যখন কাউকে সাক্ষী রেখে কোনও কাজ করা হয় তখন ব্যবহার করা হয় সাক্ষী গোপাল কথাটি।জানেন কি কে এই সাক্ষী গোপাল? কেনই বা তার এমন অদ্ভূত নাম? আজকের পর্বে জানাবো সাক্ষী গোপালের অলৌকিক বৃত্তান্ত|ভারতের ওড়িশার কটক শহরে রয়েছে সাক্ষী গোপালের একটি মন্দির। সাক্ষী গোপালের এই মন্দিরের সাথে জড়িত আছে অলৌকিক এক ঘটনা যেখান থেকে শুরু হয় এই কিংবদন্তী|শোনা যায় এই মন্দিরের বিগ্রহটি আগে ছিল বৃন্দবনের এক মন্দিরে। সেখান থেকে স্বয়ং ওড়িশার এই স্থানে এসেছিল ওই মূর্তি। আর এই মূর্তির নিজে পায়ে আসার ঘটনাটি ঘিরেই প্রচলিত হয়েছে এক জন্যশ্রুতি । বলা বাহুল্য সেই কাহিনির মাধ্যমেই জন্ম হয়েছে সাক্ষী গোপাল বাগধারাটি।শোনা যায় দক্ষিণ ভারতের এক কুলীন ব্রাহ্মণ সংসারের যাবতীয় দায়িত্ব নিজের ছেলের হাতে তুলে দিয়ে তীর্থদর্শনে বেরিয়ে পড়েন। তীর্থে তীর্থে ঘুরে তিনি মথুরায় এসে পৌঁছন।সেখানে তার সঙ্গে একজন যুবক ব্রাহ্মণের আলাপ হয় একসঙ্গে মিলেই তারা ঘুরে দেখতে থাকেন বৃন্দাবনের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান। হঠাৎ করেই ব্রাহ্মণের মনে হয় এমন ছেলে তাঁর কন্যার জন্য একেবারে উপযুক্ত পাত্র। তৎক্ষণাৎ নিজের মনের কথা সেই যুবককে বলেন ব্রাহ্মণ। কিন্তু ব্রাহ্মণত্বের বিচারে সেই যুবক কুলীন ছিল না, তাই প্রাথমিক ভাবে এমন প্রস্তাবে অসম্মতি জানায় ওই যুবক। তার যুক্তি ছিল, এই বিয়ে ব্রাহ্মণ সমাজ কিছুতেই মেনে নেবে না। তখন ওই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ যুবককে আশ্বস্ত করেন যে এমন কোনও পরিস্থিতি তিনি তৈরি হতে দেবেন না। তখন তাঁরা দুজনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন বৃন্দাবনের এক গোপাল মন্দিরে। ব্রাহ্মণ সেই মন্দিরের দেবতাকে সাক্ষী করে শপথ করেন যে তিনি তাঁর কন্যার বিবাহ ওই যুবকের সঙ্গেই দেবেন। যুবকটিও কিছুদিন সময় চেয়ে নিজের বাড়ি ফিরে যায়।তারপর নিজের গ্রামে পরিবারের কাছে ফিরে আসেন ওই ব্রাহ্মণ। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় সেই পাত্রের পরিচয় সকলে জানার পর। ব্রাহ্মণের নিজের পরিবার সহ সমাজের প্রত্যেকেই এই বিয়ের বিরুদ্ধে একেবারে বেঁকে বসেন। ফলত বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ পড়েন এক ভয়ানক ধর্মসঙ্কটে। একদিকে তাঁর প্রতিজ্ঞাভঙ্গের ভয়, অন্যদিকে সমাজচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা। এমন সময় হঠাৎই সেখানে হাজির হন সেই যুবক। কিন্তু তাঁকে চরম অপমান করে গ্রাম থেকে তাড়িয়ে দেন গ্রামবাসী ও ওই বৃদ্ধের আত্মীয়রা। অপমানিত যুবক গ্রামবাসীদের উদ্দেশে ঘোষণা করেন, যে মন্দিরে দাঁড়িয়ে বৃদ্ধ ব্রাহ্মণ তাঁকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, সেই মন্দিরের বিগ্রহকেই তিনি সাক্ষী হিসেবে সকলের সামনে নিয়ে আসবেন।তিনি নিজে দেবেন সাক্ষী|মনের দুঃখে যুবক হাজির হন বৃন্দাবনের সেই গোপালের মন্দিরে। কথিত আছে, সেখানে গিয়ে আকুলভাবে তিনি দেবতাকে জানান তাঁর সঙ্গে হওয়া অন্যায়ের কথা। সেই ডাকে নাকি সাড়াও দেন স্বয়ং গোপাল। তিনি রাজি হন সাক্ষী দিতে এবং যুবকের কথামতোই পাথরের বিগ্রহ রূপে স্বশরীরে তিনি সাক্ষী দিতে রওনা হন দক্ষিণ ভারতের ওই গ্রামের উদ্দেশে।গোপালের একটি শর্ত ছিলো|যাওয়ার পথে যুবক যেন পিছন ফিরে মূর্তির দিকে না দেখে। পিছনে তাকালেই তিনি থেমে যাবেন ।যুবক শর্ত মেনেই নিতেই শুরু হয় যাত্রা। বেশ খানিকটা পথ যাওয়ার পর ওড়িশার কাছাকাছি একটি গ্রামে এসে যুবকের মনে হয় গোপালের বিগ্রহ আর সঙ্গে আসছেন না। সন্দেহের বশেই একটিবারের জন্য পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখেন|ব্যাস শর্ত অনুসারে গোপাল সেখানেই দাঁড়িয়ে পড়েন।ভগবানের উপর যতক্ষণ ভক্তের বিশ্বাস ছিলো ভগবান তার সাথে ছিলো|বিশ্বাস ভঙ্গ হতেই তিনি আবার পাথরের মূর্তিতে পরিণত হলেন এবং তার গতি স্তব্ধ হলো|তবে এই খবর সর্বত্র রটে যায় এবং বৃন্দাবনের গোপাল মূর্তি এতদূর হেঁটে এসেছেন শুনে পার্শ্ববর্তী গ্রাম থেকে দলে দলে মানুষ ওড়িশার ওই গ্রামে জমায়েত হতে থাকেন। খবর পৌঁছায় সেই বৃদ্ধ ব্রাহ্মণের বাড়িতেও। তিনিও সদলবলে সেই গ্রামে উপস্থিত হন।সবাই নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং ব্রাহ্মণকন্যার সঙ্গে সেই যুবকের বিয়ের আয়োজন করেন|দ্রুত এই অলৌকিক ঘটনার কথা ছড়িয়ে পড়তেই গোপালের নামে ওই স্থানে একটি মন্দির বানিয়ে দেওয়া হয়। মন্দিরে স্থাপিত সেই গোপালের বিগ্রহ পরিচিত হয় ‘সাক্ষী গোপাল’ নামে|জন্ম হয় সাক্ষী গোপালের নামে প্রচলিত বিখ্যাত প্রবাদ|আগামী পর্বে আবার কোনো পৌরাণিক বা শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে ফিরে আসবো আপনাদের সামনে পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মন্দির রহস্য – কনক দুর্গার মন্দির
বহু মন্দিরের ইতিহাস ও অলৌকিক বৃত্তান্ত আপনাদের আগেই বলেছি ধরবাহিক লেখনী গুলির মাধ্যমে| তবে বাংলায় ঐতিহাসিক তথা প্রাচীন মন্দিরের সংখ্যা এতোই বেশি যে সহজে শেষ হওয়ার নয়|আজ বলবো ঝাড় গ্রামের কনক দূর্গা মন্দিরের কথা|চিল্কিগড়ের কনক দুর্গা মন্দির বাংলার প্রাচীন দূর্গা মন্দির গুলির মধ্যে অন্যতম। শোনা যায় এই মন্দিরটি প্রায় ৫০০ বছরের পুরনো। আজও জশ্রুতি আছে যে একসময় নরবলি হত।যদিও তার ঐতিহাসিক তথ্য প্রমান জোগাড় করা মুশকিল তাই এক্ষেত্রে বিশ্বাস টাই সব|এখনও মোষ বা পাঁঠা বলি হয় বিশেষ রীতি মেনে।বলা হয় এই মন্দিরে নিজেই নিজের ভোগ রান্না করেন দেবী।ভোগের ক্ষেত্রে এখানে বেশ বৈচিত্র এবং অদ্ভুত কিছু রীতি আছে|পুজোর চারদিন দুর্গাদেবীকে হাঁসের ডিম, মাছ পোড়া, শাক ভাজা, পান্তা ভাত দিয়ে ভোগ দেওয়া হয়। অষ্টমীর রাতে মন্দিরে পাতকুয়োর সামনে পাঠা বলি দিয়ে দেবীকে নিবেদন করা হয়। শোনা যায় নিশি রাতে সেই বলি হয়৷ নবমীর অন্নভোগের আগে সেই বলির মাংস নতুন মাটির হাড়িতে সেদ্ধ করে রাখা হয়।নবমীর যজ্ঞের পরে হাড়িতে রাখা বলির মাংস রান্না করে কনক দূর্গার ভোগ নিবেদন করা হয়। একেই পুরোহিতরা বিরাম ভোগ বলেন। অষ্টমী পুজোর পরই রাতের বেলায় জঙ্গলের গভীরে বলির আয়োজন হয়। তিথি-নক্ষত্র মেনেই বলি দেওয়া হয় আর সেটি নিয়ে আসা হয় রাজবাড়ির বিশেষ কক্ষে। এই পুজোতে বাইরের কোনও মানুষের প্রবেশ অধিকার থাকে না। শুধুমাত্র পুরোহিত এবং কয়েকজন সহায়ক থাকেন যাঁরা বংশ পরম্পরা ধরে এই কাজ করে আসছেন।শোনা যায় চিল্কিগড়ে মত্তগজ রাজবংশের গোপীনাথ সিং এই পুজোর প্রতিষ্ঠা করেন। মত্তগজ বংশের পর চিল্কিগড়ের আসেন ধবলদেও সিংহ। তাঁরও আগে ছিলেন ত্রিপাঠি বংশের রাজারা। এঁরা সকলেই ছিলেন শক্তির উপাসক। চিল্কিগড় এলাকা ঘন জঙ্গলে পরিপূর্ণ। আজও কান পাতলে শোনা যায় অদ্ভুত সব গা ছম ছম করা কিংবদন্তী শোনা যায়, চিল্কিগড়ের প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীন যে মন্দিরটি রয়েছে তার পশ্চিমপ্রান্তের এক পরিত্যাক্ত দালানে নাকি নরবলি হত। সেই রক্তেই নাকি পূজিতা হতেন কনকদূর্গা।প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই মন্দির। ঝাড়গ্রাম থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার ডুলুং নদীর তীরে গভীর জঙ্গলে অবস্থিত । এখানকার দেবী অশ্বারোহিনী চতুর্ভূজা। ১৯৬০ সালে আসল মূর্তিটি চুরি হয়ে যায়৷ ১৯৯৬ সালে গোপীনাথের বংশধররা অষ্টধাতুর কনকদুর্গার একটি রেপ্লিকা মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত করেন৷ মন্দির লাগোয়া এলাকায় বিশাল জঙ্গল। পর্যটনের জন্য বেশ ভালো।বহু দুর দুরন্ত থেকে মানুষ আসেন দেবীর দর্শন করতে|ফিরে আসবো অন্য কোনো মন্দিরের রহস্য নিয়ে|আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মন্দির রহস্য – দেবী ছিন্নমস্তার মন্দির
ভারতের প্রাচীন রহস্যময় মন্দিরগুলি নিয়ে বিগত দিনে বেশ কয়েকটি লেখা লিখেছি |সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে আজ একটি বহু প্রাচীন ছিন্ন মস্তা দেবীর মন্দিরের কথা আপনাদের বলবো|মন্দিরটি অবস্থিত আমাদেরর প্রতিবেশী রাজ্য খন্ডে|বিখ্যাত পরিচক সত্যজিৎ রায়ের ছিন্নমস্তার অভিশাপ গল্পে এই মন্দিরের উল্লেখ আছে যা নিয়ে পরে চলচ্চিত্র ও হয়েছে|ছিন্ন মস্তা মন্দিরটি ৬০০০ বছরের পুরানো|মন্দিরের ভিতরে ছিন্নমস্তিকার দেবীর মূর্তিটি দেখতে আশ্চর্যজনক। পদ্মফুলের উপর তাঁর মূর্তি স্থাপিত। তাঁর তিনটি চোখ রয়েছে। ডান হাতে তলোয়ার আর বাম হাতে দেবী তাঁর নিজের বিচ্ছিন্ন মস্তক ধারণ করছেন। বিপরীত ভঙ্গিতে কামদেব এবং রতি দেবীর পায়ের নীচে শয়ন অবস্থায় উপবিষ্ট। মা দেবীর চুল খোলা ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। তিনি একটি সর্প মালা এবং একটি মুণ্ড মালা পরে রয়েছেন। দেবী মা এখানে অলংকারে সুশোভিত। দিগম্বরী রূপেদেবী ছিন্ন মস্তার সুবিশাল আকার বিরাজমান।মন্দিরটি তার তান্ত্রিক স্থাপত্যশৈলীর জন্যও বিখ্যাত। বহু দুর থেকে তান্ত্রিক জ্যোতিষী ও সাধারণ ভক্তরা আসেন মায়ের কাছে কারন জ্যোতিষ ও তন্ত্র জগতে দেবী ছিন্নমস্তাকে রাহু গ্রহের ইষ্ট দেবী হিসেবে দেখা হয়|তার পুজো দিয়ে রাহু কে সন্তুষ্ট করা হয়|পুরান অনুসারে এক বার দেবী আদ্যাশক্তি তাঁর সখী দের সঙ্গে গঙ্গা নদীতে স্নান করতে গেলে তাঁর দুই সখী সেখানে কিছু ক্ষণ কাটানোর পর ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েন। দুজনের ক্ষুধা এতই প্রবল যে, দু’জনের গায়ের রং পরিবর্তিত হতে শুরু করে এবং তা কালো হয়ে যায়। তখন তারা দেবী মায়ের কাছে খাবারের জন্য দাবি করতে থাকে। মা তাকে ধৈর্য ধরতে বলল। কিন্তু তারা ক্ষুধার জ্বালায় জ্বলছিল। বন্ধুদের অবস্থা দেখে নিজের মাথা কেটে ফেলেন দেবী মা। তাঁর শিরশ্ছেদ করার সময় নিজের মাথা বাম হাতে পড়ে যায়। সেখান থেকে রক্তের তিনটি স্রোত বইতে শুরু করে। দেবী মা নিজের দুই সঙ্গিনীর পান করার জন্য দু’টি স্রোত প্রদান করেন এবং তিনি নিজেই অবশিষ্ট স্রোত থেকে রক্ত পান করতে শুরু করেছিলেন।তার এই রূপই ছিন্নমস্তা নামে পরিচিত|শত্রুদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করার জন্য ছিন্নমস্তা দেবীর বিশেষ পূজা করা হয়। এখানে মায়ের রূপ উগ্র।তন্ত্র মতে পুজো হয়|ভক্তরা দেবী ছিন্নমস্তিকার কাছে বলি দান এবং তন্ত্র সাধনার মাধ্যমে নিজেদের মনোবাঞ্ছা পূরণ করেন।ফিরে আসবো এমনই কোনো রহস্যময় প্রাচীন মন্দিরের কথা নিয়ে|আগামী পর্বে |পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – ব্রহ্মাস্ত্র রহস্য
বর্তমানে একটি চলচিত্রের কল্যানে ব্রহ্মস্ত্র শব্দটি বেশ জনপ্রিয়|কিন্তু কি ওই ব্রহ্মস্ত্র তা জানতে গেলে আমাদের পুরান ও রামায়ন মহাভারত পড়তে হবে|জানতে হবে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের কথা|দীর্ঘ ১৮ দিন ধরে চলেছিল এই যুদ্ধ এবং যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় ১৬০ কোটি মানুষ। এই বিপুল সংখ্যক প্রাণহানি কোনও সাধারণ অস্ত্রে কী ভাবে সম্ভব, সেই প্রশ্ন বার বার|মহাভারতে নানা রকম পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার হয়েছিল বলে দাবি করেন অনেকেই ব্রহ্মস্ত্র সহ মহাভারতে উল্লেখিত দৈব মারণ অস্ত্র নিয়ে আজ আলোচনা করবো|আধুনিক ঐতিহাসিকদের মতে মহাভারত রচিত হয়েছিল ১০০০ খ্রীষ্টপূর্বাব্দে। পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে ভয়ানক যুদ্ধে সামিল হয়েছিলেন ১০০ কৌরব-ভ্রাতা। মহাভারতের বর্ণনায় এমন বেশ কয়েকটি অস্ত্রের বর্ণনা পাওয়া যায়, যেগুলি তাদের ব্যাবহারে ও মারণ ক্ষমতায় পরমাণুঅস্ত্রের মতো। কিছু অস্ত্র এখনকার দিনের পরমাণু অস্ত্রের কথা মনে করিয়ে দেয় সহজেই।মহাভারত-সহ পুরাণে একাধিক জায়গায় ব্রহ্মাস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়। অন্যান্য অস্ত্রের তুলনায় এর মারণ ক্ষমতা অনেক বেশি। ব্যাপক ধ্বংসলীলা চালাতে সক্ষম বলেই এই অস্ত্র ব্যবহারে সেই সময়েও নিষেধাজ্ঞা ছিল। আর সমস্ত অস্ত্র ব্যর্থ হলে শুধুমাত্র অশুভ শক্তির বিনাশ ঘটাতেই ব্রহ্মস্ত্র প্রয়োগ করা যাবে বলে নির্দেশ ছিল।যে লক্ষ্যের প্রতি ব্রহ্মাস্ত্র প্রয়োগ করা হবে, তা সম্পূর্ণ রূপে ধ্বংসপ্রাপ্ত হবে। এই অস্ত্র আমাদের শুধুমাত্র পরমাণু বোমার কথাই মনে করায়। বিশেষজ্ঞদের মতে ব্রহ্মাস্ত্র আসলে বহু পরমাণু বোমার সম্মীলিত শক্তি। এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মা স্বয়ং এই অস্ত্র নির্মাণ করেছিলেন। এই অস্ত্র ব্যবহার করার ক্ষমতা হাতে গোণা কয়েকজনের কাছেই ছিল। কারণ ব্রহ্মাস্ত্রের অধিকারী হতে হলে ব্রহ্মাকে খুশি করা প্রয়োজন।ব্রহ্মশীর্ষ অস্ত্রর উল্লেখ ও আছে কিছু গ্রন্থে প্রাচীণ পুঁথি অনুসারে ব্রহ্মাস্ত্রের থেকেও চারগুণ বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ছিল ব্রহ্মশীর্ষ অস্ত্র। ব্রহ্মার চার মুখ থেকে নির্গত শক্তির সমান ক্ষমতা ধরে এই অস্ত্র। ব্রহ্মশীর্ষ অস্ত্র মাত্র একবার প্রয়োগ করেই সমস্ত সৃষ্টিকে মুহূর্তের মধ্যে ছাইয়ে পরিণত করা সম্ভব। এমনকি ব্রহ্মশীর্ষ অস্ত্র প্রয়োগ করলে স্বর্গলোকও এর হাত থেকে রেহাই পেত না। এই অস্ত্র প্রয়োগ করা হলে উল্কা-বৃষ্টি হতো বলে জানা যায়|নারায়ণী অস্ত্র নামে আরো একটি অস্ত্র ছিলো মনে করা হয় রামায়ণে শুধুমাত্র রাম এবং মহাভারতে কেবল শ্রীকৃষ্ণ, দ্রোণ ও অশ্বত্থামা এই অস্ত্রের অধিকারী ছিলেন। অশ্বত্থামা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পাণ্ডবদের উপর এই অস্ত্র প্রয়োগ করেন। তখন সমস্ত ধরনের অস্ত্র একসঙ্গে আকাশ থেকে ঝরে পড়তে শুরু করে। কিন্তু কৃষ্ণ জানতেন কী ভাবে এই অস্ত্রকে শান্ত করতে হয়। তিনি পাণ্ডবপক্ষের সবাইকে বলেন সঙ্গে সঙ্গে নিজেদের অস্ত্র ত্যাগ করে মাটিয়ে শুয়ে সম্পূর্ণ ভাবে নারায়ণী অস্ত্রের সামনে আত্মসমর্পণ করতে। তার ফলেই পাণ্ডবরা এই মারণ অস্ত্রের আঘাত থেকে রক্ষা পান।ব্রহ্মানন্দ অস্ত্র অন্যতম শক্তিশালী অস্ত্র ছিলো যার মহাভারতে উল্লেখ পাওয়া যায় মহাভারতে।বিশ্বের সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার পাঁচ মুখের সঙ্গে সাদৃশ্য রয়েছে এই মারণাস্ত্রের। সমগ্র সৌরজগতের শক্তি নিহিত ব্রহ্মানন্দ অস্ত্রের মধ্যে। বশিষ্ঠ মুনি বিশ্বামিত্রের উদ্দেশ্যে একবার এই অস্ত্র প্রয়োগ করেছিলেন বলে পুরানে উল্লেখ আছে|সব শেষে বলবো পশুপতাস্ত্রর কথা|পশুপতাস্ত্র হল পশুপতি অর্থাত্ শিবের অস্ত্র। মহাদেবের কাছ থেকেই এই অস্ত্র লাভ করেন পঞ্চপাণ্ডব অর্জুন। মহাদেবের এই অস্ত্র ভয়ংকর শক্তিশালী এবং উল্লেখযোগ্য বিষয় হল চোখের দৃষ্টির মাধ্যেমেই এই অস্ত্র চালনা করা সম্ভব। তবে কেউ এই অস্ত্র তাঁর চেয়ে দুর্বল কারোর প্রতি নিক্ষেপ করতে পারবেন না। গোটা সৃষ্টি ধ্বংস করার ক্ষমতা রাখে পশুপতাস্ত্র। মহাভারতে কেবলমাত্র অর্জুন এবং রামায়ণে কেবল মাত্র যোদ্ধা ইন্দ্রজিত্ পশুপতাস্ত্র ব্যবহারের অধিকারী ছিলেন।যথা সময়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে|চলবে পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে আলোচনা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
শ্রী কৃষ্ণ অবতার নন কেনো
বিষ্ণুর ১০ অবতার যুগে যুগে পাপীদের বিনাশ ঘটিয়ে সাধুদের পরিত্রাণ দিতে এই ধরায় অবতীর্ণ হয়েছেন। তাদের কীর্তি আগেই আপনাদের বলেছি আবার এই অবতারদের মধ্যেও দু’রকম শ্রেণী রয়েছে। বিষ্ণুর অংশাবতার এবং বিষ্ণুর পূর্ণাবতার।গীতাতে একাধিক স্লোকে কৃষ্ণ নিজেকে ভগবান বলে উল্লেখ করেছেন। বলেছেন, তিনিই শুরু আবার তিনিই শেষ। তাঁর ইচ্ছেতেই জগতের সবকিছু। সবাই তাঁর-ই অংশ। আর কোনও অবতারকে এমন কথা বলতে শোনা যায় নিতাই বাকি ৯ অবতারের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই বলা যায়, তারা অবতার কিন্তু শ্রীকৃষ্ণ অবতার নন। তিনি স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবান।যে সকল অবতারেরা বিষ্ণুর দেহের অংশ থেকে থেকে সৃষ্ট তাঁরা অংশাবতার। আর যে সকল ক্ষেত্রে বিষ্ণু স্বয়ং জন্ম নিয়েছেন, সেক্ষেত্রে তাঁর সেই জন্মগুলিকে বলা হয় পূর্ণাবতার।সেনিয়ে আগামী দিনে বলবো|আজ বলবো শ্রী কৃষ্ণ অবতার নন কেনো|শ্রীকৃষ্ণ সবথেকে আলাদা। বলা হয়, অবতার নয়। শ্রীকৃষ্ণ স্বয়ং ভগবান।কেন শ্রীকৃষ্ণ সকলের থেকে আলাদা কেনো তা তাঁর কার্যকলাপেই প্রমাণিত হয়, তিনি বাকি অবতারের থেকে আলাদা কারন বাকি অবতারদের কোনও একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল। সেই লক্ষ্য পূরণ করতেই তাঁরা অবতীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু শ্রীকৃষ্ণের কোনও নির্দিষ্ট একটি লক্ষ্য ছিল না। বরং একাধিক লক্ষ্য ছিল। বা এভাবেও বলা যায়, তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ধর্ম সংস্থাপন। তার জন্য তিনি যা যা করতে হয়, করেছেন।কংস বধ, শিশুপাল বধ, দ্রৌপদীর লজ্জা নিবারণ এবং সর্বোপরি অস্ত্র না ধরেও কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পরিচালনা। এমন কাজ তো কেবলমাত্র স্বয়ং পরমেশ্বর ভগবানই করে থাকেন। আর শ্রীকৃষ্ণ নিজেও স্বীকার করে নিয়েছেন, তিনি স্বয়ং ভগবান। শুধু অর্জুনকে নয়, একাধিকবার কৃষ্ণ একাধিক জনকে নিজের বিশ্বরূপ দর্শন করিয়েছেন।বিষ্ণুর বাকি অবতারের ক্ষেত্রে কিন্তু এমনটা কখনও দেখা যায়নি। তাঁরা কখনওই নিজেদের ভগবান বা অবতার বলে স্বীকার করেননি। এমনকি রাম তো প্রথমে জানতেনই না যে তিনি অবতার। অনেক পরে জানতে পেরেছিলেন। শ্রীকৃষ্ণ কিন্তু মোটেই তেমন নন। সেই বাল্যকাল থেকেই পূতনা বধ, কালীয়নাগ দমন, গোবর্ধন পর্বত ধারণ ইত্যাদি একাধিক লীলার মাধ্যমে বুঝিয়ে দিয়েছেন তিনি ভগবান। আর শেষে অর্জুনকে ভগবত গীতা শোনালেন।শ্রী কৃষ্ণ কে জানতে হলে গীতা জানতে হবে পাশাপাশি পারতে হবে মহাভারতে|তাছাড়া ভাগবত পুরান পাঠ করতে হবে|ফিরে আসবো আগামী পর্বে|চলবে পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে আলোচনা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মন্দির রহস্য – ঘড়ি বাবার মন্দির
ভক্তরা নিজের মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে মন্দিরে আসেন ও নানা জিনিস মানত করেন কেউ দেব মূর্তির সামনে নানা সুস্বাদু খাবার নিবেদন করেন। কেউ গরিবের সেবা করে ঈশ্বরকে তুষ্ট করার চেষ্টা করেন। কেউ আবার প্রচুর সোনাদানা, রত্ন, অর্থ দিয়ে দেবতাকে সন্তুষ্ট করতে চান।যেমন তিরুপতি মন্দিরে অনেকে কেশ দান করেন বা পদ্মনাভ মন্দিরে এককালে সোনাদানা দান করা হতো|শুনলে অবাক হবেন বারাণসীর জৌনপুরে রয়েছেন একে অদ্ভুত মন্দির যেখানে মন্দিরে ভগবানের পুজোতে নিবেদন করা হয় ঘড়ি। ভক্তদের বিশ্বাস, সেই মন্দিরের দেবতাকে ঘড়ি নিবেদন করলে জীবনে ভোলা সময় দ্রুত আসবে এবং দুঃসময় চলে যাবে|জৌনপুরের এই মন্দিরটি ব্রহ্ম বাবা নামেও পরিচিত তবে মন্দিরের অনন্য নৈবেদ্যগুলির কারণে, আজ এই মন্দিরটি ‘ঘড়ি বাবা মন্দির’ নামে বিখ্যাত|এই মন্দিরের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হল ঘড়ি নিবেদন। লোকে ফুল, মালা ইত্যাদি না দিয়ে মন্দিরে ঘড়ি দান করেন। স্থানীয়রা জানান, প্রায় ৩০ বছর ধরে এই প্রথা চলে আসছে। ব্রহ্ম বাবা বা ঘড়ি বাবার মন্দিরে এই অদ্ভুত ঘড়ি নিবেদনের প্রথা চালু হওয়ার নেপথ্যে একটি অলৌকিক ঘটনা আছে। শোনা যায় প্রায় ত্রিশ বছর আগে একবার এক ব্যক্তির খুব ভালো ড্রাইভার হয়ার ইচ্ছা জাগে। সেই মনোবাঞ্ছাপুরণ করতে তিনি ব্রহ্ম বাবা মন্দিরে যান এবং মনোবাঞ্ছা পূরণ করতে মন্দিরে মানত করেন ওই ব্যক্তি।মনের ইচ্ছা কিছুদিনের মধ্যেই পূরণ হয় তারপর সেই ব্যক্তি ব্রহ্ম বাবার মন্দিরে একটি ঘড়ি নিবেদন করেন।সেই ঘটনা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে। তারপর থেকেই ভক্তদের বিশ্বাস হযে যায় যে ব্রহ্ম বাবা মন্দিরে ঘড়ি নিবেদন করলে মনোবাঞ্ছা পূরণ হয়। মানত পূরণ করতে দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা মন্দিরে ঘড়ি দিতে আসেন|মন্দিরের বাইরের গাছে, সবাই তাঁদের ইচ্ছা পূরণের জন্য একটি ঘড়ি নিবেদন করেন।মন্দির চত্বরে জমা হয়েছে ঘড়ির স্তুপ এবং আশ্চর্য জনক ভাবে ঘড়ি বাবার মন্দিরে নিবেদন করা ওই ঘড়ি আজও কেউ চুরি করে না। হয়তো ঘড়ি বাবার প্রতি আস্থা ও শ্রদ্ধার কারনে সব ঘড়ি সুরক্ষিত থাকে এখানে|যথা সময়ে পরবর্তী পর্বে আবার ফিরে আসবো নতুন কোনো মন্দিরের রহস্য নিয়ে|সঙ্গে নিয়ে পৌরানিক ও অলৌকিক সব ঘটনার উল্লেখ|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
দশ অবতার রহস্য – বিষ্ণুর কল্কি অবতার
আজ দশ অবতার রহস্যর এই পর্বে ভগবান বিষ্ণুর কল্কি অবতার নিয়ে বলবো যা নিয়ে মানুষের কৌতূহল ও প্রশ্নের শেষ নেই|হিন্দু ধর্মে দশ অবতারের কথা বলা হয়েছে যথা মৎস্য , কূর্ম , বরাহ , নৃসিংহ , বামন , পরশুরাম , রাম , বলরাম , বুদ্ধ এবং কল্কি|এই দশ আবতারের সর্বশেষ অবতার হচ্ছেন ‘কল্কি অবতার’ কল্ক’ অর্থ ‘পাপ’ আর ‘কল্কি’ অর্থ পাপ বিনাশকারী । কলিযুগের শেষে পৃথিবী যখন পাপে পরিপূর্ণ হবে, চারিদিকে যখন অন্যায় আর অধর্ম বিরাজ করবে তখন কল্কি বা পাপ বিনাশকারী অবতার আগমণ করবেন ।মহা পুরান নয় তবে হিন্দু শাস্ত্রের আঠেরো টি উপপুরানের মধ্যে অন্যতম কল্কি পুরান | কল্কি পুরানে ভগবানের কল্কি অবতার এর আগমন বার্তা আছে আর আছে তার মহিমা| তার রূপ, স্বভাব, বৈশিষ্ট এবং সকল গুণাবলী ও আবির্ভাব এর উদ্দেশ্য আমরা বিস্তারিত জানতে পারি কল্কি পুরান থেকে |কল্কি পুরানে একটি শ্লোকে বলা আছে –“শম্ভলে বিষ্ঞুযশামে গৃহে প্রার্দুভাবাম্যহম সুমাতাং বিষ্ঞু যশম্য গর্ভ মাধব বৈষ্ঞবম ” ।অর্থাৎ এখানে বলা হচ্ছে ভগবানের কল্কি অবতার শম্ভল শহরের প্রধান পুরোহিত গৃহে জন্মগ্রহণ করবেন । তার পিতার নাম হবে বিষ্ণুযশম এবং মাতার নাম হবে সুমতী|শুধু তার জন্ম স্থান বা অভিভাবক নয় আরো অনেক তথ্য আছে কল্কি পুরানে | বৈশাখ মাসের শুক্লা পক্ষে তিনি জন্ম গ্রহন করবেন|আটটি গুন বর্তমান থাকবে তার চরিত্রে যথা প্রজ্ঞা, কুলীনতা, ইন্দ্রিয় দমন, শ্রুতি জ্ঞান,পরাক্রম,বাগ্মিতা, দান এবং কৃতজ্ঞতা । সাদা ঘোরা হবে তার বাহন,নানাবিধ অস্ত্র দ্বারা সজ্জিত হয়ে তিনি দুষ্টের দমন করবেন | সকল পাপ বিনাশ করে ধর্ম ও ন্যায় পুনর্স্থাপন করবেন তিনি | এই লড়াইয়ে সব দেবতারা তাকে সাহায্য করবেন |বাকি অবতাররা পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়ে গেছেন অর্থাৎ তারা অতীত । এক মাত্র বাকি আছেন কল্কি তিনি আসবেন ভবিষ্যত থেকে |কলির শেষ প্রান্তে অন্যায় দমন করতে শ্রীবিষ্ণু কল্কিরুপে আবির্ভূত হবেন । কল্কি অবতার নিয়ে নানা মুনির না না মত কেউ বলেন তিনি এসে গেছেন কেউ আবার মনে করেন তিনি আমাদের অর্থাৎ প্রতিটি জীবের অন্তরে সদা বিরাজমান তবে গোটা বিশ্ব এবং সনাতন ধর্মে বিশ্বাসীরা কল্কি অবতারের প্রতীক্ষা করছেন এবং দৃঢ় বিশ্বাস তিনি আসবে |যারা মনে করেন শাস্ত্র সত্যি শাস্ত্রের প্রতিটি শব্দ ব্রহ্ম স্বরূপ তারা নিশ্চিত তার আগমনেই কলির সমাপ্তি ঘটবে|কল্কি পুরানে যা লিখিত আছে তা অক্ষরে অক্ষরে ফলে যাবে | শুধু সময়ের অপেক্ষা |আবার পরের পর্বে নতুন কোনো পৌরাণিক বা আধ্যাত্মিক বিষয় নিয়ে ফিরে আসবো |সঙ্গে থাকুন|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
দশ অবতার রহস্য – বুদ্ধ অবতার
ভগবান যখন নশ্বর দেহে অবর্ভুত হন তখন তাকে বলা হয় অবতার|যুগে যুগে তিনি অবতীর্ণ হন বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে|যখন পরিপূর্ণ ভাবে বিষ্ণু আবির্ভুত হন তাকে বলে পূর্ণবতার আর আংশিক ভাবে আবির্ভুত হলে অংশাবতার বলা হয়|বিভিন্ন শাস্ত্রে অবতারের সংখ্যা বিভিন্ন রকম তবে|গরুর পুরান অনুসারে পূর্ণাবতার দশটি যারা মধ্যে আটটি নিয়ে আগে আলোচনা করেছি|আজ নবম অবতার অর্থাৎ বুদ্ধ অবতার নিয়ে আলোচনা করবো|বৈষ্ণব মতে বুদ্ধ ভগবানের নবম অবতার এবং মনে করা হয় বেদ অমান্য কারীদের ভিন্ন পথ প্রদর্শন করতে ও প্রানী হত্যা বন্ধ করতে তিনি আবির্ভূত হয়ে ছিলেন|তার প্রধান উদ্দেশ্য ছিলো জাতি ও বর্ন ভেদ থেকে সনাতন ধর্মকে রক্ষা করা এবং অহিংসার বানী প্রচার করা|নেপালের লুম্বিনী তে শুদ্ধধোন ও মায়াদেবীর সন্তান হিসেবে জন্মে ছিলেন সিদ্ধার্থ |যৌবনে রাজকুমারী যশোধরা দেবীর সাথে বিবাহ হয় সিদ্ধার্থর এক পুত্র ও হয়, নাম রাহুল |কিন্তু তিনি তো সংসার করতে আসেননি তিনি বুদ্ধ, তিনি আবির্ভুত হয়েছিলেন মানুষ কে সংসারের যাবতীয় দুক্ষ, কষ্ট ও মায়া থেকে মুক্তি দিয়ে মহানির্বানের পথ দেখাতে |বুদ্ধর বুদ্ধ হয়ে ওঠার ঘটনাটি ও বেশ রোমাঞ্চকর| যুবক রাজকুমার সিদ্ধার্থ প্রাসাদ থেকে ভ্রমণে বেরোলে, প্রথমে দেখলেন একজন বৃদ্ধ মানুষ তারপর একজন অসুস্থ মানুষ শেষে একজন মৃত মানুষ ও এই সবের পর এক সন্ন্যাসীকে দেখতে পান। এই দিন জীবনের এক চরম সত্য উপলব্ধি করলেন সিদ্ধার্থ, ভোগের রাস্তা ত্যাগ করে বেড়িয়ে পড়লেন ত্যাগের পথে, মুক্তির পথে এবং কঠোর সাধনার পর অবশেষে সিদ্ধি লাভ অর্থাৎ তার বুদ্ধ হয়ে ওঠা এবং বিশ্ববাসীকে মুক্তির পথ দেখানো যে পথে আজ হাটছে কোটি কোটি মানুষ |যদিও বুদ্ধ অবতার নিয়ে কিছু ভিন্ন মতও আছে|সনাতন ধর্ম ও বৌদ্ধ ধর্ম একাধিক বার সংঘাতে জড়িয়েছে বুদ্ধের অবতার তত্ত্ব নিয়ে|আবার বিতর্ক ও হয়েছে বুদ্ধের জীবন দর্শন নিয়ে|তবে শাস্ত্র কে যদি প্রামান্য হিসেবে দেখা হয় তাহলে গৌতম বুদ্ধ নিঃসন্দেহে বিষ্ণুর দশ অবতারের মধ্যে স্বার্থক ও অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবতার রূপে স্বীকৃত|পরবর্তী অবতারের কথা নিয়ে ফিরে আসবো যথাসময়ে |চলতে থাকবে আধ্যাত্মিক ও পৌরাণিক বিষয় নিয়ে আলোচনা|যারা জ্যোতিষ সংক্রান্ত বিষয়ে পরামর্শ বা প্রতিকার চান তারা সরাসরি উল্লেখিত নাম্বারে ফোন করে কথা বলতে পারেন|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
দশ অবতার রহস্য – বলরাম অবতার
দশঅবতার পর্বে আজ আপনাদের বলরামের কথা বলবো যিনি দ্বাপর যুগে কৃষ্ণের ভ্রাতা ও লীলা সঙ্গী রূপে এসেছিলেন|বলরামের জন্ম বৃত্তান্ত নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কিছু মত প্রচলিত আছে যদিও শাস্ত্র মতে কৃষ্ণের সত্ মা রোহিণীর গর্ভে জন্ম হয় বলরামের। যদিও তিনি ছিলেন আসলে কংসের কারাগারে বন্দি বসুদেব ও দেবকীর সপ্তম গর্ভের সন্তান। কংসের হাত থেকে তাঁকে বাঁচানোর জন্য শ্রীহরি নির্দেশে সপ্তম গর্ভের ভ্রুণ রোহণীর গর্ভে প্রতিস্থাপিত করা হয়। কংসকে জানানো হয় যে দেবকী মৃত সন্তান প্রসব করেছেন। কৃষ্ণের থেকে বলরামের চরিত্র ছোটবেলা থেকেই ভিন্ন। শান্ত প্রকৃতির বলরাম রেগে গেলে মারাত্মক রূপ ধারণ করতেন আবার কৃষ্ণ যেমন কালো, বলরাম ফর্সা। কৃষ্ণের পছন্দ হলুদ বর্ণের কাপড়়, বলরামের পরনে সব সময় নীল বস্ত্র। বলরামের অস্ত্র এক বিশাল লাঙল। তিনি এ কারণে ‘হলধারী’ নামেও পরিচিত। অস্ত্রবিদ্যায় তিনি অত্যন্ত পারদর্শী ছিলেন। ভীম এবং দুর্যোধন তাঁর কাছে গাদচালনা শিখেছিলেন।বলরাম ছিলেন অত্যান্ত বলশালী ও বীর যোদ্ধা|শক্তি ও আধ্যাত্মিকতার মিলন হয়েছে বলে তাঁর নাম বলরাম। অনেকের মতে বিষ্ণুর এক অবতার রামের ছোট ভাই লক্ষ্মণ দ্বাপর যুগে তাঁর বড় ভাই বলরাম হিসেবে জন্মগ্রহণ করেন।পুরাণ মতে বলরাম নীলবস্ত্র পরিহিতা , কনক ভূষনা ,তার অস্ত্র লাঙল বা হাল।তাই তাঁকে” হলধর”ও বলা হয়। কোনো কোনো মূর্তিতে তাঁর হাতে গদা দেখা যায় । শাস্ত্রে তাঁকে বিষ্ণুর দশ অবতাররের মধ্যে অন্যতম অবতার রূপে স্থান দেয়া হয়েছে|তিনি ভগবানের অষ্টম অবতার|মহাভারতের বন পর্বে উল্লেখিত হয়েছে- বলরাম হলেন বিষ্ণুর অবতার এবং অন্যদিকে, কৃষ্ণ হলেন সমস্ত অবতার এবং অস্তিত্বের উৎস।বলরাম স্বতন্ত্র ও স্বাধীনচেতা|মহাভারতে কৃষ্ণের পাণ্ডবদের পছন্দ করলেও বলরাম কিন্তু কৌরবদের প্রতি দুর্বল ছিলেন। ভীমের তুলনায় দুর্যোধন ছিলেন তাঁর প্রিয় ছাত্র। এমনকি নিজের বোন সুভদ্রার সঙ্গে দুর্যোধনের বিয়ে দিতেও চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু কৃষ্ণ তা বানচাল করে অর্জুনের সঙ্গে সুভদ্রার বিয়ের ব্যবস্থা করেন। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বলরাম কোনও পক্ষ অবলম্বন না করলেও ভীম যখন অনৈতিক ভাবে দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ করেন, তখন বলরাম এতটাই রেগে যান যে নিজের লাঙল তুলে ভীমকে আক্রমণ করতে উদ্যত হন তিনি। কিন্তু কৃষ্ণের কথায় তিনি নিজেকের সংবরণ করে নেন।বলরাম অবতার আসলে কৃষ্ণের ছায়া সঙ্গী হিসেবে তার সাথে প্রতিটি লীলায় অংশগ্রহন করতে আবির্ভূত হয়েছিলেন|সব দিক দিয়ে স্বার্থক ও সফল তার এই রূপ যা আমাদের বার বার শ্রী রাম ও লক্ষণের কথা মনে করিয়ে দেয়|যদু বংশ ধ্বংসের এবং কৃষ্ণের মৃত্যুর পূর্বে বলরাম দ্বারকার এক বটবৃক্ষের নিচে যোগসমাহিত অবস্থায় কাটান।কিছু শাস্ত্রে উল্লেখ আছে এই সময় বলরামের মুখ থেকে রক্তবর্ণ ও সহস্রমুখ এক সাপ নির্গত হয়ে সমুদ্রে চলে যায়।এরপর তাঁর মৃত্যু ঘটে।এই ঘটনার কারণে অনেকে তাঁকে নাগরাজের শেষ অবতার হিসাবে মান্য করে থাকেন। ইনি রাজা রৈবতের কন্যা রেবতীকে বিবাহ করেছিলেন।রেবতীর গর্ভে তাঁর নিশধ ও উল্মক নামে দুটি পুত্র জন্মায়|বুদ্ধ অবতারের কথা নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে|চলতে থাকবে আধ্যাত্মিক ও পৌরাণিক বিষয় নিয়ে আলোচনা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
রাসপূর্ণিমার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা
আজ সনাতন ধর্মের তথা সারা বিশ্বের বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ উৎসব, রাস উৎসব বা রাস পূর্ণিমা|আক্ষরিক অর্থে রাস শব্দের আরেক অর্থ অনেকের সঙ্গে একসঙ্গে আনন্দঘন নৃত্যবিশেষ|যদিও রাস শব্দর উৎপত্তি হয়েছেন ‘ রস’ শব্দ থেকে, এখানে রস মানে আনন্দ, দিব্য অনুভূতি, দিব্য প্রেম বা ভক্তি রস|বাংলায় চৈতন্যদেব রাধাকৃষ্ণের রাস উৎসবের সূচনা করেছিলেন নবদ্বীপে|পুরান মতে রাস মূলতঃ শ্রীকৃষ্ণের ব্রজলীলার অনুকরণে বৈষ্ণবীয় ভাবধারায় অনুষ্ঠিত ধর্মীয় উৎসব। ভগবান কৃষ্ণ কার্তিক মাসের এই পূর্ণিমাতেই বৃন্দাবনে রাধা-সহ সখীদের মেতেছিলেন রাসলীলায়, সেই তিথিকেই পালন করা হয়, রাস পূর্ণিমা রূপে,অনেকে মনে করেন, ঈশ্বরের সঙ্গে আত্মার মহামিলনই রাস, চীরহরণের’ পর গোপীদের সঙ্গে শ্রী কৃষ্ণর এই লীলা অনুষ্ঠিত হয়েছিলো বৃন্দাবনে, গোপীরা অধীর অপেক্ষা করছিলো কবে শ্রীকৃষ্ণের কাছ থেকে, তাদের ডাক আসবে, অবশেষে এই পূর্ণিমা তিথিতে কৃষ্ণ তাদের সেই আশা পূর্ণ করেন রাস নৃত্যর মাধ্যমে, একদিক দিয়ে দেখতে গেলে এই উৎসব ভক্ত ও ভগবানের মিলন উৎসব|শ্রীমদ্ভাগবতে একটি বিশেষ অংশ হল রাসলীলা।বিশেষ এই তিথি আরো বিশেষ হয়ে ওঠে যখন রাস পূর্ণিমার সাথে যুক্ত হয়|গ্রহন|এবারের রাস পূর্ণিমা টাই জ্যোতিষ ও তন্ত্র জগতে বেশ গুরুত্বপূর্ণ|শাস্ত্রে মতে এই তিথিতে রাস উৎসব পালন করুন|রাধাকৃষ্ণর একত্রে পুজো করুন এবং নিজের মনোস্কামনা জানান|যদি পারেন আজকের তিথিতে রাধা কৃষ্ণ বিগ্রহের উদ্দেশ্যে বাঁশি, ময়ুরের পালক অথবা দোলনা নিবেদন করুন|এই দিন গঙ্গা স্নান ও স্বাত্তিক আহার করতে পারলে আরো ভালো হয়|সব রকম তামসিক অভ্যাস থেকে দূরে থাকুন|সবাইকে জানাই রাস পূর্ণিমার আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন|ফিরে আসবো আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|