Home Blog Page 16

কালী কথা – হ্যাপা কালী

কালী কথা – হ্যাপা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

কালী কথায় বেশ কয়েকটি কালী মন্দিরের ইতিহাস ইতিমধ্যে আপনাদের জানিয়েছি।

আজ হুগলির হ্যাপা কালী নিয়ে লিখবো।

 

পান্ডুয়ার বেলুন ধামাসিন গ্রাম পঞ্চায়েতের বেলুন গ্রামে হয় এই হ্যাপা কালীর পুজো।কেনো নাম হ্যাপা কালী হলো সে নিয়েও এক জনশ্রুতি প্রচলিত আছে।শোনা যায় মা কালী প্রতিষ্ঠা করতে অনেক হ্যাপা বা ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়েছিল। বহু বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় দেবীর মন্দির তাই নাম হয়েছে হ্যাপা কালী।

 

কথিত আছে, এলাকার বাগদিপাড়ার কয়েকজন ডাকাত এই পুজোর সূচনা করেন। মা কালীর পুজো দিয়ে তাঁরা ডাকাতি করতে যেতেন ডাকাতরা। পরবর্তী কালে এলাকার সাধারণ মানুষ পুজোর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন।

 

এখানে তন্ত্র মতে দেবীর পুজো হয়। ছাগ বলি হয় পুজোর রাতে।প্রাচীন এই পুজোয় ব্যবহৃত গঙ্গাজল থেকে আলতা সিঁদুর, সবই নীলাম হয় পুজোর পরের দিন। নিলামে ওঠা প্রসাদ নিতে ভিড় জমান পার্শ্ববর্তী দশ বারোটি গ্রামের মানুষ। নিলাম থেকে আয় হওয়া অর্থ কাজে লাগানো হয় পুজোতে।

 

এই ভাবেই নিলামের অর্থে পাতার ছাউনি থেকে গড়ে উঠছে সুন্দর পাথরের মন্দির। তাছাড়া নিলামে কেনা পূজা সামগ্রী বাড়িতে রাখা শুভ বলে বিশ্বাস করেন স্থানীয়রা।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী কালী কথা নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে আরেকটি প্রাচীন মন্দিরের ইতিহাস। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ফলহারিণী অমাবস্যা এবং তন্ত্র শাস্ত্র

ফলহারিণী অমাবস্যা এবং তন্ত্র শাস্ত্র

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

মানব জীবনে জন্মছক বিশ্লেষণ করলে অথবা হস্তরেখা বিচার করলে দেখা যায় অনেকেরই কিছু না কিছু গ্রহ গত সমস্যা আছে।সমস্যা থাকলে সমাধানও রয়েছে, তবে এই গ্রহ দোষ খণ্ডনের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তন্ত্র মতে শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতে পূজো পাঠের মাধ্যমে গ্রহের প্রতিকার।

 

তন্ত্র প্রাচীন ভারতীয় সনাতনী ঐতিহ্যর আশীর্বাদ। এই তন্ত্র মূলত মানব কল্যাণের জন্যই সৃষ্টি হয়ে ছিলো। সঠিক তিথিতে সঠিক স্থানে সঠিক মন্ত্র উচ্চারনের মাধ্যমে গ্রহের অধীস্টাত্রী দেবীকে সন্তুষ্ট করে গ্রহের অশুভ প্রভাব নাশ করা হয়।

 

তন্ত্র মতে বা শাস্ত্র সম্মত ভাবে গ্রহ দোষ খণ্ডনের ক্ষেত্রে যে বিশেষ অমাবস্যা তিথি গুলি রয়েছে তার মধ্যে ফল হারিনী অমাবস্যা অন্যতম কারন এই অমাবস্যার অর্থাৎই হলো জন্ম জন্মান্তরের পাপের ফল থেকে মুক্তি লাভ|শাস্ত্র মতে এই সময়ে করা যেকোনো তন্ত্র ক্রিয়া বা গ্রহ দোষ খণ্ডনের উপাচারের ফলে দেবী কালীর কৃপা সহজেই লাভ করা যায় এবং তিনি সমস্ত গ্রুহ গত কুপ্রভাব ও তার খারাপ ফল হরণ করে নেন, তাই এই অমাবস্যা ফলহারিনী নামে পরিচিত।

 

মনে করা হয় ফল হারিণী অমাবস্যার চন্দ্রহীন রাত তন্ত্র শক্তির জাগরণের শ্রেষ্ঠ সময়। এই থিতিকে দশ মহা বিদ্যার পূজা বিশেষ ফল দায়ী। জ্যোতিষ শাস্ত্রে এই দশ মহা বিদ্যার সাথে গ্রহদের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।

 

একটা সময় ছিলো যখন এই বিশেষ অমাবস্যায় কামাখ্যা, তারাপীঠ সহ একাধিক স্থানে তান্ত্রিক বা জ্যোতিষীরা উপস্থিত হয়ে বিশেষ পুজো,হোম যজ্ঞর মাধ্যমে বহু মানুষের গ্রহগত দোষ খণ্ডন করতেন। তান্ত্রিক সাধনা করতেন।বহু সিদ্ধ যোগী এই ফলহারিণী অমাবস্যায় সিদ্ধি লাভও করেছেন বলে শোনা যায়।

 

ফল হারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে সংক্ষেপে আজ তন্ত্র , জ্যোতিষ এবং ফলহারিণী অমাবস্যার সম্পর্ক আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। আগামী দিনেও চলতে থাকবে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক এবং শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – বাহান্ন হাত কালী

কালী কথা – বাহান্ন হাত কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের কালীকথায় নদীয়ার বাহান্ন হাত কালীর কথা লিখবো নদীয়ার শান্তিপুরের নৃসিংহপুরে হয় এই বাহান্ন হাত কালীর পুজো।

 

কথিত আছে, যে ঘাট দিয়ে নিমাই গঙ্গা পার হয়েছিলেন, সেই নৃসিংহপুর কালনাঘাটেই অবস্থিত এই কালী মন্দির।

 

নৃসিংহপুরের দশ জন ব্যবসায়ী প্রথম স্বপ্নে আদেশ পেয়ে পৌষকালীর পুজো শুরু করেছিলেন। সব্বাই আলাদা আলাদা ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। স্বপ্নাদেশ পাওয়ায় তাঁরা মকর সংক্রান্তির পুণ্য তিথিতে ফেরিঘাটের পাশেই পূজো শুরু করেন।

 

একবার ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে পুজো চলাকালীন মায়ের মূর্তি ভেঙে পড়েছিল। তারপর একটি তালগাছের নীচে মায়ের পুজো শুরু হয়। তখন পুজো উদ্যোগক্তারা ঠিক করেন, তাল গাছটির উচ্চতার সমান হবে মায়ের মূর্তির উচ্চতা। মেপে দেখা যায় তালগাছের উচ্চতা প্রায় ৫২ হাত। তারপর থেকে বাহান্ন হাত মূর্তি তৈরি করে পুজো হয়ে আসছে।যদিও আগে একটি ক্ষুদ্র মূর্তির পুজোই হতো।

 

প্রতি বছর মকর সংক্রান্তির পূর্ণ্য লগ্নে শুরু হয় মাতৃ আরাধনা, টানা দশ দিন চলে পুজো।দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন নানান প্রার্থনা নিয়ে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মা কাউকেই খালি হাতে

ফেরান না।

 

প্রতিমা নিরঞ্জনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ কিছু নিয়ম। মন্দিরের মধ্যেই মূর্তিতে জল দিয়ে মিশিয়ে ফেলা হয় অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে বিসর্জন হয়না।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী কালী কথা নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধম্যবাদ।

কালী কথা – বামা কালী

কালী কথা – বামা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আসন্ন ফল হারিণী অমাবস্যার প্রাক্কালে আজ আপনাদের বীরভূমের বামা কালীর পুজোর কথা বলবো। এই কালী পূজো আলাদা ঐতিহ্য বহন করে। এখানকার কালী পুজোর এক সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে অনেক জনশ্রুতি। সেসব নিয়েই আজকের কালী কথা।

 

এই গ্রামে বাস করতেন এক মাতৃ সাধক, নাম

রাম কানাই।কথিত আছে গভীর জঙ্গলে সাধনা করতে গিয়ে মা কালীর সাক্ষাৎ পান সাধক রামকানাই। মায়ের সাক্ষাৎ সেই রূপ তিনি একটি থালায় এঁকে নেন। জীবন্ত মায়ের সেই রূপের ছবি দেখে বানানো হয় মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি যা পরবর্তীতে মূর্তি বানিয়ে মন্দিরে স্থাপন করে শুরু হয় পুজো।

 

এই মন্দিরের প্রধান দুটি আকর্ষণ হলো সাধক রাম কানাইয়ের লেখা দুর্বধ্য ভাষায় লেখা একটি প্রাচীন পুঁথি যে পুঁথিতে আছে অনেক প্রাচীন উপাচার এবং পূজা পদ্ধতি এবং সেই থালা যে থালায় মায়ের জীবন্ত রূপ দেখে ছবি এঁকেছিলেন।

 

বাংলায় সাধারণ দেবী কালীর দুই রূপ বেশি

পুজো করা হয়। দক্ষিনা কালী এবং বামা কালী।

রামকানাই দ্বারা স্থাপিত কালী বামা কালী।

দীপান্বিতা অমাবস্যা বা দীপাবলী এই মন্দিরের প্রধান উৎসব। ইন্দ্রগাছার এই বামাকালী প্রায় পাঁচশো বছর ধরে পুজিত হয়ে চলেছে। প্রায় তেরো ফুটের এই বামকালীর গায়ের রং ও চক্ষুদান করা হয় পুজোর দিনেই প্রাচীন প্রথা মেনে। গায়ের রং করা হয় কাঠে আগুন জ্বালিয়ে তৈরি ভুসোকালি থেকে। আজও এই ক্ষেত্রে কৃত্তিম উপায়ে তৈরী রঙ ব্যাবহার হয়না।

 

প্রতি বছর কালী পুজোর দিন মধ্যরাতে মূর্তিকে চল্লিশ ফুট বড় লাল কাঠের ওপর চাপিয়ে কাঁধে করে নিয়ে আসা হয় মূল মন্দিরে। পুজোর পর ভাইফোঁটার দিন বিসর্জন হয়।বিগত প্রায় পাঁচশো বছরে এই পুজোর রীতি নীতি পরিবর্তন হয়নি।

 

আজও এই পুজো দেখতে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ।বামা কালীর প্রতি তাদের অগাধ বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা রয়েছে।বামা কালী তাদের সব মনোস্কামনা পূরণ করে বলেই বিশ্বাস।

 

আগামী দিনে আবার ফিরে আসবো কালী কথা নিয়ে। ফল হারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে চলতে

থাকবে কালী কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বাংলার কালী – কাঞ্চন ডাকাতের কালী

বাংলার কালী – কাঞ্চন ডাকাতের কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ আপনাদের বাংলার আরো এক ডাকাত কালীর কথা জানাবো।এই ডাকাত কালীর
পুজো হয় খানাকুলে চক্রপুরে।অনেকেই এই পুজোকে বলেন কাঞ্চন সর্দারের পুজো।

এক সময়ে ঘন জঙ্গল ও নদীনালায় ভর্তি খানাকুলের চক্রপুর ছিল কাঞ্চন সর্দারের প্রধান ডেরা। এখানেই মায়ের পুজো দিয়ে ডাকাতি করতে বেরতেন কাঞ্চন সর্দার ও তাঁর দলবল। পণ্যবাহী নৌকা ও ধনী লোকেরাই ছিলেন কাঞ্চন সর্দারের প্রধান লক্ষ্য।পেশায় ডাকাত হলেও কাঞ্চন
সর্দার ছিলেন বেজায় কালী ভক্ত তন্ত্র শাস্ত্রে পারদর্শী।

শোনা যায় ডাকাতির আগে পঞ্চমুণ্ডের আসনে বসে তন্ত্র মতে মায়ের পুজো করতেন কাঞ্চন সর্দার।পঞ্চ মুন্ডির আসন সহ সবই স্থাপিত ছিলো এই মন্দির চত্বরে। আজও জনশ্রুতি আছে যে ডাকাত সর্দার কাঞ্চনের ছিলো তন্ত্র শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্য এবং নানাবিধ সিদ্ধি।

শোনা যায় ডাকাতি করে যা অর্জন হতো তা গরিব মানুষদের বিলিয়ে দিতেন।তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে তার ছিলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা।

এককালে এই পুজোয় নরবলী দেয়া হোতো
বলেও অনেকে বিশ্বাস করেন যদিও এই সব বিতর্কিত বিষয় নিয়ে কোনো নিদ্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়না সবটাই জনশ্রুতি। তবে বলী কিভাবে বন্ধ হয় তা নিয়ে এক কিংবদন্তী প্রচলিত আছে।এবার নাকি এক ব্রাহ্মণ যুবককে অপহরণ করে বলী দিতে গিয়েছিলেন।ডাকাত দল তারপর নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে বলী থেকে তারা বিরত হয় এবং সেই থেকে নরবলি বন্ধ হয়ে যায়।

আজও সব প্রথা মেনেই হয় পুজো এবং বলির হাত থেকে রক্ষা পাওয়াসেই ব্রাহ্মণ যুবকের বংশধরদের পরিবার থেকে এখনও এই পুজোয় ভেট আসে যাকে বলা হয় প্রাণরক্ষার ভেট।
প্রথা মেনে সেই ভেট অর্পণ করা হয় মায়ের কাছে।

এই কালীকে মা সিদ্ধেশ্বরী নামে ডাকা হয়
শতাব্দী প্রাচীন এই কালী পুজো নিঃসন্দেহে বাংলার অন্যতম প্রাচীন এবং গুরুত্বপূর্ণ পুজো। কাঞ্চন ডাকাতের কালী পূজো সম্পর্কে গোটা খানাকুল অঞ্চলের মানুষের মনে আছে অগাধ শ্রদ্ধা এবং ভক্তি।

ফিরে আসবো কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে। থাকবে অনেক এমন ইতিহাস এবং
অলৌকিক ঘটনা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – হলদে কালী বাড়ি 

কালী কথা – হলদে কালী বাড়ি

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পানিহাটি প্রাচীন এবং বিখ্যাত কালী মন্দির হলো হলদে কালী মন্দির বা হলদে কালী বাড়ি।

যদিও দেবীর গাত্রবর্ণ হলুদ নয় তবু এই কালী মন্দিরকে হলদে কালী বাড়ি বলা হয়। কেনো এমন নাম সে প্রসঙ্গে পরে আসবো আগে এই মন্দিরের ইতিহাস জেনে নেয়া যাক।

 

হলদে কালী বাড়ির বয়স প্রায় সাড়ে তিনশো বছর। কেদারনাথ মুখোপাধ্যায় ১৬৯৪ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। কেদারনাথ ছিলেন কালী ভক্ত এবং তন্ত্র সাধক। কেদারনাথ মুখোপাধ্যায় বেনারসে তাঁর গুরুর কাছে তন্ত্র দীক্ষা নেন। মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় কাশীধাম থেকে কষ্টিপাথরের কালী বিগ্রহ নিয়ে আসা হয়েছিল। সেই মূর্তিই এখানে প্রতিষ্ঠা করা হয়। মাতৃমূর্তি চতুর্ভুজা।মন্দিরের দেবী কালী হলেন দক্ষিণা কালী।

 

প্রতিষ্ঠাতা চক্রবর্তী পরিবারের বংশধরেরাই আজও মন্দিরের দেখভাল করছেন। মন্দিরে নিত্যপুজো হয়। সন্ধ্যায় আরতি হয়।প্রতি অমাবস্যায় ধুমধাম করে কালী পূজো হয়।

এক কালে বলী প্রথা থাকলেও

মায়ের স্বপ্নাদেশে এখন বলিদান বন্ধ।

 

মন্দিরের প্রবেশদ্বারের বাঁ দিকে রয়েছে পঞ্চমুণ্ডীর ঘর।জনশ্রুতি আছে প্রতি রাতে মন্দিরের দরজা বন্ধ করার পরও ভিতর থেকে ধূপ-ধুনোর সুগন্ধ ভেসে আসে। গভীর রাতে দেবী কালীর বিচরণভূমিতে পরিণত হয় মন্দির চত্ত্বর।

শোনা যায় একবার দেবী নাকি এক অসুস্থ ভক্তের কপালে হাত রেখে তাঁর রোগ সারিয়ে দিয়েছিলেন।

 

কথিত আছে এই মন্দিরে অর্পণ করা হলদু অতি পবিত্র।এক সময়ে এই এলাকায় এই মন্দির থেকে হলুদ না-গেলে গায়ে-হলুদের অনুষ্ঠান বা বিয়ে হত না। সেই থেকেই মন্দিরের নাম হয় হলুদ কালী বাড়ি বা হলদে কালী বাড়ি।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী কালী কথা নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে অন্য এক কালী মন্দিরের ইতিহাস। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন ধন্যবাদ।

কালী কথা – সনাতন ডাকাতের কালী

কালী কথা – সনাতন ডাকাতের কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ফল হারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে চলছে কালী কথা।

বাংলার কালী মন্দির গুলি নিয়ে লিখতে বা বলতে গেলে অনিবার্য ভাবে ডাকাত কালী প্রসঙ্গ আসবেই।আজ আপনাদের জানাবো হুগলির

এক কালের কুখ্যাত সনাতন ডাকাতের কালী

পুজোর কথা।

 

স্বাধীনতার বহু আগে হুগলীর পুরুষত্তম পুর ছিলো বেশ দুর্গম এলাকা।এই অঞ্চলে ডাকাতরাই দাপিয়ে বেড়াতো। প্রশাসন থেকে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে যারা একটু অর্থবান তারা সনাতন ডাকাতের ভয়ে সর্বদা ভয়ে ভয়ে থাকতো।দুঃসাহসী ডাকাত সর্দার ছিলেন সনাতন বাগদী। নিবিড় জঙ্গলের মধ্যে দেবী কালীর উপাসনা করতেন তিনি।তার ডাকাত দল নিয়ে বহু কিংবদন্তী প্রচলিত।

 

কথিত আছে একদিন সনাতন বাগদী ডাকাতি করতে বের হবেন। অমাবস্যার রাতে মায়ের পূজা দিয়ে তবেই কাজে বেরোবে তারা। সেইমতো নানা পূজার উপাচারে সেজে উঠেছে মন্দির। এদিকে সেদিকে ছড়িয়ে বসে আছে ডাকাত দল। সবাই অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রস্তুত এবং সুরাপনে মত্ত। হঠাৎ সনাতন উচ্চকণ্ঠে ‘বলি কোথায়?’ বলে চিৎকার করে উঠলো। সবাই দেখলো তাইতো। মায়ের বলীর ব্যবস্থা করা হয়নি।অথচ তন্ত্র মতে তারা পূজো করে এবং বহুকাল থেকে বলী দিয়ে পূজো সম্পন্ন করার রীতি রয়েছে।

 

দলের ডাকাতেরা ভয়ে জানালো চৈত্র মাস! ঝড় বৃষ্টি লেগেই আছে! সব ওলট-পালট করে দিচ্ছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ । ঘর থেকে বের হতে পারেনি কেউ।তাই মায়ের বলীর ব্যবস্থাও করা হয়নি।

 

সর্দার সনাতন রাগে গর্জে উঠলো ‘সে কী! চৈত্র মাস বলে মা অনাহারে থাকবেন? বলী হবেনা।না তা হবে না! গভীর রাতেই হুকুম হলো।যে ভাবে পারিস বলি ধরে আন।’ কিন্তু সেদিন ডাকাতরা তার কথা শুনলোনা কারন ডাকাতির ভাগবখরা নিয়ে আগে থেকেই দলে অসন্তোষ ছিল। সর্দারের বিরুদ্ধে তলে তলে বিদ্রোহ হচ্ছিলো আগে থেকেই।

 

নিজের চ্যালাদের এই অবহেলায় ক্ষেপে উঠলেন সনাতন ডাকাত ।রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিনি বললেন, “আমার আদেশ অমান্য করা! এত বড় স্পর্ধা! তোদের সবকটাকে আজ মায়ের পায়ে বলি দেব।”এই বলে হুঙ্কার দিয়ে রাগে আক্রোশে উন্মুক্ত তরবারি হাতে নিজের দলের লোকেদের ওপরেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন ডাকাত-সর্দার সনাতন।বহু ডাকাত নাকি সেদিন তার হাতে প্রাণ হারায়। তার দল ও ক্ষমতা হারায় এবং ক্রমে ডাকাতি প্রায়

বন্ধ হয়।

 

আজও গোটা হুগলী জুড়ে প্রচলিত আছে সনাতন ডাকাতের নানা কীর্তি এবং খুবই জনপ্রিয় তাঁর ডাকাত কালীর পূজো।আজও ডাকাত কালীর পুজো হয় নিষ্ঠা সহকারে। দেবী খুবই জাগ্রত এবং বহু মানুষ নিজের মনোস্কামনা নিয়ে আসেন

দেবীর কাছে।

 

কালী কথা নিয়ে আবার ফিরে আসবো

পরের পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পঞ্চ মহাপুরুষ যোগ

পঞ্চ মহাপুরুষ যোগ মূলত হংস যোগ যা বৃহস্পতির অবস্থানের উপর হয়। ভদ্র যোগ যা বু্ধের অবস্থানের উপর হয়। রুচক যোগ যা মঙ্গলের অবস্থানের উপর হয়ে থাকে। শশ যোগ যা শনির অবস্থানের উপর হয়ে থাকে। মালব্য যোগ যা শুক্রের অবস্থানের উপর হয়ে থাকে অর্থাৎ এই পাঁচটি যোগকে একত্রিত পঞ্চ মহাপুরুষ যোগ বলা হয়। এই গ্রহগুলি যদি নিজ ভাবে অথবা তুঙ্গী অবস্থায় রাশি বা লগ্নের কেন্দ্রভাবে অথবা ত্রিকোন ভাবে অবস্থান করে তবে এই যোগের সৃষ্টি হয়। হংস যোগে জন্মগ্রহণকারী জাতক জাতিকারা বিদ্বান বুদ্ধিমান জ্ঞানী বহু বিষয়ের উপর পাণ্ডিত্য লাভ করেন এরা দয়াশীল ও পরোপকারী হয়ে থাকে ন। এদের জীবনে রাজ তুল্য সম্মান প্রাপ্তি ঘটে। বুধের নিজে ভাবে অবস্থান অথবা তুঙ্গী অবস্থায় কেন্দ্রে বা ত্রিকোণ ভাবে রাশি ও লগ্ন থাকলে ভদ্র যোগ হয় এই যোগের জাতক জাতিকা বিদ্বান ও বিভিন্ন বিষয়ের পাণ্ডিত থাকে । এই যোগের জন্ম গ্রহণকারী জাতক-জাতিকারা কবি সাহিত্যিক হয়ে থাকেন। রুচক যোগ মূলত মঙ্গল নিজ ওভাবে অবস্থান বা তুঙ্গে থাকলে এই যোগ হয়। এই যোগের জাতক জাতিকারা মূলত শিল্পকলা অথবা প্রশাসনিক কর্মে সাফল্য পেয়ে থাকেন। শশ যোগ মূলত শনির অবস্থানের উপর নির্ভর করে এই যোগের জন্মগ্রহণকারী জাতক জাতিকার জীবনে কর্ম ও অর্থনৈতিক প্রবল সাফল্য আসে এরা অত্যান্ত খুবই রাগী ও দয়ালু প্রকৃতির হয়ে থাকে এদের প্রভাব প্রতিপত্তি থাকে অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক জীবনেও সাফল্য পান। মালব্য যোগ মূলত শুক্রের অবস্থানের উপর নির্ভর করে এই যোগ সৃষ্টি হয়। মালব্য যোগের জাতক জাতিকারা মূলত শিল্পকলা জগতে প্রবল সাফল্য পেয়ে থাকেন গান বাজনা নৃত্য অভিনয় বাচিক শিল্পী হিসাবে খ্যাতি লাভ করে। রাজযোগ কারী শুক্রের মহা দশায় প্রবল সাফল্য

ফলহারিণী অমাবস্যা এবং গ্রহ দোষ খণ্ডন

ফলহারিণী অমাবস্যা এবং গ্রহ দোষ খণ্ডন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের এই বিশেষ পর্বে আপনাদের ফল হারিণী অমাবস্যা তিথিতে গ্রহ দোষ খন্ডনের গুরুত্ব নিয়ে কিছু জানাবো। জানাবো কেনো গ্রহ দোষ বলতে জ্যোতিষ শাস্ত্রে কি বোঝায়। গ্রহ দোষ খণ্ডন কি এবং কেনো ফল হারিণী অমাবস্যায় গ্রহ দোষ খণ্ডন হয়।

 

জাতক জাতিকার জন্মছক বিশ্লেষণ করলে অথবা হস্তরেখা বিচার করলে দেখা যায় অনেকেরই কিছু না কিছু গ্রহদোষ রয়েছে। অর্থাৎ কিছু শুভ গ্রহ এবং কিছু অশুভ গ্রহের গ্রহগত সংযোগ। সেটা দৃষ্টি বিনিময় বা অশুভ স্থানে অবস্থানে ফলে হতে পারে আবার অশুভ গ্রহ দ্বারা কোনো গ্রহ পীড়িত হলেও হতে পারে। আবার অশুভ নক্ষত্রর প্রভাবেও হতে পারে।গ্রহ দোষের প্রভাব আজীবন বয়ে বেড়াতে হয় যদি না সঠিক সময়ে শাস্ত্র সম্মত ভাবে সেই গ্রহ দোষ খণ্ডন হয় ।

 

জ্যোতিষ শাস্ত্রে যতরকম প্রতিকারের কথায় উল্লেখ আছে তার মধ্যে শাস্ত্র মতে পুজো পাঠ এবং মন্ত্র উচ্চারনের মধ্যে দিয়ে গ্রহদোষ খণ্ডনকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়েছে|তবে সাফল্য এবং

তার স্থায়ীত্ত্ব নির্ভর করে সঠিক তিথি

নির্বাচনের উপর।সেক্ষেত্রে যেহেতু গ্রহ দশ অশুভ কর্ম ফলের প্রভাবে তৈরী হয় তাই ফল হারিণী অমাবস্যায় সেই কর্ম ফল এবং তার থেকে সৃষ্ট গ্রহ দোষ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

ফল হারিণী অমাবস্যার অর্থাৎই হলো জন্ম জন্মান্তরের পাপের ফল থেকে মুক্তি লাভ।

 

জন্ম ছকে মাঙ্গলিক দোষ থাকলে যেমন বিবাহিত জীবনে সমস্যা আসে তেমনই রাহু ও চন্দ্রের অশুভ সংযোগে তৈরী হয় গ্রহণ দোষ যা মানসিক অসুস্থতা ডেকে আনে। সাফল্য আসতে দেরি হয়। আবার রবি শুক্র দারিদ্র যোগ জীবনে চলার পথে পদে পদে বাঁধা তৈরি হয়।আবার কুখ্যাত রাহু কেতুর নাগ পাশ তৈরী করে কালসর্প দোষ যা জীবনের উন্নতি শান্তির পথে বাঁধা তৈরী করে।

 

বিগত কয়েক বছর ধরেই প্রায় প্রতিটি বিশেষ তিথিতে তারাপীঠে বিশেষ হোম যজ্ঞ, ও পূজা পাঠের মাধ্যমে শাস্ত্র মতে গ্রহগত দোষ খণ্ডন হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়া এবং মন্দিরের ওয়েবসাইট কে ব্যবহার করে লখ্য লখ্য মানুষ ও মায়ের ভক্তরা দূর থেকেই এই বিশেষ পুজোয় অংশ নিয়েছেন ও মায়ের কৃপায় জীবনের সমস্যাথেকে মুক্তি লাভ করেছেন|

 

এবছরও ফল হারিণী অমাবস্যায় বিশেষ পূজা ও গ্রহ দোষ খণ্ডনের আয়োজন করা হয়েছে, আমি থাকবো নিমিত্ত হিসেবে বাকিটা মায়ের কৃপা ও আপনাদের আস্থা এবং শ্রদ্ধা|সবাইকে ফল হারিণী কালী পুজোয় অনেক শুভেচ্ছা।

 

ফিরে আসবো ধারাবাহিক কালী কথা নিয়ে আগামী পর্ব গুলিতে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শুভ পঁচিশে বৈশাখ

শুভ পঁচিশে বৈশাখ

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ বিশ্ব কবি রবীন্দ্রনাথের জন্ম দিন। আজ আমরা সাধারণত গঙ্গা জলে গঙ্গা পূজো করার মতো তাঁর সৃষ্টি দিয়েই তাঁকে স্মরণ করে থাকি।
তবে আজ একটু আলাদা ভাবে তাঁকে দেখার চেষ্টা করবো।তার মানবিক দিক গুলি যেমন রস বোধ, খাওয়া দাওয়া, প্রকৃতি প্রেম, আধ্যাত্মিকতা, দেশ প্রেম নিয়ে একটু লেখার চেষ্টা করছি।

অসাধারণ রসিক মানুষ ছিলেন কবিগুরু।
একবার চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় গেছেন শিলাইদহে জমিদার রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা আনতে। চারুচন্দ্র তখন ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। রবীন্দ্রনাথ তখন অবস্থান করছিলেন পদ্মার ওপারে বজরায়। নদীর ঘাট থেকে বজরা পর্যন্ত একটা তক্তার সাঁকো পেতে দেয়া হয়েছে।
চারুচন্দ্র পা টিপে টিপে নৌকায় উঠে আসছেন। বজরার ছাদ থেকে এ দৃশ্য দেখে রবীন্দ্রনাথ সাবধান করলেন চারুকে, ‘সাবধানে পা ফেলো। এ জোড়াসাঁকো নয়!’ তার এই মন্তব্য শুনে আশপাশের সবাই হেসে উঠে ছিলেন|

রবীন্দ্রনাথের রসনা বিলাস নিয়েও বহু মিথ চালু আছে। অনেকে বলেন কবি রাজি কাটলেট এর কবি আসলে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। এই নিয়ে একটি গল্পও আছে।একবার তিনি বিখ্যাত বসন্ত কেবিনে গিয়েছিলেন কাটলেট খেতে।কাটলেটের উপরে থাকা পাউরুটির প্রলেপ কবির একেবারে পছন্দ হয়নি। বাবুর্চি তা জানতে পেরে ডিমের গোলায় ডুবিয়ে বানিয়ে দিলেন এক নতুন কাটলেট। সেটা খেয়ে কবির বেশ পছন্দ হয়েছিল।কবির মন রাখতে যেহেতু আবিষ্কার তাই সেই থেকে এই কাটলেটের নাম দেওয়া হয় ‘কবিরাজি কাটলেট’|

প্রকৃতি প্রেমিক ছিলেন রবীন্দ্রনাথ এবং বর্ষা ছিলো কবির প্রিয় ঋতু।বর্ষা ঋতু কবির অজান্তেই যেন তাঁর অন্তর সত্তায় স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছিল। তাই রবীন্দ্র সঙ্গীতে ও সাহিত্যে সর্বত্রই তার প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।বর্ষায় কবি শান্তি নিকেতনেই থাকতে পছন্দ করতেন। সেই সময় বর্ষার বোলপুর যেনো এক স্বপ্নের জগৎ। সেই জগৎ ধরা দিতো তার গানে তার কবিতায়।

বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে তিনি রাখি উৎসবকে হাতিয়ার করে ছিলেন।হিংসা নয় শান্তি এবং মৈত্রীর মাধ্যমে প্রতিবাদ ছিলো তাঁর প্রথম পছন্দ।

তাঁর ধর্ম চেতনা বা আধ্যাত্মিকতা ও ছিলো অন্য ধরণের। পরম পিতার প্রতি তাঁর আস্থা ছিলো অগাধ। ধর্মীয় গোঁড়ামির উর্ধে উঠে তিনি মানুষের মধ্যে নিজের ঈশ্বরকে খুঁজতেন। ভূত প্রেত পরলোক নিয়েও তাঁর কৌতূহল ছিলো।আত্মার অস্তিত্ব নিয়ে অনুসন্ধান করতে চাইতেন। তাই এক সময়ে ঠাকুর বাড়িতে প্ল্যানচেট নিয়ে চর্চাও হতো।

জন্ম দিনে তার চরিত্রের কিছু বিশেষ দিক ছুঁয়ে যেতে চেষ্টা করলাম। মানুষ রবীন্দ্রনাথকে খোঁজার চেষ্টা করলাম।আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। গুরুদেব কে জানাই প্রণাম এবং শ্রদ্ধাঞ্জলি। ফিরে আসবো আধ্যাত্মিক বিষয়
নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে।
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন ধন্যবাদ।