আজ নীল ষষ্টি উদযাপন তাই শুরু করবো নীল ষষ্ঠীর পৌরাণিক ব্যাখ্যা দিয়ে |এই নীল পুজো আসলে শিবেরই পুজো, নীল আর কেউ নয় স্বয়ং শিব|নীল বা নীলকণ্ঠ মহাদেব শিবের অপর নাম। চৈত্র মাসে সেই নীল বা শিবের সঙ্গে নীলচণ্ডিকা বা নীলাবতী পরমেশ্বরীর বিয়ে উপলক্ষ্যে লৌকিক আচার-অনুষ্ঠান সংঘটিত হয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুসারে, দক্ষযজ্ঞে দেহত্যাগের পর শিবজায়া সতী পুনরায় সুন্দরী কন্যারূপে নীলধ্বজ রাজার গৃহে আবির্ভূতা হন ৷ রাজা তাঁকে নিজ কন্যারূপে লালন-পালন করে শিবের সঙ্গে বিয়ে দেন ৷ বাসর ঘরে নীলাবতী শিবকে মোহিত করেন এবং পরে মক্ষিপারূপ ধরে ফুলের সঙ্গে জলে নিক্ষিপ্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন ৷ রাজা-রাণীও শোকে প্রাণবিসর্জন দেন ৷ নীলপূজা শিব ও নীলাবতীরই বিবাহ-অনুষ্ঠানের স্মারক ৷আজ উত্তর বঙ্গের বিখ্যাত এক শিব তীর্থর কথা উল্লেখ করবো|উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার প্রসিদ্ধ তীর্থক্ষেত্র হল জল্পেশ মন্দির।কোচবিহারের মহারাজা নরনারায়ণের বাবা বিশ্ব সিংহ ১৫২৪ সালে প্রথম এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন।১৫৬৩ সালে মন্দিরটি পুনর্নির্মিত হয়। পরবর্তীতে ১৬৬৩ সালে রাজা প্রাণ নারায়ণও একবার মন্দিরটি নতুন করে গড়ে তোলেন।জল্পেশ মন্দির প্রসঙ্গে একটি ভিন্ন তত্ত্বর অস্তিত্বও রয়েছে|কিছু ঐতিহাসিক মনে করেন|জল্পেশ নামে কোনো এক প্রতাপশালী রাজবংশী ক্ষত্রিয় রাজা অথবা সর্দারের নাম ছিল জল্পেশ। তাঁর নাম অনুসারে মন্দিরের নাম হয়েছে জল্পেশ। হয়ত তিনি কোনো দৈব শক্তির অধিকারী ছিলেন। তাই তাঁর মৃত্যুর পরে তাঁকে দেবতায় উন্নীত করা হয়েছে। উত্তরবঙ্গে এমন অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন নর দেবতায় রূপান্তরিত হয়েছে এমন বহু দৃষ্টান্ত আছে। জল্পেশ হয়ত কোনো শক্তিশালী গ্রামদেবতা ছিলেন। পরে কোচবিহারের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় শিবের সঙ্গে একীভূত হয়ে উত্তরবঙ্গের প্রধান দেবতা বলে স্বীকৃত হয়েছেন ।তবে শাস্ত্র মতে ভ্রামরী শক্তিপিঠের ভৈরব হলেন জল্পেশ। শিব এখানে গর্তের মধ্যে রয়েছেন, তাই তিনি অনাদি নামেও পরিচিত।উত্তর বঙ্গ ভ্রমন অসম্পূর্ণ থেকে যায় বাবা জল্পেশ্বর এর দর্শন ছাড়া|বিশেষ করে শ্রাবন ও চৈত্র মাসের বহু দর্শণার্থী আসেন|বিশেষ পুজো হয় এবং সব মিলিয়ে উৎসবের আনন্দে মেতে ওঠেন স্থানীয় থেকে দূর দুরন্তর মানুষ|আবার দেখা হবে আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন শিব ভূমি|ফিরে আসবো অন্য কোনো শিবভূমি নিয়ে|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
শিব ভূমি – বাণেশ্বর শিবমন্দির
আজ শিব ভূমির শুরুতে শিবের অস্ত্র ত্রিশূল নিয়ে বলবো, পুরান অনুসারে শিব হলেন স্বয়ম্ভু যিনি নিজের চেতনায় নিজ ইচ্ছায় সৃৃষ্ট হন এবং যাকিছু অশুভ বা সৃষ্টির জন্যে বিপদজনক তা সংহার করার দায়িত্বে থাকেন তিনি স্বয়ং কিন্তু সংহার কর্তার এই সংহার লীলার জন্যে প্রয়োজন অস্ত্র, এই অস্ত্র নির্মাণের ভার স্বাভাবিক ভাবেই গিয়ে পরে দেব শিল্পী বিশ্বকর্মার উপর|বিষ্ণুপুরান অনুসারে সূর্যের তেজ ও রশ্মির ব্যবহার করে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা ত্রিশূল নির্মাণ করেন এবং তা শিবকে প্রদান করেন|এতে শিব ও তার অস্ত্র পান এবং সূর্যের তেজ কিছুটা কমায় বিশ্বকর্মার কন্যা এবং সূর্যপত্নী সংজ্ঞাও কিছুটা স্বস্তি পান|আজকের শিব ভূমি বানেশ্বর শিব মন্দির|কোচবিহারের বিখ্যাত মন্দিরগুলির মধ্যে বাণেশ্বর শিবমন্দির অন্যতম। মন্দিরটির উত্তর দিকে অবস্থিত একটি চালামন্দির ত্রিরথ; সিংহাসনের শীর্ষে পদ্মের উপর শিবমূর্তির উপবিষ্ট বিগ্রহ ও এক অর্ধনারীশ্বরের মূর্তি অধিষ্ঠিত। পিতলের মূর্তি উচ্চতায় ৬ ইঞ্চির মতো। অর্ধনারীশ্বরের অর্থাৎ শিবদুর্গার সম্মিলিত পৌরাণিক রূপ বাণেশ্বর বলেও আখ্যাত। মূর্তির ডান দিকে শিবের জটা আর বাম দিকে দুর্গার মাথায় অর্ধ পদ্মাকৃতি মুকুট দেখা যায়।মন্দিরটির প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে নানা মতবাদ চালু আছে। কেউ বলেন বাণরাজা কেউ বলেন রাজা জল্পেশ মন্দিরটি নির্মাণ করেছিলেন। তবে পরবর্তী সময়ে মহারাজা প্রাণনারায়ণই ইটের প্রাচীর ঘিরে মন্দিরটি সংস্কার করেছিলেন।কিংবদন্তি অনুসারে দৈত্যরাজ বাণাসুর বাহুবলে স্বর্গরাজ্য অধিকার করে দেবতাদের তাড়িয়ে দিয়েছিলেন। বাণাসুর ছিলেন শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত। দেবতাদের দুর্দশা দেখে শিব বাণাসুরকে নির্দেশ দিয়েছিলেন স্বর্গরাজ্য দেবতাদের ফিরিয়ে দিতে। বাণাসুর একটি শর্তে স্বর্গরাজ্য ফিরিয়ে দিতে সম্মত হয়েছিলেন। সেটি হল যদি তাঁর উপাস্য দেবতা এই স্থানে অধিষ্ঠান করেন। সেই সময় থেকেই বাণেশ্বর শিবের প্রতিষ্ঠা।বানেশ্বর মন্দিরটি উচ্চতায় ৪০ ফুট, গম্বুজাকৃতি, বাঁকানো কার্নিশ এবং মন্দিরটি পশ্চিমমুখী। মন্দিরের গর্ভগৃহটি মাটির সমতল থেকে ৭ ফুট নীচে সিঁড়ি বেয়ে নামতে হয়। মন্দিরের অভ্যন্তরে কালো পাথরের শিবলিঙ্গ এবং গৌরীপট্ট প্রতিষ্ঠিত। পাশেই আরেকটি মূর্তি রয়েছে দু’হাতে ত্রিশূল নিয়ে। দেবী চণ্ডীর পিতলের মূর্তি। পাশে রয়েছে পাথরের তৈরি একটি ছোটো বিষ্ণুপট্ট, তাতে লক্ষ্মী, সরস্বতী, গঙ্গা, যমুনা মূর্তি খোদিত।শিব চতুদর্শীতে এবং চৈত্র মাসে বাণেশ্বর মহাসমারোহে পূজা অনুষ্ঠিত হয় এবং সপ্তাহব্যাপী মেলা চলে।চলবে শিব ভূমি নিয়ে আলোচনা|পড়তে থাকুন|আপনাদের সবাইকে নীল ষষ্ঠীর আগাম শুভেচ্ছা|ভালো থাকুন|নমস্কার|
শিব ভূমি – তারকেশ্বর মন্দির
বাংলার শৈব্য তীর্থ ক্ষেত্র গুলির মধ্যে অন্যতম তারকেশ্বর শিব মন্দির যা হুগলীতে অবস্থিত|দেশ বিদেশের শিব ভক্ত দের কাছে অন্যতম জনপ্রিয় তীর্থ ক্ষেত্র এই স্থান|অবশ্য তারকেশ্বর থেকে ছয় কিলোমিটার দূরে একটি বৌদ্ধ মন্দির। এই স্থানটির নাম দেউলপাড়া। এটি হুগলি জেলার একমাত্র বৌদ্ধ মন্দির।শোনা যায়, তারকেশ্বর মন্দিরের প্রতিষ্ঠাতা উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা বিষ্ণুদাস নামের এক শিবভক্ত। উত্তরপ্রদেশ থেকে এসে হুগলিতে বসবাস শুরু করেন তিনি।লোককথা অনুযায়ী, বিষ্ণুদাসের ভাই দেখেন স্থানীয় জঙ্গলে একটি কালো পাথরের ওপর গরুরা নিয়মিত দুধ দান করে আসে। এই অদ্ভুত দৃশ্য দেখে সে তিনি কথা বিষ্ণুদাসকে জানান। আর এর পরই স্বপ্নাদেশে ওই পাথরটিকে শিবজ্ঞানে পুজো শুরু করেন বিষ্ণুদাস।শিবের তারকেশ্বর রূপ অনুসারে এই মন্দিরের নামকরণ করা হয়। তারকেশ্বরের মহাদেবকে বলা হয় স্বয়ম্ভূলিঙ্গ ৷ কারণ তারকেশ্বরের শিবলিঙ্গ কেউ স্থাপন করেননি। অন্যদিকে, গঙ্গার পলল ভূমিতে ওই ধরনের পাথর মেলাও মুশকিল। তাই মনে করা হয়, শিব এখানে স্বয়ং অবির্ভূত হয়েছিলেন|তারকেশ্বর শিবের মন্দির এই তীর্থের প্রধান আকর্ষণ। মন্দিরটি বাংলা আটচালা শৈলীর মন্দির। মন্দিরের সামনে একটি নাটমন্দির অবস্থিত। অদূরেই কালী ও লক্ষ্মী-নারায়ণের দুটি মন্দির রয়েছে। মন্দিরের উত্তরে অবস্থিত পুকুরটির নাম দুধপুকুর। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, এই পুকুরে স্নান করলে মনস্কামনা পূর্ণ হয় বিশেষ বিশেষ তিথিতে অসংখ্য মানুষ এই পুকুরে স্নান করেন|সারাবছরই তারকেশ্বর মন্দিরে পূণ্যার্থীদের ভিড় লেগে থাকে। প্রতি সোমবার ও শ্রাবণ মাসে শ্রাবনী মেলাতে প্রচুর জনসমাগম হয়। এছাড়া ফাল্গুন মাসে শিবরাত্রিও চৈত্র-সংক্রান্তিতে গাজন উৎসবেও বহু মানুষ আসেন। সমগ্র শ্রাবণ মাস জুড়ে প্রতি সোমবার শিবের বিশেষ পূজা হয়ে থাকে এবং সেই উপলক্ষে বহু মানুষের আগমন ঘটে এই তীর্থে|আগামী পর্বে বাংলার নতুন কোনো শিব ভূমি নিয়ে ফিরে আসবো |পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
রামনবমীর শুভেচ্ছা
রামচরিতমানস অনুসারে আজকের তিথিতে অভিজিৎ নক্ষত্রে জন্মে ছিলেন প্রভু শ্রী রাম|শাস্ত্রমতে এই রাম নবমী উপলক্ষ্যে ধার্মিক ব্যক্তিরা সমগ্র দিন জুড়ে বৈদিক মন্ত্র পাঠ করেন। সমগ্র দিনজুড়ে ভক্তিমূলক গান গাওয়া বিভিন্ন হিন্দু ধর্মীয় বইগুলি থেকে পাঠ করে শোনাবার রীতি আছে| এই দিনটিতে রাম কথার বর্ণনা করে, রাম কাহিনী পড়ে সহজেই বিষ্ণুর কৃপা লাভ করা যায়, অনেকে মন্দিরে যান, অনেকে বাড়িতে রামের মূর্তিতে পূজা করেন। হিন্দুদের আদি দেবতা সূর্য দেবকে জল প্রদান করে, সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী সূর্য দেবতার আশীর্বাদ গ্রহণ করা হয় আজকের দিনে|ভগবান রামের উল্লেখ যে শুধুমাত্র প্রাচীন হিন্দু গ্রন্থে পাওয়া যায় তা নয়, জৈন এবং বৌদ্ধ ধর্ম গ্রন্থেও ভগবান রামের উল্লেখ আছে। বিশ্বের বহু দেশেই রামের মন্দির আছে,ইন্দোনেশিয়ায় রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম রাম মূর্তি|শ্রী রাম সততার প্রতীক, ত্যাগের প্রতীক,অসত্যর উপর সত্যর জয়ের প্রতীক|রাজ ধর্ম পালন করতে তিনি যে আত্মত্যাগ করেছেনতা এক দৃষ্টান্ত|রাম নামকে বলা হয় কলিযুগের সব অন্ধকারকে দূর করে এগিয়ে যাওয়ার প্রধান অস্ত্র|বিভিন্ন যুগে ভগবান বিষ্ণু বিশ্ব সংসারের সকল মানুষকে ন্যায়পরায়ণতার ও সত্যের পথ প্রদর্শন করতে মিথ্যার উপর সত্যের জয় প্রতিষ্ঠা করতেনানা অবতার রূপে আমাদের ধরিত্রী তে অবতরণ করেন|ত্রেতা যুগে রাম ভগবান বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রূপে জণ্মেছিলেন আজকের দিনে, এই দিনটি প্রতি বছর পালিত হয় রামনবমী রূপে, অর্থাৎ রাম নবমী পালন করার মূল উদ্দেশ্য হল অধর্মকে নিক্ষেপ করে ধর্মকে স্থাপন করা। মন্দ শক্তির বিনাশ করে শুভ শক্তির সূচনা করা|আপনাদের সবার জীবনে শুভ শক্তির বিকাশ হোক, ঘুচে যাক অন্ধকার|সবাইকে জানাই রামনবমীর অসংখ্য শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
দেবী অন্নপূর্ণা ও মহাদেব
আজ একটি বিশেষ পর্ব লিখছি আপনাদের জন্য, আজ মা অন্নপূর্ণার পূজার দিন,তিনি অন্নের দেবী, সুখ ও সমৃদ্ধির দেবী|কথিত আছে তার পুজোর পর দরিদ্রকে অন্ন দান করলে জীবন থেকে সব অভাব দূর হয়|নিষ্ঠাভরে দেবীর আরাধনায় সংসার হয়ে ওঠে পরিপূর্ণ|আজ জানাবো দেবীর আবির্ভাবের কথা এবং মহাদেব কিভাবে যুক্ত দেবীর অন্নপূর্ণার সাথে তাও বলবো|এক চৈত্র মাসের শুক্ল অষ্টমীতে দেবী অন্নপূর্ণা আবির্ভুতা হয়ে ছিলেন কাশীধামে|পুরাণ মতে দেবী পার্বতীর সঙ্গে দেবাদিদেবের মতবিরোধে দেবী কৈলাস ত্যাগ করলে মহামারি, খাদ্যাভাব ঘটে। ভক্তগণকে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দেবাদিদেব ভিক্ষার ঝুলি নিজ কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু দেবীর মায়ায় ভিক্ষারও আকাল ঘটে। তখন দেবাদিদেব শোনেন কাশীতে এক নারী সকলকে অন্ন দান করছেন। দেবকে চিনতে মহাদেবের একটুও দেরি হয় না। মহাদেব দেবীর কাছে ভিক্ষা গ্রহণ করেন ও অন্ন ভিক্ষা নিয়ে তার ভক্তদের খাদ্যাভাব থেকে রক্ষা করেন|এরপর মহাদেব দেবীর একটি মন্দির নির্মাণ করেন কাশীতে এবং সেই থেকে তিনি কাশীর অধিষ্টাত্রী দেবী তার কৃপায় কাশিতে ইচ্ছা থাকলেও অনাহারে থাকা যায়না, প্রত্যেক কাশী বাসির অন্নদানের ভার দেবী অন্নপূর্ণার|অন্নদাত্রী দেবী অন্নপূর্ণার আরেকনাম অন্নদাতিনি দেবী দুর্গার আরেক রূপভেদ।মূলত দ্বিভূজা বা চতুর্ভূজা । গায়ের রঙ লালচে। দ্বিভূজা দেবীর বামহাতে সোনার অন্নপাত্র। ডানহাতে চামচ বা হাতা।মাথায় বিরাজিত অর্ধচন্দ্র। তিনি ক্ষুধার্ত মহাদেবকে অন্নদান করছেন স্মিতহাস্যে তার এক পাশে শ্রী ও অন্য পাশে ভূমি|প্রাচীন তন্ত্রসার গ্রন্থে দেবীর পূজা পদ্ধতি রয়েছে, আবার অন্নদামঙ্গল কাব্য রচিত হয়েছে দেবীর মহিমা কীর্তন করে|সব মিলিয়ে সনাতন ধর্মে দেবী অন্নপূর্ণার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য অপরিসীম|আজ দেবীর পুজোর দিনে তার মহিমা সংক্ষেপে বর্ণনা করলাম|দেবীকে আমার প্রণাম জানাই|আগামী পর্বে আবার শিব ভূমি নিয়ে ফিরে আসবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
শিব ভূমি – ত্রম্বকেশ্বর
জ্যোতিষ শাস্ত্রের সাথে গভীর সম্পর্ক রয়েছে দেবাদিদেব মহাদেবের আজ শুরুতে সেই বিষয়ে একটু আলোকপাত করবো কারন আজকের শিব ভূমি ত্রম্বকেশ্বর|জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে লগ্ন কুন্ডলি তে যে কয়েকটি অশুভ গ্রহগত সংযোগ থাকে তার মধ্যে অন্যতম কাল স্বর্প দোষ|মোট বারো প্রকারের কাল স্বর্প দোষ থাকে যার সব গুলোই একেকটা সাপের নামে আর এই কাল সর্প দোষ খণ্ডনের সর্ব শ্রেষ্ঠ স্থান মহারাষ্ট্রে অবস্থিত ত্রম্বকেশ্বর মন্দির যা দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গের অন্তর্গত|কেনো এই স্থানে কালসর্প দোষ খণ্ডিত হয় তার পেছনে আছে এক পৌরাণিক ঘটনা|পুরান মতে একবার গণেশ মহাদেবের পুজো করেন সেই সময়ে শিবের গলায় থাকা বাসুকি নাগের মনে হয় যে গণেশ তারই পুজো করছেন। তার এই ঔদ্ধত্যের জন্য শিব রেগে গিয়ে তাকে অভিশাপ দেন যে নাগকূল তাদের সব ক্ষমতা হারিয়ে ফেলবে।তাই হয়|পরবর্তীতে ক্ষমতা হারিয়ে ফেলা নাগেরা শিবের কাছে গিয়ে অভিশাপ ফিরিয়ে নেওয়ার আবেদন জানায়। শিব তখন দোয়াবসত তাদের মর্ত্যে গিয়ে তাঁর পুজো করতে বলেন|নাগকুল এই ত্রম্বকেশ্বর মন্দিরে শিব পূজা করে তাদের হারানো গৌরব ফিরে পায়|সেই থেকে এই মন্দিরের নিষ্ঠা সহকারে প্রথা মেনে পূজাপাঠের মাধ্যমে কাল স্বর্প দোষ খণ্ডনের প্রথা চলে আসছে|এছাড়া আরেকটি পৌরাণিক আখ্যান মতে রাহু ও কেতুও এই স্থানে মহাদেবের পুজো করেছিলেন |বর্তমান মন্দির টি নির্মাণ করিয়েছিলেন পেশোয়া তৃতীয় বালাজি বাজি রাও,1755 থেকে 1786 দীর্ঘ একত্রিশ বছর লেগেছিলো এই মন্দির নির্মাণ সম্পুর্ন হতে|ত্র্যম্বকেশ্বর মন্দিরের পিছনের পাহাড় ব্রহ্মগিরি থেকে উদ্ভূত হয়ে গোদাবরী গুপ্ত ভাবে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে এসে ক্ষীণ আকারে বেরিয়ে আসছে জ্যোতির্লিঙ্গ ত্র্যম্বকেশ্বরের মধ্য থেকে। মন্দির থেকে কিছু দূরে কুশাবর্ত কুণ্ড ও গোমতী ঘাট। কুম্ভপর্বে যে তিনটি স্নান হয়, তার একটি রামতীর্থ রামঘাটে ও অপর দুটি হয় এই কুশাবর্ত তীর্থেআমি নিজে গিয়েছিলাম ত্রম্বকেশ্বর|উদ্দেশ্য ছিলো কিছু ক্লাইন্টের কাল সর্প দোষ খণ্ডন ও অবশ্যই জ্যোতিরলিঙ্গ দর্শন|তবে পেয়েছিলাম অনেক বেশি কারন হটাৎ সেদিন ওই স্থানে শঙ্করাচার্যর আগমন ঘটে ছিলো|তার দিব্য দর্শন লাভ করে ধন্য হয়েছিলাম|এছাড়াও গোদাবরী কুন্ডে স্নান করার পর যে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি লাভ করেছিলাম তা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না|শিব ভূমি আবার ফিরে আসবো যথা সময়ে পড়তে থাকুন|জ্যোতিষ বিষয়ে কথা বলতে অথবা সমস্যা নিয়ে আসতে চাইলে যোগাযোগ করুন উল্লেখিত নাম্বারে|ভালো থাকুন|
শিব ভূমি – মহাকালেশ্বর
আজ শুরুতে শিব ও বাসুকি নাগের সম্পর্ক নিয়ে বলবো|শিবের মাথায় থাকেন বাসুকি নাগ, এই প্রবল পরাক্রমী বাসুকি কিভাবে শিবের মাথায় স্থান পেলো তাই নিয়ে একাধিক শাস্ত্রে একাধিক ব্যাখ্যা আছে|শিব ও বাসুকিনাগ কে নিয়ে একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় | মনে করা হয় শিব ও পার্বতীর বিবাহের সময় যখন শিবের অঙ্গ সজ্জার প্রয়োজন হয় তখন বাসুকি তার কণ্ঠে জড়িয়ে যান | শিব এতে এতটাই খুশি হন যে সদা সর্বদা তিনি বাসুকি কে ওই স্থানে ধারণ করে থাকেন |ভবিষ্য পুরানে বলা হচ্ছে যে নাগেরাই প্রথম শিব পূজা শুরু করে এবং নাগ রাজা হিসেবে বাসুকি শিবের তপস্যা করেন ও শিব কে তুষ্ট করে বরদান পান যে তিনি শিবের কণ্ঠে স্থান পাবেন ও সারা জীবন শিবের সবথেকে কাছে থেকে তার স্তুতি করবেন |আরেকটি পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে সমুদ্র মন্থন করে অমৃত সন্ধানের সময়ে বাসুকি রজ্জু হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে ছিলেন ও তার পরবর্তীতে শিব যখন হলা হল পান করেন তখনো বাসুকি শিব কে সাহায্য করেন | বাসুকীর এই ভক্তি দেখে শিব সন্তুষ্ট হন ও বাসুকি কে তার জটায় আশ্রয় দেন |আর কথা না বাড়িয়ে শুরু করা যাক আজকের পর্ব, আজ জানবো জ্যোতির্লিঙ্গ মহাকালেশ্বরের কথা| বারোটি জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম এই মহাকালেশ্বর অবস্থিত মধ্যপ্রদেশের উজ্জয়িনীতে, রূদ্র সাগর হ্রদের তীরে|শিব এখানে সয়ম্ভু|এই শিব লিঙ্গ কে দক্ষিনা মূর্তিও বলা হয় কারন তাঁর অবস্থান দক্ষিণ মুখী|এই জ্যোতির্লিঙ্গের অন্যতম বৈশিষ্ট হলো তান্ত্রিক নেত্র যা আর কোনো মূর্তিতে চোখে পরে না|ওঙ্কারেশ্বর এর ন্যায় এই শিব মন্দির ও পাঁচটি তল বিশিষ্ট যা মহাকাল মন্দির নামে খ্যাত|মহাদেবে’র মূর্তিটি মহাকাল মন্দিরের গর্ভগৃহের উপরে স্থাপিত|এছাড়াও মন্দিরের বিভিন্ন স্থানে রয়েছে গনেশ, পার্বতী, কার্তিক ও নন্দীর মূর্তি|সুবিস্তৃত মন্দির প্রাঙ্গন ও সুউচ্ছ চূড়া মহাকাল মন্দিরের সৌন্দর্য বহু অংশে বৃদ্ধি করে|ভূগর্ভস্থ কক্ষটির পথটি পিতলের প্রদীপ দ্বারা আলোকিত হয়। মনে করা হয়, দেবতাকে এই কক্ষেই প্রসাদ দেওয়া হয়|এ এক ব্যতিক্রমী ও স্বতন্ত্র প্রথা|পুরাণ অনুসারে উজ্জয়িনী শহরটির নাম ছিল অবন্তিকা|অবন্তিকার রাজা ছিলেন শিব ভক্ত কিন্তু এই সৎ ও শিব ভক্ত রাজার শত্রুও ছিলো অনেক |একবার ব্রহ্মার আশীর্বাদে দূষণ নামে এক দৈত্য অদৃশ্য হয়ে যাবার ক্ষমতা পেয়েছিল। শত্রুরাজারা দূষণের সাহায্যে উজ্জয়িনী আক্রমণ করেন। যুদ্ধে তাদেরই জয় হয় এবং তারা সকল শিবভক্তের উপর অত্যাচার শুরু করে দেন।অসহায় ভক্তদের প্রার্থনা শুনে শিব মহাকালের রূপে উজ্জয়িনীতে আবির্ভূত হয়ে অসুর ও রাজার শত্রুদের পরাজিত করেন |ভক্ত দের অনুরোধে শিব উজ্জয়িনীতে বাস করতে রাজি হন|সেই থেকে তিনিই হন রাজ্যের প্রধান দেবতা এবং শিবভক্তদের রক্ষাকর্তা|ভারতের অন্যান্য তীর্থ ক্ষেত্রের ন্যায় এই মন্দিরের ও রয়েছে এক রক্তাক্ত ইতিহাস| সুলতান ইলতুৎমিসের শাসন কালে ধ্বংস করা হয় মহাকাল মন্দির|পরবর্তীতে শিব ভক্ত মারাঠা পেশোয়ারা আবার এই মন্দির পুনর্নির্মাণ করান|ভারতের স্বাধীনতার পর দেবস্থান ট্রাস্টের পরিবর্তে উজ্জয়িনী পৌরসংস্থা এই মন্দিরের ভার নেয়। বর্তমানে এটি একটি কালেক্টরয়েটের অধীনে রয়েছে|সনাতন ধর্ম বিশ্বাস অনুসারে, এই মন্দিরের প্রধান উপাস্য দেবতা শিব অনন্তকাল ধরে উজ্জয়িনীর শাসক|তিনি পার্বতী সহ এখানে স্বমহিমায় বিরাজমান|এই চত্বরেই রয়েছে শক্তি পীঠ মহাকালী ও স্বপ্নেশ্বর মহাদেবের মন্দির|অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী প্রায় সারা বছরই আসেন মহাকাল মন্দিরে, তাদের মনোস্কামনা জানান ও প্রচলিত বিস্বাস বাবা কাউকে খালি হাতে ফেরান না|প্রতি বছর শিব রাত্রিতে এখানে মেলা বসে ও সেই উপলক্ষে ব্যাপক জনসমাগম হয়|আবার আগামী পর্বে আলোচনা করবো শিব ও শিব ভূমি নিয়ে|পড়তে থাকুন|ওঁম নমঃ শিবায়ঃ |ধন্যবাদ|
শিব ভূমি – নাগেশ্বর
আজ প্রথমে আসুন জেনে নিই শিবের মাথায় জল ও বেল পাতা কেনো অর্পণ করা হয়|বিষ্ণু পুরান মতে সমুদ্র মন্থনের পরে বিষ পান করেন মহাদেব, বিষের প্রভাবে শিবজির মস্তক গরম হয়ে যায়, তখন সমস্ত দেবতারা মিলে শিবজির মাথায় জলাভিষেক করেন,এইভাবে শিবজির মস্তকের গরমভাব দূর হয়ে যায় কিন্তু উনার কণ্ঠে তখনও বিষের প্রভাবে তীব্র জলন বাকি ছিল, তো দেবতারা তখন মহাদেবকে বেলপত্র খাওয়ান, কেননা বেলপত্র বিষের প্রভাবকে কম করে দেয়। এই জন্যই শিবলিঙ্গে জলাভিষেক করা হয়ে থাকে ও বেলপত্র অর্পন করা হয়ে থাকে।আসলে অসীম শক্তির আধার শিব লিঙ্গর তেজ কে ঠান্ডা ও নিয়ন্ত্রিত রাখতেই এই নিরন্তর জল অভিষেক ও বেল পত্র অর্পণ|শিব ভূমি তে আজ নাগেশ্বর নিয়ে আলোচনা করবো|এই বিশেষ জ্যোতির্লিঙ্গ টির সঠিক অবস্থান নিয়ে কিছু বিতর্ক বা মতপার্থক্য রয়েছে|যদিও বর্তমানে এই শিব লিঙ্গ ও মন্দির ভারতের গুজরাটের দ্বারকায় অবস্থিত কিন্তু অনেকেই মনে করেন ভারতের উত্তরে, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত যোগেশ্বর শিব লিঙ্গই আসলে জ্যোতির্লিঙ্গ নাগেশ্বর| এই জ্যোতির্লিঙ্গ সৃষ্টি নিয়ে শিব পুরানে এক সুন্দর পৌরাণিক আখ্যান আছে|এক কালে এই অঞ্চলের শাসক ছিলো দারুক নামে এক অত্যাচারি রাক্ষস|নিজের প্রাধান্য বিস্তারের জন্য সে সবার উপর খুব অত্যাচার করতো|তার রাজ্য বাস করতো সুপ্রিয় নামে এক শিব ভক্ত|একদিন দারুক তাকে বন্দী করে ও অত্যাচার শুরু করে|সুপ্রিয় ভয় না পেয়ে আরাধ্য মহাদেব কে ডাকতে থাকেন|ভক্তর ডাকে সাড়া দিয়ে প্রকট হন মহাদেব ও বধ করেন রাক্ষস দারুককে|এর পর সুপ্রিয়র অনুরোধে এখানেই জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে বাস করতে সম্মত হন মহাদেব|এই বিশেষ জ্যোতির্লিঙ্গ নাগেশ্বর রূপে খ্যাত|অর্থ্যাৎ নাগেদের ঈশ্বর|দেবী পার্বতীও এই স্থানে নাগেশ্বরী রূপে বিরাজিতা|সারা বছর অসংখ্য ভক্ত ও দর্শনার্থী ভীড় করেন নাগেশ্বর মন্দিরে|জ্যোতির্লিঙ্গ ও সুন্দর শিব মন্দিরটি দর্শন করে নিজেদের ধন্য করেন|অন্যান্য জ্যোতির্লিঙ্গের ন্যায় শিব রাত্রিতে ও কিছু বিশেষ তিথীতে এখানেও বিশেষ পূজা হয় ও সেই উপলক্ষে ব্যাপক জনসমাগম হয়|দুর দূরান্ত থেকে মানুষ আসেন তাদের মনোস্কামনা নিয়ে|ভক্তদের বিশ্বাস বাবা নাগেশ্বর সকল ভক্তের মনোস্কামনা পূরণ করেন|এই পর্ব এখানেই শেষ করে আজ বিদায় নেবো|দেখা হবে পরের পর্বে, শিব ভূমি চলতে থাকবে সারা চৈত্র মাস ধরে,ভুলবেন না এই মাসের গুরুত্ব কারন এই মাস জ্যোতিষ প্রতিকার গ্রহনের জন্য অতি উত্তম সময়|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
শিব ভূমি – ভীমেস্বর বা ভীমাশঙ্কর
আজকের শিব ভূমি ভিমেশ্বর, তবে তার আগে শিবের অনুচর নন্দী কে নিয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিয়ে আলোচনা করবো|নন্দী ও ভৃঙ্গী কে নিয়ে পুরানে অনেক কথাই বলা আছে কূর্মপুরাণে নন্দী প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, মহাদেবের এই প্রধান অনুচরটি করালদর্শন, বামন, বিকটাকার, মুণ্ডিতমস্তক, ক্ষুদ্রবাহু ও মহাবল।পূর্বে নন্দী মহারাজ পৃথক দেবতা হিসেবেও পূজিত হতেন পরবর্তীতে তিনি শিবের বাহন হিসেবে স্থান পান|শিব মহাপুরাণ মতে, নন্দী শিলাদ মুনির পুত্র। শিলাদ ছিলেন ভগবান শিবের পরম ভক্ত এবং শিবের আশীর্বাদেই নন্দীর জন্ম হয়েছিলো এবং শিব স্বয়ং তাকে চিরঞ্জীবী হওয়ার বর দেন ও নিজের বাহন হিসেবে স্থান দেন|রামায়ণেও নন্দীর উল্লেখ পাওয়া যায় যেখানে অহংকারী রাবন কৈলাশ এসে নন্দীকে তার চেহারার জন্যে অপমান করেন ও বানর বলেন, নন্দী তাকে অভিশাপ দিয়েছিলো যে এক বানর তার পতন ডেকে আনবেন, পরে তাই হয়েছিলো|এবার আসি আজকের শিব ভূমি প্রসঙ্গে,প্রথমেই বলে রাখি এই জ্যোতির্লিঙ্গ টি নিয়ে শাস্ত্রবিশেষজ্ঞ ও পন্ডিত দের মধ্যে সামান্য মত পার্থক্য আছে অনেকেই মনে করেন পুনে তে অবস্থিত ভীমা শংকর হচ্ছে প্রকৃত জ্যোতির্লিঙ্গ আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন আসামে অবস্থিত এই ভীমেস্বরই হচ্ছেন ভীমাশংকর এবং এই স্বয়ংভু শিব লিঙ্গই প্রকৃত জ্যোতির্লিঙ্গ|আজ আমি আসামের ভীমা শঙ্করের কথাই বলছি|আসামের গুয়াহাটির কাছে দীপর হ্রদের ধারে ডাইনি পাহাড় বা ডাকিনি পাহাড় নামে এক বেশ রহস্যময় স্থানে ভীমশঙ্কর অবস্থিত|এখানে শিব মন্দির ও শিব লিঙ্গ প্রায় প্রাকৃতিক ভাবেই তৈরি যা আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক দুই ভাবেই দর্শনার্থীদের মোহিত করে|শিব লিঙ্গের উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে এক প্রাকৃতিক জলধারা বা ঝর্না|দু ধারে সবুজ বনাঞ্চল ও জল ধারা দেখতে দেখতে পাহাড়ি পথ অতিক্রম করে এই স্থানে পৌঁছানো এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা|জ্যোতির্লিঙ্গ থেকে কিছু দূরেই রয়েছে একটি গণেশ মন্দির|সেখানেও ভক্তিভরে পূজা দেন দর্শনার্থীরা|এই শিব লিঙ্গ ও শিব মন্দির তৈরির পেছনে রয়েছে এক পৌরাণিক ঘটনা|শিব পুরান মতে কুম্ভ কর্ণ ও পাতাললোকের রাজকুমারী কর্কটির পুত্র ছিলেন ভীমাসুর যিনি ব্রহ্মদেবের বর লাভ করে অজেও হয়ে উঠেছিলে|অহংকার ও ঔদ্ধত্যর বশবর্তী হয়ে তিনি কামরূপ রাজ প্ৰিয়ধর্ম কে হত্যা করতে যান|রাজা ছিলেন পরম শিব ভক্ত|যথা সময়ে স্বয়ং শিব প্রকট হয়ে ভীমাসুর কে হত্যা করেন ও কাম রূপ রাজ কে রক্ষা করেন|পরবর্তীতে রাজা ও ঋষি মুনি দের অনুরোধ রাখতে শিব সেই স্থানে বিরাজমান হতে সম্মতি দেন|আজও তিনি ডাকিনি পাহাড়ে অবস্থিত ভীমশংকরে জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে স্বমহিমায় বিরাজমান|ভীমাসুরের নাম থেকেই ভীমেস্বর বা ভীম শংকর নামের সৃষ্টি|আমি ধন্য হয়েছি এই জ্যোতির্লিঙ্গ দর্শন করে আপনারাও চাইলে ঘুরে আসতে পারেন|ভালো লাগবে|পড়তে থাকুন শিব ভূমি|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
শিবভূমি – ভূতনাথ মন্দির
আজ শুরু করবো শিবের একটি বিশেষ রূপ দিয়ে,শিবের অনেকগুলি রূপের মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর রূপটি হলেন বীরভদ্র। সতীর দেহত্যাগের পর ক্রুদ্ধ ভোলানাথ বীরভদ্রের রূপ ধারণ করেন|মতান্তরে সতী দক্ষযজ্ঞে পতিনিন্দা শুনে প্রাণত্যাগ করলে, মহাদেব ক্রোধে উত্তেজিত হয়ে নিজেরমুখ থেকে বীরভদ্রের জন্মদান করেন। শিব ও পার্বতীর প্রতি হওয়া অন্যায় ও অবিচারের প্রতিশোধ নিতে দক্ষর যজ্ঞ স্থলে এসে উপস্থিত হন বীরভদ্র|বীরভদ্র অনুচরসহ দক্ষযজ্ঞে উপস্থিত হলে,মহাকালীও বীরভদ্রের সাথে যোগ দেন।বীরভদ্র তাঁর রোমকূপ থেকে রৌম্য নামক রুদ্রতুল্য অসংখ্য গণদেবতা সৃষ্টি করেন। পরে তাদের সাথে নিয়ে ইনি যজ্ঞের সমস্ত উপকরণ চূর্ণ, উৎপাটন ও দগ্ধ করে সকলকে প্রহার করতে থাকেন। এই সময় দক্ষের মস্তক ছিন্ন হয়|তবুও বীরভদ্রের ক্রোধ শান্ত হয়না|দেবতারা বীরভদ্র কে নিরস্ত্র ও শান্ত করতে চেয়ে ব্যার্থ হন|অবশেষে ব্রহ্মা এসে বীরভদ্রের স্তুতি করে তাঁকে শান্ত করেন|এবার আসি শিবভূমিতে,উত্তরা খন্ডের ঋষিকেশে অবস্থিত একটি বহু প্রাচীন শিব মন্দির, শিব এখানে ভুতেশ্বর মহাদেব নামে প্রসিদ্ধ এবং মন্দিরটি ভূতনাথ মন্দির নামেই জগৎ বিখ্যাত|এই মন্দির ঘিরে রয়েছে একটি রহস্য ও পৌরাণিক আখ্যান|পুরান অনুসারে দক্ষ কন্যা পার্বতীকে বিবাহের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়া শিবের বরযাত্রী এই স্থানে এসেছিলো, এবং যাত্রা পথে এই নিদ্দিষ্ট স্থানে তারা অপেক্ষা করে ছিলো কিছুক্ষন, এটি তাদের বিশ্রামের স্থান|পরবর্তীতে স্থানীয় দের অনুরোধে স্বয়ং প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি ভুতেশ্বর রূপে এই স্থানে সদা বিরাজমান থাকবেন, তারপর থেকে এই স্থানে সুদৃশ্য আটতল বিশিষ্ট ভূতনাথ মন্দিরে, তিনি বিরাজমান,এমনকি মহাদেবের অশরীরী সঙ্গী সাথীরাও রয়েছে স্বমহিমায়, এমনটাই প্রচলিত বিশ্বাস|কথিত আছে এই মন্দিরে এসে ভুতেশ্বর মহাদেবের দর্শন করলে অশুভ শক্তি, ভুত, প্রেত মানুষের আর কোনো ক্ষতি করতে পারেনা, বাবা ভুতেশ্বরের কৃপায় দূর হয় অশুভ শক্তি জনিত সব সমস্যা, তাই এই এই সব সমস্যায় পীড়িত বহু মানুষ প্রায় প্রতিদিন আসেন এই মন্দিরে, ভক্তি সহকারে পূজা দেন|মন্দির প্রাঙ্গনে রয়েছে একটি সুসজ্জিত বেদি যার চারপাশে ঝোলানো রয়েছে দশটি ঘন্টা এবং রহস্য রয়েছে এই খানেও, ওই দশটি ঘন্টা থেকে দশ প্রকার আলাদা আলাদা ধ্বনি উৎপন্ন হয় যার কোনো কারন বা ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি|মন্দিরের চার পাশে বেশ একটা গা ছম ছমে অলৌকিক শক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়. প্রতিদিন সন্ধে ছটায় বন্ধ হয় মন্দির|চলবে শিব ও শিব ভূমি নিয়ে আলোচনা|পড়তে থাকুন|নমস্কার|ধন্যবাদ|