Home Blog Page 15

লৌকিক দেব দেবী – শীতলা

লৌকিক দেব দেবী – শীতলা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

গ্রাম বাংলার এক অতি প্রসিদ্ধা এবং জাগ্রতা দেবী হলেন শীতলা দেবী।কিছু পুরানে তার উল্লেখ থাকলেও তাকে লৌকিক দেবী রূপেই প্রাধান্য এবং মান্যতা দেয়া হয়।

 

দেবী বসন্ত রোগের জ্বালা নিবারণ করেন এবং

শীতলতা প্রদান করেন তাই শীতলা নামে পরিচিত হয়েছেন। বসন্ত ও চর্মরোগ থেকে পরিত্রাণের উদ্দেশ্যে শীতলা পূজা করা হয়।বিশেষ করে যখন চিকিৎসা ব্যাবস্থা উন্নত ছিলোনা তখন বহু মানুষ মারা যেতেন বসন্ত রোগে সেই সময় গ্রামে গ্রামে শীতলা দেবীর আরাধনা করা হতো। গ্রাম বাংলারা মানুষের অন্যতম ভরসা এই দেবী।

 

দেবী শীতলাকে দয়াময়ী নামেও অভিহিত করা হয়। কূলাকৃতির মুকুট এবং গর্দভের উপর উপবিষ্ট। দেবী শ্বেতবর্ণা।হাতে রয়েছে পূর্ণকুম্ভ পবিত্র জল অমৃতময় শীতল জল ছিটিয়ে রোগ, তাপ ও

শোক দূর করেন দেবী আবার কোথাও তিনি নিমের পাতা বহন করেন কারন নিম রোগ প্রতিরোধকারী উদ্ভিদ।আয়ুর্বেদিক গুনে ভরপুর।

 

সাধারণত শ্রাবণ মাসের শুক্লা সপ্তমী তিথিতে

দেবী শীতলার পূজা করা হয়।গ্রীষ্মের মরসুমি ফলই দেবীর প্রধান ভোগ হিসেবে

নিবেদন করা হয়।

 

পূর্ব মেদিনীপুরের নাচিন্দা গ্রামে রয়েছে এক জাগ্রত শীতলা মাতার মন্দির যেখানে

দেবী শীতলাকে নিয়ে প্রচলিত আছে

বহু অলৌকিক জনশ্রুতি।

 

শোনা যায় যেখানে শীতলা মন্দির, তার কাছাকাছিই থাকতেন এক অসুস্থ বৃদ্ধা।

একদিন রাতে ওই বৃদ্ধাকে স্বপ্নে দেখা দেন দেবী শীতলা এবং তিনি বলেন, ‘তুই চুপচাপ শুয়ে থাকিস না। তোর বাড়ির সামনের পুকুরে রোজ স্নান করবি।স্নান শেষে একট গাছের নীচে ঘট স্থাপন করবি।আমার পুজো করবি। আমার পুজো করলে তোর আর কোনো দুঃখ থাকবেনা। আমার পুজো করলে রোগগ্রস্ত মানুষ মুক্তি পাবে। সন্তানহীনা সন্তান লাভ করবে।

 

স্বপ্ন দেখার পর বৃদ্ধারা ঘুম ভেঙে যায়।সেদিন ছিল অক্ষয় তৃতীয়া।তিনি স্বপ্নে দেখানো দেবীর নির্দেশমতোই পুকুর থেকে স্নান সারেন। তারপর একটি গাছের নীচে জলভর্তি ঘট স্থাপন করেন।দেবীর পুজো করেন এবং সুস্থ হয়ে ওঠেন।সেই থেকে প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়ায় বিশেষ পুজো হয় এই মন্দিরে। পুজো উপলক্ষে মেলাও বসে।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। থাকবে লৌকিক দেব দেবী নিয়ে আরো অনক তথ্য।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – মনসা

লৌকিক দেব দেবী – মনসা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ধারাবাহিক ভাবে লিখছি বাংলার লৌকিক দেব দেবীদের নিয়ে।আজকের পর্ব
দেবী মনসা কে নিয়ে।

মনসা বাংলার লৌকিক দেবীদের মধ্যে সর্বাধিক জাগ্রতা।শ্রাবন মাসে বর্ষার প্রকোপে সাপের বিচরণ বেড়ে যায়। বহু মানুষের মৃত্যু হয় সাপের কামড়ে।তাই সর্পদংশন প্রতিরোধ ও সাপের বিষের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে তাঁর পূজা করা হয়।এক্ষেত্রে মনসা মূলত সাপের দেবী।

আবার বহু স্থানে ধন-সম্পদ এবং সমৃদ্ধির জন্য মা মনসার পূজা করা হয়। জনশ্রুতি, লোককথা বা কিংবদন্তী অনুসারে মনসা মূলত একজন আদিবাসী দেবতা কারণ শুরুতে নিম্নবর্ণীয় হিন্দুদের মধ্যে তাঁর পূজা প্রচলিত ছিল। পরবর্তীকালে উচ্চবর্ণীয় হিন্দুসমাজেও মনসা পূজা প্রচলন লাভ করে। বর্তমানে মনসা আর আদিবাসী দেবতা নন বরং তিনি একজন সনাতনী দেবীতে রূপান্তরিত হয়েছেন।

মনসা মঙ্গল কাব্য অনুসারে শিব ভক্ত চাঁদ সওদাগরের মাধ্যমে মর্তে দেবী মনসার পুজো প্রচলন হয়|মঙ্গলকাব্যে তাঁকে শিবের কন্যা বলা হয়েছে আবার পুরাণ অনুসারে তিনি ঋষি কশ্যপের কন্যা। একদা সর্প ও সরীসৃপগণ পৃথিবীতে কলহ শুরু করলে কশ্যপ তাঁর মন থেকে মনসার জন্ম দেন।

বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত বিবরণ অনুযায়ী মনসা সর্বাঙ্গে সর্পাভরণভূষিতা এবং পদ্ম অথবা নাগপৃষ্ঠে আসীনা। তাঁর মাথার উপর সপ্তফণাযুক্ত নাগছত্র দেখা যায়। কখনো কখনো তাঁর কোলে একটি শিশুকেও দেখা যায়। মনে করা হয় এটি তাঁর পুত্র আস্তিক। মনসার একটি চোখে দৃষ্টি নেই কারণ তাঁর একটি চোখ সৎ-মা চণ্ডী কর্তৃক দগ্ধ হয়েছিল|

ফিরে আসবো পরবর্তী লৌকিক দেবী বা
দেবতাকে নিয়ে আগামী পর্বে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – দক্ষিণরায়

লৌকিক দেব দেবী – দক্ষিণরায়

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার অন্যতম প্রসিদ্ধ, জনপ্রিয় এবং রহস্যময় লৌকিক দেবতা হলেন দক্ষিণ রায়।মূলত দক্ষিণ বঙ্গ বিশেষ করে সুন্দরবন এবং বঙ্গপ সাগর লাগোয়া দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা জেলাতেই তার পূজো বেশি হয়।বাঘসহ সুন্দরবনের সমস্ত পশু ও জঙ্গলের নিয়ন্ত্রক এবং রক্ষা কর্তা তিনি।

প্রচলিত বিশ্বাস এবং স্থানীয় লোককথাতেই তার অস্তিত্ব। অনেকে মনে করেন এক সময় তিঁনি রক্ত-মাংসের দেহধারী মানুষই ছিলেন এবং পরবর্তীকালে মানুষের আস্থা এবং শ্রদ্ধা অর্জন করে লৌকিক দেবতায় পরিণত হয়েছেন।বর্তমানে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে গোটা সুন্দরবন অঞ্চলে তিনি পুজো পান।

দক্ষিণ রায়ের একটি কল্পিত রূপ অনুসারে তার সারা গায়ে বাঘের মতো ডোরাকাটা দাগ, বিরাট পাকানো গোঁফ, মুখের দু’দিক থেকে ঝরছে লালা, আর লম্বা একটি লেজ। সর্বদা তীর-ধনুক, ঢাল-তলোয়ার-বল্লম নিয়ে যুদ্ধসাজে সজ্জিত।

শোনা যায় এক সময় চোরা শিকারি, অত্যাচারী জমিদার এবং জলদস্যু দের হাত থেকে তিনি সুন্দরবনের মানুষ, পশু পাখি এবং প্রকৃতিকে রক্ষা করতেন।তার বীরত্ব এবং দয়ালু স্বভাবের জন্য তিনি অরণ্যের প্রতিটি প্রাণী এবং অরণ্যের উপর নির্ভরশীল মানুষের কাছে ভরসা এবং শ্রদ্ধা পেয়ে থাকেন।

বর্তমানে বারুইপুর এর কাছে ধপধপি নামক স্থানে রয়েছে বাবা দক্ষিণ রায়ের বিশাল এবং প্রাচীন মন্দির। মন্দিরের নাম ও দক্ষিণ রায়ের নামে। দক্ষিনেশ্বর মন্দির।মন্দিরে নিত্য পুজো হয়। শনি, মঙ্গলবার বিশেষ পুজো হয়। প্রতি বছর ১লা মাঘ দক্ষিণ রায়ের জন্মদিনে বিশেষ পুজো হয়।এখানে দক্ষিণ রায়ের মূর্তিটি এক সুপুরুষ দেবতার। সাদা গায়ের রং, মোটা কালো গোঁফ, বড়ো বড়ো চোখ, পরনে জামা ও ধুতি। পায়ে বুট। মাথায় মুকুট। কোলে রয়েছে একটি আগ্নেয়াস্ত্র।

স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন এক সময়ে সুন্দরবন এই অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। তখন থেকেই এই অঞ্চলের রক্ষাকর্তা রূপে বিরাজমান রয়েছেন বাবা দক্ষিণরায়।

আজও সুন্দরবনের প্রত্যন্ত অনেক অঞ্চলে ছোটো বড়, কাঁচা পাকা অনেক দক্ষিণ রায়ের মন্দিরের অস্তিত্ব রয়েছে। আজও কোনো বৈদিক বা পৌরাণিক দেবদেবী নয় বরং জলে জঙ্গলে বসবাসকারী মানুষের কাছে দক্ষিণরায়ই প্রধান দেবতা।

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে অন্য
কোনো লৌকিক দেবততা বা দেবীর
কথা নিয়ে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – বিবি মাতা

লৌকিক দেব দেবী – বিবি মাতা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার বিভিন্ন স্থানে একাধিক লৌকিক দেব দেবীর পূজো হয়।এমনই এক দেবী বিবি মাতা।অদ্ভুত ভাবে হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়

এই দেবীর পুজোয় অংশগ্রহন করেন।

 

বিবিমাতার উৎপত্তি সম্পর্কে নানা মতবাদ আছে|

দক্ষিণ বঙ্গে প্রচলিত একটি কিংবদন্তী অনুসারে কোন এক হিন্দু জমিদারের সাত কন্যা সন্তান ছিলো|একদিন তাদের সঙ্গে দেখা করেন এক পীরবাবা।পীরবাবার ইচ্ছেতে সাত কন্যার বিবাহ হয় এক ধর্মপ্রাণ মুসলমান জমিদারেরে পুত্রের সঙ্গে এবং পরবর্তীতে ক্রমে এই নারীদের মধ্যে দৈবী শক্তির বিকাশ ঘটে।তারা দেবী মর্যাদা পান এবং লোকসমাজে সাতমা বলে পরিচিত হন।এই সাতবোন বা সপ্ত মাতারা যেহেতু মুসলিম পরিবারে বিবাহ হয়েছিলো তাই বিবি শব্দটি জুড়ে যায় নামের সাথে|

 

সাত বোন বা সপ্ত মাতার নাম যথাক্রমে ওলাবিবি, ঝোলাবিবি, ঝড়িবিবি, চাঁদবিবি, বহেড়াবিবি, মড়িবিবি ও আসানবিবি।সাতটি বিবি সাতটি রোগের নিরাময়কারী দেবী হিসাবে পুজিত হন।যার মধ্যে কলেরা বা ওলাওটা রোগের দেবী হিসাবে ওলাবিবি বা ওলাইচন্ডী দেবী পরিচিত।।

বিবিমাতা হলেন ওলাবিবি বা ওলাইচন্ডী।

তিঁনিই বাকিদের মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয়।

 

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনারা বহু স্থানে তার মন্দির রয়েছে যেখানে নিষ্ঠা সহকারে পুজো হয় এবং বছরের নিদ্দিষ্ট কিছু সময়ে উৎসব ও মেলার আয়োজন হয় যাদের মধ্যে বারুইপুরের এবং মগরাহাট অঞ্চলের বিবি মাতা মন্দিরগুলি বিশেষ ভাবে প্রসিদ্ধ।পুরান বা অন্য কোনো প্রাচীন প্রামাণ্য ধর্মগ্রন্থে বা শাস্ত্রে উল্লেখিত না থাকলেও অসংখ্য মানুষের আস্থা ও ভরসা রয়েছে এই বিবিমাতার প্রতি।

 

আরো অনেক লৌকিক দেব দেবীর কথা জানানোর আছে। ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে লৌকিক দেব দেবী নিয়ে লেখা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেবদেবী – পাঁচু ঠাকুর 

লৌকিক দেবদেবী – পাঁচু ঠাকুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরান বা বেদের বাইরেও অনেক লৌকিক দেব দেবীর অস্তিত্ব আছে। এমনই কিছু লৌকিক দেবদেবী নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে এই সপ্তাহে লিখবো। আজ শুরু করবো বাবা পঞ্চানন্দ বা পাঁচু ঠাকুরকে দিয়ে।

 

পঞ্চানন বা পাঁচু ঠাকুর বাংলার এক বিখ্যাত লৌকিক দেবতা। লোকবিশ্বাসে ইনি মহাদেব শিবের এক লৌকিক রূপ আবার অন্যমতে,

ইনি শিবের মানস পুত্র। মূলত গ্রামরক্ষক রূপে পঞ্চানন পূজিত শস্যদেবতা হিসাবেও তার পূজার প্রচলন আছে। আবার কোথাও তিনি

শিশুদের রক্ষাকর্তা।

 

মহাদেব শিবের সঙ্গে পঞ্চানন ঠাকুরের দেহাকৃতি ও বেশভূষার সাদৃশ্য আছে।পঞ্চাননের গাত্রবর্ণ লাল এবং চোখমুখের ভঙ্গি রুদ্ররূপী; বেশ বড় গোলাকার ও রক্তাভ তিনটি চোখ ক্রোধোদ্দীপ্ত। প্রশস্ত ও কালো টিকালো নাক, দাড়ি নেই, গোঁফ কান অবধি বিস্তৃত। মাথায় পিঙ্গলবর্ণের জটা চূড়া করে বাঁধা এবং তার মধ্যে জটা কিছু বুকে পিঠে ছড়ানো। কানে ধুতুরা ফুল বিরাজমান।গলায় ও হাতে বেশ বড় পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষমালা থাকে। হাতে ত্রিশূল ও ডমরু; পায়ে খড়ম এবং মাথায় বা দেহের উপর সাপ বিদ্যমান। পাশে থাকে পঞ্চরংয়ের বা পাঁচমুখো গাঁজার কলকে।উর্ধাঙ্গ অনাবৃত নিম্নাঙ্গ বাঘছাল পরিহিত।

 

দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ এ প্রাচীন এক মন্দিরে পঞ্চানন ঠাকুরের মূর্তি সাড়ে তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিত হয়ে আসছেন।

বহুকাল আগে যখন টালিগঞ্জের আদিগঙ্গার পাড়ে জন বসতি সেই ভাবে গড়ে ওঠেনি সেখানে বাস করতে বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য্য নামে এক পূজারী ব্রাহ্মণ। এক রাতে বৈদ্যনাথ স্বপ্ন দেখলেন, পঞ্চানন ঠাকুর এসেছেন। বর্তমানে যে মূর্তি আমরা দেখি, সেই রূপে। ঠাকুর বলছেন, এই গঙ্গার ঘাটে আমি তোর অপেক্ষায় আছি। জলের মধ্য থেকে উদ্ধার করে আমাকে নিয়ে চল দ্রুত।

পুজো করার আদেশ ও পেলেন।পরের রাতে আবার একই স্বপ্ন ভোর হতে তখনো খানিকটা সময় বাকি, কিন্তু অপেক্ষা করলেন না তিনি। সেই রাতেই গ্রামের কয়েকজন ভক্তকে ডেকে নিয়ে, সস্ত্রীক চললেন গঙ্গার ঘাটে।ঘাটে এসে তিনি দেখলেন তিনটে প্রায় চারকোণা আকৃতির পাথর রাখা আছে জলের ধারে, আর তিনটিই রক্তাভ। তিনটে পাথরকে এক বিরাট সাপ জড়িয়ে আছে। সেই পাথর তুলে এনে তিনি স্থাপন করলেন নিজের মন্দিরে। পরবর্তীতে স্বপ্নে দেখা রুপ মিলিয়ে তৈরি হলো মূর্তি শুরু হলো পুজো।এই রকম জনশ্রুতি আর ভক্তির সাথে মিলেমিশে রয়েছে এই পঞ্চানন ঠাকুরের মন্দির ও তার অস্তিত্ব।

 

চলতে থাকবে লৌকিক দেবদেবীদের নিয়ে ধারাবাহিক লেখা। ফিরে আসবো পরের পর্বে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – বোম্বেটে কালী

কালী কথা – বোম্বেটে কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

নদীয়া জেলা সাধারণত মহাপ্রভুর ভক্তি আনন্দ বা বৈষ্ণব দের জন্য বিখ্যাত হলেও এই জেলার কিছু কালী পুজো বেশ প্রসিদ্ধ তার মধ্যে অন্যতম শান্তিপুরের বোম্বেটে কালী।আজকের কালী কথায় বোম্বেটে কালী নিয়ে লিখবো।

“বোম্বেটে” শব্দটি পর্তুগিজ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ বোমাবাজ বা জলদস্যু। এটি মূলত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ে যুক্ত একদল স্বাধীনতাসংগ্রামীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, এবং পরে জলদস্যুদেরও বোঝাতো। অনেকটা আমাদের দেশের বর্গীদের ন্যায়।

প্রথমে ব্রিটিশ আমলে এই দেবীর পুজোর প্রচলন করেছিলেন একদল সসস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামী, যারা ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং বিদেশি শাসকদের কাছে তারা ছিলেন ভয়ঙ্কর অপরাধী। তাই তাদের প্রচলিত কালী পুজো হয়ে ওঠে বোম্বেটেদের কালী পুজো এবং দেবী হয়ে যান বোম্বেটে কালী।

ভিন্ন একটি মত অনুসারে জলদস্যুদের বলা হতো বোম্বেটে। একদল ডাকাত এই পুজোর প্রচলন করে ছিলো এবং তারা প্রধানত জল পথে ডাকাতি করতো। তাই তাদের কালীকে বোম্বেটে কালী বলা হয়।

এই কালীর মূর্তিতে দেবী শিবের বুকের ওপর বাম পা রাখেন, যা তাকে অন্যান্য কালীমূর্তি থেকে আলাদা করে। দেবীকে শাস্ত্র মতে বামা কালী রূপে পুজো করা হয়।

শান্তি পুর সহ গোটা নদীয়া জেলায় দেবীকে অত্যন্ত জাগ্রত বলে মানা হয় এবং লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই দেবীর আরাধনা করেন।নিজেদের মনোস্কামনা জানান। দেবী কাউকে নিরাশ করেননা বলেই বিশ্বাস।শোনা যায় এক কালে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশের পরিবার এই কালীর পূজো করতেন।

আবার কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে ফিরে আসবো আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – কল্যাণী কালী

কালী কথা – কল্যাণী কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বর্ধমানের কল্যাণী কালীমন্দিরকে কেন্দ্র করে আছে বহু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ যা মুলত জনশ্রুতি তাই সবার আগে বলে রাখি যে সব অলৌকিক ঘটনা গুলির কথা এখন লিখতে চলছি সেগুলি মূলত স্থানীয় দের কাছে শোনা যার বেশি ভাগই লোক মুখে প্রচলিত কিংবদন্তী।

 

বর্ধমানে আজও কান পাতলেই শোনা যায় এক ঘটনা – কথিত আছে এই মন্দিরে এক চোর চুরি করেছিল। তবে আশ্চর্য জনক ভাবে প্রণামীর অর্থ সে আর নিয়ে যেতে পারেনি। পথেই আচমকা সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। চোর হলেও সে নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও কোনো রকমে মন্দিরে ফিরে এসে দেবী কল্যাণীকে তার প্রণামীর অর্থ ফিরিয়ে দেয় এবং ক্ষমা চেয়ে নেয় দেবীর কাছে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও পর মুহূর্তে সেরে যায় ওই চোরের রোগ । সে নিশ্চিন্তে ফিরে যায় সুস্থ শরীর নিয়ে।

 

বর্ধমানের কল্যাণী কালী মন্দিরের দেবী কালী ভক্তদের কাছে জীবন্ত কালী নামেই বেশি পরিচিত।

কারণ তাঁদের বিশ্বাস দেবী কল্যাণী আজও জীবন্ত। তিনি কালীরূপে এই মন্দিরে বিরাজিতা।

তিনি আছেন মানেই সব আছে। সব নিরাপত্তা আছে। ভয় এলে তা দূরে চলে যেতে বাধ্য।

এবং এই বিশ্বাস বা শ্রদ্ধা একদিনে আসেনি

এসেছে এই সব অলৌকিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে। এসেছে দেবীর ভক্তদের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি এবং নানাবিধ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে।

 

এমন আরো একটি জনশ্রুতি আছে।

শোনা যায় একবার এক মহিলা কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যখন তাঁর মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। সেই সময়ে তিনি দেবীর কাছে নিজের জীবনভিক্ষা করেন দয়াময়ী কল্যাণী কালী সেই আবেদন যেন কান পেতে শুনেছিলেন ।কিছুদিন পরে দেখা

যায় হটাৎ সেরে গিয়েছেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ওই মহিলা। পরবর্তীতে তিনি সুস্থ্য শরীরে বহু দিন জীবিত ছিলেন।

 

দেবী কল্যাণী যেমন দয়াময়ী তেমনই আবার তিনি

ক্রোধ ও করেন। একবার দেবী জীবন্ত কালীর ছবি মোবাইলে বন্দি করেছিলেন কোনো এক ভক্ত সেই সময় তিনি হটাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে দেবীর মন্দিরে প্রণাম করে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে আরোগ্য প্রার্থনা করেন এবং সুস্থ্য হন।

 

আজও অনেক ভক্ত অনুভব করতে পারেন যে দেবী তাঁদের আশপাশেই আছেন। আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছেন। এভাবেই এই মন্দিরের দেবী কালী যেন বুঝিয়ে দেন।তিনি জড় বিগ্রহ নন। তিনি জীবন্ত।প্রয়োজন শুধু আস্থা আর তার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পন।তিনি পরম দয়াময়ী এবং শুন্য হাতে কাউকে ফেরান না।তাই প্রতি অমাবস্যায় বিশেষ পুজো উপলক্ষে কল্যাণী কালী মন্দিরে উপচে পরে ভক্তদের ভিড়।এছাড়া প্রতিদিন দর্শণার্থীদের আনাগোনা তো লেগেই আছে।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে। কালী কথা নিয়ে

ধরাবাহিক আলোচনা চলতে

থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – দেবী চৌধুরানীর কালী 

কালী কথা – দেবী চৌধুরানীর কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবী চৌধুরানী বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহাসিক চরিত্র যাকে নিয়ে ছড়িয়ে আছে বহু ঘটনা এবং জনশ্রুতি।জলপাইগুড়ি জেলার গোশালা মোড়ের দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দির সেই ঐতিহাসিক চরিত্রের সাক্ষী বহন করে চলেছে আজও।প্রায় আড়াইশো বছর থেকে এই পুজো হয়ে আসছে। রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। আজ এই মন্দিরের কথা জানাবো কালী কথায়।

 

এক কালে এই শ্মশানকালী মন্দিরে পুজো দিয়ে গিয়েছিলেন দেবী চৌধুরানী ৷ সেই কারণেই পরবর্তীকালে এই মন্দিরের নাম দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দির দেওয়া হয়। আবার অনেকে বলে থাকেন উত্তরবঙ্গে দেবী চৌধুরানীর একাধিক ডেরা ছিল তার মধ্যে এটি অন্যতম। তিস্তা দিয়ে বজরায় করে যাতায়াত এর সময়ে একাধিক বার নাকি দেবী চৌধুরানীর আগমন ঘটে এই স্থানে।

 

সেকালে প্রায় সব ডাকাতদলই দেবী কালীর পূজো করে ডাকাতি করতে যেতো। ভবানী পাঠক বা দেবী চৌধুরানীরাও ব্যতিক্রমী ছিলেন না তাই খুবই স্বাভাবিক যে এই মন্দিরে আসা যাওয়া ছিলো দেবী চৌধুরানীর।

 

আজও এখানে পূজো হয় তন্ত্র মতে এবং একাধিক বিশেষ রীতি নীতি আজও অপরিবর্তিত আছে।

দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দিরে দেবীকে ভোগ দেওয়া হয়, বোয়াল মাছ, শোল মাছ ও মাংস দিয়ে।

 

দেবী চৌধুরানীর শ্মশানকালী মন্দিরের আরো বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ মিলে মিশে পুজোর সব দায়িত্ব ভার গ্রহন করেন।সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে গোশালা মোড়ের এই দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য পীঠস্থান হয়ে উঠেছে ৷

 

আবার ফিরে আসবো কালী কথার পরবর্তী পর্বে অন্য এক মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে। থাকবে আরো অনেক তথ্য এবং জনশ্রুতি।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – খুকীমা কালী

কালী কথা – খুকীমা কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলায় দেবী কালী শুধু শাস্ত্র সম্মত মহাকালী বা
ভদ্র কালী রূপে পূজিতা হন তা নয়। তিনি বাংলার ঘরের মেয়ে। আমাদের ঘরের মেয়েকে আমরা যেমন নানা রকম আদরের নাম্বার দিয়ে থাকি তেমনই দেবী কালীও নানা নামে নানা রূপে আমাদের কাছে ধরা দেন। কোথাও তিনি
বড়মা আবার কোথাও তিনি কৌটা কালী। কোথাও আবার পুটে কালী । এমনই
এক কালী মন্দির আছে বজ বজে যেখানে দেবীকে খুকীমা নামে ডাকা হয়। আজকের পর্বে খুকীমা কালীর কথা লিখবো।

অদ্ভুত এই কালী মূর্তির ইতিহাস। শোনা যায় দয়াল ঠাকুর নামে এক মাতৃ সাধক এক সময়ে এই স্থানে সাধনা করতেন। পাশেই ছিলো শ্মশান এবং আদি গঙ্গা। এক রাতে এক ডাকাত দল এখানে আসে।
সাধক কে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের সর্দারের কাছে।ডাকাত সর্দারের গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। পানীয় জল ও চিকিৎসারে জন্যই তাই কুটির দেখে দাঁড়িয়ে পড়া শুনশান প্রান্তরে।
সেই ফাঁকে হয়ে যাবে ভাগ-বাটোয়ারাও। জানা গেল, সুদূর বর্ধমান থেকে লুঠ করে আসছেন তাঁরা।

দয়াল ঠাকুর লুট করা সামগ্রীরে মধ্যে পাথরের তৈরি এক কালী মূর্তি দেখলেন এই মূর্তি যে চুরি করা আনা হয়েছে কোনো রাজবাড়ি থেকে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তাঁর কাছে। তার কারণ বিগ্রহের গঠন। অখণ্ড কষ্ঠীপাথরের তৈরি এই মূর্তি বড়ো কোনো পাথর থেকে কেটে বানানো। এমনকি দেবীর গলার নরমুণ্ডের মালাও খোদাই করে তৈরি। এ যে কোনো সাধারণ শিল্পীর হাতের কাজ হতে পারে না তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি তাঁর। তিনি অবহেলায় পড়ে থাকা সেই মূর্তির পুজোর ও ভোগের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ পালন করতেই সেরে ওঠেন ডাকাত সর্দার।
তারা বিদায় নেয় এবং কালী মূর্তি ওই স্থানেই স্থাপিত হয় এবং খুকিমা নামে আজও তিনি সেখানে স্বমহিমায় বিরাজিতা।

সেই থেকেও খুকী কালী এই স্থানে বিরাজিতা এবং নিত্য পূজিতা হয়েছ আসছেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি খুবই জাগ্রতা এবং দয়াময়ী।

এমন কতো অজানা দৈব ঘটনা কতো অদ্ভুত অলৌকিক লীলা ঘটেছে এই বাংলায়। আগামী পর্ব গুলিতে আরো অনেক এমন ইতিহাস এবং জনশ্রুতি নিয়ে ফিরে আসবো।কালী কথায়
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – মনোহর ডাকাতের কালী 

কালী কথা – মনোহর ডাকাতের কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার কালী ক্ষেত্র গুলি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বার বার ঘুরে ফিরে আসে ডাকাত কালীর প্রসঙ্গ কারন আজকের গৃহস্ত বাড়িতে পূজিতা মা কালী এক কালে মূলত তান্ত্রিক ও ডাকাতদের আরাধ্যা দেবী ছিলেন।শুধু জেলা নয় কলকাতা সংলগ্ন এলাকাতেও দাপিয়ে বেড়াতো ডাকাতেরা। অবশ্য কলকাতা তখনও পুরোপুরি শহর হয়নি।

 

এমনই এক দুর্ধর্ষ ডাকাত ছিলো কলকাতার মনোহর ডাকাত। তার নামেই আজকের মনোহর পুকুর। তার পূজিতা কালী আজ ছানা কালী বা ছোটো কালী নামে খ্যাত।বেজায় কালী ভক্ত মনোহর ডাকাত সেই সময় জঙ্গলের মধ্যে একটি ছোট কালী মূর্তি প্রতিষ্টা করেছিলেন। কষ্টি পাথরের কালী মূর্তিটি খুবই ছোট। তাই অনেকে এই কালীকে ছানা কালী বা ছোট কালী বলে উল্লেখ করেন।

 

সেকালে ডাকাত কালী বাড়ি নামেই এটি সুপ্রসিদ্ধ। ছিলো তখন কোন অলংকার ছিল না দেবীর গায়ে। দেবী ছিলেন মুন্ডমালা বিভূষিতা তার হাতে ঝুলতো

নর করোটি।আদিগঙ্গা দিয়ে নৌকো করে বা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সদলবলে এসে দর্শণার্থীরা মাকে দর্শন করতো তবে সন্ধ্যের পর কেউ সাধারণত আসতোনা এদিকে ।

 

শোনা যায় ডাকাত মনোহর ছিল অকৃতদার।একবার ডাকাতি করে ফেরার সময় মনোহর দেখে যে জঙ্গলে এক মহিলা বাঘের হানায় মৃত হয়ে পড়ে আছেন। পাশেই জীবিত শিশু। মনোহর তখন সন্তান স্নেহে এই শিশুটিকে মানুষ করে এবং

ধীরে ধীরে নিজেও বদলাতে শুরু করে।। পরবর্তীতে শেষ জীবনে ডাকাতি ছেড়ে কৃষি কাজে মন দেয় পাশাপাশি চলে মাতৃ আরাধনা।

 

জনশ্রুতি আছে বৃদ্ধ বয়সে সে বহু মোহর আর সোনা রুপো দিয়ে যায় জন কল্যাণ মূলক কাজের জন্য। সেই অর্থে কাটানো হয় একাধিক পুকুর।তার মধ্যেই একটি পুকুর মনোহর পুকুর নামে বিখ্যাত এবং সেই পুকুর সংলগ্ন রাস্তাও আজ মনোহরের নামে পরিচিত।

 

আবার ফিরে আসবো এমনই কোনো ঐতিহাসিক কালী মন্দির বা কালী পুজোর কথা নিয়ে কালী কথায়।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।