শিব মন্দের উপর ভালোর বিজয়ের বার্তা দেন এবং সনাতন ধর্মকে শক্তিশালী করেন।

 

এছাড়াও, তান্ত্রিক ঐতিহ্যে জগন্নাথদেবকেও বজ্রেশ্বর নামে অভিহিত করা হয়। ধার্মিকতার রক্ষক এবং দুষ্টের দমনকারী তিনি।

 

“বজ্র” অর্থ অটল, কঠিন ও অপ্রতিরোধ্য শক্তি।

“ঈশ্বর” অর্থ সর্বশক্তিমান প্রভু। তাই বজ্রেশ্বর মানে যিনি বজ্রের ন্যায় অপরাজেয় শক্তির অধিকারী।এই রূপে শিব বজ্রের মতো অদম্য শক্তি, অশুভ বিনাশ এবং ধর্মরক্ষা-র প্রতীক।এই রূপে শিবের দেহ থেকে তেজ ও বিদ্যুতের মতো জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয় হাতে ত্রিশূল বা বজ্রশক্তির প্রতীক অস্ত্র। তিনি ক্রোধময় কিন্তু ন্যায়রক্ষাকারী

 

শাস্ত্র মতে “ওঁ বজ্রেশ্বরায় নমঃ” মন্ত্র জপের মাধ্যমে

শিবের অবতারের পূজো হয়।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে আরো অনেক শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক বিষয় নিয়ে। আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – খান্ডবা

শিব অবতার – খান্ডবা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

খান্ডোবা হলেন ভগবান শিবের একটি জনপ্রিয় অবতার। আজকের পর্বে শিবের এই লৌকিক রূপ এবং বিশেষ অবতার নিয়ে লিখবো।

 

আধ্যাত্মিক দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে এই অবতার শিবের রক্ষাকারী এবং দুষ্টের দমনের রূপকে তুলে ধরে।

তাঁকে শিবের একটি রুদ্র বা উগ্র রূপ বলে গণ্য করা হয়, যিনি এক হাতে তলোয়ার এবং অন্য হাতে ডমরু বা ত্রিশূল ধারণ করেন।

 

লৌকিক বিশ্বাস অনুসারে মণি ও মল্ল নামক দুই রাক্ষসকে বধ করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শিব খাণ্ডবা রূপে অবির্ভুত হন।যিনি মূলত ভারতের মহারাষ্ট্র ও উত্তর কর্ণাটক অঞ্চলে যোদ্ধা দেবতা হিসেবে পূজিত হন।তাঁর আরেক নাম ‘মার্তণ্ড ভৈরব’। খান্ডবা ঘোড়ায় চড়া বীর যোদ্ধা রূপে চিত্রিত হন।এই রূপেই তাকে পূজো করা হয়।

 

সারা ভারতে খান্ডবা মন্দির তেমন একটা চোখে পড়েনা তবে মহারাষ্ট্রের জেজুরি

মন্দির হলো খন্ডোবার প্রধান তীর্থস্থান।মণি-মল্লকে বধ করার পর তিনি মহারাষ্ট্রের দেউরি পাহাড়ে অধিষ্ঠান করেন বলেই বিশ্বাস করা হয়।তাঁর ভক্তরা তাঁকে শিব জ্ঞানে পূজা করে থাকে।শিব রাত্রি সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তিথিতে বহু শিব ভক্ত এখনে এসে তাঁর পূজো করেন এবং কৃপা লাভ করেন।

 

খান্ডোবা শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছেই নন, বরং মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতি, উপজাতি এবং অনেক ভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছেও শ্রদ্ধেয় সেদিক দিয়ে বলা যায় এই দেবতা সামাজিক ঐক্যের প্রতীক।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী শিব অবতার নিয়ে। সমগ্র চৈত্র মাস জুড়ে চলতে থাকবে এই বিশেষ ধারাবাহিক লেখনী।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – হরিহর রূপ

শিব অবতার – হরিহর রূপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব হলেন দেবতাদের আরাধ্যা দেবতা আর বিষ্ণু হলেন একমাত্র ভগবান। আবার অন্য একটি দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে শিব হলেন ভক্ত এবং তার আরাধ্য হলেন স্বয়ং বিষ্ণু।আজ শিবের এমন একটি অবতারের কথা বলবো যেখানে ভক্ত আর ভগবানের মেল বন্ধন ঘটেছে।

এই অবতারটি হলো শিবের হরিহর অবতার।

 

ভক্তের প্রতি ভগবানের প্রেম এবং ভক্তি বোঝাতে শিব এই রূপে দেখা দিয়ে ছিলেন। এই রূপে ভক্ত শিব এবং ভগবান বিষ্ণু মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।শাস্ত্র মতে এই রূপে অনেকটা অর্ধনারীশ্বরের মতো শিবের শরীরের একপাশে শিবের জটা এবং ত্রিনয়ন এবং অন্য পাশে বিষ্ণুর মুকুট ও প্রসন্ন মুখমণ্ডল থাকে।অর্থাৎ একই দেহে শিব এবং বিষ্ণু বিরাজ করেন।

 

পুরান অনুসারে শৈব ও বৈষ্ণব ভক্তদের মধ্যে যখন বিরোধ দেখা যায় এবং কে শ্রেষ্ঠ এই বিবাদ দেখা দেয় তখন এই বিতর্কের নিরসন করতে শিব হরিহর রূপে দেখা দেন।হরিহর রূপে শিব মহাবিশ্বে ভারসাম্য রক্ষা করেন। একই সাথে তিনি হয়ে ওঠেন পালন কর্তা এবং সংহারকর্তা।এখানে যিনি হরি তিনিই শিব।দুই সত্তা এক এবং অভিন্ন।

 

এটি একটি শৈব্য এবং বৈষ্ণব দর্শনের সম্মিলিত অবতারের বিশেষ।হরিহর অবতার পরম সত্যের একত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতীক।হরিহর রূপে শিব শান্তি এবং মৈত্রীর বার্তা দেন।

 

ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে শিব অবতার নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা। ফিরে আসবো পরবর্তী শিব অবতার নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।