Home Blog Page 9

গুরু কথা – শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবা 

গুরু কথা – শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারী বাবা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের গুরু কথায় পরম শ্রদ্ধেয় এবং মহান আধ্যাত্মিক গুরু শ্রী শ্রী লোকনাথ ব্রহ্মচারীর জীবন এবং সাধনা নিয়ে লিখবো।

 

ইংরেজির ১৭৩৫ খ্রিস্টাব্দে উত্তর ২৪ পরগনা জেলার চাকলা গ্রামে লোকনাথ বাবার জন্ম হয়েছিল। তার পিতার নাম ছিল রামনারায়ন এবং মায়ের নাম ছিল কমলাদেবী। পিতা-মাতার চতুর্থ সন্তান ছিলেন তিনি। ছোটো থেকেই তার মধ্যে আধ্যাত্মিক জগৎ এবং পরম ব্রহ্মকে জানার অন্তত জিজ্ঞাসা দেখা যায়।তার যখন এগারো বছর বয়সে তখন তাকে উপনয়ন করিয়ে পাশের গ্রামের ভগবান গাঙ্গুলীর হাতে সন্ন্যাস এর জন্য তুলে দেওয়া হয়েছিল। তার বাল্যবন্ধু ছিল বেণীমাধব।ছোট্ট বেণীমাধব এবং লোকনাথ গুরুর হাত ধরে নানা স্থান পরিক্রমা করে বেড়াতে শুরু করেন। এই সময় তিনি ধ্যান জপ এবং সাধনার আরো অনেক কৌশল শেখেন।

 

গুরু ভগবান গাঙ্গুলি নানা ভাবে তার শিষ্যর পরীক্ষা নিয়েছেন।তিনি বালক লোকনাথের মনোসংযোগের পরীক্ষা নেয়ার জন্য প্রতিকূল পরিবেশে তাকে ধ্যানে বসতে বলতেন। এমনকি ধ্যান চলা কালীন চিনি চড়িয়ে পিঁপড়ে দের আকর্ষণ করতেন। প্রথম দিকে ধ্যান ভঙ্গ হলেও ধীরে ধীরে লোকনাথ তার ইন্দ্রিয় জয় করতে শিখলেন এবং একে একে সাধনার একেকটি কঠিন ধাপ পেরিয়ে হয়ে উঠলেন সিদ্ধ যোগী।

 

অসংখ্য ভক্ত শিষ্য তাঁর অনুগামী হন। দুই বাংলা তথা গোটা দেশে রয়েছে বহু আশ্রম। প্রতিবছর ঘটা করে বাবা লোকনাথের জন্ম তিথি এবং

তিরোধান দিবস পালিত হয়।চাকলা ধাম সহ প্রতিটি লোকনাথবাবার মন্দিরে বহু ভক্তের সমাগম হয়। আজীবন তিনি মানুষকে সর্বদা সত্যের পথে চলতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন।

অনেকেই তাঁকে শিবের অবতার বলে মনে করেন

এবং যেকোনো বিপদ আপদ থেকে বাবা লোকনাথ

তাদের উদ্ধার করবেন বলেই তাদের বিশ্বাস।

 

একাধিক অলৌকিক ঘটনা আছে বাবা লোকনাথের জীবনে।শোনা যায় বরোদাতে

থাকার সময়ে একবার অহংকারী সাধক লোকনাথ বাবাকে সিদ্ধিলাভের প্রমাণ দিতে বলেন। তিনি বলেছিলেন লোকনাথ বাবা যদি সিদ্ধপুরুষ হন তবে তিনি তার শিষ্যত্ব গ্রহণ করবেন। লোকনাথ বাবাকে ধুতরা ফুল ও ভয়ংকর সাপের বিষ দেওয়া হয়েছিল। সেই বিষকে পরাজিত করে বাবা লোকনাথ অক্ষত ছিলেন।

 

বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের বারদী আশ্রমে তিনি সমাধিস্থ হয়েছিলেন। জানা যায় যে এক ভক্ত পুত্রের যক্ষ্মারোগ তিনি নিজের শরীরে ধারণ করেছিলেন তাতে বালকটি পুরো সুস্থ হয়ে ওঠে এবং এই ঘটনার কিছুদিন পর যক্ষ্মা রোগে বাবা লোকনাথের মৃত্যু ঘটে। একশো ষাট বছর বয়সে লোকনাথ বাবা পরলোক গমন করেন।

 

আবার গুরু কথার আগামী পর্বে অন্য এক মহান গুরুর জীবন এবং সাধনার কথা নিয়ে

ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – শ্রী শ্রী ভবা পাগলা

ভবা পাগলা: ভক্তি, মাতৃসাধনা ও অলৌকিক আধ্যাত্মিক জীবনের এক অনন্য অধ্যায়

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার সাধক-ঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন কিছু মহাপুরুষের নাম আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, যাঁদের জীবন ছিল একাধারে রহস্যময়, অলৌকিক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত। সেই বিরল সাধকদের অন্যতম হলেন ভবা পাগলা। তিনি ছিলেন মাতৃসাধক, শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা, আধ্যাত্মিক গুরু এবং অসংখ্য মানুষের কাছে এক জীবন্ত আশ্রয়। তাঁর গান, তাঁর বাণী এবং তাঁর জীবনদর্শন আজও লক্ষ লক্ষ ভক্তের হৃদয়ে সমানভাবে আলো জ্বেলে রেখেছে। বাহ্যিকভাবে তাঁকে অনেকেই “পাগল” বলে মনে করলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন ঈশ্বরপ্রেমে আত্মহারা এক বিরল সাধক। তাই মানুষের মুখে মুখে তাঁর নাম হয়ে ওঠে “ভবা পাগলা”।

ভবা পাগলার প্রকৃত নাম ছিল ভবেন্দ্র মোহন চৌধুরী (কিছু সূত্রে ভবেন্দ্রনাথ চৌধুরী নামও উল্লেখ করা হয়েছে)। তাঁর পিতার নাম ছিল গজেন্দ্র মোহন চৌধুরী। তিনি অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার আমতা অঞ্চলে (বর্তমানে বাংলাদেশে) উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, সাধারণভাবে ১৯০২ সালের দিকে জন্মগ্রহণ করেন বলে অধিকাংশ গবেষক মত প্রকাশ করেছেন, যদিও তাঁর জন্মসাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ধর্মভাব, সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ এবং দেবী মহামায়ার প্রতি অসীম টান লক্ষ্য করা যেত। সাধারণ খেলাধুলার চেয়ে নির্জনে বসে ঈশ্বরচিন্তা, ভক্তিগান এবং ধ্যানেই তিনি বেশি আনন্দ পেতেন।

শৈশব থেকেই ভবা ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং হৃদয়বান। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করত। দরিদ্র, অসহায় কিংবা বিপদগ্রস্ত মানুষকে দেখলে তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের চেষ্টা করতেন। পার্থিব জীবনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ খুব কম ছিল। সংসারের নানা নিয়ম, প্রতিষ্ঠা কিংবা অর্থসম্পদের চেয়ে তিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্যকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে করতেন। এই কারণেই সমাজের অনেকেই তাঁকে প্রথমদিকে অস্বাভাবিক বা পাগল বলে ভাবতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে এই “পাগলামি” আসলে ছিল মাতৃভক্তির পরম উন্মাদনা।

কৈশোর ও যৌবনে তাঁর জীবনে বহু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কথা ভক্তদের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, তিনি প্রায়ই মা কালীকে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করতেন এবং কখনও কখনও মাতৃভাবাবিষ্ট হয়ে দীর্ঘ সময় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তাঁর কাছে আসা বহু মানুষ দাবি করেছেন যে, তিনি মানুষের অন্তরের কথা বুঝতে পারতেন এবং অনেক সময় এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করতেন যা পরবর্তীকালে সত্য বলে প্রমাণিত হতো। যদিও এসব ঘটনার ঐতিহাসিক প্রমাণ সর্বত্র পাওয়া যায় না, তবুও তাঁর ভক্তদের কাছে এগুলো তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির প্রকাশ হিসেবে আজও সমাদৃত।

ভবা পাগলার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর রচিত ভক্তিগীতি। তিনি হাজারেরও বেশি শ্যামাসঙ্গীত ও আধ্যাত্মিক গান রচনা করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাঁর গানের ভাষা ছিল সহজ, হৃদয়স্পর্শী এবং গভীর দর্শনে পূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য জটিল আচার-অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই; দরকার কেবল নির্মল হৃদয়, অকৃত্রিম ভক্তি এবং মায়ের প্রতি নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ। তাঁর গান শুনে অসংখ্য মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিক পরিবর্তন এসেছে বলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন। আজও তাঁর গান বাংলার বিভিন্ন মন্দির, আশ্রম এবং ভক্তসমাজে সমান জনপ্রিয়।

দেশভাগের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন এবং জীবনের একটি বড় অংশ কাটান এখানেই। তাঁর আশ্রমে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় জমাতেন। কেউ আসতেন মানসিক শান্তির খোঁজে, কেউ পারিবারিক সমস্যার সমাধান চাইতে, আবার কেউ শুধুমাত্র তাঁর সান্নিধ্যে কয়েক মুহূর্ত কাটানোর জন্য। তিনি সকলকে সমান স্নেহে গ্রহণ করতেন। তাঁর কাছে ধনী-গরিব, জাত-পাত বা ধর্মের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। তিনি বলতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে একজন মানুষ, আর সেই মানুষ যদি সত্য, প্রেম ও ভক্তির পথে চলে, তবে ঈশ্বর নিজেই তাকে পথ দেখান।

ভবা পাগলার জীবন ছিল অত্যন্ত সরল। তিনি কখনও বিলাসিতা বা প্রচারের প্রতি আকৃষ্ট হননি। সাধারণ পোশাক, সহজ জীবনযাপন এবং সর্বদা ঈশ্বরের নামস্মরণ—এই ছিল তাঁর জীবনের মূল বৈশিষ্ট্য। তিনি ভক্তদের শিখিয়েছিলেন যে অহংকার মানুষকে ঈশ্বর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু বিনয় ও ভালোবাসা মানুষকে ঈশ্বরের আরও কাছে নিয়ে যায়। তাঁর প্রতিটি আচরণে ছিল মায়ের প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাস এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।

তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু অলৌকিক কাহিনি। অনেক ভক্তের বিশ্বাস, তাঁর আশীর্বাদে কঠিন রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেছেন অনেকে, আবার অনেকের জীবনের জটিল সমস্যারও অপ্রত্যাশিত সমাধান হয়েছে। এসব ঘটনার সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই—ভবা পাগলার ব্যক্তিত্ব মানুষের হৃদয়ে গভীর আস্থা, ভক্তি এবং আশার সঞ্চার করেছিল। তাঁর সামনে এসে বহু মানুষ এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি অনুভব করতেন।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ভক্তদের মধ্যে ঈশ্বরপ্রেম, মানবসেবা এবং মাতৃসাধনার বাণী প্রচার করে গিয়েছেন। দীর্ঘ আধ্যাত্মিক সাধনা ও অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে তিনি ১৯৮৪ সালে দেহত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে ভক্তসমাজ গভীর শোকাহত হলেও তাঁর শিক্ষা, তাঁর গান এবং তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার আজও সমানভাবে জীবন্ত। প্রতি বছর তাঁর স্মরণোৎসবে অসংখ্য ভক্ত সমবেত হয়ে তাঁর রচিত গান গেয়ে এবং তাঁর আদর্শ স্মরণ করে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

আজকের ব্যস্ত, উদ্বেগময় এবং স্বার্থকেন্দ্রিক পৃথিবীতে ভবা পাগলার জীবন আমাদের এক অমূল্য শিক্ষা দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, সত্যিকারের শক্তি অর্থ, ক্ষমতা বা খ্যাতিতে নয়; প্রকৃত শক্তি নিহিত আছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, মানবসেবা, বিনয় এবং ঈশ্বরের প্রতি অটল বিশ্বাসে। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে মানুষ নিজের হৃদয়কে ভালোবাসা ও ভক্তিতে পূর্ণ করতে পারে, তার মধ্যেই ঈশ্বরের আবাস ঘটে। তাই ভবা পাগলা শুধুমাত্র একজন সাধক নন; তিনি বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক চিরজাগ্রত আলোকবর্তিকা, যাঁর জীবন ও বাণী আগামী প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করে যাবে।

 

এই মহান কালী সাধককে আমার শ্রদ্ধা এবং প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের পর্ব। পরবর্তী গুরু কথায় অন্য এক গুরুকে নিয়ে

ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – গুরু গোরক্ষ নাথ

গুরু কথা – গুরু গোরক্ষ নাথ

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে ভারতের আধ্যাত্মিক গুরুদের নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে আলোচনা চলছে। আজ গুরু গোরক্ষ নাথ এবং তার অলৌকিক জীবনে কিছুটা আলোকপাত করবো।

গুরু গোরক্ষ নাথ ছিলেন নাথ সম্প্রদায়ের অন্যতম
সন্ন্যাসী। তার সঠিক আবির্ভাব ও তিরোধান দিবস স্পষ্ট করে বলা যায়না। তিনি ছিলেন তিনি মতসেন্দ্র নাথের প্রধান শিষ্য এবং উত্তরসূরি।
অত্যন্ত কঠিন হট যোগ সাধনা করে তিনি সিদ্ধি লাভ করেছিলেন। তার নানা বিধ অলৌকিক ক্ষমতার কথা আজ কিংবদন্তীর ন্যায় প্রচারিত।

গুরু গোরক্ষ নাথের কর্মকান্ড শুধু ভারত নয় নেপালেও তার বিস্তৃতি রয়েছে।
নেপালের গোরখা জনজাতি মহাযোগী গোরখনাথকে তাঁদের রক্ষাকারী দেবতারূপে পূজা করেন। এমনকি রাজতন্ত্রের যুগে নেপালের মুদ্রায় বা প্রশাসনিক বিভিন্ন চিহ্নে গোরখনাথের ছবি ব্যবহার করা হতো । ধৰ্মপ্রাণ নেপালীরা বিশ্বাস করেন, যুগ যুগ ধরে মহাসাধক গোরখনাথই তাদের রক্ষা করছেন।খুব সম্ভবত গুরু গোরক্ষ
নাথের নাম থেকেই গোর্খা শব্দের উৎপত্তি।

একবার কোনো কারণে গোরখনাথ নেপালবাসীর ওপর প্রচন্ড ক্ষুব্ধ হয়ে নেপাল ছেড়ে চলে যান।
তারপর নেপালের উপর যেন প্রকৃতির অভিশাপ নেমে আসে। অনাবৃষ্টি, দাবানল বা ভূমিকম্পের কবলে পড়ে গোটা দেশ।বহুদিন এই অবস্থা সহ্য করার পরে নেপাল রাজ সিদ্ধান্ত নেন যে সবাই মিলে গোরখনাথের শরণাপন্ন হবেন। সেই মতো দেশের সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজা রানি একসাথে গোরখনাথের আরাধনা শুরু করেন।

তারপর গুরু গোরক্ষ নাথের কৃপায় নেপাল আবার শস্য-শ্যামল, সজীব হয়ে ওঠে।আজও নেপালের লোককাহিনিতে এই ঘটনা বিশেষ ভাবে উল্লেখিত আছে।

একবার গুরু গোরক্ষ নাথ তার গুরু মতসেন্দ্র নাথ কে যোগ বলে কামাখ্যার মায়াবী নারীদের থেকে রক্ষা করেছিলেন।বহু দিন গুরুর সান্নিধ্য না পেয়ে একবার ধ্যানস্ত গোরক্ষ নাথ ধ্যানের মধ্যে গুরুকে স্মরণ করলেন। ধ্যানাবিষ্ট অবস্থায় তিনি আশ্চর্য্য হয়ে দেখলেন গুরুদেব রয়েছেন কামরূপে। এবং সেখানে শত শত  তরুণী দ্বারা তিনি বেষ্টিত। ভাবলেন কামরুপ রাজ্যের কুহুকিনি নারীদের মায়া জালে আটকে গুরুদেব ভোগসুখে ডুবে আছেন।  যোগ বলে গোরক্ষনাথ গুরুদেবের উদ্ধারের নিমিত্ত সেখানে উপস্থিত হলেন। এবং অনেক চেষ্টায় সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করে আনলেন।
বাস্তবে হয়তো গুরু তার শিষ্যর ভক্তি এবং ক্ষমতার পরীক্ষা নিয়েছিলেন।

বর্তমান উত্তর প্রদেশের গোরক্ষপুর শহর তার নামেই গড়ে উঠেছে। গোরক্ষ নাথ মন্দিরঅ রয়েছে
এই স্থানেই এবং গুরু শিষ্য পরম্পরা মেনে নাথ সম্প্রদায়ের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য এবং পরম্পরা বর্তমানে সফল ভাবে বহন করে চলেছেন সুযোগ্য উত্তরসূরীরা। দেশ এবং দেশের বাইরে অসংখ্য
ভক্ত শিষ্য রয়েছে।

পরবর্তী পর্বে আরো এক অলৌকিক ক্ষমতা
সম্পন্ন গুরুর জীবন কাহিনী নিয়ে ফিরে আসবো।
গুরু কথায়। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

গুরু কথা – ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে গুরুদের নিয়ে যে লেখনী শুরু করেছি তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি প্রেমের ঠাকুর ও বাংলার আধ্যাত্মিক জগতের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণদেব প্রসঙ্গে না লিখি।

অন্যান্য আধ্যাত্মিক গুরুদের তুলনায় শ্রী রামকৃষ্ণ ছিলেন অনেকটাই আলাদা ১৮৩৬ সালে একটি সাধারণ বাঙালি গ্রামীণ পরিবারে জন্মগ্রহণকারী রামকৃষ্ণ ছিলেন একজন মাতৃ সাধক, দার্শনিক ও ধর্মগুরু। তিনি ছিলেন উনিশ শতকের এমন এক ব্যক্তিত্ব যিনি বাঙালি নবজাগরণে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।

তার গর্ভে থাকাকালীন তার বাবা-মা আধ্যাত্মিক শক্তির প্রকাশ অনুভব করেছিলেন এবং যেমনটি প্রত্যাশা করা হয়েছিল তেমন টাই হয় পরবর্তীতে।শৈশবকালেই তিনি রহস্যময় ও অলৌকিক শক্তির অধিকারী ছিলেন ।পরবর্তীতে বাংলায় হিন্দু ধর্মের পুনর্জাগরণের ক্ষেত্রে প্রধান ব্যক্তি ছিলেন শ্রী রামকৃষ্ণদেব।গুরু শিষ্য পরম্পরার মাধ্যমে ও বিবেকানন্দের নেতৃত্বে তৎকালীন বাংলার শিক্ষিত যুব সমাজের একটি বড়ো অংশ যুক্ত হয় রামকৃষ্ণর আধ্যাত্মিক কর্ম কাণ্ডের সাথে|

শ্রী রামকৃষ্ণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এসেছিলেন তার লীলা করতে, পরমহংসদেব যখন জগৎ সমক্ষে উদিত হন, তখন ঘোরতর ধর্মবিপ্লব চলছে চারপাশে, “জড়বাদী মুক্তকণ্ঠে বলছেন – “জড় হইতেই সমস্ত,জড়ের সংযোগেই আত্মা, জড় ব্যতীত আর কিছু নাই ”
ব্রাহ্ম সমাজ বলছে – “বেদ, বাইবেল, কোরান প্রভৃতি কিছুই মানিবার আবশ্যক নাই, কোনটিই অভ্রান্ত নয়, কোনটিই ঈশ্বর বাক্য নয়”
এমন সময় পরমহংসদেব প্রচার করলেন “কোন ধর্ম কোন ধর্মের বিরোধী নয়। বাহ্য দৃষ্টিতেই বিরোধ কিন্তু সকল ধর্মই মূলত এক কথা বলে
আরো সহজ করে বললেন ” যত মত ততো পথ ”

কথিত আছে, ঠাকুর যখন জন্মগ্রহন করেছিলেন, কামারপুকুর বাটিতে তাদের শিব মন্দির চন্দ্রালোতে আলোকিত হয়ে উঠেছিল। রামকৃষ্ণদেবের গড়নে ছিল দৈবিকভাব|
সেটাই স্বাভাবিক, তিনি কোনো স্বাভাবিক মানুষ ছিলেন না, একাধারে সাধক ও দার্শনিক এই মানুষ টাকে হয়তো এখনো বাঙালি ঠিক চিনে উঠতে পারেনি, তার অবতার তত্ত্ব নিয়েও দ্বিমত আছে, তবে সাধনার যে উচ্চস্তরে তিনি গিয়েছিলেন তা কল্পনা করা কঠিন।

১৮৬১ সাল থেকে ১৮৬৩ সাল পর্যন্ত মহিলা সাধু এবং ভৈরবী ব্রাহ্মণীর কাছ থেকে তন্ত্র পদ্ধতি শিখেছিলেন। রামকৃষ্ণ তন্ত্রের ৬৪ টি সাধনা পূরণ করেছিল|১৮৬৪ সালে তোতাপুরী নামক জনৈক পরিব্রাজক বৈদান্তিক সন্ন্যাসীর কাছ থেকে রামকৃষ্ণ সন্ন্যাস গ্রহণ করেন|পরবর্তীতে বিদায় বেলায় তোতাপুরী আবার তার এই শিষ্যের কাছে দীক্ষা গ্রহন করেন|গুরু শিষ্য পরম্পরায় এ এক বিরল ঘটনা|

তিনি শিব জ্ঞানে জীব সেবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন তার ভাব শিষ্য নরেন কে, সেই আদর্শ আজও এগিয়ে নিয়ে চলেছে রামকৃষ্ণ মঠ।

বেশ অল্প সময়ের মধ্যে অর্থাৎ ১৮৭৯ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নিজের প্রধান শিষ্যদের সঙ্গে রামকৃষ্ণ পরমহংসের সাক্ষাৎ হয়। এঁদের অনেকেই ছিলেন উচ্চ শিক্ষিত। কেউ আবার ছিলেন একান্তই নাস্তিক|নিছক কৌতূহলের বশেই তাঁরা শ্রীরামকৃষ্ণকে দেখতে এসেছিলেন। কিন্তু শ্রীরামকৃষ্ণের উপদেশ এঁদের সকলের মধ্যেই গভীর প্রভাব বিস্তার করে এবং এঁরা সকলেও তাঁর অনুরাগী ভক্তে পরিণত হন। প্রবল যুক্তিবাদী সুরেন্দ্রনাথ মিত্র তাঁকে দেখতে গিয়েছিলেন,তাকে সমালোচনা করার জন্যে|কিন্তু শেষপর্যন্ত তিনি শ্রীরামকৃষ্ণের একনিষ্ঠ ভক্তে পরিণত হন। তাঁর অননুকরণীয় ধর্মপ্রচারের ভঙ্গি অনেক সংশয়বাদী ব্যক্তির মনেও ভক্তির উন্মেষ ঘটাতে সক্ষম হয়েছিল|

রামকৃষ্ণ পরমহংস সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর “পরমহংস রামকৃষ্ণদেবের প্রতি” কবিতাটি লিখেছিলেন:

বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা,
ধেয়ানে তোমার মিলিত হয়েছে তারা;
তোমার জীবনে অসীমের লীলাপথে
নূতন তীর্থ রূপ নিল এ জগতে;
দেশ বিদেশের প্রণাম আনিল টানি
সেথায় আমার প্রণতি দিলাম আনি।

কবি গুরুর এই কবিতা থেকে আধ্যাত্বিক জগতে ঠাকুর রামকৃষ্ণের গুরুত্ব খুব ভালো করেই বোঝা যায়।

আবার আগামী পর্বে পরবর্তী
আধ্যাত্মিক গুরুকে নিয়ে লেখায়
ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – আদি গুরু শংকরাচার্য্য

গুরু কথা – আদি গুরু শংকরাচার্য্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শাস্ত্র মতে সনাতন ধর্মের অভিভাবক এবং রক্ষক আদি গুরু শংকরাচার্য্য। ভারতীয় গুরু শিষ্য পরম্পরা তার দেখানো পথেই অগ্রসর হয়েছে।আজকের পর্ব আদি গুরু শংকরাচার্য্যকে নিয়ে।

 

বিভিন্ন মতবাদে বিভক্ত সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাখা এবং সম্প্রদায়কে এক সূত্রে গেথে সনাতন ধর্মকে একটি নিরাপদ এবং মজবুত ভিত্তি প্রদান করতে মহাদেব স্বয়ং আদি শঙ্করাচার্য্য রূপে পৃথিবীতে এসেছিলেন। তিনিই আদি গুরু। তার দেখানো পথেই এগিয়েছে সনাতন ধর্মের ঐতিহ্য।

 

আদি গুরুর পিতার নাম শিবগুরু ও মায়ের নাম আর্যাম্বা|কথিত আছে ত্রিশূরের বৃষভচল শিবমন্দিরে পুত্রকামনা করে পূজা দিয়ে আশীর্বাদ স্বরূপ শংকরকে পেয়ে ছিলেন তাঁরা।

তিনি মাত্র আট বছর বয়সে তিনি চারটি বেদ আয়ত্ত্ব করে ফেলেন অতি সহজে|অল্প বয়সে পিতৃ বিয়োগের পর চরম আর্থিক দুর্দশার

সম্মুখীন হতে হয় তাকে|

 

কৈশোর থেকেই শঙ্করের ইচ্ছে ছিলো সন্ন্যাস নেয়ার কিন্তু মা রাজি ছিলেন না পরবর্তীতে তাকে রাজি হতে হয়,এ নিয়েও আছে এক অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ|একবার বালক শংকর পূর্ণা নদীতে স্নান করছিলেন। এমন সময় একটি কুমির তার পা কামড়ে ধরে। শঙ্করের মা তখন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন|তিনি মা-কে বলেন, মা যদি সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দেন, তাহলে কুমিরটি তার পা ছেড়ে দেবে। ছেলের প্রাণ বাঁচাতে মা তাকে সন্ন্যাস গ্রহণের অনুমতি দিলেন|কুমির ও সাথে সাথে পা ছেড়ে অদৃশ্য হলো|এরপর সন্যাস নিয়ে গৃহ ত্যাগ করলেন শঙ্করাচার্য্য|গুরুর খোঁজে বেড়িয়ে পড়লেন পথে|

 

দীর্ঘ সময় পদব্রজে সারা উত্তর ভারত পরিভ্রমণ করার পর অবশেষে গুরুর সাথে সাক্ষাৎ হলো|নর্মদানদীর তীরে ওঙ্কারেশ্বরে তিনি গৌড়পাদের

শিষ্য গোবিন্দ ভগবদপাদের শিষ্যত্ব গ্রহন করলেন শঙ্করাচার্য্য|গুরু শঙ্করাচার্য্যকে অদ্বৈত মত প্রচার করতে বলেন|পরবর্তীতে তিনি কাশী,বদ্রিনাথ সহ বহু স্থানে ঘুরে বেড়ান|অসংখ্য ভাষ্য ও গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেন এবং তার পাশাপাশি চালিয়ে যান

অদ্বৈতবাদের প্রচার|এই সময় অসংখ্য অনুগামী ও ভক্ত তার সংস্পর্শে আসেন ও তার শিষ্যত্ব গ্রহন করেন|বহু ধর্মীয় বিতর্কে অংশগ্রহন করে সেকালের ধর্মজগতের বহু সনামধন্য পন্ডিতকে শাস্ত্র আলোচনায় পরাস্ত করে শংকরাচার্য্য হয়ে ওঠেন এক অতি পরিচিত কিংবদন্তী স্বরূপ|মনে করা হয় কাশীতে বিশ্বনাথ মন্দিরদর্শন করতে যাওয়ার সময় স্বয়ং শিব এক চন্ডাল রূপে

তাকে দর্শন দিয়ে ছিলেন|

 

শঙ্করাচার্য্য সারাটা জীবন ধরে অদ্বৈতত্ত্বের প্রচার করে বেদ বিমুখী সমাজকে আবার বেদান্তের পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসেন| শঙ্করাচারজ্যর অদ্বৈত ত্বত্ত্বের মূল কথা ছিল- ব্রহ্ম সত্য, জগৎ মিথ্যা। জীব ও ব্রহ্মে কোনো প্রভেদ নেই|অর্থাৎ, জীব ও ব্রহ্মকে এক ভাবাই অদ্বৈতবাদ।সকল জীবের অভ্যন্তরে যে আত্মা বিরাজমান, তা পরমাত্মারই প্রকাশ। এ তত্ত্বে জীবাত্মা ও পরমাত্মা এক|

 

একাধিক গ্রন্থ এবং শ্লোক রচনা করেন শংকরাচার্য্য। শঙ্করা চার্য্য নির্বাচন পদ্ধতিও তিনি

একটি গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করে যান।

 

শঙ্করাচার্য্য দেশের চার প্রান্তে চারটি মঠ প্রতিষ্ঠা করেন|পুরী, জোশীমঠ, দ্বারকা এবং শৃঙ্গেরী।

আজও এই পরম্পরা মেনে চারটি মঠের প্রধান অর্থাৎ চারজন শঙ্করাচার্য্য পদাধিকারী সনাতন ধর্মের কল্যানে নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন সর্বদা|চার টি মঠের একেটির অধীনে একেকটি বেদ কে রাখা হয়েছে।যদিও কাঞ্চিপীঠ চারটি পীঠের অন্তর্গত নয় তবু যেহেতু শংকরাচ্যার্য্য এই পিঠে স্বয়ং আসীন ছিলেন তাই কাঞ্চিকেও একটি পীঠের মর্যাদা দেয়া হয়।

 

গুরু কথা আজ এখানেই শেষ করলাম।তবে ভারতের আধ্যাত্মিক গুরুদের সাধনা এবং তাদের জীবনী নিয়ে আবার পরবর্তী পর্বে

ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ 

গুরু কথা – স্বামী প্রণবানন্দ মহারাজ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

গুরু পূর্ণিমা পালিত হয়ে গেছে ইতিমধ্যে।

তবে ভারত আধ্যাত্মিকতার দেশ। হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসা গুরু শিষ্য পরম্পরায় রয়েছেন অগণিত মহান গুরুদের উজ্জ্বল উপস্থিতি

তাই এই আলোচনা এতো সহজে শেষ হওয়ার নয়।

আজকের গুরু কথায় দেশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আধ্যাত্মিক গুরু এবং সিদ্ধ যোগী পুরুষ স্বামী প্রনবানন্দ সরস্বতী কে নিয়ে লিখবো।

জানবো তার জীবন কাহিনী এবং একজন আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে তার যাবতীয় কর্মকান্ড।

 

পরাধীন ভারতে ১৮৯৬ সালে ২৯ জানুয়ারি একে মাঘী পূর্ণিমার দিন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মাদারীপুরে অত্যান্ত সাধারন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন স্বামী প্রনবানন্দ|পিতার নাম বিষ্ণুচরন ভূইঞা ও মাতা এবং মাতা সারদা দেবী। তার সন্ন্যাস পূর্ব নাম ছিলো বিনোদ।

 

প্রণবানন্দকে স্বয়ং বাবা মহাদেবের বরপুত্র

বলা হয়।|ছোটো বেলা থেকেই ঈশ্বর চিন্তা এবং আধ্যাত্মিকতায় গভীর আকর্ষণ ছিলো তার|মাত্র সতেরো বছর বয়সে স্বামী গম্ভীরনাথ এর কাছে দীক্ষা নেন তিনি|মাত্র ২০ বৎসর বয়সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন এবং ১৯২৪ সালে প্রয়াগে অর্দ্ধকুম্ভমেলায় স্বামী গোবিন্দানন্দ গিরির নিকট আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস গ্রহণ করেন ও হয়ে যান স্বামী প্রনবানন্দ।

 

স্বামী প্রণবানন্দ একাধারে ছিলেন সন্যাসী, সমাজ সংস্কারক এবং স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী এক বীর সন্ন্যাসী|ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতার যুদ্ধে যোগ দিয়ে তিনি গ্রেপ্তার ও হয়ে ছিলেন।

সারা জীবন তিনি একাধিক প্রাচীন হিন্দু তীর্থ ক্ষেত্র সংস্কার করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন|

 

তবে তার যে কীর্তি তাঁকে অমরত্ব প্রদান করেছে এবং তাঁর আদর্শকে বহন করে চলছে তা অবশ্যই ভারত সেবাশ্রম তৈরি|তিনি ভারত সেবাশ্রম সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন 1917 সালে|বিশ্ব জুড়ে সমাজ সংস্কার, সেবা মূলক কর্ম সূচি ও সনাতন ধর্মের প্রচারে ভারত সেবাশ্রম আজ এক অতি পরিচিত নাম। একজন আধ্যাত্মিক গুরু হিসেবে তিনি অসংখ্য ভক্ত শিষ্যকে মানব সেবা এবং সমাজ সংস্কারের কাজে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

 

সারাটা জীবন ধরে স্বামী প্রনবানন্দ সক্রিয় ছিলেন দেশের সনাতন সমাজকে ঐক্য বদ্ধ করতে এবং সংকীর্ণ জাতপাতের বেড়া জাল থেকে সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে|তিনি সকল রকম ধর্মীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছিলেন|তিনি ব্যক্তি চরিত্র নির্মাণ, আদর্শ পরিবার গঠন যথাযত শিক্ষা ইত্যাদিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন|তিনি বলেছিলেন – হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, চণ্ডাল আদির কোন ভেদ নেই|অর্থাৎ সব হিন্দু সমান, সবার সমান অধিকার এবং সবাইকে সমান চোখে দেখতে হবে|

 

আজও তিনি ঘরে ঘরে পূজিত হন এক আদর্শ

গুরু ও এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে|১৯৪১ সালে ৮ জানুয়ারি মাত্র ৪৫ বৎসর বয়সে তিনি দেহ ত্যাগ করেন। আজও তার অগণিত ভক্ত এবং তার সংগঠনের সদস্যরা তার দেখানো পথে সনাতন ধর্মের স্বার্থে কাজ করে চলেছে।জাতী ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সেবাই তাদের প্রধান উদ্দেশ্য।

 

আজ এই মহান গুরু স্বামী প্রণবানন্দ

ব্রহ্মচারীকে জানাই প্রনাম এবং শ্রদ্ধা। আবার গুরুকথার পরবর্তী পর্বে অন্য এক গুরুর জীবনী নিয়ে ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর

গুরু কথা – শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

গুরু কথার আজকের উপস্থিত হয়েছি এক মহান আধ্যাত্মিক গুরুর জীবন কাহিনী নিয়ে|আজকের পর্বে শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর কে নিয়ে লিখবো।

 

অবিভক্ত বাংলার গোপালগঞ্জ জেলায়

যশোমন্ত ও অন্নপূর্ণা দেবীর গৃহে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন কলি যুগের এই অন্যতম শ্রেষ্ট মহাপুরুষ।তাঁর পরিবার ছিলো নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব পরিবার।ফলে শৈশব থেকেই শাস্ত্র পাঠ ও ধর্ম আলোচনার প্রতি তার এক গভীর আগ্রহ ও নিষ্ঠা

বর্তমান ছিলো।যত বয়স বাড়তে লাগলো শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মধ্যে এক ঐশরিক শক্তির বিকাশ হতে থাকলো।যথাযত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়াই তিনি একজন জ্ঞানী শাস্ত্রজ্ঞ ও বৈষ্ণব শাস্ত্রে অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী হয়ে উঠেছিলেন।

মূলত প্রেম-ভক্তির কথা সহজ-সরলভাবে প্রচার করতেন তিনি।

 

পরবর্তীতে তার প্রচলিত সাধন পদ্ধতি মতুয়াবাদ রূপে ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে|মতুয়া শব্দের অর্থ মেতে থাকা বা মাতোয়ারা হওয়া। মূলত ঈশ্বর বা হরিনামের প্রেমে যিনি বা যারা মগ্ন বা বিভোর হয়ে থাকেন, তাদেরকেই মতুয়া বলা হয়।

 

 

শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুর মতুয়া সম্প্রদায়ের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রান পুরুষ|সারা জীবন তিনি উৎসর্গ করেন মতুয়া আদর্শের প্রচারে এবং প্রসারে|তিনি মনে করতেন ঈশ্বর প্রাপ্তির জন্য সন্ন্যাস নেয়ার প্রয়োজন নেই অন্তরে শ্রদ্ধা ও ভক্তি থাকলে এবং নিষ্ঠা সহকারে ঈশ্বর চিন্তা করলে গৃহীরও ঈশ্বর লাভ সম্ভব|নানা শ্রেণী ও জাতি তে বিভক্ত হিন্দু সমাজ কে তিনি ঐক্যবদ্ধ করতে পেরেছিলেন মতুয়াবাদের দ্বারা|তৎকালীন হিন্দু সমাজের অসংখ্য নিপিড়িত, দরিদ্র ও তথা কথিত নিম্ন শ্রেণীর মানুষ দের তিনি পরম স্নেহে বুকে টেনে নিয়েছিলেন এবং তাদের সার্বিক উন্নতি সাধনই ছিলো তার জীবনের প্রধান লক্ষ্য|

 

আজ দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা কোটি কোটি মতুয়াদের কাছে  শ্রী শ্রী হরিচাঁদ চাঁদ ঠাকুর কলি যুগের শেষ এবং শ্রীহরি-র পূর্ণ অবতার|যথার্থ অর্থেই তিনি পতিতপাবন।

 

শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরের মহা প্রয়ানের পর তার পুত্র শ্রী শ্রী গুরুচাঁদ ঠাকুর মতুয়া সমাজের উন্নতি সাধনে ব্রতী হন।আজও বংশ পরম্পরার শ্রী শ্রী হরিচাঁদ ঠাকুরহরিচাঁদ ঠাকুরের সুযোগ্য বংশধরেরা মতুয়া সমাজ কে নেতৃত্ব দান করে চলেছে সঙ্গে রয়েছেন অসংখ্য মতুয়া ভক্ত এবং শিষ্য।

 

প্রনাম জানাই এই মহান আধ্যাত্মিক গুরু এবং পরম ব্রহ্ম স্বরূপ আধ্যাত্মিক ব্যাক্তিত্বকে।

আবার ফিরে আসবো গুরু কথার আগামী পর্ব নিয়ে।যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো ঠাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু পূর্ণিমার শুভেচ্ছা 

গুরু পূর্ণিমার শুভেচ্ছা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

প্রথমেই সবাইকে গুরু পূর্ণিমার শুভেচ্ছা জানাই আজকের এই পুন্য তিথিতে স্মরণ করবো যোগীরাজ শ্যামা চরণ লাহিড়ীকে। যাকে সবাই লাহিড়ী মহাশয় বলেই জানেন।

 

ভারতের ক্রিয়াযোগের জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র যোগী রাজ শ্যামাচরণ লাহিড়ী।সংসার ধর্ম পালন করেও যে আধ্যাত্মিক মার্গে সফল ভাবে হাঁটা যায় এবং সাধনার সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছানো যায় তা হাতে কলমে প্রমান করে দিয়েছেন এই মহান আধ্যাত্মিক গুরু।

 

ব্রিটিশ ভারতবর্ষে 1895 সালে নদীয়া জেলায় এক ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন শ্যামচরণ। তার জীবন ছিলো আর পাঁচটা সাধারণ গৃহস্ত বঙ্গ সন্তানের মতোই। চাকরি করতেন একটি বেসরকারি সংস্থায়। একবার কর্মসূত্রে তাকে যেতে হয় হিমালয়ের পাদদেশে এক এলাকায় এর এখানেই ঘটে এক অদ্ভূত ঘটনা।একদিন পাহাড়ে চলার সময় তিনি তাঁর গুরু কিংবদন্তী স্বরূপ মহাবতার বাবাজির দেখা পেলেন।মহাবতার বাবা শ্যামাচরণ কে ক্রিয়া যোগের কৌশলগুলো শিখিয়ে দিলেন এবং দীক্ষা দিলেন।দীক্ষার পর চললো কঠোর অনুশীলন ধীরে ধীরে শ্যামচরণ হয়ে উঠলেন যোগীরাজ শ্যামাচরণ।

 

পরবর্তীতে গৃহস্ত জীবনে থেকে তিনি সাধনা করেছেন। অসংখ্য ভক্ত শিষ্য হয়েছে। ঘটিয়েছেন বহু অলৌকিক ঘটনা যা নিয়ে আজও আলোচনা হয়।

 

শোনা যায় একবার তাঁরই এক শিষ্যা অভয়া গুরুর সঙ্গে দেখা করতে হাওড়া থেকে বারাণসী আসছেন। মালপত্র নিয়ে ছুটতে ছুটতে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছতেই দেখলেন, বারাণসী এক্সপ্রেস স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। কাঁদতে কাঁদতে স্টেশনেই বসে পড়লেন তিনি। আস্তে আস্তে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। চূড়ান্ত হতাশ অভয়া তখন অঝোরে কাঁদছেন আর গুরুদেব শ্যামাচরণ লাহিড়িকে স্মরণ করছেন।হটাৎ অভয়া দেখলেন, ট্রেন থেমে গিয়েছে।ড্রাইভার ও গার্ড ও অবাক তৎক্ষণাৎ মালপত্র নিয়ে দৌড় দিলেন তিনিও। অভয়া ট্রেনে ওঠা মাত্র থেমে যাওয়া বারাণসী এক্সপ্রেস আবার গড়গড় করে চলতে শুরু করল।বারাণসী পৌঁছে অভয়া তাঁর গুরুদেবের কাছে গেলেন। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা মাত্র যোগীরাজ শ্যামাচরণ বললেন, ‘ট্রেন ধরতে গেলে একটু সময় হাতে নিয়ে বেরোতে হয় মা,অত বড়ো ট্রেনকে কি আটকে রাখা যায়?গুরুর অলৌকিক ক্ষমতায় দেখে অবাক হলেন শিষ্যা অভয়া।

 

এমন অনেক অলৌকিক কীর্তি ছড়িয়ে আছে তাঁর জীবনে।বলা হয় তিনি যোগ বলে সুক্ষ দেহে যেখানে খুশি যেতে পারতেন।তাঁর ভক্ত শিষ্যদের মনের কথা পড়তে পারতেন। স্বপ্নে দেখা দিতে পারতেন।ক্রিয়া যোগের দ্বারা তিনি বহু অসাধ্য সাধন করেছেন।যদিও বাইরে থেকে তাঁকে দেখে তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা বোঝা যেতোনা।

 

আজও তাঁর দেখানো পথে হাটছেন তাঁর দীক্ষিত এবং বহু ভাব শিষ্য তাঁদের কাছে তিনি প্রকৃত যোগীরাজ অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন এক মহান গুরু।

 

গুরু পূর্ণিমার অনেক শুভেচ্ছা

জানাই।এমন অনেক আরো গুরুর কথা

নিয়ে লেখা বাকি আছে।ফিরে আসবো

আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরুকথা – শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র 

গুরুকথা – শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আসন্ন গুরু পূর্ণিমার এই পবিত্র তিথী উপলক্ষে গুরু তত্ব নিয়ে বা জগৎ বিখ্যাত গুরুদের নিয়ে উপস্থাপনা এক অনন্য সাধারণ অনুভূতি যে অনুভূতি আপনাদের সাথে ভাগ করে নিতে পেরে আমি অত্যান্ত আনন্দিত।আজকের পর্বে পরম পূজনীয় শ্রী শ্রী অনুকূল ঠাকুরকে নিয়ে বলবো।তার কথা যতই বলা হোক কথা শেষ হয় না এমনই অদ্ভুত এবং অলৌকিক জীবন ও আধ্যাত্মিক সাধনা।

 

অনুকূলচন্দ্র চক্রবর্তী ১৮৮৮ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশের পাবনা জেলার হিমায়তপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন|তাঁর পিতার নাম শিবচন্দ্র চক্রবর্তী এবং মাতার নাম ছিলো মনমোহিনী দেবী|

হিমায়তপুর গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে তাঁর শিক্ষা জীবন শুরু হয় পরে নৈহাটী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে স্কুল জীবনের পড়া শেষ করে তিনি কলকাতা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন|

 

অনুকূল চন্দ্রের পরিবার ছিলো উত্তর ভারতের যোগীপুরুষ শ্রী শ্রী হুজুর মহারাজের শিষ্য তবে ঠাকুর অনুকূলচন্দ্র মায়ের কাছেই দীক্ষা গ্রহন করেন|কঠোর পরিশ্রম ও দক্ষতার সঙ্গে তিনি জীবনে এগিয়ে চলেন, অনুকূলচন্দ্র ছিলেন একাধারে কবি, লেখক, ডাক্তার ও সর্বোপরি এক আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় গুরু|তিনি ছিলেন হিন্দু সমাজের একজন মহাপুরুষ, বিশ্ব মানবতাবাদী এবং পরম কৃষ্ণ ভক্ত।সারা জীবন তিনি চেষ্টা করে গেছেন কি ভাবে মানুষ ভাল থাকবে, সুস্থ থাকবে, শান্তিপূর্ণ ভাবে সবাই মিলে মিশে থাকবে|সেজন্য ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র সব সময় চাইতেন, তার অনুসারিরা সব সময় কৃষ্ণ ভক্তির পথে থাকুক|তাঁর এই দর্শন ও আদর্শ সাফল্যের সাথে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে তাঁর পরিবার ও অগণিত ভক্ত শিষ্যর।

 

তাঁর বহু ভক্ত শিষ্যও বহু অলৌকিক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। যেমন তাঁর সান্নিধ্যে এলে মনের সব অন্ধকার দিক মুছে যেতো। প্রানে শান্তি পাওয়া যেতো। আবার অনেকে তাঁকে স্মরণ করে বহু দুরে থেকেও তাঁর দিব্য দর্শন পেয়েছেন। বহু রোগী তাঁর কৃপায় সুস্থ্য হয়েছেন এমন ও দাবী আছে।একবার হিমায়ত পুর গ্রামে কলেরা মহামারীর আকার নেয়। সেই সময় এক রাতে গ্রামের রাস্তায় শ্রী শ্রী অনুকূল ঠাকুরের সামনে পরে যান এক রমণী। মুহূর্তে ঠাকুরের কপাল থেকে জ্যোতি বেরিয়ে ধেয়ে যায় সেই রহস্যময়ী রমণীর দিকে। তারপর সেই রমণী অদৃশ্য হয়। সেই রাতের পর কলেরা বিদায় নেয়

গ্রাম থেকে।

 

তবে লোক শিক্ষার জন্য তিনি চীরস্মরণীয়।শ্রী শ্রী অনুকূল ঠাকুর প্রায় ৪৬টি পুস্তক রচনা করেন|এগুলোতে ধর্মশিক্ষা, সমাজ সংস্কার প্রচলন প্রভৃতি বিষয়ে আদর্শ ও উপদেশসমূহ বর্ণিত হয়েছে।এগুলি ধর্ম ও আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে অত্যান্ত গুরুত্ব পুর্ন গ্রন্থ হিসেবে সর্বত্র সমাদৃত |বই গুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য, সত্যানুসরণ, পুণ্যপুথি, অনুশ্রুতি, চলার সাথী, শাশ্বতী, বিবাহ বিধায়না,সমাজ সন্দীপন ইত্যাদি।

 

পাবনা শহরের কাছে হেমায়েতপুর গ্রামে শ্রী শ্রী ঠাকুর অনুকূল চন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন সৎসঙ্গ আশ্রম ও মন্দির যা আজ লক্ষ লক্ষ ভক্ত শিষ্যর কাছে এক মহান তীর্থ ক্ষেত্র|1946 সালে অনুকূল ঠাকুর পাবনা থেকে দেওঘর আসেন ও দেওঘর আশ্রম তৈরি করেন|এই দেওঘরেই 1969 সালে ঠাকুর পরলোক গমন করেন|আজ এই আশ্রম ও ঠাকুরের সংগ্রহশালা দেও ঘরের মুখ্য আকর্ষণ হয়ে উঠেছে।

 

আবার যথা সময়ে ফিরে আসবো।

গুরু কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে। চলতে থাকবে ধারাবাহিক লেখা।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

গুরু কথা – শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর

গুরু কথা – শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

গুরু কথার আজকের পর্বে যে মহান
গুরুকে নিয়ে লিখবো।তিনি শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর যার সন্যাস জীবনের পূর্বের নাম ছিলো রাম চন্দ্র চক্রবর্তী। তার জীবন এবং সাধনা ভারতের আধ্যাত্মিক জগতে আদৰ্শ স্বরূপ। আজও দেশে বিদেশে তার অসংখ্য ভক্ত রয়েছে।ভারতের আধ্যাত্মিক জগতে তিনি এক উজ্জ্বল নক্ষত্র সম।

অবিভক্ত বাংলায় ১৮৬০ সালে ফরিদপুর জেলায় শ্রী রাধামাধব চক্রবর্তী ও শ্রীমতি কমলাদেবীর সন্তান হিসাবে শ্রীশ্রী রামঠাকুর জন্মগ্রহণ করেন|

শৈশব থেকেই ধীরে ধীরে বালক রামচন্দ্রের মধ্যে কিছু দৈব্য ক্ষমতা বা সাধকের গুনাবলি প্রকাশ পেতে শুরু করে।বাল্যকাল থেকেই শাস্ত্রে তার খুব আগ্রহ ছিলো মাঝে মাঝেই ঈশ্বর চিন্তা করে তিনি ভাব তন্ময় হয়ে যেতেন |ঈশ্বরে কে কেন্দ্র করে নানা আধ্যাত্মিক প্রশ্ন তার মনে ঘুরপাক খেতো এই ঈশ্বরের খোঁজেই ১৮৭২ সালে সকলের অজ্ঞাতে অজানাকে জানার লক্ষ্যে গৃহত্যাগী হন এবং নানা স্থানে ঘুরে শেষে পৌঁছালেন আসামের শ্রীশ্রী কামাক্ষ্যাদেবীর মন্দিরে এবং এক অক্ষয় তৃতীয়ার দিন শ্রীশ্রী রামঠাকুর দেখেন জটাধারী, দীর্ঘাঙ্গী এক জ্যোতির্ময় মহাপুরুষ তার সামনে দাঁড়িয়ে|গুরু হিসাবে তিনি সেই দিব্য পুরুষ কে গ্রহন করলেন শুরু হলো তার সাধনা এবং
আধ্যাত্মিক যাত্রা|

একের পর এক বহু কঠিন সাধনায় সিদ্ধি লাভ করে একসময় তিনি হয়ে উঠলেন অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর। পরবর্তীতে আরো কঠোর সাধনা করে তিনি অষ্টসিদ্ধি লাভ করলেন এরপর গুরুর এদেশে গৃহে ফিরে মাতৃ সেবা এবং কর্ম জীবনে কিছুকাল নিজেকে নিয়োজিত করলেন|এসবের মধ্যে থেকেও তার আধ্যাত্মিক শক্তি এবং জ্ঞান গোপন রইলো না বেশি দিন।ধীরে ধীরে তার চারপাশের মানুষরা বুঝতে পারেন তিনি আর কোনো সাধারণ মানুষ নেই।তার মধ্যে অলৌকিক আধ্যাত্মিক শক্তি জন্ম নিয়েছে।

শোনা যায় শ্রী শ্রী রাম ঠাকুর একই সাথে দুই স্থানে থাকতে পারতেন, মানুষের মনের কথা পড়তে পারতেন এমনকি অদৃশ্য হতে পারতেন|
এমন বহু ঘটনা তিনি তার জীবদ্দশায় ঘটিয়েছেন যা থেকে তাঁর অলৌকিক সত্ত্বার প্রমান পাওয়া যায়।

শ্রীশ্রী রামঠাকুরের নির্দেশে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ১৯৩০ সালে কৈবল্যধাম আশ্রম এবং ১৯৪২ সালে কলকাতার যাদবপুরে কৈবল্যধাম আশ্রম তৈরি হয় যেগুলি তার ভক্ত ও শিষ্য দের কাছে আজ তীৰ্থ ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে|এছাড়াও ১৯৪৩ সালে তার জন্মভিটা ডিঙ্গামানিক গ্রামে সত্যনারায়ণ সেবা মন্দির তৈরি হয়। অসংখ্য ভক্ত তার আদর্শে দীক্ষিত। আজও বহু রাম ঠাকুর ভক্ত তার দেখানো
ভক্তি মার্গে চলছেন এবং নানা রকম জন সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন।শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের কাছে, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শুচি, অশুচির কোনও ভেদ ছিল না|জীবনের দীর্ঘ সময় কঠিন যোগ সাধনায় মগ্ন থেকেও ভক্ত দের তিনি নিঃস্বার্থ ভাবে জীব সেবা করতে শিখিয়ে গেছেন|তার জীবন ও দর্শন তার অগণিত ভক্ত ও শিষ্য দের কাছে এক আদর্শ স্বরূপ|

ভারতের এই মহান আধ্যাত্মিক ব্যাক্তিত্ব
শ্রী শ্রী রাম ঠাকুরের চরনে আমার শত কোটি প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের গুরু কথা|গুরু পূর্ণিমা উপলক্ষে চলতে থাকবে
গুরু কথা।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।