Home Blog Page 7

কালী কথা – জংলী কালী মন্দির

কালী কথা – জংলী কালী মন্দির

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

এক কালের বাংলা বিহার উড়িষ্যার রাজধানী মুর্শিদাবাদের নশীপুরে রয়েছে পাঁচশো বছরের পুরোনো জংলী কালীর মন্দির। এ মন্দিরে দেবী নেই, দেবীর বিগ্রহও নেই।রয়েছে দেবীর পদ চিহ্ন তারই পূজো হয়।আজ কালী কথায় এই

প্রাচীন মন্দিরের ইতিহাস।

 

জনশ্রুতি আছে যে এক সময় নশিপুরের ওই এলাকা ছিল জঙ্গসে পরিপূর্ণ। আর সেই জঙ্গলেই ছিল কুখ্যাত সব ডাকাতদের ডেরা। যাদের ভয়ে কাঁপত গোটা এলাকা। তা সেই ডাকাতদল অন্যান্য ডাকাত দলের মতোই ডাকাতিতে বেরনোর আগে শরণ নিতেন সেই জঙ্গলি কালীর।

জঙ্গলে বিরাজমানা দেবী তাই সম্ভবত দেবী

জংলী কালী নামে প্রসিদ্ধা।

 

একদিন মায়ের পুজো শেষে ডাকাতির উদ্দেশে রওনা দেয় ডাকাতদল। তবে সেদিন শুন্য হাতে ফিরতে হয় এবং ক্ষুধার্ত, তৃষ্ণার্ত ডাকাতদলের কিছু না-পাওয়ার রাগ গিয়ে পড়েছিল দেবী কালীর উপরে। ক্ষোভে দেবী মূর্তি ভাঙতে যায় তারা সেই সময় দেবী জাগ্রত হয়ে উঠে পাশের একটি কুয়োতে অদৃশ্য হয় সেই কুয়োর পাড়ে পড়ে থাকে দেবীর পায়ের ছাপ। সেই পদচিহ্ন যুগলই বর্তমানে দেবী রূপে পূজো করা হয়।

 

এখানে দেবীর থানের পাশেই রয়েছে বহুপ্রাচীন একটি নিমগাছ। স্থানীয় লোকেদের বিশ্বাস, ওই গাছটিতে দেবীর সহচরীরা থাকেন। কেউ কেউ বলেন, মাঝেমধ্যেই সেই গাছ থেকে বিভিন্ন রকম আওয়াজ ভেসে ওঠে। পরবর্তীকালে মন্দিরটি সংস্কার হলেও গাছটি কাটা হয়নি বরং আরো যত্ন নেয়া হয়েছে।কালীপুজোর দিন যত্ন করে সাজিয়ে তোলা হয় ওই নিমগাছের চারপাশ।

 

পাঁচশো বছর ধরে শুন্য দেবালয়ে দেবীর চরণ

চিহ্ন দেবী রূপে পূজো পাচ্ছে অসংখ্য ভক্তদের কাছে। এখানে এখনো কালীপুজোর সময় বহু ভক্তের ভিড় হয়। মুর্শিদাবাদ ছাড়াও অন্যান্য

জেলা থেকেও ভক্তেরা আসেন।

 

ফিরে আসবো কালী কথার আরো একটি পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। চলতে থাকবে

ধারাবাহিক কালী কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

পবিত্র রাখী পূর্ণিমার শাস্ত্রীয় তাৎপর্য 

পবিত্র রাখী পূর্ণিমার শাস্ত্রীয় তাৎপর্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ সারা দেশ জুড়ে পালিত হচ্ছে পবিত্র রাখী পূর্ণিমা উৎসব।ভারতীয় সনাতন সভ্যতায় বহু প্রাচীন কালথেকে চলে আসছে এই উৎসব|ভারতের পুরাণ, মহাকাব্য থেকে ইতিহাস ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রাখী বন্ধনের গল্প।

রাখী পূর্ণিমা শুধু সামাজিক নয় একটি শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠানও বটে আজ রাখী বন্ধনের সেই শাস্ত্রীয়

গুরুত্ব নিয়ে লিখবো।

 

পুরান অনুসারে দেবী লক্ষী রাজা বলীর হাতে রাখী পড়িয়ে বিষ্ণু কে বৈকুন্ঠ লোকে ফিরিয়ে এনেছিলেন।

 

আমাদের দুটি প্রধান মহাকাব্য রামায়ণ এবং মহাভারতে রাখীর উল্লেখ আছে।রামায়নে মহর্ষি বাল্মীকির আশ্রমে রাম-সীতার দুই সন্তান লব-কুশের জন্মের পর তাদের হাতে সুরক্ষা কবচ হিসেবে একটি বিশেষ সুতো বেঁধে দেন বাল্মীকি।

 

আবার মহাভারতে, মা কুন্তী যখন কর্ণকে জন্মের পর জলে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন সদ্যোজাতের হাতে বেঁধে দিয়েছিলেন একটি সুতো যা রাখীর মতোই রক্ষা কবচ হিসেবে রক্ষা করেছিলো তার সন্তানকে।

 

শিশুপালের দিকে সুদর্শন চক্র ছুড়ে দেওয়ার সময় কৃষ্ণের হাতের আঙ্গুল কেটে রক্ত বের হতে শুরু করে। কৃষ্ণসখী দ্রৌপদী তাঁর শাড়ির আঁচল খানিকটা ছিঁড়ে তাঁর হাতে বেঁধে দেন। বড়ো ভাইয়ের ন্যায় শ্রীকৃষ্ণও দ্রৌপদীকে সব বিপদ থেকে রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন।

যা একপ্রকার রাখী বন্ধনই।

 

এই দিনে অনেকেই নিজের ইষ্ট দেবকে রাখী অর্পণ করেন। এতে খুব ভালো এবং দ্রুত

নিজের মনোস্কামনা পূর্ণ হয় বলে বিশ্বাস।

 

তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাত ধরে রাখী অন্য মাত্রা পায়।রাখী বন্ধন প্রতিশ্রুতি রক্ষার উৎসব হয়ে যায়।নিজের প্রেম পর্যায়ের গানেও রবি

ঠাকুর লিখেছেন … ” মনে করে সখী,

বাঁধিয়া রাখিয়ো আমার হাতের রাখী

তোমার কনক কঙ্কনে।

 

আপনাদের সকলকে জানাই এই পবিত্র রাখী

বন্ধন উৎসবের অনেক শুভেচ্ছা এবং

অভিনন্দন।ভালো থাকুন।

পড়তে থাকুন।ধন্যবাদ।

কালী কথা – জোড়াসাঁকো কালী বাড়ি

কালী কথা – জোড়াসাঁকো কালী বাড়ি

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতি বিজড়িত জোড়াসাঁকোর রবীন্দ্র সরণি মোড়ে রয়েছে একটি প্রাচীন কালী মন্দির। আজ কালী কথায় এই প্রসিদ্ধ কালী মন্দির নিয়ে লিখবো।

 

এক কালে এই অঞ্চল ছিলো ডাকাতদের ঘাঁটি।

সে সময়ে একটি বিশাল বটগাছের নীচে ডাকাতরা মা কালীর আরাধনা করত। একবার এক মাতৃ সাধক ব্রাহ্মণ সন্তান চিৎপুর রোড ধরে কালীঘাটে মায়ের মন্দির দর্শন করতে যাচ্ছিলেন। পথে ডাকাতদের কবলে পড়লেন তিনি।কিন্তু মা কালী ভক্তের সহায় ছিলেন ডাকাত সর্দার জানালেন তিনি গতরাতে মা ভবতারিণীর স্বপ্ন দেখেছেন। দেবী তাঁকে স্বপ্নে বলেছেন, তোর তো বয়স হয়ে গেল। এবার পুজোর ভার এক ব্রাহ্মণের হাতে ছেড়ে দে। আগামীকাল এক ব্রাহ্মাণ সন্তান এই বটগাছের পাশ দিয়ে কালীঘাট মন্দির দর্শনে যাবে। তাঁকে স্বপ্নাদেশের কথা বলে পুজোর দায়িত্ব

অর্পণ কর।

 

সব শুনে সেই ব্রাহ্মণ তারপর পুজো করতে রাজি হয়ে গেলেন। জোড়াসাঁকোতে কালী মন্দির গড়ে মাকে প্রতিষ্ঠা করে পূজো শুরু করলেন। সেই মন্দিরই আজকের জোড়াসাঁকো কালী বাড়ি এবং আজও বংশ পরম্পরায় সেই ব্রাহ্মণ পরিবারের সদস্যরাই পূজো করে আসছেন।

 

দেবী এখানে দক্ষিনাকালী এবং গর্ভ গৃহে শ্বেতপাথরের বেদীতে প্রতিষ্ঠিতা।শ্বেত সদাশিবের উপর দন্ডায়মান দেবী মূর্তি কষ্টিপাথর নির্মিত।

দেবী চতুর্ভুজা, তাঁর হাতে থাকে রৌপ্য খর্ড়্গ, নরমুণ্ড। মাথায় রৌপ্যমুকুট, তার উপরে রৌপ্যছত্র। দেবীর জিহ্বা সোনার।

 

দুর্গাপূজা কালী পূজা সহ প্রতিটি বিশেষ তিথিতে মহা সমারোহে দেবীর পূজোর আয়োজন হয় এবং সেই উপলক্ষে বহু ভক্তের সমাগম হয়।

 

ফিরে আসবো কালী কথার পরবর্তী

পর্ব নিয়ে।চলতে থাকবে এই

ধারাবাহিক কালী কথা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – বাসুদেবপুর ডাকাত কালী 

কালী কথা – বাসুদেবপুর ডাকাত কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আর কয়েকটিদিন পরেই কৌশিকী অমাবস্যা। তন্ত্র মতে কালী সাধনার শ্রেষ্ঠ তিথি।আজ কালী কথার এই পর্বে আপনাদের জন্যে নিয়ে এসেছি বাংলার এক প্রাচীন ডাকাত কালী মন্দিরের কথা যা অবস্থিত হুগলীর বাসুদেব পুরে।

 

বাংলার এই ডাকাত কালী মন্দিরের সাথে জড়িত আছে কুখ্যাত রঘু ডাকাতের নাম। শোনা যায় সাধক রামপ্রসাদ ও এই মন্দিরে এসেছিলেন এবং এক অলৌকিক অভিজ্ঞতার সাক্ষী হয়েছিলেন|

 

শোনা যায় আনুমানিক পাঁচশো বছর আগে বাগহাটির জয়পুরের বাসিন্দা বিধুভূষণ ঘোষ ও তার ভাই রঘু ঘোষ ঘন জঙ্গলের মধ্যে শাস্ত্র মতে তাদের কালী মূর্তি স্থাপন করে। দিনের বেলায় দুই ভাই দিনমজুরের কাজ করলেও রাতে ধনীদের বাড়িতে ডাকাতি করত যদিও ডাকাতি করে আনা জিনিসপত্র এলাকার গরিব মানুষের মধ্যে বিলি করত এই দুই ডাকাত|তাই এলাকায় বেশ জনপ্রিয় ছিলো। দুই ভাইয়ের মধ্যে রঘুই ছিলো দলের নেতা।

 

সেকালে ডাকাত দলের ভয়ে দুপুরের পর থেকে এই রাস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করত না। কথিত আছে সেই সময়ে রঘু ডাকাতের লোকজন রাস্তা দিয়ে যাওয়া কোনও মানুষকে ধরে বেঁধে রাখত। সন্ধ্যার পর পুরোহিতকে ডেকে এনে ঢাকঢোল বাজিয়ে নরবলি হতো| তারপর পুজো দিয়ে ও মহাপ্রসাদ খেয়ে ডাকাতি করতে বের হত।

 

সাধক কবি রামপ্রসাদ সেন কোনও এক সময়ে এই রাস্তা ধরে ফিরছিলেন। ওই সময়ে রঘু ডাকাতের লোকজন তাকে নরবলি দেওয়ার জন্য ধরে নিয়ে এসে বেঁধে রাখে। অলৌকিক ভাবে ডাকাত দল বলি দেয়ার আগের মুহূর্তে হারিকাঠে রামপ্রসাদের পরিবর্তে মা কালীকে দেখতে পায়। এরপর থেকে রঘু ডাকাত বলি বন্ধ করে রামপ্রসাদের সেবার ব্যবস্থা করে এবং পরের দিন সকালে নৌকায় করে রামপ্রসাদকে সসম্মানে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসে।

 

এখানে চতুর্ভুজা কালিকার ঊর্ধ্ব বাম হস্তে খড়্গর পরিবর্তে রয়েছে তরবারি ও অন্যান্য হাতগুলিতে রয়েছে দেবী কালিকার মতোই নানা প্রহরণ৷ দেবী জোড় পায়ে শবরূপী শিবের হৃদপদ্মে দণ্ডায়মান৷ মায়ের মুখোমুখি মন্দির অঙ্গনে স্থাপিত শিবলিঙ্গ৷ রয়েছে জটাজাল বিস্তৃত প্রাচীন বটবৃক্ষ৷

 

রঘু ডাকাতের আমল থেকেই মন্দিরের পুজো চলছে। মন্দিরে নরবলির প্রথা বহু পূর্বে বন্ধ হয়েছে। তবে এখনও মানত করা| ছাগবলি হয়|

 

বিশেষ বিশেষ তিথিতে বিশেষ পুজো ও সেই উপলক্ষে বহু মানুষের সমাগম হয়।বাংলার ঐতিহাসিক ডাকাত কালী মন্দিরগুলির মধ্যে

এই রঘু ডাকাতের কালী বিশেষ ভাবে উল্লেযোগ্য।

 

বাংলার নানা স্থানে রয়েছে এমন আরো অনেক প্রাচীন ঐতিহাসিক কালী মন্দির।কালী কথা নিয়ে আগামী পর্বে আবার অন্য একটি কালী ইতিহাস জানাবো আপনাদের। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – জরাসন্ধ কালী

কালী কথা – জরাসন্ধ কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ কালী কথায় আপনাদের বাংলার এমন

এক প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক কালী মন্দিরের কথা জানাবো যার সাথে জড়িয়ে আছে মগধরাজ জরাসন্ধ, রানী অহল্য বাই এবং মহারাজা নন্দ কুমারের নাম।

 

তখন বর্তমানের বিহার ছিল ইতিহাসের মগধ ক্ষেত্র

কষ্টিপাথরে তৈরি পদ্মাসনা কালীমূর্তিকে মগধ রাজপুজো করতেন।তার নামেই নাম হয় জরাসন্ধ জরাসন্ধের মৃত্যুর পর সেই মূর্তি স্থান পায়

পাতালে থেকে যায়।কেটে যায় বহু বছর। পরবর্তীতে রানি অহল্যাবাই কিছুদিন মগধে থাকাকালীন স্বপ্নাদেশে পাতালে একটি মূর্তির সন্ধান পান।তার নির্দেশে একটি নিদ্দিষ্ট স্থানে শুরু হয় খনন। সেখান থেকে উদ্ধার হয় জরাসন্ধের এই প্রাচীন কালী মূর্তি।

 

মূর্তিটি যেহেতু মগধে মিলেছে এবং সেই সময়ে ওই স্থান কাশী রাজের অধীনে তাই রানি অহল্যা সেটি তৎকালীন কাশীরাজ চৈতসিংকে দান করেন। সেই সময়ে ব্রিটিশ শাসনধীন ভারতের বড়লাট অর্থাৎ তৎকালীন ইংরেজ শাসক ওয়ারেং হেস্টিংসের নজরে পড়ে মূর্তিটির উপরে তার মনে

ইংল্যান্ডের মিউজিয়ামে সেটি নিয়ে

যাওয়ার বাসনা জাগে। সেকথা জানতে পেরে কাশীরাজ চৈত সিং তখন মূর্তিটি বাঁচাতে

সেটিকে কাশীর দশাশ্বমেধ ঘাটে গঙ্গার পবিত্র জলে লুকিয়ে দেন।এক কথায় পাতাল থেকে খুঁজে আনা মূর্তির সলীল সমাধি ঘটে।

 

আবার কিছুকাল অতিক্রান্ত হয়। তখন মহারাজ নন্দকুমার বাংলার দেওয়ান।তিনি কাশীধামে যান। তীর্থ করতে এবং গঙ্গাবক্ষ থেকে কালী মূর্তি তুলে আনার স্বপ্নাদেশ পান।আবার উদ্ধার হয় মূর্তি

সেই মূর্তি তিনি নলহাটির এই আকালীপুরে এনে প্রতিষ্ঠা করেন এবং পুজোর ব্যাবস্তা করেন।

 

দেবী মূর্তিটি কোষ্টি পাথরের তৈরী সাপের কুণ্ডলীর উপর পদ্মাসনে বসেন দেবী। মাথায় তার সহস্র নাগের ফনা। হাতে পায়ে সাপের নকশা।

 

আজও এই আকালীপুরের মন্দিরে পুজো হয় দিনের বেলা। সমস্ত তান্ত্রিক নিয়ম অনুসরণ হয় । তবে সব কিছুই দিনের বেলা। রাতে মা নৈশ লীলা করেন। তাই নিঝুম অন্ধকার থাকে এবং পরিবেশ থাকে নিস্তব্ধ।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে । কালী কথা নিয়ে ধরাবাহিক লেখা চলতে থাকবে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – লাল কালী মন্দির

কালী কথা – লাল কালী মন্দির

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার প্রসিদ্ধ কালী মন্দির গুলি মধ্যে উত্তর কলকাতার লাল কালী মন্দির অন্যতম।
এই কালী মন্দিরের সাথে জড়িয়ে আছে অনেক গল্প, কিংবদন্তী ও অলৌকিক ঘটনা। আজ কালী কথায় সেই সব নিয়েই লিখবো।

যেখানে সেন্ট্রাল এভিনিউয়ের রাস্তা দুভাগে ভাগ হয়ে নাম হয়েছে চিত্তরঞ্জন এভিনিউ এবং যতীন্দ্র মোহন এভিনিউ সেখানে অবস্থিত এই প্রাচীন কালী মন্দির।বর্তমানে মন্দিরটি যতীন্দ্র মোহন এভিনিউ-তে পড়ে। প্রায় সব মন্দিরই দেখা যায় সাধারণত রাস্তার একধারে কিন্তু অদ্ভুত ভাবে এখানে রাস্তায় মাঝখানে রয়েছে মন্দিরটি।
তারও একটি বিশেষ কারন আছে।

প্রায় ২৫০ বছর আগে এই মন্দির একটা মাটির ঘর ছিল তখন অমরকৃষ্ণ ঠাকুর চক্রবর্তী নামে এক মাতৃ সাধক রাজা নবকৃষ্ণের বাড়িতে চণ্ডীপাঠ করতেন আর ওই মাটির ঘরে তিনি তন্ত্রসাধনা করতেন|

শোনা যায় রঘু ডাকাত একবার হাটখোলা থেকে ডাকাতি করে ফেরার সময় লুঠ করা যোগমায়ার মূর্তি রাজা নবকৃষ্ণের পুকুরে ফেলে দেয় পরবর্তীতে অমরকৃষ্ণ ঠাকুর চক্রবর্তী স্বপ্নাদেশ পেয়ে মাকে নিয়ে এসে সেই মাটির ঘরে পুজো শুরু করেন|

ব্রিটিশ আমলে রাস্তা তৈরি করার সময় ইংরেজরা মন্দির টি সরাতে চাইলে অমরকৃষ্ণ ঠাকুর চক্রবর্তী মন্দির সরিয়ে নিয়ে যেতে অস্বীকার করেন৷ তখন ব্রিটিশ গভনর্মেন্ট তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করে৷ তিনদিন তাঁকে হাজতে আটকে রেখেছিল৷শোনা যায় যোগমায়াকে কোলে নিয়েই হাজতে ছিলেন তিনি ৷ রাজকৃষ্ণদেব তাঁর হয়ে মামলা লড়েন এবং সেই মামলায় তাঁর জয় হয়৷ তারপর ইংরেজরাই ওনাকে প্রস্তাব দেয় মন্দিরটা সুন্দর করে বানিয়ে দেওয়ার৷ তাতে তিনি রাজি হয়েছিলেন৷ ইংরেজরাই এই লাল রঙের মন্দির তৈরি করে দেয়।

শোনা যায় ব্রিটিশরা যখন পুরোনো মন্দির ভেঙে দেয়া প্রচুর জল বেরিয়েছিলো এখান থেকে যদিও আশ্চর্যজনক ভাবে জলের কোনো উৎস খুঁজে পাওয়া যায়নি|

কলকাতায়া মেট্রো রেলের কাজ শুরু হওয়ার সময় এই মন্দিরের গায়ে কোনও আঁচড় লাগেনি৷ সেইসময় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন ইন্দিরা গান্ধী, তিনি মন্দিরটা চিনতেন,ইন্দিরা গান্ধী বলেছিলেন, এই মন্দিরটা রেখেই মেট্রোর কাজ হবে৷ তার জন্য আলাদা করে তিনি কিছু টাকা অনুমোদন করেছিলেন বলেও শোনা যায়|ইন্দিরা গান্ধীর পরেও এই নিয়ম মেনেই মেট্রোর কাজ এগিয়েছে এখানে। মোট কথা কোনো ভাবেই মন্দির আগের স্থান থেকে সরানো যায়নি। তাই আজও রাস্তার মাঝখানেই এই কালী মন্দির অবস্থান করছে।

এই মন্দিরে মাকে যোগমায়া রূপে পুজো করা হয়৷ তন্ত্রমতে সেই পুজো হয়৷ আগে ছাগ বলি হত৷ এখন পশু বলি হয়না।
আর প্রতিবছর কালীপুজোর আগে মন্দিরের রঙ লাল করা হয়|

আজকের এই পর্ব এখানেই শেষ করছি।আবার পরের পর্বে নতুন কোনো কালী মন্দির নিয়ে
ফিরে আসবো কালী কথায়। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – প্রসন্নময়ী কালী

কালী কথা – প্রসন্নময়ী কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার বিখ্যাত কালী মন্দির গুলির মধ্যে অনেকগুলি ব্রিটিশ আমলের জমিদারদের পৃষ্ঠেপোষকতায় গড়ে উঠেছিল যাদের ঘিরে আছে নানা রকম অলৌকিক ঘটনা। এমনই এক কালী মন্দির আছে উত্তর চব্বিশ পরগনার গোবর ডাঙায়

যা প্রসন্ন ময়ী কালী নামে খ্যাত।আজ কালী কথায় এই ঐতিহাসিক কালী মন্দির নিয়ে লিখবো।

 

শোনা যায় স্থানীয় জমিদারবাবুর স্ত্রীর গর্ভে কোন পুত্রসন্তান না হওয়ায় তিনি খুবই মনঃকষ্টে ছিলেন। সেই সময় এক সন্ন্যাসী এসে তাঁকে কালীমাতার প্রসাদী ফুল দৈব,ওষুধ হিসাবে ধারণ করতে বলেন। কিছু দিন পর সন্তান লাভ হয়। মনে করা হয় ওই ওষুধ ধারণের ফলে তার স্ত্রী ওই

পুত্রসন্তান লাভ করেন। কালী মাতা প্রসন্ন হয়ে এই পুত্রসন্তান দেওয়ায় সেই পুত্রের নাম রাখা হয় কালীপ্রসন্ন এবং কালীমাতার প্রসাদে পুত্রসন্তান লাভ করায় জমিদার বাবু কালীমূর্তি ও কালীমন্দির স্থাপনে উদ্যোগী হন। কিন্তু মন্দির নির্মাণ কার্য শেষ হওয়ার আগেই তার মৃত্যু হয় এবং পরবর্তীতে পুত্র কালীপ্রসন্ন জমিদার হন এবং মন্দির নির্মাণ কার্য শেষ করেন। এই কালী মন্দির প্রসন্ন ময়ী কালী মন্দির নাম প্রসিদ্ধ হয়।

 

বংশের রীতি মেনে আজও ওই বংশের প্রতিটি পুরুষের নামের সঙ্গে ‘প্রসন্ন’ শব্দ যুক্ত করা হয়।

তারা মনে করেন এই পরিবারে দেবী কালীর বিশেষ আশীর্বাদ রয়েছে।

 

প্রসন্ন ময়ী কালী মন্দির উঁচু ভিত্তি বেদির উপর প্রতিষ্ঠিত। দক্ষিণমুখী মন্দিরটি একটি দালান বিশিষ্ট।গর্ভগৃহে শ্বেত পাথরের বেদির উপর শায়িত স্বেত পাথরের শিবের উপর দণ্ডায়মানা প্রায় ২.৫ ফুট উঁচু কষ্টি পাথরের সুন্দর কালিকা মূর্তি প্রতিষ্ঠিত।

 

প্রায় চারশো বছরের পুরোনো এই মন্দিরে প্রতিটি বিশেষ তিথি যেমন কৌশিকী বা দীপান্বিতা অমাবস্যায় উৎসব উপলক্ষ্যে আশেপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে অনেক লোকের সমাগম হয়। শনি-মঙ্গলবারে অনেকে মনোস্কামনা পূরণের জন্য পূজাও দিয়ে থাকেন।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে। অন্য কোনো প্রাচীন কালী মন্দিরের ইতিহাস সমৃদ্ধ লেখা

নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – চঞ্চলা কালী 

কালী কথা – চঞ্চলা কালী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বালুরঘাট শহরের প্রাচীন কালী পুজো পূজো গুলির অন্যতম চঞ্চলা কালী নিয়ে

আজকের কালী কথা।

 

প্রায় তিনশো বছর ধরে পুজো চলছে এখানে শোনা যায় কোনো এক সময়ে এখান থেকে কিছু অলৌকিক নিদর্শন খুঁজে পাওয়া গিয়েছিল। তখন স্থানীয় রাজা এই পুজোর প্রচলন করেন। রাজার মৃত্যুর পর কিছুকাল পুজো বন্ধ থাকলেও পরবর্তীতে এই এলাকার এক বাসিন্দা স্বপ্নাদেশ পেয়ে স্থানীয় জমিদারের সহযোগিতায় আবার পুজোর সূচনা করেন।দেবী এখানে

চঞ্চলা কালী নামে প্রসিদ্ধা।

 

বালুরঘাট শহরের হোসেনপুরের কাছে চকবাখর গ্রামে রয়েছে এই চঞ্চলা কালী। প্রতি বছর এখানে দোলপূর্ণিমার পরের দিন গভীর রাতে চঞ্চলা কালীর পুজো হয়।সাধারণত কালীর পায়ের নিচে শিবের দেখা মিললেও এই কালীর পায়ের নিচে অশুর রয়েছে। অন্য পায়ের নিচে আছে সিংহ। বলা হয়, মহামায়া ও চামুণ্ডার এক রূপ এই চঞ্চলা কালী মাতা।দেবীর উচ্চতা সাড়ে দশ হাত এবং চঞ্চলা কালী মাতার হাতের সংখ্যা আট।

 

চঞ্চলা কালীর মন্দিরের পাশেই রয়েছে শ্মশান কালী এবং মাশান কালীর মন্দির। মা চঞ্চলার পুজোর পরের দিন এঁরা তন্ত্র মতে ভক্তিভরে পূজিতা হন। এখানে রয়েছে একটি পুকুর। জনশ্রুতি রয়েছে এই পুকুর থেকে একসময় পূজোর কাজের জন্য থালা-বাসন ভেসে উঠত।পূজোর পর আবার সেগুলি জলাশয়ে রাখা হতো।বর্তমানে এই পুকুরের জল দিয়েই মায়ের পুজো সম্পন্ন করা হয়।

 

দেবী মন্দিরের সামনে রয়েছে নাটমন্দির যেখানে পুজোর পরে দুদিন রাতভর মঙ্গলচন্ডীর গান শোনানো হয়।প্রায় তিনশো বছরের পুরোনো এই পুজোয় শুধু দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার নয়, বিহার, ঝাড়খণ্ড সহ প্রতিবেশী রাজ্যের ভক্তরাও আসেন।

 

আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে। কালী কথা নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে উপস্থাপনা

চলতে থাকবে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – তারাশঙ্করী পীঠ

কালী কথা – তারাশঙ্করী পীঠ

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ কালী কথায় কলকাতার বেলগাছিয়া অঞ্চলে অবস্থিত এক প্রসিদ্ধ কালী মন্দির
নিয়ে লিখবো যা তারাশঙ্করী পীঠ নামে প্রসিদ্ধ।

শাস্ত্রে উল্লেখিত শক্তি পীঠ নাহলেও তারাপীঠের মতো এটিকেও একটি সিদ্ধপীঠ রূপে দেখা হয়। ১৯৫২ সালে মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন যোগী মহারাজ পরেশচন্দ্র রায় মৌলিক এবং তন্ত্রমতে মায়ের আরাধনা শুরু করেন ।

শোনা যায় অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন যোগী মহারাজ পরেশচন্দ্র রায় মৌলিক। তিনি ভবিষ্যত দেখতে পারতেন।একবার তৎকালীন এক নামি রাজনীতি বিদ এই মন্দিরে এসেছিলেন তখন মাতৃ সাধক ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেছিলেন তিনি সাংসদ হিসেবে নির্বাচিত হবেন এবং মন্ত্রী হবেন।পরবর্তীতে বাস্তবে হয়েছিল ঠিক তেমনটাই।
এমন বহু ঘটনা আছে যা থেকে তাঁর খ্যাতি
ছড়িয়ে পরে গোটা বাংলায়।

বহু প্রাচীন কাল থেকে একটি অদ্ভুত রীতি পালিত হয় এই মন্দিরে|মন্দির প্রতিষ্ঠার সময় বারাণসীর মণিকর্নিকা মহাশ্মশান থেকে এক সধবার চিতার আগুন আনা হয় এখানে সেই থেকে আজ পর্যন্ত জ্বলছে সেই চিতার আগুন|অত্যন্ত পবিত্র অগ্নি রূপে এই আগুন কে শ্রদ্ধা করা হয় এই মন্দিরে|

মা তারার পাশাপাশি এই মন্দিরের পূজিত হন যশমাধব।তার মূর্তি নিমকাঠের তৈরি যা আনা হয়েছিলো বাংলাদেশ থেকে।নিত্য পুজোয়
যশমাধবকে দেওয়া হয় নিরামিষ ভোগ।
একই সঙ্গে তারাশঙ্করী পীঠে পূজিত হন কালভৈরব|তারাশঙ্করী পীঠের আরও এক আকর্ষণ হল ‘নরমুণ্ডি আসন’। বাঘ, হাতি, শেয়াল, সাপ, অপঘাতে মৃত ব্যক্তি, চণ্ডাল ইত্যাদির ৯টি মাথার খুলি দিয়ে সজ্জিত এই আসন তন্ত্র সাধনায় ব্যাবহিত হতো।

প্রায় প্রত্যেক বিশেষ তিথিতে এবং অমাবস্যায় এখানে বিশেষ পুজো এবং হোম যজ্ঞর আয়োজন হয়।সেই সময়ে বহু মানুষের ভিড় হয়
এই মন্দির প্রাঙ্গনে।

আগামী পর্বে আবার ফিরে আসবো অন্য কোনো কালী মন্দিরের কথা নিয়ে কালী কথায়।ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে এই
আধ্যাত্মিক লেখা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

কালী কথা – সাত ভাইয়ের কালী পুজো 

কালী কথা – সাত ভাইয়ের কালী পুজো

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ কালী কথায় আপনাদের এককালের অবিভক্ত বাংলার একটি প্রসিদ্ধ ডাকাত কালী পূজোর কথা জানাবো।যে পুজো সাত ভাইয়ের পুজো নামে খ্যাত।অবশ্য সাত ডাকাতের পূজো বললেও ভুল বলা হয়না কারন সাত ভাই ছিলো ডাকাত এবং তারাই শুরু করে এই কালী পূজো।

 

এই পুজোর ইতিহাস বেশ প্রাচীন এবং বর্ণময় অবিভক্ত বাংলার যশোরের কাছে বাস করতো এক পরিবার। সাত ভাইয়ের পরিবারে সবাই ছিলো ডাকাত।জলে জঙ্গলে ঘেরা এই অঞ্চল তখন দাপিয়ে বেড়াতো এই সাত ভাইয়ের ডাকাত দল। শোনা যায় তাদের নামে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খেতো।

 

এক বার যশোর জমিদার বাড়িতে ডাকাতি করতে যায় সাত ভাই দল।সেখানেই ঘটে এক অলৌকিক ঘটনা।শোনা যায়, ডাকাতি করে ফেরার সময় ডাকাতদের উদ্দেশ্যে সেই বাড়ির মন্দিরের কালীঠাকুর বলেছিলেন, ’’ তোরা সব কিছু নিয়ে যাচ্ছিস, আমাকে নিবি না?’’ এই শুনে ডাকার দল কালীঠাকুরকে সঙ্গে নিয়ে যায়।

 

কিন্তু কোথায় রাখবে দেবীপ্রতিমাকে এবং কেই বা করবে পুজো।শেষ পর্যন্ত আলোচনা করে প্রায় তিনশো কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে বনগাঁর ইছামতি নদীর ধারে এসে হাজির হল ডাকাত দল। বন-জঙ্গলে ঘেরা বট গাছের নীচে

প্রতিষ্ঠা করা হল কালীমূর্তি তারপর দেবীপুজোর জন্য ডাকাত দল পুরোহিতের খোঁজে বের হয়। স্থানীয় এক চক্রবর্তী পুরোহিতকে খুঁজে পায় তারা

সেই পরিবারের এক ব্রাহ্মণ সন্তান

পুজোর ভার নেন।

 

সেই থেকে চলে আসছে এই সাত ভাইয়ের পুজো।অতিক্রান্ত হয়েছে কয়েকশো বছর। আজও সেই চক্রবর্তী পরিবারই বংশপরম্পরায় পুজো করে আসছেন।এখন বহু মানুষে এখানে আসেন পুজো দিতে। নিজেদের মনোস্কামনা জানাতে।এই স্থান এখন এক জনপ্রিয় এবং প্রসিদ্ধ কালী তীর্থে পরিণত হয়েছে।

 

বাংলায় যেমন কালী মন্দিরের অভাব নেই তেমনই এই সব কালী মন্দির বা কালী পুজো নিয়ে গল্প এবং অলৌকিক ঘটনার কোনো অভাব নেই।

ফিরে আসবো পরের পর্বে কালী কথা নিয়ে

এখনো অসংখ্য কালী পুজোর ইতিহাস নিয়ে আলোচনা বাকি আছে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।দেখতে থাকুন।