Home Blog Page 6

শক্তি পীঠ – অবন্তিকা

শক্তি পীঠ – অবন্তিকা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজকের শক্তিপীঠ পর্ব মধ্যপ্রদেশের উজ্জ্বয়ীনীতে অবস্থিত অবন্তীকা শক্তি পীঠ নিয়ে।

দেবী ভগবৎ পুরান মতে এই শক্তিপীঠে সতীর উপরের ঠোঁট পড়ে যদিও শ্রী অঙ্গ খুঁজে পাওয়া যায়নি আবার অনেকে বলেন দেবীর শ্রী অঙ্গ থেকেই ভৈরব পর্বতের জন্ম হয়েছে।এখানে

দেবী হলেন অবন্তি এবং ভৈরব হলেন লম্বকর্ণ।

ভরতচন্দ্র তার অন্নদা মঙ্গলে লিখেছেন –

” লম্বকর্ণ ভৈরব অবন্তী দেবী তায় “

এই অবন্তী শক্তি পীঠ শিপ্রা নদীর তীরে ভৈরব পাহাড়ে অবস্থিত।এই ভৈরব পর্বত প্রায় পৌরাণিক সময়ের।

এক কালে এই তীর্থ হরসিদ্ধি নামেও পরিচিত ছিলো।বন, শ্মশান, নদী সবই ঘিরে আছে এই শক্তি পীঠকে তাই অনেকে শাস্ত্রজ্ঞ মনে করেন এটি একটি আদর্শ তীর্থ ক্ষেত্র।

পুরান অনুসারে ত্রিপুরাসুরকে বধ করার আগে মহাদেব দেবী অবন্তীর পুজো করেছিলেন এবং দেবী তাকে খুশি হয়ে পশুপত অস্ত্র দিয়ে ছিলেন সেই অস্ত্র দিয়েই মহাদেব অত্যাচারী ত্রিপুরাসুরকে বধ করে দেবতা এবং সৃষ্টি রক্ষা করেছিলেন।

ভৈরব পর্বতে রয়েছে রঙিন পাথর দিয়ে তৈরী এক প্রাচীন মন্দির যার নির্মাণের সঠিক সাল তারিখ পাওয়া যায়না।মন্দিরের ছাদে এবং দেওয়ালে খুব সুন্দর পাথরের কাজ করা আছে

যা দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়।

দেবী দশভুজা এবং সিংহ বাহিনী রূপে পূজিতা হন দেবী অবন্তী দেবী দশভূজার দশটি হাতে দশ রকমের অস্ত্রশস্ত্র থাকে।দেবীর মাথায় রয়েছে মুকুট এবং গায়ে রয়েছে অনেক অনেক অলংকার বিশেষ তিথিতে ফুলের মালা এবং লাল রঙের শাড়িতে দেবীকে সাজানো হয়।

প্রত্যেক বারো বছর অন্তর শিপ্রা নদীর তীরে এই স্থানে কুম্ভ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।সেই উপলক্ষ্যে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থী আসেন।

আজকের শক্তি পীঠ নিয়ে আলোচনা এখানেই শেষ করছি ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য একটি শক্তিপীঠ নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – যোগ্যদা

শক্তি পীঠ – যোগ্যদা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ জানাবো এই বাংলারই পূর্ব বর্ধমানে অবস্থিত অত্যান্ত জাগ্রত শক্তি পীঠ দেবী যোগ্যদার কথা|জানবো তাকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হওয়া বেশ কিছু কিংবদন্তী ও রহস্যময় কাহিনী|জানবো দেবী যোগ্যদার আধ্যাত্মিক ও ধার্মিক তাৎপর্য|

 

এলাকায় অন্যান্য লৌকিক দেবদেবীর মন্দির ও পূজার প্রচলন থাকলেও দেবী যোগ্যদাকে এখানে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়া হয়|সংরক্ষিত একটি প্রাচীন ধার্মীক পুঁথি থেকে দেবী যোগ্যতা সম্পর্কে বলা হয়েছে

 

“বাম স্কন্ধে লক্ষণ নিল,

দক্ষিণ স্কন্ধে রাম,

মাথায় প্রতিমা করে চলে হনুমান ।

শ্রীরাম বলি হুংকার ছাড়িলো হনুমান ।ক্ষীরগ্রাম মধ্যে হনু দিলা দরশন।”

 

বাংলার শক্তি পীঠ গুলির মধ্যে এই পীঠটি অন্যতম|পীঠ নির্নয় তন্ত্র মতে দেবী সতীর ডান পায়ের একটি আঙ্গুল পতিত হয়েছিলো এই স্থানে|একটি প্রচলিত কিংবদন্তী অনুসারে এই দেবীকে প্রতিষ্ঠিত করে ছিলেন স্বয়ং বীর হনুমান, এবং তিনি স্বয়ং পুরাকালে দেবীকে দর্শন করতে ও তার পূজা করতে আসতেন|এই দেবী যোগ্যদা বর্তমানে ক্ষীর গ্রামের অধিষ্টাত্রী কুলদেবী।

 

শোনা যায় এক কালে পার্শবর্তী অঞ্চলে বলি প্রথা প্রচলন থাকলেও বৈষ্ণব প্রভাবের ফলে যোগ্যদা দেবীর কাছে পশু বলি হয়না|অবশ্য এ নিয়ে একটি রোমাঞ্চকর অলৌকিক কাহিনীও প্রচলিত আছে এই এলাকায়|প্রাচীন কালে স্থানীয় রাজা দেবীকে প্রতিষ্ঠা করে প্রতিশ্রুতি দিলেন যে তিনি দেবী প্রতিদিন বলি দেবেন, কথামতো রাজা রাজ্যে পালার ব্যবস্থা করলেন, বলি শুরু হলো, প্রতিদিন একটি করে বলি|এইভাবে একটি ব্রাহ্মণের ঘরে এল পালা|প্রান ভয়ে আগের দিন ব্রাহ্মণ গ্রাম ছেড়ে পালানোর চেষ্টা করলেন এবং এক অলৌকিক ঘটনা ঘটলো, ব্রাহ্মণ কে বাধা দিলেন ব্রাহ্মনী বেশি দেবী । ব্রাহ্মণ কে অভয় দিয়ে দেবী বললেন, ” আমি সেই যোগ্যদা ।আর আমি মানুষের রক্ত খাই না ।খাবোনা। রাজা নিজের মত চাপিয়ে দিয়েছে তোমাদের ওপর। তুমি ঘরে ফিরে যাও” এরপর দেবী যোগ্যতা তখন দশভুজা মূর্তি ধারণ করে ব্রাহ্মণ কে দেখা দিলেন|সেই থেকে ক্ষীর গ্রামের দেবী যোগ্যতার উদ্দেশ্য বলি বন্ধ হয়|

 

গোটা অঞ্চলে একাধিক স্থানে দেবী যোগ্যতার পূজা হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে|মূলত তন্ত্র মতেই দেবীর পূজা হয়|দেবী দুর্গার একটি রুপ দেবী যোগ্যদা।আবার ভদ্রকালী হিসেবেও তার পূজা হয় একটি অতি প্রাচীন পাথর খন্ডের উপর চিত্রিত দেবীকে মূলত পূজা করা হয় বিশেষ বিশেষ তিথীতে|দেবীর একটি প্রতিরূপকে প্রয়োজনে জনসমক্ষে আনা হয়|ক্ষীর গ্রামের দেবী যোগ্যতা কে নিয়ে আরো একটি রহস্যময় প্রথা প্রচলিত আছে,দেবীর মুল বিগ্রহ টি একটি পুকুরে ডুবিয়ে রাখা হয় ও পূজার সময় জল থেকে তুলে এনে তা পূজা করা হয় এবং পূজা হয় মধ্যরাতে|অত্যান্ত গোপনীয়তার সাথে এই পক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়|

 

বাংলা এবং দেশ বিদেশে নানা স্থানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা শক্তিপীঠ গুলির তাৎপর্য ব্যাখ্যা, অজানা কথা এবং রোমাঞ্চকর বহু ঘটনা নিয়ে চলতে থাকবে এই ধারাবাহিক লেখা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – বর্গভীমা

শক্তি পীঠ – বর্গভীমা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরাণে কথিত একান্ন সতীপীঠের একপীঠ তমলুকের দেবী বর্গভীমা।আজকের পর্বে এই

শক্তিপীঠ নিয়ে আলোচনা করবো।

 

কথিত আছে বিষ্ণুর সুদর্শন চক্রের খন্ডিত দেবী সতীর বাম পায়ের গোড়ালি এখানে পড়েছিল। পুরান মতে দেবী বর্গভীমার এই মন্দির নির্মাণ করেছিলেন স্বয়ং দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা।

 

দেবী বর্গভীমা মায়ের মন্দির নির্মাণের সাথে একটি অলৌকিক ঘটনা জড়িত আছে এবং এই ঘটনাটি চন্ডীমঙ্গল কাব্যের নায়ক ধনপতি সওদাগরকে নিয়ে। ধনপতি সওদাগর তাম্রলিপ্ত বন্দর হয়ে বাণিজ্যতরী নিয়ে সিংহল বা আজকের শ্রী লঙ্কায় যাত্রাকালে দেখতে পান এক জন সোনার কলসি নিয়ে যাচ্ছে। ধনপতি সওদাগর কৌতূহলবশত ওই লোককে জিজ্ঞেস করেন এই সোনার কলসি কোথায় পেয়েছে, উত্তরে তিনি বলেন জঙ্গলের মধ্যে একটি পবিত্র কুণ্ড আছে যেখানে পেতলের পাত্র ডোবালে সোনার পাত্র হয়ে যায়। এরপর ধনপতি সওদাগর সেই কুন্ড খুঁজে বের করেন এবং অনেক পেতলের পাত্র পবিত্র কুন্ডের জলে ডুবিয়ে সোনায় রূপান্তরিত করে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। বাণিজ্যে প্রভূত লাভ হয়। ফিরে আসার সময় তাম্রলিপ্ত বন্দরে নোঙ্গর করে ঐ পবিত্র কুণ্ড ঘিরে দেবী মায়ের মূর্তি ও মন্দির নির্মাণ করেন।সেই মন্দিরই আজকের বর্গভীমা মন্দির।

 

আরো একটি কিংবদন্তী অনুসারে তাম্রলিপ্ত নগরীর রাজা তাম্রধ্বজ দেবীবরণ মায়ের মন্দির নির্মাণ করে। রাজা তাম্রধ্বজের নিয়োজিত এক জেলেপরিবার প্রত্যহ রাজপরিবারে মাছ সরবরাহ করত। রাজ পরিবারে প্রতিদিন জ্যান্ত মাছ নিয়ে যাওয়ার আদেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ঐ জেলে বউয়ের প্রতিদিন জ্যান্ত মাছ রাজ পরিবারের জন্য জোগাড় করা সম্ভব হয়ে ওঠেনি। এরকম একদিনে ওই জেলে বউ মরা মাছ নিয়ে জঙ্গলের সম্পুর্ন পথ দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে রাজপরিবারের উদ্দেশ্যে যাওয়ার সময় রাস্তায় অপরিচিতা নারীর দেখা পান। ঐ জেলে বউ তার সমস্যার কথা সবিস্তারে সেই নারীকে বলেন। তখন সেই অপরিচিতা নারী জেলে বউকে বলেন তার মরা মাছ জীবিত করা সম্ভব। জঙ্গলের মধ্যে এক কুন্ড আছে সেই কুন্ডের জল মাছের উপর ছড়ালেই মরা মাছ জ্যান্ত হয়ে যাবে। এই কথা বলার পর ওই অপরিচিতা নারীর দেখা আর পাননি ঐ জেলে বউ। অপরিচিতা নারীর বর্ণিত পবিত্র কুন্ডু খুঁজে পান জেলে বউ এবং কোন সেই কুণ্ডের জল মরা মাছের ওপর ছড়াতেই মাছ জ্যান্ত হয়ে যায়। এরপর জেলে বউ প্রতিদিনই কুন্ডে জল ছিটিয়ে মরা মাছ জ্যান্ত করে রাজপরিবারের জন্য নিয়ে যায়। প্রতিদিন জ্যান্ত মাছ সরবারহ দেখে তাম্রলিপ্ত রাজার সন্দেহ। জেলে বউকে জিজ্ঞেস করতেই সে সব সত্যি কথা বলে দেয়। রাজা তাম্রধ্বজ সপারিষদ সেই কুণ্ড দেখতে এলে দেখতে পান একটি বেদী ও বেদীর উপর অধিষ্ঠিত দেবী মূর্তি। রাজা তাম্রধ্বজ জঙ্গল পরিষ্কার করে ওই জায়গায় মন্দির নির্মাণ করেন। অনেকের মতে এটি দেবী বর্গভীমা মন্দির রূপে বর্তমানে পুজিত হয়।

 

বর্তমানে মন্দিরের গর্ভগৃহে কালো পাথরে তৈরি বর্গভীমা মায়ের মূর্তি বিরাজ করছে দেবী উগ্রতারা রূপে।পুরান মতে দেবী ধর্ম-অর্থ-কাম এবং মোক্ষ এই চারটি বর্গ দান করেন বলেই

এখানে মায়ের নাম দেবী বর্গভীমা।

 

চলবে শক্তি পীঠ নিয়ে ধারাবাহিক লেখা

ফিরে আসবো আগামী পর্বে অন্য কোনো

শক্তি পীঠ নিয়ে। পড়তে থাকুন|

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – সুগন্ধা

শক্তি পীঠ – সুগন্ধা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শক্তি পীঠ পর্বে আজ যে বিশেষ পীঠটির কথা লিখবো তা বর্তমানে আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের বরিশালের শিকারপুর গ্রামে অবস্থিত এই বিশেষ শক্তি পীঠর নাম সুগন্ধা।

 

পুরান মতে দেবীর নাসিকা পতিত হয়েছিলো এই স্থানে|দেবীর ভৈরব এখানে ত্র্যম্বক|মন্দিরের স্থান টি অতি সুন্দর, পাশ দিয়ে বয়ে গেছে সুগন্ধা নদী।

এককালে স্থান টি ছিলো অতি দুর্গম, দুর দুর থেকে তন্ত্র সাধকরা আসতেন এখানে তন্ত্র সাধনা করতে|

 

অন্নদা মঙ্গল কাব্যে সুগন্ধা নামক শক্তি পীঠের উল্লেখ আছে, সেখানে বলা হচ্ছে –

 

সুগন্ধায় নাসিকা পড়িল চক্রহতা|

ত্র্যম্বক ভৈরব তাহে সুনন্দা দেবতা|

 

এছাড়া শিব চরিত এবং পীঠ নির্নয় তন্ত্রেও শক্তি পীঠ সুগন্ধার উল্লেখ আছে।

 

বহু কাল পূর্বে শিকার পুরের জমিদার শ্রীরাম রায় স্বপ্নাদেশ পেয়ে গভীর জংগলের মধ্যে খুঁজে পান ত্রম্বকেশ্বর মহাদেবের মূর্তি এবং ওই স্থানেই নির্মাণ করান শিব মন্দির।সেই সময়ে ত্রম্বকেশ্বর শিব ছিলেন এখানে আরাধ্য দেবতা।

পরবর্তীতে আরো একটি অলৌকিক ঘটনা ঘটে।শিকারপুর গ্রামে পঞ্চানন চক্রবর্তী নামে একজন নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বাস করতেন|দেবী কালী এই ব্রাহ্মণ কে স্বপ্নাদেশ দিয়ে সুগন্ধা নামক এই বিশেষ শক্তি পীঠের সন্ধান দেন|পরবর্তীতে এই ঘটনা লোক মুখে প্রচারিত হয় এবং দেবীর মন্দির স্থাপিত হয়|

 

অত্যন্ত দুক্ষের বিষয় প্রাচীন সুগন্ধার মন্দির টি বহুদিন আগেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে, এমনকি প্রাচীন দেবী মূর্তি ও আর নেই|বর্তমান মন্দির ও মূর্তি দুটোই আধুনিক সময়ে নতুন করে নির্মিত|দেবীর প্রস্তুরীভূত দেহাংশ ও এখানে সংরক্ষিত নেই যা অন্য অনেক শক্তি পীঠে আছে|

 

বর্তমানে এখানে দেবী উগ্রতারার মূর্তি বিরাজিতা। তাকেই দেবী সুগন্ধা রূপে পূজা করা হয় । মাথার ওপর কার্ত্তিক, ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব , গণেশ বিরাজমান |দেবী খড়্গ, খেটক, নীলপদ্ম, নর মুণ্ডের কঙ্কাল ধারন করে আছেন |

 

সুগন্ধা মন্দিরে নিষ্ঠা সহকারে ও মহা সমারোহে পালিত হয় শিব চতুর্দশী|সেই উপলক্ষে ব্যাপক জন সমাগম হয়।

 

আজ এখানেই শেষ করছি শক্তি পীঠ সুগন্ধা

নিয়ে আলোচনা।যথা সময়ে পরের পর্বে

অন্য একটি শক্তি পীঠ নিয়ে

ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – নলাটেশ্বরী

শক্তি পীঠ – নলাটেশ্বরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার শক্তি পীঠ গুলির অধিকাংশই অবস্থিত বীরভূমে।আজকের একান্ন পীঠ পর্বে লিখবো

বাংলার শক্তি পীঠেগুলির অন্যতম একটি পীঠ নিয়ে যা বীরভূমের নলহাটিতে অবস্থিত এবং নলাটেশ্বরী নামে প্রসিদ্ধ।

 

অনেকে বলেন, ২৫২ বঙ্গাব্দে ব্রহ্মচারী কামদেব স্বপ্নাদেশে কাশী থেকে এসে এই পীঠস্থানটি আবিষ্কার করেন। আবার জনশ্রুতি আছে যে আজ থেকে প্রায় পাঁচশো বছর আগে স্মরনাথ শর্মা নামে এক সাধক, স্বপ্নে দেবী নলাটেশ্বরীর দেখা পেয়ে জানতে পারেন, এখানেই সতীর খণ্ডিত দেহাংশ শিলারূপে অবস্থান করছে। তারপর সাধক স্মরনাথই এই জায়গা আবিষ্কার করে দেবীর নিত্যপুজার ব্যবস্থা করেন। তারপর ধীরে ধীরে প্রচারিত হয় দেবী নলাটেশ্বরীর মহাত্ম।

 

শাস্ত্র মতে এখানে সতীর গলার নলি পড়েছিল। নলাটেশ্বরী থেকেই এলাকার নাম নলহাটি।

 

নলহাটিতে আছে ছোট্ট জঙ্গলাবৃত এক প্রাচীন টিলা। তারই এক প্রান্তে দেবী নলাটেশ্বরীর অধিষ্ঠান।এককালে বহু সাধকের সাধনার সাক্ষী জঙ্গল ঘেরা এই পাহাড়। এক সময়ে এখানে সাধারণ মানুষের তেমন আনাগোনা ছিল না। কেবলমাত্র যাতায়াত ছিল দুর্ধর্ষ দস্যু এবং বীরাচারী তান্ত্রিকদের।

 

ইতিহাস বলছে কোনো এক সময়ে নাটোরের রানি ভবানী বর্তমান মন্দির তৈরি করান।বর্তমানে এখানে গণেশও পাহাড়ে গায়ে শিলারূপে অধিষ্ঠিত।রয়েছে সিদ্ধিদাতা গণেশের প্রাচীন একটি মন্দির।কথিত আছে, ভৈরব মন্দির স্থাপনের সময়, মাটির নীচ থেকে উঠে এসেছিল শ্রীবিষ্ণুর পদচিহ্ন আঁকা শিলাখণ্ড! আজও দেবী ও ভৈরবের আগে প্রতিদিন এই শিলাখণ্ডের পুজো হয়।

 

বিশেষ বিশেষ অমাবস্যা তিথিতে খুব সূর্য ওঠার আগে দেবীর মঙ্গলারতি হয়।

তারপর শুরু হয় নিত্যপুজো।গভীর রাতে একশো আটটি টি প্রদীপ জ্বালিয়ে মায়ের বিশেষ আরতি হয়।যুগ যুগ ধরে এই প্রথা চলে আসছে।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। শক্তি পীঠের পরবর্তী পর্ব নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – ভ্রামরী

শক্তি পীঠ – ভ্রামরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

জলপাইগুড়ির জল্পেশ ধামেই রয়েছে একটি জাগ্রত সতী পীঠ ভ্রামরী।স্বয়ং জল্পেশ্বর মহাদেব এই শক্তি পীঠের ভৈরব। একান্ন পীঠের অন্যতম এই শক্তিপীঠে নিয়ে আজকের পর্বে।

 

ভ্রামরী সতীপীঠ উত্তর বঙ্গের ত্রিস্রোতা বা তিস্তা নদীর ধারে অবস্থিত চার পাশে বৈকুণ্ঠ পুরের জঙ্গল।

 

পীঠনির্ণয়তন্ত্র মতে এখানে দেবীর বাম চরণ পড়েছিল। বর্তমান মন্দিরটির নির্মাণ নিয়েও একটি জনশ্রুতি আছে।কয়েক দশক আগে লাল শালু পরা এক সাধক এসেছিলেন। তাঁর জটা পা পর্যন্ত ঠেকত। তিনি দীর্ঘদিন এই মন্দিরে পূজা ও যজ্ঞ করতেন। ওই সাধকই তিনটি মোটা গাছের গুঁড়ির নীচে দেবীর পাথররূপী বাম পায়ের সন্ধান পান।

তারপরই সতী পীঠ হিসেবে এই মন্দিরের জনপ্রিয়তা গোটা উত্তর বঙ্গ জুড়ে দাবা নলের মতো ছড়িয়ে পরে।নতুন করে মন্দির সংস্কার হয়।ভক্ত সমাগম বাড়তে শুরু করে।

 

পুরাণ অনুসারে অরুণাসুর নামে এক অসুর ব্রহ্মার থেকে বরদান পেয়েছিল যে কোনো দ্বিপদী বা চতুষ্পদী প্রাণী তাকে হত্যা করতে পারবে না। এই বরের অহংকারে মত্ব হয়ে সে কৈলাস আক্রমণ করেছিল তখন দেবী পার্বতী ভ্রামরী রূপ ধরে যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং সাথে নেন শতসহস্র ভ্রমরকে। তারা অরুণাসুরকে দংশন করে এবং শেষে বধ করে। দেবীর এই ভ্ৰমরী রূপেরই পুজো হয় জলপাইগুড়ির এই শক্তি পীঠে।

 

স্থানীয় বাসিন্দাদের বিশ্বাস, দেবী এখানে অত্যন্ত জাগ্রত। যাঁর কৃপায় বহু বিপদ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।তা সে আইনি বিবাদই হোক বা রোগ ব্যাধি ।

শোনা যায় দেবীর মন্দিরে জানানো সব গুলি মনোস্কামনা আজ অবধি পূর্ণ হয়েছে।

ভ্রামরী দেবীর মন্দিরে দুর্গাপুজো এবং মাঘি পূর্ণিমায় বিশেষ পুজোপাঠ হয়। এই সময় দূর-দূরান্ত থেকে এখানে বহু ভক্ত আসেন।

 

ফিরে আসবো শক্তি পীঠের পরবর্তী পর্ব নিয়ে। আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – বিশ্বেসী

শক্তি পীঠ – বিশ্বেসী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দক্ষিন ভারতের গোদাবরী নদীর তীরে অবস্থিত বিশ্বেসী শক্তিপীঠ নিয়ে আজকের শক্তি পীঠ পর্ব।

 

প্রাচীন কুব্জিকা তন্ত্র গ্রন্থে স্বয়ং শিব একটি শক্তি পীঠের উল্লেখ করে দেবী পার্বতীকে বলছেন –

 

” কামগিরি মহাপিঠঙ তথা গোদাবরী প্রিয়ে ”

 

এই শক্তি পীঠই বিশ্বেসী নামে খ্যাত।

 

জনশ্রুতি আছে যে কয়েকশো বছর আগে বিশু নাথ নামে এক সিদ্ধ যোগী এই দুর্গম অরণ্যঘেরা অঞ্চলে তপস্যা করতেন।এক রাতে তার আরাধ্যা দেবী কালী তাকে স্বপ্নে দেখা দেন এবং বলেন কাছেই দক্ষিণ দিকে এক জলাশয়ে একটি রুপোর ঘটে দেবী বিরাজ করছেন এবং তিনি যেনো তাকে উদ্ধার করে মন্দিরে স্থাপন করেন। আদেশ অনুসারে সেই মাতৃ সাধক পুকুর থেকে ঘট তুলে এনে পুজো শুরু করেন।

 

এর কিছুদিন পরে আবার এক সপ্নাদেশ এলো।

দেবী বললেন সামনেই আছে এক নীম গাছ সেই নীম গাছের ডাল থেকে যেনো দেবীর মূর্তি তৈরী হয়।একই সাথে রাজাও সেই রাতে স্বপ্ন দেখলেন যে মাতৃ সাধক বিশুনাথকে তিনি যেনো দেবীর মূর্তি নির্মাণ এবং মন্দির তৈরীতে সাহায্য করেন।

শুধু তাই নয় ভৈরব দন্ডপানি কে প্রতিষ্ঠা করে পুজো করার কথাও দেবী বলে দেন।সব কথা অক্ষরে অক্ষরে পালন হয়।

 

শাস্ত্র মতে এখানেই পড়েছিলো দেবীর গন্ডদেশ। যদিও দেবীর শ্রী অঙ্গ এবং স্থান টি নিয়ে কিঞ্চিৎ মতপার্থক্য আছে।তবে একাধিক শাস্ত্রে এই স্থানকে একান্ন পীঠের অন্যতম স্থানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে।

 

দেবী এখানে বিশ্বেশী। শান্ত, স্নিগ্ধ এবং মমতাময়ী রূপে দেবী এখানে বিরাজ করছেন। এই স্থান তন্ত্র সাধনার উপযুক্ত বলে মনে করা হয়। তাই বহু তন্ত্র সাধক তাদের সাধনার জন্য এই পবিত্র স্থানকে বেছে নেন।জনশ্রুতি আছে বহু মানুষ এই স্থানে পুজো দিয়ে স্বপ্নে।দেবীকে দর্শন করেছেন এবং তাদের সমস্যার সমাধান পেয়েছেন।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে চলতে থাকবে

শক্তি পীঠ নিয়ে ধারাবাহিক বিস্তারিত আলোচনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – কিরিটেশ্বরী

শক্তি পীঠ – কিরিটেশ্বরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার এককালীন রাজধানী মুর্শিদাবাদে রয়েছে অন্যতম জাগ্রত এবং প্রসিদ্ধ এক শক্তি পীঠ

যার নাম কিরীটেশ্বরী। এই পীঠকে কেন্দ্র করে অলৌকিক ঘটনা বা কিংবদন্তীর শেষ নেই।

সেসব নিয়েই আজকের পর্ব।

 

প্রাচীন ইতিহাস অনুসারে এই স্থানের নাম

ছিল কিরীটকণা। অনেকে মনে করেন এখনে সতীর মুকুটের বা কিরিটের কণা পড়েছিল। আবার কেউ বলেন কিরীট অর্থে এখানে ললাট বা কপাল বোঝানো হয়েছে।তবে মন্দিরের সঙ্গে যুক্ত সেবাইত দের অনেকেই বলেন কিরীট কথাটি এসেছে করোটি বা মাথার খুলি থেকে। সেই থেকে দেবীর করোটি এখানে পতিত হয়ে ছিলো।

শুধু তাই নয় সেই করোটির টুকরো প্রস্তুরীভূত অবস্থায় আছে বলেই অনেকে মনে করেন।

তাই করোটি থেকে কিরীটী নাম হয়েছে বলেই তাদের ধারনা।

 

আদি কিরিটেশ্বরী মন্দির ঠিক কবে কে স্থাপন করেছেন তা স্পষ্ট ভাবে বলা না গেলেও বর্তমান মন্দিরটি বাংলার ১১০৪ সালে নাটোরের রানি ভবানী প্রতিষ্ঠা করেন।পরবর্তী সময়ে মহারাজা

যোগেন্দ্রনারায়ণ রাই ১৩৩৭ বঙ্গাব্দে নবরূপে

এই মন্দিরের সংস্কার করেন।

 

তিন ধর্মের স্থাপত্যের মিশেল রয়েছে এই মন্দিরে। হিন্দু, বৌদ্ধ ও ইসলাম ধর্মের স্থাপত্য শৈলীর অতি সুন্দর এবং যথাযত ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়

এই মন্দিরে।মা কিরীটেশ্বরী এখানে

দক্ষিণাকালী রূপে ধ্যানআসনে পূজিতা।

নিয়ম প্রত্যেক নিশি রাতেই মায়ের পুজো হয়।

 

শোনা যায় পলাশীযুদ্ধে বিস্বাসঘাতকতার করার শাস্তি পেতে হয় মীরজাফরকে।বৃদ্ধ বয়সে নবাব মীরজাফর দুররোগ্য কুষ্ট রোগে আক্রান্ত হন এবং অত্যন্ত কষ্ট পান।সেই সময়ে কিরিটেশ্বরী মন্দিরের চরণামৃত গ্রহণ করে কুষ্ঠ রোগ

থেকে মুক্তি পান তিনি।পরবর্তী সময়ে কিরীটেশ্বরীতে একটি পুস্করিণী খনন করে দেন

নবাব মীরজাফর। মন্দিরের পাশে করা সেই পুষ্করিণী কালী সাগর নামে পরিচিত।

 

বহু শক্তি পীঠ নিয়ে আলোচনা এখনো

বাকি আছে।চলতে থাকবে একান্ন পীঠ নিয়ে এই

বিশেষ ধারাবাহিক লেখনী।ফিরে আসবো পরের পর্বে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তি পীঠ – ত্রিপুরা সুন্দরী

শক্তি পীঠ – ত্রিপুরা সুন্দরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দির সতীর একান্ন শক্তিপীঠের মধ্যে এটি অন্যতম।শাস্ত্র মতে দেবী সতীর ডান পা এই স্থানে পতিত হয়েছিল। দেবী সতীকে এই মন্দিরে ত্রিপুরা সুন্দরী বা ত্রিপুরেশ্বরী হিসাবে পুজো করা হয়।আজকের একান্ন পীঠ পর্বে

ত্রিপুরা সুন্দরী বা ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির নিয়ে লিখবো।

 

মধ্যযুগে মহারাজা ধন্য মানিক্য দেবীর

স্বপ্নাদেশের পর চট্টগ্রাম থেকে দেবী বিগ্রহ নিয়ে এসে মাতাবাড়ির একটি ছোট পাহাড়ের উপর স্থাপন করেন।

 

এই মন্দিরের গর্ভগৃহে দুটি দেবীমূর্তি রয়েছে।

পাঁচ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট মূর্তিটি ত্রিপুরাসুন্দরী নামে পরিচিত এবং দু ফুট লম্বা ছোট মূর্তিটিকে ছোটমা বা চন্ডীমাতা বলা হয় ।ত্রিপুরেশ্বরী মন্দিরে দেবী মূর্তির পাশাপাশি নারায়ণ শিলা রয়েছে।

ভারতের স্বাধীনতার পর ত্রিপুরা রাজ্যর ভারতে অন্তর্ভুক্তির সময় ত্রিপুরার তৎকালীন রানী কাঞ্চন প্রভাদেবীর ইচ্ছেতে রাজ্য সরকার ত্রিপুরা সুন্দরী মন্দিরের পরিচালনার দায়িত্ব নেয়।

 

আজও বিশেষ বিশেষ তিথিতে পুজোর সময়

রাজ পরিবারের সদস্যদের অর্ঘ্য আহুতি দিতে হয়।

ত্রিপুরেশ্বরী মন্দির চত্বরে থাকা কল্যাণ সাগর এই শক্তি পীঠের একটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। এই দিঘিতে আছে প্রচুর পরিমাণে কচ্ছপ।এই দীঘিকে খুবই পবিত্র মনে করা হয় এবং ভক্তরা বিশ্বাস করেন এই দীঘির কচ্ছপদের খেতে দিলে তাদের মনোস্কামনা পূর্ণ হবে।

 

শক্তি পীঠ ত্রিপুরাসুন্দরীকে ‘কূর্ম পীঠ’ ও বলা হয়। অনেকে মনে করেন এই কল্যাণ সাগরের কচ্ছপদের উপস্থিতির জন্যই এইরুপ নাম আবার অনেকে বিশ্বাস করেন যেখানে মন্দির অবস্থিত সেই পাহাড়ের আকৃতি ঠিক কচ্ছপের মত ছিল বলে এই শক্তিপীঠের নামকরণ করা হয় কুর্ম পীঠ।

 

এখনো অনেকগুলি শক্তিপীঠ নিয়ে আলোচনা বাকি আছে। পরবর্তী শক্তিপীঠ নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

সিদ্ধ পীঠ – তারাপীঠ

সিদ্ধ পীঠ – তারাপীঠ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

অমাবস্যা উপলক্ষে আজ সাধনপীঠ তারাপীঠ নিয়ে বিশেষ পর্বে আপনাদের স্বাগত।

পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে তারাপীঠ একান্নটি সতী পীঠের অন্তর্ভুক্ত না হলেও তারাপীঠকে বলা হয় সাধন পীঠ বা সিদ্ধ পীঠ। তারাপীঠের গুরুত্ব শাক্ত সম্প্রদায়ের মধ্যে এতটাই বেশি যে এই পীঠকে মহা পীঠ আখ্যা দেয়া হয়। আদতে তারাপীঠ দশ মহাবিদ্যা দেবী তারার জাগ্রত মন্দির।

 

তারাপীঠ মন্দিরের ইতিহাস বেশ প্রাচীন।

আজ থেকে প্রায় আটশো বছর আগের ঘটনা।রাজা জয়দত্ত বাণিজ্যে প্রভূত সম্পদ, অর্থ লাভ করে বাড়ি ফিরছিলেন। চলার পথে অসুস্থতায় মৃত্যু হল তাঁর সঙ্গে থাকা প্ৰিয় পুত্রের। বাড়ি ফিরেই ছেলের অন্ত্যেষ্টি করবেন স্থির করে তিনি মাঝিদের বললেন, পুত্রের দেহটাকে ভালো করে সংরক্ষণ করে রাখতে।এদিকে সন্ধ্যা নেমেছে। রাত্রিটা তাই পথেই বিশ্রাম নিতে হবে। চলতে চলতে থামলেন এক বিশাল জঙ্গলের পাশে। স্থানটির নাম চণ্ডীপুর।নিদ্রাহীন জয় দত্ত তখন মৃত ছেলের দেহ আঁকড়ে রাত জাগছেন। সেই সময় এক কুমারী মেয়ে নৌকার কাছে এসে দাঁড়ালেন। দেখা গেলো রাত্তির আকাশজুড়ে অপূর্ব এক জ্যোতি। অপূর্ব সুন্দরী সেই মেয়েটি জয়দত্তকে জিজ্ঞাসা করলেন,‘ও বাছা, এত নৌকা ভরে কী নিয়ে চলেছো গো?’ পুত্রশোকে জয়দত্তের মন ভারাক্রান্ত ছিল। তাই তিনি রাগত স্বরে মেয়েটিকে বললেন, ‘ছাই আছে’। সে কথা শুনে মেয়েটি ‘আচ্ছা’ বলে চলে গেলেন। কিছুক্ষণ পরে জয়দত্ত দেখলেন তাঁর নৌকার সব বাণিজ্যসামগ্রী, অর্থ ছাইতে পরিণত হয়েছে। পরদিন সকালে মাঝিরা রান্নায় বসল। খেয়েদেয়ে নৌকা নিয়ে যাত্রা করতে হবে। কাটা শোল মাছ কাছেই এক কুণ্ডের জলে ধুতে গেল তারা। কী আশ্চর্য! জলের স্পর্শ পেয়ে মাছটি জ্যান্ত হয়ে সাঁতরে চলে গেল। মাঝিরা দৌড়ে এসে জয়দত্তকে সব কথা জানাল। জয়দত্তের মনে পড়ল আগের রাতের সেই মেয়েটির কথা। তিনি বুঝতে পারলেন কোনো দেবী এসেছিলেন তার কাছে। অজ্ঞানতা বসত তিনি বুঝতে পারেননি।সেই রাতে দেবী তারা স্বপ্নে দেখা দিলেন এবং বললেন কুণ্ডের জল ছেলের গায়ে ছড়ালেই সে বেঁচে উঠবে। পরদিন বশিষ্ঠকুণ্ডের জল ছেলের গায়ে ছেটাতেই ছেলে ‘তারা তারা’ বলে বেঁচে উঠল সে। শুধু তাই নয় তিনি হারানো সম্পদও ফিরে পেলেন। সেদিন রাতে বী তাঁকে স্বপ্নে দর্শন দিলেন। তাঁকে আদেশ করে বললেন যে এই জঙ্গলের মধ্যে একটা শ্বেতশিমুল গাছের নীচে একটা শিলাবিগ্রহ রয়েছে। সেই বিগ্রহ একটা মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করে তার পুজোর ব্যবস্থা করবি। আমি হলাম উগ্রতারা। জঙ্গলের মধ্যে শ্মশানে আমার বাস।’ পরদিন সকালে জয় দত্ত আদেশ অনুসারে জঙ্গলে খুঁজে খুঁজে শ্বেতশিমুল গাছের নীচ থেকে শিলাবিগ্রহ আবিষ্কার করলেন এবং তার কাছেই পেলেন চন্দ্রচূড় শিবের মূর্তি। বশিষ্ঠকুণ্ড বা জীবিতকুণ্ডের সামনে তাড়াতাড়ি মন্দির নির্মাণ করে সেই শিলামূর্তি ও চন্দ্রচূড় শিবের মূর্তি প্রতিষ্ঠা করলেন এবং কাছেই মহুলা গ্রামের এক ব্রাহ্মণকে নিত্যপূজার দায়িত্ব দিয়ে বিদায় নেন।এই ছিলো তারাপীঠ মন্দির সৃষ্টির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস।

 

আবার শাস্ত্র মতে এখানে সতীর ঊর্ধ্ব নয়নতারা বা প্রজ্ঞানয়ন পড়েছিল।শাস্ত্র মতে তারাপীঠে পুজো দিলে সর্ব কার্য সিদ্ধি হয়। এমনকি কিছু

শাস্ত্রে উল্লেখ আছে তারাপীঠে পুজো দিলে অশ্বমেধ যজ্ঞর ফল লাভ হয়।

 

সাধক বামা ক্ষেপা থেকে সাধক কমলা কান্ত সবার ও অন্যতম প্ৰিয় সাধন স্থল ছিলো এই তারাপীঠ। বামা ক্ষেপা তো তার সারাটা জীবনই কাটিয়েছেন এই তারা পীঠ মহাশ্মশানে এবং সিদ্ধি লাভ করেছেন।আজও প্রতি অমাবস্যায় বহু কাপালিক তান্ত্রিকদের সাধনায় মুখরিত হয় তারাপীঠের এই

পুন্য ভূমি।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে শক্তি পীঠ নিয়ে ধারাবাহিক লেখায়। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।