আজ মন্দির রহস্য পর্বে একটি নয় আটটি ভিন্ন ভিন্ন মন্দিরের কথা লিখবো |আটটি গণেশ মন্দির, যেগুলিকে একত্রে অষ্টবিনায়ক মন্দির বলা হয়|শিবের পুজোর জন্য দ্বাদশ জ্যোতির্লিঙ্গ ও শক্তির আরাধনার জন্য যেমন ৫১ শক্তিপীঠের উল্লেখ পাওয়া যায়, তেমনই গণেশের আরাধনার জন্য ৮টি পবিত্র মন্দির রয়েছে যাকে অষ্টবিনায়ক বলা হয় উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো ৮টি মন্দিরই মহারাষ্ট্রে অবস্থিত। প্রথমটি হলো ময়ূরেশ্বর মন্দির, পুণে শহর থেকে প্রায় ৭৫ কিলোমিটার দূরে গণেশের এই পবিত্র ধাম অবস্থিত। মনে করা হয় এই স্থানেই ময়ূরে সওয়ার হয়ে সিন্ধুরাসুর নামক রাক্ষস বধ করেছিলেন গণেশ। তাই এই মন্দিরের নাম ময়ূরেশ্বর মন্দির। দ্বিতীয়টি হলো সিদ্ধিবিনায়ক মন্দির,মহারাষ্ট্রের আহমেদনগরে ভীম নদীর ধারে অবস্থিত গণেশের এই মন্দির। পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত এই মন্দির সম্পর্কে প্রচলিত আছে যে, এই পবিত্র স্থানেই সিদ্ধি অর্জন করেছিলেন স্বয়ং শ্রী বিষ্ণু। তৃতীয়টি হলো বল্লালেশ্বর মন্দির, গণপতির এই সিদ্ধ মন্দির মহারাষ্ট্রের কুলাবা জেলার পালী নামক স্থানে অবস্থিত।অদ্ভুত স্থাপত্য শৈলীর জন্য বল্লালেশ্বর মন্দিরে গণেশের ওপর সরাসরি সূর্য কিরণ পড়ে।গণেশের অন্যতম ভক্ত বল্লালের নাম অনুসারে এই মন্দিরের এমন নামকরণ করা হয়। চতুর্থ মন্দিরটি হলো, বরদ বিনায়ক যেটা কোলহাপুরে অবস্থিত। প্রচলিত আছে, এই মন্দিরে গণেশ দর্শন করলে ব্যক্তির সমস্ত মনোস্কামনা পূর্ণ হয়।পঞ্চম মন্দিরটি হলো, চিন্তামণী মন্দির,এখানে নিজের ভক্তদের সমস্ত চিন্তা দূর করে থাকেন গণেশ। তাঁর এই মন্দির পুণা থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে থেউর গ্রামে অবস্থিত। গণেশের পরম ভক্ত মোরয়া গোসাবী এই মন্দির স্থাপন করেন।ষষ্ঠ স্থানে আছে গিরিজাত্মজ অষ্টবিনায়ক মন্দির, পুণা শহর থেকে প্রায় ১০০ কিলোমিটার দূরে এক গ্রামে অবস্থিত গণেশের এই সিদ্ধ মন্দির।বহু যুগ আগে পর্বত খোদাই করে এই গিরিজাত্মজ মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল|সপ্তম স্থানে আছে বিঘ্নেশ্বর অষ্টবিনায়ক মন্দির,মহারাষ্ট্রের ওঝর জেলার জূনর অঞ্চলে গণেশের এই মন্দির অবস্থিত। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী গণেশ এই অঞ্চলে বিঘনাসুর নামক রাক্ষস বধ করে এই অঞ্চলের জণগণকে রক্ষা করেছিলেন|অষ্টম তথা অষ্টবিনায়কের শেষ মন্দির মহাগণপতি মন্দির যা পুণা থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে রাজণগ্রামে অবস্থিত। গণেশের এই মন্দির বহু প্রাচীন। নবম থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে এই মন্দির নির্মিত।গণপতি এখানে মহোৎকট নামেও পরিচিত।সিদ্ধিদাতা গণেশর এই আট মন্দির দর্শনেই সব কষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন অনেকে।ফিরে আসবো পরের পর্বে নতুন কোনো মন্দিরের রহস্য নিয়ে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মন্দির রহস্য – সংকট মোচন মন্দিরের রহস্য
তুলসী দাস হনুমান চালিশা লিখেছিলেন তা আপনারা জানেনা, অনেকে এটাও জানেন তিনি হনুমান চালিশা লেখার আগে স্বয়ং হনুমানজীর দর্শন পেয়ে ছিলেন|আজ আপনাদের সেই মন্দিরের কথা জানাবো যেখানে বজরংবলী ও তুলসীদাসের সাক্ষাৎ হয়েছিলো|ভারতের উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের বারাণসী শহরে অসী নদীর তীরে কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অবস্থিত সঙ্কটমোচন হনুমান মন্দির অবস্থিত।কথিত আছে, এই মন্দিরটি যেখানে নির্মিত হয় সেখানেই তুলসীদাস হনুমানের দর্শন পেয়েছিলেন।বাল্মীকি-রামায়ণের অবধি-সংস্করণ রামচরিতমানস গ্রন্থের রচয়িতা তুলসীদাস এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। মন্দিরের বর্তমান স্থাপত্যটি শিক্ষাবিদ, স্বাধীনতা সংগ্রামী তথা কাশী হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা পণ্ডিত মদনমোহন মালব্যের দ্বারা নির্মিত।হনুমান জয়ন্তী এই মন্দিরের প্রধান উৎসব। এই উৎসব উপলক্ষে দুর্গামন্দিরের নিকটবর্তী দুর্গাকুণ্ড থেকে হনুমান মন্দির পর্যন্ত এক বিশাল শোভাযাত্রা বের হয়।প্রচলিত বিশ্বাস অনুসারে, এই মন্দির যাঁরা নিয়মিত দর্শন করেন, তারা হনুমানের আশীর্বাদ পান। প্রতি মঙ্গলবার ও শনিবার ভক্তেরা এই মন্দিরে হনুমানের বিশেষ পূজা দিয়ে থাকেন। জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে, হনুমান দুষ্টগ্রহ শনিকে দমন করেন। তাই অনেক গ্রহরাজ শনিদেবের অশুভ প্রভাব থেকে বাঁচাতে এই মন্দিরে পূজা দেন।আপনাদের হয়তো মনে আছে ২০০৬ সালের অভিশপ্ত এক দিনে আরতি চলাকালীন তিনটি বোমা বিস্ফোরণ হয় এই মন্দির চত্বরে।এই সময় মন্দিরে অসংখ্য দর্শনার্থী উপস্থিত ছিলেন|বজরংবলীর কৃপায় রক্ষা পায় মন্দির ও ভক্তগন পরদিন থেকে আবার মন্দিরের দৈনন্দিন পূজাশুরু হয়|ফিরে আসবো পরের পর্বে নতুন কোনো মন্দিরের রহস্য নিয়ে|অনেক রহস্য ময় ঘটনা ও তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|অনলাইন এবং চেম্বারে এসে ভাগ্য বিচারের জন্য যোগাযোগ করুন উল্লেখিত নাম্বারে|ধন্যবাদ |
মন্দির রহস্য – ভূত নাথ মন্দিরের রহস্য
উত্তরা খন্ডের ঋষিকেশে অবস্থিত একটি বহু প্রাচীন শিব মন্দিরে নিয়ে আজকের পর্বে লিখবো| শিব এখানে ভুতেশ্বর মহাদেব নামে প্রসিদ্ধ এবং মন্দিরটি ভূতনাথ মন্দির নামেই জগৎ বিখ্যাত|এই মন্দির ঘিরে রয়েছে একটি রহস্য ও পৌরাণিক আখ্যান|পুরান অনুসারে দক্ষ কন্যা পার্বতীকে বিবাহের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়া শিবের বরযাত্রী এই স্থানে এসেছিলো, এবং যাত্রা পথে এই নিদ্দিষ্ট স্থানে তারা অপেক্ষা করে ছিলো কিছুক্ষন, এটি তাদের বিশ্রামের স্থান|পরবর্তীতে স্থানীয় দের অনুরোধে শিব স্বয়ংপ্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি ভুতেশ্বর রূপে এই স্থানে সদা বিরাজমান থাকবেন, তারপর থেকে এই স্থানে সুদৃশ্য আটতল বিশিষ্ট ভূতনাথ মন্দিরে, তিনি বিরাজমান,এমনকি মহাদেবের অশরীরী সঙ্গী সাথীরাও রয়েছে স্বমহিমায়, এমনটাই প্রচলিত বিশ্বাস|জনশ্রুতি আছে এই মন্দিরে এসে ভুতেশ্বর মহাদেবের দর্শন করলে অশুভ শক্তি, ভুত, প্রেত মানুষের আর কোনো ক্ষতি করতে পারেনা, বাবা ভুতেশ্বরের কৃপায় দূর হয় অশুভ শক্তি জনিত সব সমস্যা, তাই এই এই সব সমস্যায় পীড়িত বহু মানুষ প্রায় প্রতিদিন আসেন এই মন্দিরে, ভক্তি সহকারে পূজা দেন|মন্দিরের চার পাশে বেশ একটা গা ছম ছমে অলৌকিক শক্তির উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়. প্রতিদিন সন্ধে ছটায় বন্ধ হয় মন্দির|বেশ রহস্যময় একটি বিষয় রয়েছে এই মন্দির প্রাঙ্গনে, এখানে আছে একটি সুসজ্জিত বেদি যার চারপাশে ঝোলানো রয়েছে দশটি ঘন্টা এবং রহস্য রয়েছে এই খানেও, ওই দশটি ঘন্টা থেকে দশ প্রকার আলাদা আলাদা ধ্বনি উৎপন্ন হয় যার কোনো কারন বা ব্যাখ্যা আজও পাওয়া যায়নি|চলবে মন্দির রহস্য নিয়ে আলোচনা|ফিরে আসবো পরের পর্বে নতুন কোনো মন্দিরের রহস্য নিয়ে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মন্দির রহস্য – গ্রহরাজ শনিদেবের অদ্ভুত কিছু মন্দির
আজ শনিবার |আজ মন্দির রহস্য পর্বে গ্রহ রাজ শনিদেবের চারটি মন্দিরের কথা বলবো যেগুলি ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার পাশাপাশি জ্যোতিষ শাস্ত্রের দিক দিয়েও গুরুত্বপূর্ণ|প্রথম মন্দিরটি তামিলনাড়ু তাঞ্জাভুর জেলায় এই মন্দির অবস্থিত। দুই নদীর মাঝখানে অবস্থিত এই মন্দির। এখানে শনিদেবের বিশেষ মহিমা রয়েছে । প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, এখানে পুজো করলে ব্যক্তি স্বয়ং নিজের রাশি পরিবর্তন করতে পারে। এই মন্দিরে শনির পাশাপাশি শিবের পুজোও করা হয়। এখানে শিব ও শনি এক সঙ্গে নিজের ভক্তদের কল্যাণ করেন।দ্বিতীয় মন্দিরটি মথুরার কোসি কলায় অবস্থিত একটি প্রসিদ্ধ শনি মন্দির যারা চারদিকে জঙ্গল দিয়ে ঘেরা এই মন্দির সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাস যে, এখানে সাতটি শনিবার সরষের তেল অর্পণ করলে শনি দোষ দূর হয়। উল্লেখ্য, এটি শনির পাশাপাশি গুরু বরখন্ডী বাবারও মন্দির। মনে করা হয় কৃষ্ণ এই স্থানেই কোকিল রূপে শনিকে দর্শন দিয়েছিলেন।পবিত্র এই স্থানে গ্রহ রাজ শনির সঙ্গে শ্রীমতী রাধারানী ও কৃষ্ণের পুজো করা হয়।তৃতীয় মন্দিরটি ছতরপুরে অবস্থিত|এটিও বিখ্যাত একটি পর্যটনস্থল। এখানে শনিদেবের মূর্তি প্রাকৃতিক এবং বিশ্বে শনির সবচেয়ে উঁচু মূর্তি এখানেই আছে । প্রচলিত ধারণা অনুযায়ী এখানে শনিবার পূজার্চনা করলে শনি প্রদত্ত সব দুখঃ কষ্ট দূর হয়।মন্দিরে কাকের ওপর বিরাজমান শনিদেবের মূর্তি রয়েছে।সারা দেশে বিশেষ করে বাংলায় রহস্যময় মন্দিরের সংখ্যা প্রচুর|ফিরে আসবো অন্য কোনো মন্দির রহস্য নিয়ে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান রহস্য – গয়াসুরের কথা
সনাতন ধর্মে যতগুলি পবিত্র তীর্থস্থানের উল্লেখ আছে গয়া তারমধ্যে অন্যতম বিভিন্ন হিন্দুপুরাণে গয়া নগরীর উল্লেখ আছে। রামায়ণে গয়া নগরীর মহিমার বর্ণনা দিয়েছেন স্বয়ং রামচন্দ্র|আজ গয়া নগরীর ইতিহাস ও গয়াসুরের জীবন নিয়ে লিখবো যার নাম অনুসারে গয়ার নাম রাখা হয়েছে|মধ্যযুগে মৌর্য শাসনকালে গয়া সুসম্পন্ন নগরী হিসেবে গয়া প্রতিষ্ঠিত হয়।পরে নন্দ, গুপ্ত, পাল বংশের রাজারা গয়া শাসন করে। এরপর গয়া চলে যায় মোগলদের হাতে।তারও পরে ইংরেজরা এই শহর দখল করে নেয়।পুরাণ অনুযায়ী, নিজের শরীরকে দেবতাদের মতো পবিত্র করার ইচ্ছায় প্রজাপতি ব্রহ্মার তপস্যা করেছিলেন বিষ্ণু ভক্ত গয়াসুর। ব্রহ্মার বরে গয়াসুরকে দর্শন করলেই দর্শনকারী স্বর্গে যেতে পারবেন যার ফলে প্রচুর পাপ এবং অন্যায় করেও শুধুমাত্র গয়াসুরের দর্শন করেই স্বর্গে যেতে শুরু করেন সকলে। দেবতারা বিপদে পড়েন। স্বর্গে ভিড় বাড়তে থাকে। অবশেষে দেবতারা গয়াসুরের কাছে নতুন কোনও পবিত্র স্থানের দাবি করেন। বিষ্ণুর কৌশলে গয়াসুর বলেন তিনি মাটিতে শুয়ে পড়লে তাঁর উপর যেন পবিত্রভূমি তৈরি হয়। গয়াসুরের দেহ প্রায় পাঁচ ক্রোশব্যাপী এক পর্বতে পরিণত হয়। গয়াসুরের ইচ্ছে ছিল, তাঁর শরীরের উপর তৈরি নগরীতে কেউ পিণ্ডদান করলে তিনি যেন স্বর্গে যান। ভগবান বিষ্ণু তাঁর সেই ইচ্ছে পূরণ করেন। এবং পরবর্তী সময়ে সেই পাহাড় ভেঙেই এই প্রাচীন নগরী সৃষ্টি হয়েছিল।গয়ার প্রাচীন নাম বিষ্ণু নগরী। একে জ্ঞান এবং মোক্ষলাভের ভূমি বলেও ডাকা হয়। ফল্গু নদীর তীরে অবস্থিত এই প্রাচীন নগরীতেই নাকি রাজা দশরথের নামে পিণ্ডদান করেছিলেন স্বয়ং রাম সীতা । তারপরেই নাকি রাজা দশরথ স্বর্গে প্রবেশ করতে পারেন। ধর্মীয় বিশ্বাস তারপর থেকেই হিন্দুরা মৃত পূর্ব পুরুষের পিণ্ডদানের জন্য গয়াধামে যান। মহাভারতে গয়াকে বলা হযেছে গয়াপুরী।গয়ায় রয়েছে বোধি বৃক্ষ যে বটগাছের নীচে ভগবান বুদ্ধ পরম জ্ঞান লাভ করেছিল|বর্তমানে মহাবোধি মন্দিরের পিছনেই রয়েছে এই প্রাচীন বৃক্ষ। রয়েছে মুচলিন্দ হ্রদ |বৌদ্ধদের বিশ্বাস, ভগবান বুদ্ধের ধ্যানের সময় ভয়ানক ঝড় ওঠে। ঝড়ের দাপটে বুদ্ধদেবের ধ্যান ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়। সেই সময় মুচলিন্দ সাপ বুদ্ধদেবকে রক্ষা করে। সাপের নামেই হ্রদের নাম হয় মুচলিন্দ হ্রদ।গয়ার খুব কাছেই অবস্থিত নালন্দা, পাটনা, রাজগীর, বৈশালী সহ একাধিক স্থান। ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের বহু নিদর্শন রয়েছে সেখানে।সারা দেশে বিশেষ করে বাংলায় ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক স্থানের সংখ্যা প্রচুর|তাদের সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য কিংবদন্তী এবং অলৌকিক ঘটনা|আবার ফিরে আসবো অন্য কোনো পৌরাণিক স্থানের রহস্য নিয়ে আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন |ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মন্দির রহস্য – করুনাময়ী কালী মন্দির
টালিগঞ্জ এর করুণাময়ী কালী মন্দিরের কথা আপনাদের আগে বলেছি|আজ মন্দির রহস্য পর্বে আপনাদের জন্য উত্তর বঙ্গের রায় গঞ্জে অবস্থিত বিখ্যাত করুণাময়ী কালী মন্দির নিয়ে লিখবো যে মন্দির ঘিরে আছে অসংখ্য রহস্য ও অলৌকিক ঘটনা|রায় গঞ্জ দিয়ে প্রবাহিত কুলিক নদীর তীরে রায়গঞ্জ বন্দর অবস্থিত| সেখানেই ছোট তিনরাস্তার মোড়ে রয়েছে আদি করুনাময়ী কালী মন্দির। বর্তমান মন্দিরের আনুমানিক বয়স কয়েকশো দুশো বছরের বেশি যদিও পুজো হচ্ছে আরো আগে থেকে । আজও সাধক বামাক্ষ্যাপার উত্তরসূরিরা এই মন্দিরের দায়িত্বে আছেন ।শোনা যায় একদা কুলিক নদী দিয়ে বজরা নিয়ে বাণিজ্যে যেতেন সওদাগরেরা।ব্যবসা-বাণিজ্য করতে যাওয়ার সময় এই মন্দিরে পুজো দিতে যেতেন তারা|বর্তমান সময়ে কুলিক নদীর গতিপথ অনেকটাই সংকীর্ণ|শোনা যায়, প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর আগে এই পুজোর প্রচলন হয়। সিদ্ধিলাভের জন্য পঞ্জাব প্রদেশের এক সাধু হেঁটে এসে কুলিক নদীর তীরে বন্দর এলাকায় একটি গাছের নীচে পঞ্চমুণ্ডি আসন প্রতিষ্ঠা করে সাধনায় বসেন। সিদ্ধিলাভও করেন তিনি। তারপর তিনি চলে যান। সেই থেকেই এই পঞ্চমুণ্ডির বেদিতে কালীপুজো শুরু হয়।জনশ্রুতি আছে যে বেদি প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখানে মা হেঁটে বেড়াতেন। রাতে মায়ের পায়ের নূপুরধ্বনি শোনা যেত। দিনাজপুরের তৎকালীন রাজা মায়ের স্বপ্নাদেশ পেয়ে এই স্থানে মন্দির নির্মাণ করেন। মন্দির নির্মাণের পর বামাক্ষ্যাপার উত্তরসূরী সাধক জানকীনাথ চট্টোপাধ্যায় ১২১৬ সালে বেনারস থেকে মায়ের কষ্টিপাথরের মূর্তি এনে মন্দিরে স্থাপন করেন। তখন থেকে এই মন্দিরে নিত্যপুজো শুরু হয়।রায়গঞ্জের করুণাময়ী কালী মন্দিরে প্রতিটি অমাবস্যা তিথিতে এবং বিশেষ করে দীপান্বিতা অমাবস্যা তিথিতে তন্ত্র মতে পূজিতা হন মা।আজও কালীপুজোর রাতে নাকি মন্দির থেকে মায়ের পায়ের নুপূরধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। দেবীকে নাকি হেঁটে বেড়াতেও দেখেছেন অনেকে। দীপান্বিতা অমাবস্যার রাতে কলকাতা সহ অন্যান্য জেলার পাশাপাশি ওডিশা, বিহার, এমনকি বাংলাদেশ থেকেও রায়গঞ্জ বন্দরের প্রসিদ্ধ এই কালীবাড়িতে প্রচুর ভক্ত আসেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস আদি মন্দিরের মা কালী খুব জাগ্রত, তাঁর কাছে প্রার্থনা করলেই তা পূরণ হবে।তন্ত্র মতে এখানে দেবীর পুজো হয় তাই পশুবলী দেয়া হয়|তাছাড়া বিশেষ বিশেষ তিথিতে হোম যজ্ঞ ও চন্ডীপাঠ হয়|সারা দেশে বিশেষ করে বাংলায় মন্দিরের সংখ্যা প্রচুর|তাদের সাথে জড়িয়ে আছে অসংখ্য কিংবদন্তী এবং অলৌকিক ঘটনা|আবার ফিরে আসবো অন্য কোনো মন্দিরের রহস্য নিয়ে আগামী পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
আদি বিনায়ক মন্দিরে রহস্য
ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে সিদ্ধিদাতা গণেশের বহু প্রসিদ্ধ মন্দির রয়েছে এবং প্রতিটি মন্দিরে তাঁর মূর্তি গজাননরূপেই স্থাপিত হয়। কিন্তুতামিলনাড়ুর তিরুভারুরের বিখ্যাত আদিবিনায়ক মন্দিরে গণপতির মুখের আদল মানুষের মতো|আজ মন্দির রহস্যর এই পর্বে সেই মন্দিরটি নিয়েই লিখবো |আদি বিনায়ক মন্দিরে গণেশর মুখ মানুষেরমতো হওয়ার কারণ হল|গণেশের গজানন মুখ সৃষ্টি হওয়ার আগে তাঁর মুখ ছিল বাকি সবার মতো স্বাভাবিক অর্থ্যাৎ মানুষের মতো|গণেশ কে এখানে তার আগের রূপেই পূজা করা হয়।বিঘ্নহর্তা গণেশের এই রূপ খুব কমই পুজো করা হয়। এই রূপে গণেশের হাতে রয়েছে একটি কুড়ুল, একটি দড়ি, একটি মোদক ও একটি পদ্ম|আদি বিনায়ক মন্দিরে শুধু শ্রী গণেশই নয়, শিব ও মা সরস্বতীরও পূজা করা হয়। ফলে বহু ভক্ত একযোগে মহাদেব, আদি বিনায়কের সঙ্গে দেবী সরস্বতীর আশীর্বাদ পেতেও এখানে আসেন।আদি বিনায়ক মন্দির বহু প্রাচীন|সম্ভবত রামায়ণের যুগের ও আগের|কারন শোনা যায়ভগবান রাম একবার আদি বিনায়ক মন্দিরে তাঁর পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্য পুজো দিয়েছিলেন|আজও বহু মানুষ পিতৃ পুরুষের আত্মার শান্তির জন্য এই মন্দিরে পুজো দিতে আসেন|ভক্তরা বিশ্বাস করেন, মহাগুরু অগস্ত্য স্বয়ং প্রতি ‘সংকষ্টি চতুর্থীতে’ আদি বিনায়কের পূজা করেন। এমনও বিশ্বাস করা হয় যে এখানে গণেশের পূজা করলে পারিবারিক অশান্তি দুর হয় ও পরিবারের শিশুদের বিশেষ ভাবে কল্যান হয়|আগামী পর্বে যথা সময়ে আবার ফিরে আসবো অন্য কোনো মন্দিরের রহস্য ও তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরীর দরিয়া বা বেড়ি হনুমান মন্দিরের রহস্য
বাঙালির বড়ো প্ৰিয় এবং অন্যতম জনপ্রিয় তীর্থ ক্ষেত্র হচ্ছে শ্রীক্ষেত্র পুরী|আমি নিজে কতবার যে গেছি তার হিসেব নেই |পুরীতে আছে এক অদ্ভুত বজরংবলীর মন্দির যা বেড়ি হনুমান বা দরিয়া হনুমান নামে খ্যাত|আজ মন্দির রহস্য পর্বে সেই বেড়ি মন্দিরের কথাই আপনাদের জন্য লিখছি |যারা পুড়িতে গেছেন তারা নিশ্চই জানেন পুরী ধামে চক্রতীর্থের কাছে বেড়ি হনুমান মন্দির অবস্থিত।শ্রীজগন্নাথদেব হনুমানকে পুরীধাম রক্ষায় নিয়োজিত করেন। কেননা কখনও কখনও সমুদ্রের ঢেউ পুরীতে প্রবেশ করত এবং পুরীবাসীকে ভুগতে হত। সেজন্য জগন্নাথদেব এখানে পাহারায় হনুমানকে নিযুক্ত করেন, যাতে সমুদ্র পুরী শহরে প্রবেশ করতে না পারে।বজরংবলী হনুমান পুরীতে দ্বার রক্ষক এবং জগতের নাথের ইচ্ছায় তিনি শ্রীক্ষেত্রর সুরক্ষার দায়িত্বে আছেন|পুরীর এই মন্দিরে হনুমানের মূর্তি একটি বেড়ি দিয়ে আবদ্ধ করা হয়েছে।তার ও একটি কারন আছে|পুরান অনুসারে একবার হনুমানের অযোধ্যা পরিদর্শনের জন্য ইচ্ছা হল এবং পুরীধাম পাহারার দায়িত্ব ফেলে ঐ স্থান ত্যাগ করে হনুমান অযোধ্যা গেলেন। ফলে সমুদ্রের জল শহরে প্রবেশ করল এবং শহরবাসীর খুব ভোগান্তি হলো । শ্রীজগন্নাথদেব হনুমানকে অযোধ্যা থেকে ফিরিয়ে আনলেন। তাঁকে এখানে বেড়ি দিয়ে আবদ্ধ করে রাখলেন এবং তাঁকে আজ্ঞা দিলেন যে, কখনও যেন সে এই স্থান ছেড়ে না যায় এবং দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করে।বেড়ি দিয়ে বা শৃঙ্খল দিয়ে আবদ্ধ করার জন্য বজরংবলীকে এখানে বেড়ি হনুমান বলা হয়|যেহেতু হনুমান পুরী ধামকে মহাসাগর বা দরিয়া থেকে সুরক্ষিত রাখতে দরিয়ার নিকটে অবস্থান করছে, সেজন্য তিনি দরিয়া হনুমান নামেও খ্যাত।যারা তীর্থ করতে পুরীতে আসেন তারা জগন্নাথ দর্শনের পাশাপাশি বেড়ি হনুমান দর্শন করতে ভোলেন না|আগামী পর্বে যথা সময়ে আবার ফিরে আসবো অন্য কোনো মন্দিরের রহস্য নিয়ে|পড়তে থাকুন |ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
মন্দির রহস্য – মাটিয়া কালী
আজ মন্দির রহস্য পর্বে আপনাদের জন্য এমন এক কালী পুজো নিয়ে লিখবো যেখানে তথা কথিত মন্দির বলে কিছু নেই আবার মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি থেকেও নেই|আগাগোড়া পুরোটাই রহস্য দিয়ে ঢাকা|দেবী এখানে মাটিয়া কালী নামে প্রসিদ্ধ|দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কালী মন্দিরগুলির মধ্যে অন্যতম কালী মন্দির হল কুশমন্ডি ব্লকের আমিনপুরের ‘মাটিয়া কালী’ মন্দির।দীর্ঘ ৬০০ বছর ধরে এখানে পুজো হয়ে আসছে দেবীর।যে মাটির আসনে পুজো করা হয় তাঁকে সেই মাটিতেই মিলিয়ে যান তিনি। এখানে দেবীর কোনো প্রতিমা নেই। নেই কোনো পাকা মন্দির। তিনি এখানে মাটির বেদীতেই বিরাজমান।স্বাধীনতার আগে ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধের সময় রটন্তী কালী নামে মায়ের পুজো করে যুদ্ধে জয়লাভ করেছিল জমিদার বংশ। যদিও পরে মাটিতে থাকার কারণে এই রটন্তী কালী এলাকাবাসীর কাছে ‘মা মাটিয়া কালী’ নামে পূজিত হন।পুজোর সূচনা গ্রামের জমিদার যোগেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরীর আমলে। ইংরেজ আমলে হরিপুর এস্টেটের জমিদারির দায়িত্ব ছিল তাঁর ওপর। তিনিই একদিন দেবীর স্বপ্নাদেশ পান। মা কালী তাঁকে নির্দেশ দেন, এই গ্রামের মাটিতেই মিশে আছেন তিনি । তাই তিনি এই খোলা আকাশের নীচে মাটির বেদীতেই পুজো নিতে চান। স্বপ্নাদেশ মতো আজও নির্মাণ করা হয়নি কোনো মন্দির। সেই থেকে মাটির বেদীকেই মা কালী রূপে পুজো করে আসছেন গ্রামের লোক|গ্রামের অভিভাবকের আসনে দেবী স্বয়ং তাই গ্রামে যেকোনো শুভ কাজের পূর্বে দেবীর পুজো করা হয় রীতি মেনে|পূর্বে ‘মা মাটিয়া কালীর’ থানের ঈশাণ কোণে ছিল একটি ঘর। যেখানে এক সময় মায়ের সাজগোজের গয়না রাখা হত। তার পাশেই রয়েছে পঞ্চমুখী শিব। যদিও মায়ের পাকা মন্দির নেই তবে পঞ্চমুখী শিবের জন্য মন্দির করা হয়েছে। প্রাচীন রীতি মেনে আজও মাটির থানেই হয় এই পুজো। শোনা যায়, মা মাটিতে থাকার কারণে সেই সময়ে জমিদার পরিবারের সকলে নাকি মাটিতেই ঘুমোতেন।তবে কার্তিক মাসের দীপান্বিতা অমাবস্যায় তাঁর পুজোর সময় তৈরী করা হয় দেবী প্রতিমা যা পরবর্তীতে মাটিতেই বিলীন হয়ে যায়|আগামী পর্বে যথা সময়ে আবার ফিরে আসবো অন্য কোনো মন্দিরের রহস্য নিয়ে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
সাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের বাড়ির পুজো
বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে সাড়া জাগানো নাম তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়|তবে সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি তিনি মাতৃ শক্তির আরাধনাও করেছেনশতাব্দী প্রাচীন বন্দোপাধ্যায় বাড়ির কালী পুজোবেশ কয়েকটি কারনে বৈচিত্রপূর্ন|আজ লিখবো সাধক তারাশঙ্করের পুজো নিয়ে|বীরভূমে রয়েছে একাধিক শক্তি পীঠ যার মধ্যে সতী পীঠের অন্যতম লাভপুরের ফুল্লরা মায়ের মন্দিরে প্রথমে পুজোর পর তারা মায়ের পুজোশুরু হয় তারাশঙ্করের পৈতৃক ভিটেতে। বন্দোপাধ্যায় বাড়ির গৃহ মন্দিরে তারা মা, নীল সরস্বতী রূপে বিরাজমানা।তারাশঙ্করের বাড়ির পুজোয় মা দশ মহাবিদ্যার এক বিদ্যারূপে পূজিত হন। তারাশঙ্করের বংশধর এবং পরিবারের সদস্যরা তো বটেই প্রতি অমাবস্যা এবং বিশেষ বিশেষ তিথিতে রাতের এই পুজোয় অংশ নেন আশেপাশের গ্রাম মিলিয়ে কয়েকশো মানুষ।তারাশঙ্করের পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, তাদের পূর্ব পুরুষ জমিদার হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় দীর্ঘদিন নিঃসন্তান ছিলেন। পরে ফুল্লরা মন্দিরে সাধনা করতে আসা তান্ত্রিক রামজি গোঁসাই হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী প্রভাবতী দেবীকে উপায় বাতলে দেন। নিদান দেন যে, আশ্বিন মাসে দুর্গাদুর্গাপুজো” করতে হবে|নিদান মেনে পুজো সারেন হরিদাস বন্দ্যোপাধ্যায় এবং তাঁর স্ত্রী প্রভাবতী দেবী। শোনা যায়, তার পরের বছরই জন্ম হয় তারাশঙ্করের ।তাঁর জন্মের পরই তারা মায়ের মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করা হয় লাভপুর গ্রামের দক্ষিণ প্রান্তের একটি মাঠে। সেই থেকে বছর বছর সেখানে পুজো হয়ে আসছে। আজ পর্যন্ত সেই ধারা অব্যাহত। তবে উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এখানে তারা মা, নীল সরস্বতী রূপে পূজিত হন। বর্তমানে মাঠটি তারামা ডাঙা নামে পরিচিত। নামের সঙ্গে সাযুজ্য রেখেই এখানে দেবীর গায়ের রঙ নীল। সারা দেহে জড়ানো থাকে সাপ। প্রতিমার পরনে থাকে বাঘ ছাল, মাথায় গেরুয়া জটা, গলায় মুণ্ডমালা এবং হাতে কৃপাণও থাকে।তারাশঙ্করের লেখায় বার বার ঘুরেফিরে এসেছে এই পুজোর কথা|আজও সন্ধের দিরে পুজো শুরু হলেও, তা চলে মধ্যরাত্রি পর্যন্ত। পুজোর পাশাপাশি চলে হোম-যজ্ঞও। তারাশঙ্কর যত দিনে জীবিত ছিলেন, তিনি পুজো করিয়ে গিয়েছেন নিয়ম করে। তাঁর লেখা ‘গণদেবতা’, ‘ধাত্রীদেবতা’, ‘কবি’-সহ বিভিন্ন উপন্যাসে তারা মায়ের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বিভিন্ন ভাবে। ফিরে আসবো অন্য কোনো মন্দিরের কথা নিয়ে|সঙ্গে থাকবে আরো অনেক অলৌকিক ঘটনা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|