Home Blog Page 14

লৌকিক দেব দেবী – বড়াম দেবী

লৌকিক দেব দেবী – বড়াম দেবী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ লৌকিক দেব দেবীর এই পর্বে আপনাদের ঝাড়গ্রাম এলাকার বড়াম দেবীর কথা জানাবো।

শুধু ঝাড়গ্রাম নয়। বাঁকুড়া এবং পুরুলিয়া সহ মেদিনীপুরের কিছু স্থানে এই পূজো হয় বহু প্রাচীন কাল থেকে।

 

কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন বড়াম’ নামকরণ হয়েছে ‘বুড়ি’ থেকে। যেহেতু এটি মহিলা দেবতা।

দেবীকে বৃদ্ধা রূপে কল্পনা করে পূজো করা হয় তাই এই রুপ নাম করণ।

 

বড়াম দেবীর কোনো নিদ্দিষ্ট রূপ নেই সাধারণত একটি শিলা খন্ডে প্রান প্রতিষ্টা করে সিঁদুর দিয়ে চোখ নাক এঁকে তার পূজো করা হয়।এককালে মূলত আদিবাসীরাই বড়াম দেবীর পূজো করতো।

বড়াম সাধারণত গ্রাম বা অরণ্যের রক্ষাকত্রী।গ্রামের মানুষ তাঁদের পোষা গৃহপালিতদের এবং পরিবেশ বাঁচানোর জন্য শরণাপন্ন হত বড়াম

দেবীর কাছে।

 

বড়ামের নাম ও স্থান ভেদে ভিন্ন ভিন্ন কোথাও বড়াম চণ্ডী, আবার কোথাও বড়াম বুড়ি আবার কোনো স্থানে বড়াম মাঈ বলা হয়ে থাকে।

 

বড়াম দেবীকে দেবী দুর্গা বা দেবীর চন্ডীর লৌকিক রূপ হিসেবে দেখা হয়।আবার অনেকের কাছে তিনি বন দুর্গা বা জয় দুর্গা যা দুর্গারই রূপ।

কিছু স্থানে বড়াম দেবীর পূর্ণাবয়ব মূর্তি বানিয়েও পূজো হয়। সেখানে বাঘের পিঠে পা ঝুলিয়ে বসে থাকতে অথবা অথবা বাঘের গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন দেবী। ঠিক যেনো সিংহ বাহিনী

মা দুর্গা।

 

প্রাচীন কাল থেকে প্রচলিত বড়াম পূজায় কোনো মন্ত্র বা শাস্ত্রীয় রীতি নীতি নেই। ভক্তদের বিশ্বাস, ভক্তি আর শ্রদ্ধাই সব।পৌষ সংক্রান্তির রাতে বড় করে বড়াম পূজা হয়।পূজোর দিন বড়াম থানে পোড়ামাটির হাতি ঘোড়া দেওয়া হয়।পুজোতে নৈবেদ্য রূপে শুয়োর, ছাগল, মুরগি বলিও করা হয়।কোথাও কোথাও চাল ভাজা। ফল, ফুল এবং মহুয়ার ফুল থেকে নির্মিত মদ ব্যবহার করা হয় বলেও শোনা যায়। জাতি, ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই বড়াম পুজোয় অংশ গ্রহন করেন এবং আনন্দ উৎসবে মেতে ওঠেন।

 

ফিরে আসবো লৌকিক দেব দেবীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। চলতে থাকবে এই

ধারাবাহিক লেখনী।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – ভূত বাবা

লৌকিক দেব দেবী – ভূত বাবা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার প্রায় প্রতি জেলাতেই আছে কিছু লৌকিক দেব দেবীর অস্তিত্ব। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার এক বিশিষ্ট লোকদেবতা হলেন ভূতবাবা বা ভূতেশ্বরবাবা।যিনি আসলে মহাদেবেরই
এক লৌকিক রূপ।

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার দুটি ভূত বাবার মন্দির বেশ প্রসিদ্ধ একটির নাম বড় কাছারি অন্যটি ছোট কাছারি নামে বিখ্যাত।

ছোট কাছারি মন্দিরটি তুলনামূলক ভাবে বয়সে
নবীন। কোনো এক ভূত বাবার ভক্ত তার মনোস্কামনা পূর্ণ হওয়ায় সম্ভবত ছোট কাছারি মন্দিরটি নির্মাণ করান।

বিষ্ণুপুরে বাখরাহাট অঞ্চলে অবস্থিত বড় কাছারি মন্দিরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন।এক সময়ে আজকের বাখরাহাট সংলগ্ন এলাকা ছিলো ঘন জঙ্গলে ঢাকা, এখানেই বাস করতেন এক সাধু, শোনা যায় স্থানীয় অধিবাসীদের সকল বিপদ থেকে রক্ষা করতেন ওই সাধু, তার মৃত্যুর পর তার মরদেহ না পুডিয়ে সেই শশ্মানে সমাধিস্থ করে ভক্তগণ। পরে সেই সমাধিক্ষেত্র হতে এক অশ্বত্থ গাছ জন্মায় এবং ওই স্থানে স্থাপন করা হয় এক শিবলিঙ্গ, স্থানটি ক্রমশঃ সর্বত্র বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং দূর দূর থেকে মানুষ আসতে থাকেন পুজো দিতে|

কেনো বড়ো কাছারি নাম হলো সে নিয়েও এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে,জনশ্রুতি অনুসারে এই শশ্মানে নাকি গভীর রাতে স্বয়ং শিবশম্ভু ভূতনাথ বেশে বিচার সভা বসাতেন। সেকারণে স্থানটিকে অনেকে এখনো ভূতের কাছারিও বলেন। আর যেহেতু সে বিচার ভূতনাথরূপী শিবের দরবারে, সুতরাং তাঁর বিচারই সর্বশ্রেষ্ঠ তাই সব কাছারির উর্ধে এই কাছারি ও তার বিচার তাই বড়ো কাছারি নামেই পরিচিত হয়েছে এই স্থান|

ভূতবাবার মূর্তির সাথে পাঁচু ঠাকুরের মূর্তির কিছু মিল চোখে পড়ে। দুটিই শিবের লৌকিক রূপ হওয়ায় এই সাদৃশ্য থাকা স্বাভাবিক। সাধারণত সিংহাসনের উপর বামপদ ঝুলিয়ে বসে থাকেন ভূত বাবা। গলায় রুদ্রাক্ষ দেখা যায়। বিস্তৃত মোটা গোঁফ। দেবতার দুই হাত। এক হাতে গাঁজার কলকে। মাথায় ঝাঁকড়া চুল।সৌম্য ও শান্ত মুখ। ভূতবাবার ডানদিকে ও বামদিকে তাঁর দুই
সঙ্গী থাকেন।

ভূত বাবার ভক্তরা বিশ্বাস করেন ভূত
বাবার পূজো করলে অশুভ শক্তি নাশ হয়।
শত্রু বিজয় হয়। দুর্ভাগ্য দুর হয়। প্রতি শিব রাত্রিতে
ভূত বাবার বিশেষ পূজো হয়।

ফিরে আসবো লৌকিক দেব দেবীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। চলতে থাকবে এই
ধারাবাহিক আলোচনা। দেখতে থাকুন।

লৌকিক দেব দেবী – দেবী বাসুলী

লৌকিক দেব দেবী – দেবী বাসুলী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবী বাসুলী বাংলার অন্যতম জাগ্রতা লৌকিক দেবী। দেবী সর্বাধিক জনপ্রিয় বাঁকুড়ায় । বাঁকুড়া ছাড়াও পুরুলিয়া এবং দক্ষিণবঙ্গের কিছু

স্থানেও দেবী বাসুলীর পূজো হয়।

 

বাঁকুড়ার ছাতনা অঞ্চলে রয়েছে অতি প্রাচীন বাসুলী দেবীর মন্দির।এককালে ছাতনা অঞ্চল ছিলো বাঁকুড়া রাজধানী। একবার বাঁকুড়ার এক রাজা স্বপ্নাদেশ পেয়েছিলেন মা বাসুলির ৷ স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী বাসুলি দেবীর মূর্তি তৈরি করান। পূজো শুরু করেন।তারপর থেকে গোটা বাঁকুড়ার জনপ্রিয় দেবী হিসেবে বাসলী মায়ের পূজা হতে শুরু হয়।তৈরী হয় বাসুলী দেবীর একাধিক মন্দির।কালের নিয়মে বহু মন্দির আজ অস্তিত্ব হারিয়েছে তবু টিকে আছে কিছু।

আজও স্বমহিমায় রাঢ় বঙ্গে বিরাজ করছেন

দেবী বাসুলী।

 

দেবীকে মা কালীরই একটি লৌকিক রূপ বলে মনে করা হয়।আবার কারোর কাছে তিনি দেবী

দুর্গার লৌকিক রূপ।দেবী দ্বিভূজা ও রক্তবর্ণা। দেবী কালীর মতোই মহাদেবের উপর দণ্ডায়মানা এবং মুণ্ডমালা ও পরিহিতা।হাতে রয়েছে হাতে খড়গ দেবীকে রক্তসরস্বতী হিসেবে ভাবা হয়।আবার মূলত দক্ষিণ বঙ্গের দেবী বিশালক্ষী মাতাকেও অনেকে বাসুলী দেবীর একটি রূপ বলেই মনে করেন।

 

শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের রচয়িতা বড়ু চণ্ডীদাস বাসুলী দেবীর আরাধনা করতেন এমন তথ্য প্রাচীন কিছু গ্রন্থে পাওয়া যায়।কিছু বাসুলী দেবীর মন্দিরে সম্পূর্ণ তন্ত্রমতে তিনি পুজো পান। আবার কিছু স্থানে তান্ত্রিক এবং বৈষ্ণব উভয় মিশ্রিত পদ্ধতিতে পুজো হয়।

 

বাঁকুড়ার পাত্রসায়রের বাসুলী মন্দিরে মূলত গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের লোকজনের বাস। এরা জলপথে বাণিজ্যের লবণ ব্যবসায়ের সঙ্গেই জড়িত ছিল।লবন ব্যাবসায়ী গন্ধবণিক সম্প্রদায়ের মধ্যে দেবী বাসুলীর জনপ্রিয়তার জন্য অনেকে মনে করেন হয়তো দেবী এক সময়ে লবণের দেবী ছিলেন।নদীমাতৃক বাংলায় একদিকে যেমন দক্ষিণরায় বা বনবিবি পূজিত হতেন তেমনই ব্যাবসার কল্যানে লবণের একজন অধিস্টাত্রী দেবী থাকবেন তাতে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

 

দেবী বাসুলী হন বা বিশালক্ষী বা রক্ত সরস্বতী। তার ভক্তদের কাছে তিনি পরম দয়াময়ী এবং

সবার মনোস্কামনা পূরণ করেন বলেই বিশ্বাস।

 

এখনো বহু লৌকিক দেব দেবী নিয়ে লেখা

বাকি আছে। ফিরে আসবো আগামী পর্বে। ধারাবাহিক লেখা নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – দেবী সন্তোষী

লৌকিক দেব দেবী – দেবী সন্তোষী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবী সন্তোষী বৈদিক না পৌরাণিক নাকি লৌকিক তা নিয়ে বহু বিতর্ক হয়েছে। ধৰ্মর প্রামান্য শাস্ত্রগুলিতে সেই ভাবে মা সন্তোষীর উল্লেখ পাওয়া যায়না। আবার সনাতন ধর্মের সর্বোচ্চ গুরু শঙ্করাচার্য্যর মতেও সন্তোষী লৌকিক দেবী। অর্থাৎ লোককথা এবং জনশ্রুতি তেই তাঁর মাহাত্ম

বর্ণনা করা হয়েছে।

 

একটি পৌরাণিক কাহিনী মতে একবার রাখি পূর্ণিমার দিন ভগবান গণেশের বোন তাঁর হাতে রাখি বাঁধছিলেন। তাই দেখে গণেশের দুই ছেলে শুভ আর লাভেরও ইচ্ছা হয়, তাঁরা বোনের হাতে রাখি পরবেন। দুই ছেলের মন রাখতে গণেশ সৃষ্টি করেন এক কন্যার।সেই কন্যাই সন্তোষী।

 

দেবী তার ভক্তদের সন্তোষ প্রদান করেন। মনোস্কামনা পূরণ করেন। সুখ সমৃদ্ধি এবং সৌভাগ্য দেন বলে বিশ্বাস করা হয়।

 

তবে দেবী সন্তোষী সর্বাধিক জনপ্রিয়তা লাভ করেন ১৯৭৫ সালে মুক্তি প্রাপ্ত বলিউডের ছবি ‘জয় সন্তোষী মা’ এর মাধ্যমে। তারপর গোটা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে সন্তোষী মায়ের কথা।

শুক্রবারে দেবীর আবির্ভাব হয়েছিলো বলে বিশ্বাস করা হয় তাই ওই দিন সন্তোষী মার ব্রত

পালন করা হয়।

 

ভারতে রাজস্থানের যোধপুরে রয়েছে সন্তোষী মাতার মন্দির। মন্দিরের সঙ্গেই রয়েছে অমৃত কুণ্ড।বহু সন্তোষী মায়ের ভক্ত সেখানে

পুজো করতে আসেন

 

দেবী সন্তোষী চতুর্ভুজা। পরনে লালবস্ত্র। একটি হাতে ত্রিশূল, একটিতে তলোয়ার, একটি হাত আশীর্বাদের, চতুর্থ হাতটি রয়েছে সংহার মুদ্রায়। তাঁর ত্রিশূল সত্ত্ব, রজ ও তমগুণের প্রতীক এবং তলোয়ার জ্ঞানের প্রতীক।

 

ফিরে আসবো লৌকিক দেব দেবীর পরবর্তী

পর্বে। ধারাবাহিক লেখনী চলতে

থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – মাকাল ঠাকুর

লৌকিক দেব দেবী – মাকাল ঠাকুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সুন্দরবন অঞ্চলের আরো এক জনপ্রিয় লৌকিক দেবতা হলেন মাকাল ঠাকুর।কে এই মাকাল দেব তা নিয়ে নানা মুনির নানা মত। অনেকে মনে করেন মহাকাল থেকে মাকাল বা মাখাল উৎপত্তি। সেক্ষেত্রে মাকাল শিবের লৌকিক রূপ হতে পারেন।

 

সাধারণত মাটির তৈরী স্তূপ কে মাকাল দেব রূপে প্রান প্রতিষ্টা করে পূজো করা হয়।মাকালদেবের স্তূপে সর্বদা একটি স্তূপ থাকে না বেশি ভাগ ক্ষেত্রে একাধিক স্তূপের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

 

মাকাল দেব মূলত মৎসজীবিদের আরাধ্য দেবতা। সেই অর্থে তিনি মাছ বা নদী নালার ঠাকুর।বছরের বিভিন্ন সময় মাকাল দেবতার পূজা হয়ে থাকে। তবে বর্ষাকালে তাঁর পূজার প্রাধান্য বেশি।মৎস জীবিরা মাছ ধরতে যাওয়ায় আগে চাপা ফুল দিয়ে মাকাল ঠাকুরের পূজো করেন।এই পূজায় কোনো ব্রাহ্মণ লাগে না। সাধারণত মৎস্যজীবী দলের প্রধানই পূজা সারেন। আতপ চাল, নিরামিষ বাতাসা আর পাকা কলা নৈবেদ্য হিসেবে দেওয়া হয়। জ্বালানো হয় প্রদীপ। মাকাল ঠাকুরের সামনে কোথাও কোথাও মাটির কুমির মূর্তি বানানো হয়।

 

কবিশেখরের ‘কালিকামঙ্গল’-এ মাকাল ঠাকুরের উল্লেখ আছে। আবার দেবী মাকালচণ্ডী বাংলার এক বিশেষ লৌকিক দেবী যাকে অনেকে মাকাল ঠাকুরের স্ত্রী রূপ বলে মনে করেন।

 

প্রাচীন বঙ্গে বিশেষ করে গাঙেও দক্ষিণ বঙ্গে ‘আট মাকাল’ পূজো প্রচলিত ছিলো । এই আট মাকালের ক্ষেত্রে বেদিতে আটটি মাটির পর্বতআকৃতি স্তূপ বানানো হতো । আটটি স্তূপের মাঝের স্তূপটিকে ‘আটেশ্বর’ দেবতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।অর্থাৎ মাকাল ঠাকুরের আটটি রূপের খোঁজ পাওয়া যায়।সাধারণত গবাদী পশুদের হিংস্র জন্তুদের হাত থেকে বাঁচতে এই পূজো করা হতো।

 

বাংলা তথা গোটা দেশে ছড়িয়ে আছে এমন অসংখ্য লৌকিক দেব দেবী। ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।

ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – বুলেট বাবা

লৌকিক দেব দেবী – বুলেট বাবা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শুধু মাত্র বাংলাতেই লৌকিক দেব দেবীদের অস্তিত্ব আছে এমনটা নয়। দেশের নানা প্রান্তে বিরাজ করছেন একাধিক লৌকিক দেব দেবী। মূলত জনশ্রুতি। প্রচলিত কিংবদন্তী এবং লোককথা তেই তারা দেবতা। তবে তাঁদের ভক্তদের শ্রদ্ধা ভক্তিতে কোনো খুঁত নেই। এদের মধ্যে অনেকেই এক কালে মানুষ হলেও পরবর্তীতে নিজেদের অলৌকিক শক্তির জোরে দেবত্বে উন্নীত হয়েছেন। এমনই এক লৌকিক দেবতা রাজস্থানের বুলেট বাবা।

 

রাজস্থানের এক মন্দির আরাধ্য দেবতা একটি বুলেট বাইক এবং মন্দিরটি বুলেট বাবার মন্দির নামে বিখ্যাত|বিখ্যাত এই মন্দির প্রতিষ্ঠার পিছনে রয়েছে অলৌকিক এক গল্প। তিন দশক আগে ১৯৯৮ সালে ওম সিং রাঠৌর নামে এক তরুণের মৃত্যু হয় পথদুর্ঘটনায়। স্থানীয় গ্রামবাসীর ছেলে ছিলেন তিনি। বুলেট বাবা মন্দিরে পুজো হওয়া বাইকটি আসলে ওম সিং রাঠৌরের । ওই বাইকটি নিয়ে ফেরার পথে পালির কাছে দুর্ঘটনায় পড়েন তিনি। পরদিন পুলিশ তাঁর শবদেহ এবং বাইকটি উদ্ধার করে নিয়ে যায়। কিন্তু গ্রামবাসীদের দাবি, রাতে আচমকা উধাও হয়ে যায় বাইকটি। সেটিকে খুঁজে পাওয়া যায় ওম সিং রাঠৌরের দুর্ঘটনার স্থানে। স্থানীয় সূত্রে দাবি, এরকম ঘটনা এক নয় একাধিকবার ঘটে। ট্যাঙ্ক থেকে তেল খালি করে, চেন দিয়ে বেঁধে রাখলেও উধাও হয়ে গিয়েছে বাইকটি।স্থানীয়দের দাবি, আপনাআপনি ইঞ্জিন স্টার্ট হয়ে চালু হয়ে যায় বাইকটি। তারপর থেকেই একটি বিশ্বাস ছড়িয়ে যায় ওম বাবা নিজে ওই বাইকের মাধ্যমে বেঁচে আছেন। পথদুর্ঘটনায় আর যাতে কারও মৃত্যু না হয় তাই তিনি পাহারা দিতে বেরোন। এরপরই দুর্ঘটনাস্থলের গাছের নীচে প্রতিষ্ঠিত হয় বুলেট বাবার মন্দির।

 

রাজস্থানের যোধপুর থেকে পালির দিকে ৫০ কিমি গেলেই দেখা মিলবে এই বুলেট বাবা মন্দিরের। যেখানে পূজিত হয় ৩৫০ সিসি রয়্যাল এনফিল্ডের এক বহুমূল্য বাইক। বুলেট বাবার মন্দির বা ওম বাবার মন্দির বলে বিখ্যাত রাজস্থানের এই মন্দির। স্থানীয়দের বিশ্বাস বুলেট বাবার পূজো দিলে পথদুর্ঘটনা থেকে বাঁচাবেন বুলেট বাবা । তাই এদিকে যাত্রার আগে স্থানীয় থেকে পর্যটক, সমস্ত গাড়ি চালকরাই এই মন্দিরে পুজো দেন।শুধু তাই নয় গ্রামবাসীদের দাবী বাইকের কাছে যেকোনও সমস্যার কথা জানালে তা সমাধানও হয়ে যায়|

আজ রাজস্থানের তথা দেশের অন্যতম জনপ্রিয় লৌকিক দেবতা এই বুলেট বাবা।

 

ফিরে আসবো আগামী দিন নতুন পর্ব নিয়ে।

চলতে থাকবে লৌকিক দেব দেবী নিয়ে ধারাবাহিক লেখা । পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেবদেবী – ক্ষেত্র পাল

লৌকিক দেবদেবী – ক্ষেত্র পাল

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার আরো এক জাগ্রত এবং প্রসিদ্ধ লৌকিক দেবতা হলেন ক্ষেত্র পাল।ক্ষেত্রপাল মূলত ভূমিরক্ষক রূপে পূজিত হন আবার কোথাও কোথাও তিনি কৃষির দেবতা। ক্ষেত্রপালের কৃপায় কৃষকদের ভূমি রক্ষা পায় এবং ফসল ভালো হয় বলেই বিশ্বাস।কিছু ক্ষেত্রে তাকে চারটি দিকের দেবতা অর্থাৎ উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম দিকের দেবতা বলা হয়। শুধু হিন্দু ধর্ম নয় বৌদ্ধ ধর্মেও ক্ষেত্র পালের উল্লেখ আছে।

 

লৌকিক দেবতা হলেও কিছু পুরান এবং তন্ত্র শাস্ত্রে ক্ষেত্র পালের উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘প্রয়োগসার ’ নামক তন্ত্রগ্রন্থে ক্ষেত্রপালের নাম ‘ঘণ্টাদ ’ সেখানে ক্ষেত্র পালের রূপ, পূজো পদ্ধতি এবং মন্ত্রের উল্লেখ আছে।আবার তন্ত্রশাস্ত্রে শিবের একটি নাম ক্ষেত্রপাল বা ক্ষেত্রেশ এবং তিনি কৃষি কাজে যুক্ত থাকেন তাই ক্ষেত্রপালকে শিবের লৌকিক রূপ হিসেবেও দেখা হয়।

 

মৎস পুরান অনুসারে ক্ষেত্রপাল দিগম্বর , বিশালকৃতি, জটাধারী এবং সর্বদা

কুকুর ও শৃগাল বেষ্টিত হয়ে থাকেন।

বিভিন্ন শাস্ত্রে ক্ষেত্রপালের মোট উনোপঞ্চাশ

প্রকার রূপ বর্ণনা করা হয়েছে।প্রতিটি রূপের আলাদা আলাদা নাম আছে।

 

বাংলায় ক্ষেত্রপালের পূজো বহু প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে তবে তাঁর মন্দিরের সংখ্যা খুবই কম।

বর্ধমানের পানাগড়ের অধীনস্থ ক্ষেত্রপাল মন্দিরের পুজো আনুমানিক পাঁচশো বছরের পুরনো৷

ক্ষেত্রপাল এখানে প্রস্তরখণ্ড রূপে বিরাজ করছেন প্রথমে ক্ষেত্রপাল ছিল খোলা আকাশের নীচে৷ পরে স্থানীয়দের উদ্যোগে এবং বর্ধমান রাজপরিবারের

চেষ্টায় ক্ষেত্রপাল মন্দির নির্মাণ হয়।

কথিত আছে এই মন্দিরে ঘন্টা বাঁধলে সব মনস্কামনা পূর্ণ হয় তাই ক্ষেত্র পালের আশীর্বাদ পাবার আশায় ভক্তগণ মন্দিরে ঘন্টা অর্পণ করেন। তাছাড়া নিত্য পূজো উপলক্ষে প্রায় রোজই বহু ভক্তের আগমন হয়।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে ধারাবাহিক লৌকিক দেব দেবী প্রসঙ্গে লেখা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – দেবী ওলাই চন্ডী

লৌকিক দেব দেবী – দেবী ওলাই চন্ডী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজকের পর্বে লিখবো গ্রাম বাংলায় পূজিতা
দেবী ওলাই চন্ডীকে নিয়ে।।ওলাইন্ডী হলেন দেবী চণ্ডীরই লৌকিক রূপভেদ।আবার বিবি মাতা প্রসঙ্গে আলোচনা করতে গিয়ে বলেছিলাম সাত বোন বা সপ্ত মাতার এক মাতা ওলা বিবি।হিন্দুর ঘরের ওলাইচন্ডীই মুসলমানের ঘরে গিয়ে হলেন ওলাবিবি।

এক সময়ে বাংলায় ওলাওঠা বা কলেরা রোগে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যেতো। সেই সময়ে রোগ ভোগ থেকে বাঁচতে অসহায় মানুষ আশ্রয় নিতো ওলা বিবি বা ওলাই চন্ডীর থানে। তিনি কলেরা বা আঞ্চলিক ভাষায় ওলাওঠার অধিষ্ঠাত্রী দেবী ।

ওলাইচণ্ডী বাংলার লোকসংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির মধ্যে তাঁর পূজা প্রচলিত।কোথাও ওলাইচণ্ডী শস্যদাত্রী দেবী আবার কোথাও প্রজননের দেবী বা সন্তানপ্রদায়িনী। তবে দক্ষিণ বঙ্গের বেশি ভাগ স্থানেই ইনি মহামারী প্রতিরোধক দেবী এবং তাকে ডাবের জলে স্নান করিয়ে তুষ্ট রাখতে হয়। তিনি রুষ্ট হলে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে যায়।তাই কিছুটা ভয় এবং কিছুটা ভক্তিতে আজও অসংখ্য মানুষ তাঁর পূজো করেন।

বাংলার জনপ্রিয় ওলাই চন্ডীর মন্দির গুলির মধ্যে একটি রয়েছে ব্যান্ডেলের কাছে।মন্দিরটি বহু প্রাচীন।জনশ্রুতি অনুযায়ী একবার স্থানীয় বাগদী পরিবারের এক বৃদ্ধ স্বপ্ন দেখেন যে দেবী তাঁকে এক জলাশয় থেকে উদ্ধার করে একটি নিদ্দিষ্ট অসত্থ গাছের নিচে প্রতিষ্ঠা করতে বলছেন।স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী দেবীকে উদ্ধার করে মন্দির নির্মাণ করে প্রতিষ্ঠা করে পূজো শুরু হয়।

বাংলায় এমন বহু প্রাচীন ওলাই চন্ডীর মন্দির আছে। আসলে পৌরাণিক দেবী চন্ডী একটি নিদ্দিষ্ট শ্রেণীর মানুষের কাছে সীমাবদ্ধ ছিলেন তবে তাঁর লৌকিক রূপ ওলাই চন্ডী জাতি, ধর্ম বর্ন এবং শ্রেণী নির্বিশেষে সবার আপন সবার বেশি কাছের।তার জনপ্রিয়তা তাই সীমাহীন।

ফিরে আসবো লৌকিক দেব দেবীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। ধারাবাহিক ভাবে চলবে এই লেখনী। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – বনবিবি 

লৌকিক দেব দেবী – বনবিবি

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলায় পূজিত লৌকিক দেব দেবী দের মধ্যে অন্যতম জনপ্রিয় হলেন বন বিবি।

এই বনবিবি মূলত দক্ষিণ বঙ্গের সুন্দর বনের অধিষ্টাত্রী দেবী, মূলত দক্ষিণ রায়ের সাথেই তার নাম উচ্চারিত হয়ে আসছে যুগ যুগ থেকে।বিপদ সংকুল সুন্দরবনের মানুষ যেকোনো বিপদ থেকে বাঁচতে বনবিবির স্মরণ নেন।

 

লৌকিক কিংবদন্তী অনুসারে বনবিবি মক্কার এক সুফি ফকিরের কন্যা। ফকিরের দুই বউ। প্রথম বউয়ের দেওয়া শর্তে, ঘটনাক্রমে দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভজ দুই ছেলেমেয়েকে ফকির রেখে আসতে বাধ্য হন গহন বনে । পরে অবশ্য ছেলেটিকে ঘরে নিয়ে যান ফকির কিন্তু একা মেয়েটি বড় হয় জঙ্গলে পশু পাখি দের সাথে এবং ক্রমে তিনিই হয়ে ওঠেন বনবিবি|এই বনবিবি যথার্থ অর্থে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অদ্ভুত নিদর্শন যাকে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ ভক্তি করেন এবং পূজো করেন।

 

শুধু সুন্দরবন নয় খাস কলকাতাতেই রয়েছে এক বন বিবির মন্দির। এক কালে দক্ষিণের সাগর-ছোঁয়া জল-জঙ্গল বিস্তৃত ছিল আদিগঙ্গার পাড় অবধি যা বয়ে যেতো দক্ষিণ কলকাতার গা ঘেঁষে|খাঁড়ি, বাদাবন আর মউলি-মেছুয়ার জঙ্গলে দাপানো ‘বড় মিঞা’ বা ‘দক্ষিণ রায়’-এর রাজত্ব গড়িয়েছিল এখানেও। সেই দক্ষিণ রায়ের তর্জন-গর্জন থেকে বাঁচাবেন কে এক বনবিবি ছাড়া!তাই এই অঞ্চলেও গড়ে উঠেছিল বনবিবির মন্দির। আজ গ্রাম আর নেই। অরণ্য সংকুচিত।

এইসব অঞ্চলের ভৌগোলিক পরিবর্তন হয়েছে, আধুনিক হয়েছে মানুষের জীবনযাত্রা|কিন্তু এখনো সেই প্রাচীন লৌকিক পরম্পরাকে ধরে রেখেছে এই সুপ্রাচীন বন বিবির মন্দির।

 

আজও লৌকিক দেবী বন বিবি পূজিতা হন জাতি ধর্ম বর্ন নিবিশেষে তার অগণিত ভক্তদের দ্বারা।

 

আপাতত এই পর্বে বন বিবিকে নিয়ে এইটুকুই|আগামী পর্বে অন্য এক লৌকিক দেবীকে নিয়ে লিখবো। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – মাসান ঠাকুর

লৌকিক দেব দেবী – মাসান ঠাকুর

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আগের কয়েকটি পর্বে আপনাদের দক্ষিণ বঙ্গের কিছু বিখ্যাত লৌকিক দেব দেবীর কথা লিখেছি। আজ লিখবো উত্তর বঙ্গের প্রসিদ্ধ মাসান
ঠাকুরের কথা।

মাশান ঠাকুর অনেকের কাছে দেবী কালীর সন্তান আবার অনেকে মনে করেন তিনি ধর্ম ঠাকুরের মানস পুত্র।কোচবিহারের রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষের কাছে মাশান ঠাকুর অত্যন্ত জাগ্রত এবং জনপ্রিয়।

কোথাও কোথাও প্রেত দেবতা বা অপদেবতা জ্ঞানেও পুজো করা হয় মাশান ঠাকুরকে মূলত ভাদ্রমাসে তার পূজো হয় তাছাড়াও সারা বছর এমনকী দীপান্বিতা অমাবস্যাতেও কোথাও কোথাও পুজো পান তিনিও।তার ভক্তরা মনে করেন যাঁকে তুষ্ট না রাখলে সর্বনাশ এবং তিনি তুষ্ট থাকলে সব বিপদ দুর হবে।

মনে করা হয় ভাদ্রমাসের শনিবারে মাসান ঠাকুরের জন্ম। জলে জন্ম তার জন্ম এবং এবং জন্মের পর মাসানের নাড়িকুণ্ডলী জলে ফেলে দেয়। সেখান থেকে কলমী শাকের জন্ম হয়। মাসান বাবাকে সম্মান জানাতে ভক্তরা ভাদ্র মাসে কলমীশাক খায় না।

মাসান দেবতা সর্ব ক্ষেত্রেই বিকট দর্শন। কোথাও বুকেই চোখ,মুখ, বিরাট জিহ্বা এবং ভয়াল চোখ।রয়েছে ভুঁড়ি এবং ক্রুর দৃষ্টি। কোথাও মাছের পিঠে আসীন। কোথাও শূকরপৃষ্ঠে।

মোট ১৮ প্রকার মাসান পুজো পান এই বঙ্গে। তাঁদের রয়েছে আলাদা আলাদা কাজ এবং বাসস্থান। তারা হলেন যথাক্রমে –

১) বাড়ীকা মাসান

২) তিসিলা মাসান

৩) ঘাটিয়া মাসান

৪) চুঁচিয়া মাসান

৫) চালান মাসান

৬) বহিতা মাসান

৭) কাল মাসান

৮) কুহুলীয়া মাসান

৯) নাঙ্গা মাসান

১০) বিষুয়া মাসান

১১) ওবুয়া মাসান

১২) শুকনা মাসান

১৩) ভুলা মাসান

১৪) ড্যামশা মাসান

১৫) অঙ্গিয়া মাসান

১৬) ছলনার মাসান

১৭) ন্যাড়া মাসান

১৮) কলি মাশান

মাসান ঠাকুরের ভক্তরা তাকে ভক্তিও করেন।
ভয় ও পান। তাই নিষ্ঠা সহকারে তার পূজো হয়ে
আসছে যুগ যুগ ধরে এই বঙ্গে।

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্ব নিয়ে।
ধারাবাহিক ভাবে এই লেখনী চলতে।
থাকবে।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।