Home Blog Page 10

লৌকিক দেবদেবী – পাঁচু ঠাকুর 

লৌকিক দেবদেবী – পাঁচু ঠাকুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরান বা বেদের বাইরেও অনেক লৌকিক দেব দেবীর অস্তিত্ব আছে। এমনই কিছু লৌকিক দেবদেবী নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে এই সপ্তাহে লিখবো। আজ শুরু করবো বাবা পঞ্চানন্দ বা পাঁচু ঠাকুরকে দিয়ে।

 

পঞ্চানন বা পাঁচু ঠাকুর বাংলার এক বিখ্যাত লৌকিক দেবতা। লোকবিশ্বাসে ইনি মহাদেব শিবের এক লৌকিক রূপ আবার অন্যমতে,

ইনি শিবের মানস পুত্র। মূলত গ্রামরক্ষক রূপে পঞ্চানন পূজিত শস্যদেবতা হিসাবেও তার পূজার প্রচলন আছে। আবার কোথাও তিনি

শিশুদের রক্ষাকর্তা।

 

মহাদেব শিবের সঙ্গে পঞ্চানন ঠাকুরের দেহাকৃতি ও বেশভূষার সাদৃশ্য আছে।পঞ্চাননের গাত্রবর্ণ লাল এবং চোখমুখের ভঙ্গি রুদ্ররূপী; বেশ বড় গোলাকার ও রক্তাভ তিনটি চোখ ক্রোধোদ্দীপ্ত। প্রশস্ত ও কালো টিকালো নাক, দাড়ি নেই, গোঁফ কান অবধি বিস্তৃত। মাথায় পিঙ্গলবর্ণের জটা চূড়া করে বাঁধা এবং তার মধ্যে জটা কিছু বুকে পিঠে ছড়ানো। কানে ধুতুরা ফুল বিরাজমান।গলায় ও হাতে বেশ বড় পঞ্চমুখী রুদ্রাক্ষমালা থাকে। হাতে ত্রিশূল ও ডমরু; পায়ে খড়ম এবং মাথায় বা দেহের উপর সাপ বিদ্যমান। পাশে থাকে পঞ্চরংয়ের বা পাঁচমুখো গাঁজার কলকে।উর্ধাঙ্গ অনাবৃত নিম্নাঙ্গ বাঘছাল পরিহিত।

 

দক্ষিণ কলকাতার টালিগঞ্জ এ প্রাচীন এক মন্দিরে পঞ্চানন ঠাকুরের মূর্তি সাড়ে তিনশ বছরেরও বেশি সময় ধরে পূজিত হয়ে আসছেন।

বহুকাল আগে যখন টালিগঞ্জের আদিগঙ্গার পাড়ে জন বসতি সেই ভাবে গড়ে ওঠেনি সেখানে বাস করতে বৈদ্যনাথ ভট্টাচার্য্য নামে এক পূজারী ব্রাহ্মণ। এক রাতে বৈদ্যনাথ স্বপ্ন দেখলেন, পঞ্চানন ঠাকুর এসেছেন। বর্তমানে যে মূর্তি আমরা দেখি, সেই রূপে। ঠাকুর বলছেন, এই গঙ্গার ঘাটে আমি তোর অপেক্ষায় আছি। জলের মধ্য থেকে উদ্ধার করে আমাকে নিয়ে চল দ্রুত।

পুজো করার আদেশ ও পেলেন।পরের রাতে আবার একই স্বপ্ন ভোর হতে তখনো খানিকটা সময় বাকি, কিন্তু অপেক্ষা করলেন না তিনি। সেই রাতেই গ্রামের কয়েকজন ভক্তকে ডেকে নিয়ে, সস্ত্রীক চললেন গঙ্গার ঘাটে।ঘাটে এসে তিনি দেখলেন তিনটে প্রায় চারকোণা আকৃতির পাথর রাখা আছে জলের ধারে, আর তিনটিই রক্তাভ। তিনটে পাথরকে এক বিরাট সাপ জড়িয়ে আছে। সেই পাথর তুলে এনে তিনি স্থাপন করলেন নিজের মন্দিরে। পরবর্তীতে স্বপ্নে দেখা রুপ মিলিয়ে তৈরি হলো মূর্তি শুরু হলো পুজো।এই রকম জনশ্রুতি আর ভক্তির সাথে মিলেমিশে রয়েছে এই পঞ্চানন ঠাকুরের মন্দির ও তার অস্তিত্ব।

 

চলতে থাকবে লৌকিক দেবদেবীদের নিয়ে ধারাবাহিক লেখা। ফিরে আসবো পরের পর্বে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – বোম্বেটে কালী

কালী কথা – বোম্বেটে কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

নদীয়া জেলা সাধারণত মহাপ্রভুর ভক্তি আনন্দ বা বৈষ্ণব দের জন্য বিখ্যাত হলেও এই জেলার কিছু কালী পুজো বেশ প্রসিদ্ধ তার মধ্যে অন্যতম শান্তিপুরের বোম্বেটে কালী।আজকের কালী কথায় বোম্বেটে কালী নিয়ে লিখবো।

“বোম্বেটে” শব্দটি পর্তুগিজ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ বোমাবাজ বা জলদস্যু। এটি মূলত ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াইয়ে যুক্ত একদল স্বাধীনতাসংগ্রামীকে বোঝাতে ব্যবহৃত হতো, এবং পরে জলদস্যুদেরও বোঝাতো। অনেকটা আমাদের দেশের বর্গীদের ন্যায়।

প্রথমে ব্রিটিশ আমলে এই দেবীর পুজোর প্রচলন করেছিলেন একদল সসস্ত্র স্বাধীনতাসংগ্রামী, যারা ব্রিটিশ-বিরোধী আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন এবং বিদেশি শাসকদের কাছে তারা ছিলেন ভয়ঙ্কর অপরাধী। তাই তাদের প্রচলিত কালী পুজো হয়ে ওঠে বোম্বেটেদের কালী পুজো এবং দেবী হয়ে যান বোম্বেটে কালী।

ভিন্ন একটি মত অনুসারে জলদস্যুদের বলা হতো বোম্বেটে। একদল ডাকাত এই পুজোর প্রচলন করে ছিলো এবং তারা প্রধানত জল পথে ডাকাতি করতো। তাই তাদের কালীকে বোম্বেটে কালী বলা হয়।

এই কালীর মূর্তিতে দেবী শিবের বুকের ওপর বাম পা রাখেন, যা তাকে অন্যান্য কালীমূর্তি থেকে আলাদা করে। দেবীকে শাস্ত্র মতে বামা কালী রূপে পুজো করা হয়।

শান্তি পুর সহ গোটা নদীয়া জেলায় দেবীকে অত্যন্ত জাগ্রত বলে মানা হয় এবং লক্ষ লক্ষ ভক্ত এই দেবীর আরাধনা করেন।নিজেদের মনোস্কামনা জানান। দেবী কাউকে নিরাশ করেননা বলেই বিশ্বাস।শোনা যায় এক কালে কৃষ্ণানন্দ আগমবাগিশের পরিবার এই কালীর পূজো করতেন।

আবার কালী কথার পরবর্তী পর্ব নিয়ে ফিরে আসবো আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – কল্যাণী কালী

কালী কথা – কল্যাণী কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বর্ধমানের কল্যাণী কালীমন্দিরকে কেন্দ্র করে আছে বহু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ যা মুলত জনশ্রুতি তাই সবার আগে বলে রাখি যে সব অলৌকিক ঘটনা গুলির কথা এখন লিখতে চলছি সেগুলি মূলত স্থানীয় দের কাছে শোনা যার বেশি ভাগই লোক মুখে প্রচলিত কিংবদন্তী।

 

বর্ধমানে আজও কান পাতলেই শোনা যায় এক ঘটনা – কথিত আছে এই মন্দিরে এক চোর চুরি করেছিল। তবে আশ্চর্য জনক ভাবে প্রণামীর অর্থ সে আর নিয়ে যেতে পারেনি। পথেই আচমকা সে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ে। চোর হলেও সে নিজের ভুল বুঝতে পারে এবং অসুস্থ হওয়া সত্ত্বেও কোনো রকমে মন্দিরে ফিরে এসে দেবী কল্যাণীকে তার প্রণামীর অর্থ ফিরিয়ে দেয় এবং ক্ষমা চেয়ে নেয় দেবীর কাছে। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও পর মুহূর্তে সেরে যায় ওই চোরের রোগ । সে নিশ্চিন্তে ফিরে যায় সুস্থ শরীর নিয়ে।

 

বর্ধমানের কল্যাণী কালী মন্দিরের দেবী কালী ভক্তদের কাছে জীবন্ত কালী নামেই বেশি পরিচিত।

কারণ তাঁদের বিশ্বাস দেবী কল্যাণী আজও জীবন্ত। তিনি কালীরূপে এই মন্দিরে বিরাজিতা।

তিনি আছেন মানেই সব আছে। সব নিরাপত্তা আছে। ভয় এলে তা দূরে চলে যেতে বাধ্য।

এবং এই বিশ্বাস বা শ্রদ্ধা একদিনে আসেনি

এসেছে এই সব অলৌকিক ঘটনার মধ্যে দিয়ে। এসেছে দেবীর ভক্তদের প্রত্যক্ষ উপলব্ধি এবং নানাবিধ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে।

 

এমন আরো একটি জনশ্রুতি আছে।

শোনা যায় একবার এক মহিলা কঠিন ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যখন তাঁর মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। সেই সময়ে তিনি দেবীর কাছে নিজের জীবনভিক্ষা করেন দয়াময়ী কল্যাণী কালী সেই আবেদন যেন কান পেতে শুনেছিলেন ।কিছুদিন পরে দেখা

যায় হটাৎ সেরে গিয়েছেন দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত ওই মহিলা। পরবর্তীতে তিনি সুস্থ্য শরীরে বহু দিন জীবিত ছিলেন।

 

দেবী কল্যাণী যেমন দয়াময়ী তেমনই আবার তিনি

ক্রোধ ও করেন। একবার দেবী জীবন্ত কালীর ছবি মোবাইলে বন্দি করেছিলেন কোনো এক ভক্ত সেই সময় তিনি হটাৎ জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে দেবীর মন্দিরে প্রণাম করে তার কাছে ক্ষমা চেয়ে আরোগ্য প্রার্থনা করেন এবং সুস্থ্য হন।

 

আজও অনেক ভক্ত অনুভব করতে পারেন যে দেবী তাঁদের আশপাশেই আছেন। আশপাশেই ঘোরাঘুরি করছেন। এভাবেই এই মন্দিরের দেবী কালী যেন বুঝিয়ে দেন।তিনি জড় বিগ্রহ নন। তিনি জীবন্ত।প্রয়োজন শুধু আস্থা আর তার প্রতি সম্পূর্ণ সমর্পন।তিনি পরম দয়াময়ী এবং শুন্য হাতে কাউকে ফেরান না।তাই প্রতি অমাবস্যায় বিশেষ পুজো উপলক্ষে কল্যাণী কালী মন্দিরে উপচে পরে ভক্তদের ভিড়।এছাড়া প্রতিদিন দর্শণার্থীদের আনাগোনা তো লেগেই আছে।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে। কালী কথা নিয়ে

ধরাবাহিক আলোচনা চলতে

থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – দেবী চৌধুরানীর কালী 

কালী কথা – দেবী চৌধুরানীর কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবী চৌধুরানী বাংলার অন্যতম জনপ্রিয় ঐতিহাসিক চরিত্র যাকে নিয়ে ছড়িয়ে আছে বহু ঘটনা এবং জনশ্রুতি।জলপাইগুড়ি জেলার গোশালা মোড়ের দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দির সেই ঐতিহাসিক চরিত্রের সাক্ষী বহন করে চলেছে আজও।প্রায় আড়াইশো বছর থেকে এই পুজো হয়ে আসছে। রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস। আজ এই মন্দিরের কথা জানাবো কালী কথায়।

 

এক কালে এই শ্মশানকালী মন্দিরে পুজো দিয়ে গিয়েছিলেন দেবী চৌধুরানী ৷ সেই কারণেই পরবর্তীকালে এই মন্দিরের নাম দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দির দেওয়া হয়। আবার অনেকে বলে থাকেন উত্তরবঙ্গে দেবী চৌধুরানীর একাধিক ডেরা ছিল তার মধ্যে এটি অন্যতম। তিস্তা দিয়ে বজরায় করে যাতায়াত এর সময়ে একাধিক বার নাকি দেবী চৌধুরানীর আগমন ঘটে এই স্থানে।

 

সেকালে প্রায় সব ডাকাতদলই দেবী কালীর পূজো করে ডাকাতি করতে যেতো। ভবানী পাঠক বা দেবী চৌধুরানীরাও ব্যতিক্রমী ছিলেন না তাই খুবই স্বাভাবিক যে এই মন্দিরে আসা যাওয়া ছিলো দেবী চৌধুরানীর।

 

আজও এখানে পূজো হয় তন্ত্র মতে এবং একাধিক বিশেষ রীতি নীতি আজও অপরিবর্তিত আছে।

দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দিরে দেবীকে ভোগ দেওয়া হয়, বোয়াল মাছ, শোল মাছ ও মাংস দিয়ে।

 

দেবী চৌধুরানীর শ্মশানকালী মন্দিরের আরো বিশেষত্ব হচ্ছে এখানে হিন্দু মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ মিলে মিশে পুজোর সব দায়িত্ব ভার গ্রহন করেন।সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে গোশালা মোড়ের এই দেবী চৌধুরানী শ্মশানকালী মন্দির সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য পীঠস্থান হয়ে উঠেছে ৷

 

আবার ফিরে আসবো কালী কথার পরবর্তী পর্বে অন্য এক মন্দিরের ইতিহাস নিয়ে। থাকবে আরো অনেক তথ্য এবং জনশ্রুতি।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – খুকীমা কালী

কালী কথা – খুকীমা কালী

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলায় দেবী কালী শুধু শাস্ত্র সম্মত মহাকালী বা
ভদ্র কালী রূপে পূজিতা হন তা নয়। তিনি বাংলার ঘরের মেয়ে। আমাদের ঘরের মেয়েকে আমরা যেমন নানা রকম আদরের নাম্বার দিয়ে থাকি তেমনই দেবী কালীও নানা নামে নানা রূপে আমাদের কাছে ধরা দেন। কোথাও তিনি
বড়মা আবার কোথাও তিনি কৌটা কালী। কোথাও আবার পুটে কালী । এমনই
এক কালী মন্দির আছে বজ বজে যেখানে দেবীকে খুকীমা নামে ডাকা হয়। আজকের পর্বে খুকীমা কালীর কথা লিখবো।

অদ্ভুত এই কালী মূর্তির ইতিহাস। শোনা যায় দয়াল ঠাকুর নামে এক মাতৃ সাধক এক সময়ে এই স্থানে সাধনা করতেন। পাশেই ছিলো শ্মশান এবং আদি গঙ্গা। এক রাতে এক ডাকাত দল এখানে আসে।
সাধক কে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের সর্দারের কাছে।ডাকাত সর্দারের গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে। পানীয় জল ও চিকিৎসারে জন্যই তাই কুটির দেখে দাঁড়িয়ে পড়া শুনশান প্রান্তরে।
সেই ফাঁকে হয়ে যাবে ভাগ-বাটোয়ারাও। জানা গেল, সুদূর বর্ধমান থেকে লুঠ করে আসছেন তাঁরা।

দয়াল ঠাকুর লুট করা সামগ্রীরে মধ্যে পাথরের তৈরি এক কালী মূর্তি দেখলেন এই মূর্তি যে চুরি করা আনা হয়েছে কোনো রাজবাড়ি থেকে তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল তাঁর কাছে। তার কারণ বিগ্রহের গঠন। অখণ্ড কষ্ঠীপাথরের তৈরি এই মূর্তি বড়ো কোনো পাথর থেকে কেটে বানানো। এমনকি দেবীর গলার নরমুণ্ডের মালাও খোদাই করে তৈরি। এ যে কোনো সাধারণ শিল্পীর হাতের কাজ হতে পারে না তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি তাঁর। তিনি অবহেলায় পড়ে থাকা সেই মূর্তির পুজোর ও ভোগের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ পালন করতেই সেরে ওঠেন ডাকাত সর্দার।
তারা বিদায় নেয় এবং কালী মূর্তি ওই স্থানেই স্থাপিত হয় এবং খুকিমা নামে আজও তিনি সেখানে স্বমহিমায় বিরাজিতা।

সেই থেকেও খুকী কালী এই স্থানে বিরাজিতা এবং নিত্য পূজিতা হয়েছ আসছেন। স্থানীয়দের কাছে তিনি খুবই জাগ্রতা এবং দয়াময়ী।

এমন কতো অজানা দৈব ঘটনা কতো অদ্ভুত অলৌকিক লীলা ঘটেছে এই বাংলায়। আগামী পর্ব গুলিতে আরো অনেক এমন ইতিহাস এবং জনশ্রুতি নিয়ে ফিরে আসবো।কালী কথায়
পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – মনোহর ডাকাতের কালী 

কালী কথা – মনোহর ডাকাতের কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার কালী ক্ষেত্র গুলি নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বার বার ঘুরে ফিরে আসে ডাকাত কালীর প্রসঙ্গ কারন আজকের গৃহস্ত বাড়িতে পূজিতা মা কালী এক কালে মূলত তান্ত্রিক ও ডাকাতদের আরাধ্যা দেবী ছিলেন।শুধু জেলা নয় কলকাতা সংলগ্ন এলাকাতেও দাপিয়ে বেড়াতো ডাকাতেরা। অবশ্য কলকাতা তখনও পুরোপুরি শহর হয়নি।

 

এমনই এক দুর্ধর্ষ ডাকাত ছিলো কলকাতার মনোহর ডাকাত। তার নামেই আজকের মনোহর পুকুর। তার পূজিতা কালী আজ ছানা কালী বা ছোটো কালী নামে খ্যাত।বেজায় কালী ভক্ত মনোহর ডাকাত সেই সময় জঙ্গলের মধ্যে একটি ছোট কালী মূর্তি প্রতিষ্টা করেছিলেন। কষ্টি পাথরের কালী মূর্তিটি খুবই ছোট। তাই অনেকে এই কালীকে ছানা কালী বা ছোট কালী বলে উল্লেখ করেন।

 

সেকালে ডাকাত কালী বাড়ি নামেই এটি সুপ্রসিদ্ধ। ছিলো তখন কোন অলংকার ছিল না দেবীর গায়ে। দেবী ছিলেন মুন্ডমালা বিভূষিতা তার হাতে ঝুলতো

নর করোটি।আদিগঙ্গা দিয়ে নৌকো করে বা জঙ্গলের মধ্য দিয়ে সদলবলে এসে দর্শণার্থীরা মাকে দর্শন করতো তবে সন্ধ্যের পর কেউ সাধারণত আসতোনা এদিকে ।

 

শোনা যায় ডাকাত মনোহর ছিল অকৃতদার।একবার ডাকাতি করে ফেরার সময় মনোহর দেখে যে জঙ্গলে এক মহিলা বাঘের হানায় মৃত হয়ে পড়ে আছেন। পাশেই জীবিত শিশু। মনোহর তখন সন্তান স্নেহে এই শিশুটিকে মানুষ করে এবং

ধীরে ধীরে নিজেও বদলাতে শুরু করে।। পরবর্তীতে শেষ জীবনে ডাকাতি ছেড়ে কৃষি কাজে মন দেয় পাশাপাশি চলে মাতৃ আরাধনা।

 

জনশ্রুতি আছে বৃদ্ধ বয়সে সে বহু মোহর আর সোনা রুপো দিয়ে যায় জন কল্যাণ মূলক কাজের জন্য। সেই অর্থে কাটানো হয় একাধিক পুকুর।তার মধ্যেই একটি পুকুর মনোহর পুকুর নামে বিখ্যাত এবং সেই পুকুর সংলগ্ন রাস্তাও আজ মনোহরের নামে পরিচিত।

 

আবার ফিরে আসবো এমনই কোনো ঐতিহাসিক কালী মন্দির বা কালী পুজোর কথা নিয়ে কালী কথায়।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – হ্যাপা কালী

কালী কথা – হ্যাপা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

কালী কথায় বেশ কয়েকটি কালী মন্দিরের ইতিহাস ইতিমধ্যে আপনাদের জানিয়েছি।

আজ হুগলির হ্যাপা কালী নিয়ে লিখবো।

 

পান্ডুয়ার বেলুন ধামাসিন গ্রাম পঞ্চায়েতের বেলুন গ্রামে হয় এই হ্যাপা কালীর পুজো।কেনো নাম হ্যাপা কালী হলো সে নিয়েও এক জনশ্রুতি প্রচলিত আছে।শোনা যায় মা কালী প্রতিষ্ঠা করতে অনেক হ্যাপা বা ঝঞ্ঝাট পোহাতে হয়েছিল। বহু বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় দেবীর মন্দির তাই নাম হয়েছে হ্যাপা কালী।

 

কথিত আছে, এলাকার বাগদিপাড়ার কয়েকজন ডাকাত এই পুজোর সূচনা করেন। মা কালীর পুজো দিয়ে তাঁরা ডাকাতি করতে যেতেন ডাকাতরা। পরবর্তী কালে এলাকার সাধারণ মানুষ পুজোর দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নেন।

 

এখানে তন্ত্র মতে দেবীর পুজো হয়। ছাগ বলি হয় পুজোর রাতে।প্রাচীন এই পুজোয় ব্যবহৃত গঙ্গাজল থেকে আলতা সিঁদুর, সবই নীলাম হয় পুজোর পরের দিন। নিলামে ওঠা প্রসাদ নিতে ভিড় জমান পার্শ্ববর্তী দশ বারোটি গ্রামের মানুষ। নিলাম থেকে আয় হওয়া অর্থ কাজে লাগানো হয় পুজোতে।

 

এই ভাবেই নিলামের অর্থে পাতার ছাউনি থেকে গড়ে উঠছে সুন্দর পাথরের মন্দির। তাছাড়া নিলামে কেনা পূজা সামগ্রী বাড়িতে রাখা শুভ বলে বিশ্বাস করেন স্থানীয়রা।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী কালী কথা নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে আরেকটি প্রাচীন মন্দিরের ইতিহাস। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

ফলহারিণী অমাবস্যা এবং তন্ত্র শাস্ত্র

ফলহারিণী অমাবস্যা এবং তন্ত্র শাস্ত্র

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

মানব জীবনে জন্মছক বিশ্লেষণ করলে অথবা হস্তরেখা বিচার করলে দেখা যায় অনেকেরই কিছু না কিছু গ্রহ গত সমস্যা আছে।সমস্যা থাকলে সমাধানও রয়েছে, তবে এই গ্রহ দোষ খণ্ডনের ক্ষেত্রে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ তন্ত্র মতে শাস্ত্রীয় পদ্ধতিতে পূজো পাঠের মাধ্যমে গ্রহের প্রতিকার।

 

তন্ত্র প্রাচীন ভারতীয় সনাতনী ঐতিহ্যর আশীর্বাদ। এই তন্ত্র মূলত মানব কল্যাণের জন্যই সৃষ্টি হয়ে ছিলো। সঠিক তিথিতে সঠিক স্থানে সঠিক মন্ত্র উচ্চারনের মাধ্যমে গ্রহের অধীস্টাত্রী দেবীকে সন্তুষ্ট করে গ্রহের অশুভ প্রভাব নাশ করা হয়।

 

তন্ত্র মতে বা শাস্ত্র সম্মত ভাবে গ্রহ দোষ খণ্ডনের ক্ষেত্রে যে বিশেষ অমাবস্যা তিথি গুলি রয়েছে তার মধ্যে ফল হারিনী অমাবস্যা অন্যতম কারন এই অমাবস্যার অর্থাৎই হলো জন্ম জন্মান্তরের পাপের ফল থেকে মুক্তি লাভ|শাস্ত্র মতে এই সময়ে করা যেকোনো তন্ত্র ক্রিয়া বা গ্রহ দোষ খণ্ডনের উপাচারের ফলে দেবী কালীর কৃপা সহজেই লাভ করা যায় এবং তিনি সমস্ত গ্রুহ গত কুপ্রভাব ও তার খারাপ ফল হরণ করে নেন, তাই এই অমাবস্যা ফলহারিনী নামে পরিচিত।

 

মনে করা হয় ফল হারিণী অমাবস্যার চন্দ্রহীন রাত তন্ত্র শক্তির জাগরণের শ্রেষ্ঠ সময়। এই থিতিকে দশ মহা বিদ্যার পূজা বিশেষ ফল দায়ী। জ্যোতিষ শাস্ত্রে এই দশ মহা বিদ্যার সাথে গ্রহদের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে।

 

একটা সময় ছিলো যখন এই বিশেষ অমাবস্যায় কামাখ্যা, তারাপীঠ সহ একাধিক স্থানে তান্ত্রিক বা জ্যোতিষীরা উপস্থিত হয়ে বিশেষ পুজো,হোম যজ্ঞর মাধ্যমে বহু মানুষের গ্রহগত দোষ খণ্ডন করতেন। তান্ত্রিক সাধনা করতেন।বহু সিদ্ধ যোগী এই ফলহারিণী অমাবস্যায় সিদ্ধি লাভও করেছেন বলে শোনা যায়।

 

ফল হারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে সংক্ষেপে আজ তন্ত্র , জ্যোতিষ এবং ফলহারিণী অমাবস্যার সম্পর্ক আপনাদের সামনে তুলে ধরলাম। আগামী দিনেও চলতে থাকবে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক এবং শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – বাহান্ন হাত কালী

কালী কথা – বাহান্ন হাত কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজকের কালীকথায় নদীয়ার বাহান্ন হাত কালীর কথা লিখবো নদীয়ার শান্তিপুরের নৃসিংহপুরে হয় এই বাহান্ন হাত কালীর পুজো।

 

কথিত আছে, যে ঘাট দিয়ে নিমাই গঙ্গা পার হয়েছিলেন, সেই নৃসিংহপুর কালনাঘাটেই অবস্থিত এই কালী মন্দির।

 

নৃসিংহপুরের দশ জন ব্যবসায়ী প্রথম স্বপ্নে আদেশ পেয়ে পৌষকালীর পুজো শুরু করেছিলেন। সব্বাই আলাদা আলাদা ব্যবসায় যুক্ত ছিলেন। স্বপ্নাদেশ পাওয়ায় তাঁরা মকর সংক্রান্তির পুণ্য তিথিতে ফেরিঘাটের পাশেই পূজো শুরু করেন।

 

একবার ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের জেরে পুজো চলাকালীন মায়ের মূর্তি ভেঙে পড়েছিল। তারপর একটি তালগাছের নীচে মায়ের পুজো শুরু হয়। তখন পুজো উদ্যোগক্তারা ঠিক করেন, তাল গাছটির উচ্চতার সমান হবে মায়ের মূর্তির উচ্চতা। মেপে দেখা যায় তালগাছের উচ্চতা প্রায় ৫২ হাত। তারপর থেকে বাহান্ন হাত মূর্তি তৈরি করে পুজো হয়ে আসছে।যদিও আগে একটি ক্ষুদ্র মূর্তির পুজোই হতো।

 

প্রতি বছর মকর সংক্রান্তির পূর্ণ্য লগ্নে শুরু হয় মাতৃ আরাধনা, টানা দশ দিন চলে পুজো।দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসেন নানান প্রার্থনা নিয়ে। স্থানীয়দের বিশ্বাস, মা কাউকেই খালি হাতে

ফেরান না।

 

প্রতিমা নিরঞ্জনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিশেষ কিছু নিয়ম। মন্দিরের মধ্যেই মূর্তিতে জল দিয়ে মিশিয়ে ফেলা হয় অন্য কোথাও নিয়ে গিয়ে বিসর্জন হয়না।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী কালী কথা নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধম্যবাদ।

কালী কথা – বামা কালী

কালী কথা – বামা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আসন্ন ফল হারিণী অমাবস্যার প্রাক্কালে আজ আপনাদের বীরভূমের বামা কালীর পুজোর কথা বলবো। এই কালী পূজো আলাদা ঐতিহ্য বহন করে। এখানকার কালী পুজোর এক সমৃদ্ধ ইতিহাস আছে অনেক জনশ্রুতি। সেসব নিয়েই আজকের কালী কথা।

 

এই গ্রামে বাস করতেন এক মাতৃ সাধক, নাম

রাম কানাই।কথিত আছে গভীর জঙ্গলে সাধনা করতে গিয়ে মা কালীর সাক্ষাৎ পান সাধক রামকানাই। মায়ের সাক্ষাৎ সেই রূপ তিনি একটি থালায় এঁকে নেন। জীবন্ত মায়ের সেই রূপের ছবি দেখে বানানো হয় মায়ের মৃন্ময়ী মূর্তি যা পরবর্তীতে মূর্তি বানিয়ে মন্দিরে স্থাপন করে শুরু হয় পুজো।

 

এই মন্দিরের প্রধান দুটি আকর্ষণ হলো সাধক রাম কানাইয়ের লেখা দুর্বধ্য ভাষায় লেখা একটি প্রাচীন পুঁথি যে পুঁথিতে আছে অনেক প্রাচীন উপাচার এবং পূজা পদ্ধতি এবং সেই থালা যে থালায় মায়ের জীবন্ত রূপ দেখে ছবি এঁকেছিলেন।

 

বাংলায় সাধারণ দেবী কালীর দুই রূপ বেশি

পুজো করা হয়। দক্ষিনা কালী এবং বামা কালী।

রামকানাই দ্বারা স্থাপিত কালী বামা কালী।

দীপান্বিতা অমাবস্যা বা দীপাবলী এই মন্দিরের প্রধান উৎসব। ইন্দ্রগাছার এই বামাকালী প্রায় পাঁচশো বছর ধরে পুজিত হয়ে চলেছে। প্রায় তেরো ফুটের এই বামকালীর গায়ের রং ও চক্ষুদান করা হয় পুজোর দিনেই প্রাচীন প্রথা মেনে। গায়ের রং করা হয় কাঠে আগুন জ্বালিয়ে তৈরি ভুসোকালি থেকে। আজও এই ক্ষেত্রে কৃত্তিম উপায়ে তৈরী রঙ ব্যাবহার হয়না।

 

প্রতি বছর কালী পুজোর দিন মধ্যরাতে মূর্তিকে চল্লিশ ফুট বড় লাল কাঠের ওপর চাপিয়ে কাঁধে করে নিয়ে আসা হয় মূল মন্দিরে। পুজোর পর ভাইফোঁটার দিন বিসর্জন হয়।বিগত প্রায় পাঁচশো বছরে এই পুজোর রীতি নীতি পরিবর্তন হয়নি।

 

আজও এই পুজো দেখতে ভিড় করেন অসংখ্য মানুষ।বামা কালীর প্রতি তাদের অগাধ বিশ্বাস এবং শ্রদ্ধা রয়েছে।বামা কালী তাদের সব মনোস্কামনা পূরণ করে বলেই বিশ্বাস।

 

আগামী দিনে আবার ফিরে আসবো কালী কথা নিয়ে। ফল হারিণী অমাবস্যা উপলক্ষে চলতে

থাকবে কালী কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।