Home Blog Page 27

নব রাত্রি – দেবী মহাগৌরী

নব রাত্রি – দেবী মহাগৌরী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দেবীর অষ্টম রূপ হল মহাগৌরী রূপ।দেবী কালরাত্রির উগ্রতা এবং ক্রোধ ত্যাগ করে দেবী মহা গৌরী রূপে শান্তি এবং মৈত্রীর বার্তা দেন।

 

মহাগৌরী শব্দের আভিধানিক অর্থ ধরলে মহা মানে মহান। আর গৌরী মানে ফর্সা।এই দেবীর রূপ এতই ফর্সা যে তাঁকে শঙ্খ, চাঁদ আর জুঁই ফুলের সঙ্গে তুলনা করা হয়।

 

শাস্ত্র মতে হিমায়লকন্যা ছিলেন গৌরবর্ণা। শিবের জন্য কঠোর তপস্যা করে রৌদ্রে তিনি কৃষ্ণবর্ণা হন| মহাদেব যখন গঙ্গাজল দিয়ে তাকে স্নান করান, তখন তিনি হয়ে ওঠেন পুনরায় গৌর বর্ণা|দেবীর এই রূপের নাম হয় মহাগৌরী|

 

দেবী এই রূপে হাতির পিঠে চার হাতে অস্ত্র নিয়ে বিরাজ করেন |আগেই বলেছি মহা গৌরী গায়ের রং শ্বেতবর্ণ, তিনি শান্ত প্রকৃতির দেবী। আট বছরের বালিকা রূপে তিনি পূজিতা হন। দেবীর এক হাত শোভিত বরাভয় মুদ্রায়। বাকি তিন হাতে থাকে পদ্ম, ত্রিশূল এবং ডমরু।

 

শাস্ত্র মতে এই রূপের পুজোয় কেটে যায় বিবাহ সম্পর্কিত বাধা।যাদের বিবাহে বিলম্ব বা বাঁধা আসছে অথবা বিবাহিত জীবন সুখের নয় তারা এই দেবীর আশীর্বাদে সমস্যার সমাধান পেতে পারেন।দেবী পরম পবিত্রতার প্রতীক এবং

অত্যন্ত করুণাময়ী।সাধকরা মনে করেন দেবী পার্বতীর এই স্বরূপ পরমসাত্ত্বিকের আধার।

তার দর্শন মাত্র মনের ভয় এবং অশান্তি দুর হয়।

 

কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের কাছে অন্নপূর্ণা মন্দিরে দেবী মহা গৌরী বিরাজ করছেন।অনেকেই কাশীতে আসেন দেবীর আশীর্বাদ পেতে।

 

নব রাত্রি উপলক্ষে বিশেষ পর্বে দেবীর পরবর্তী রূপ নিয়ে।ফিরে আসবো। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নব রাত্রি – দেবী কাল রাত্রি

নব রাত্রি – দেবী কাল রাত্রি

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

নব দুর্গার সপ্তম রূপ হল কালরাত্রি।যার পুজো হয় নব রাত্রির সপ্তম রাতে।আজ দেবীর এই রূপের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আপনাদের জানাবো।

 

বিভিন্ন অস্ত্র ও গহনায় সজ্জিত হয়ে দেবী ধরা দেন কালরাত্রি রূপে|দেবী কৃষ্ণবর্ণা ও ত্রিনয়না|দেবীর বাহন গর্ধব|চতুর্ভুজা দেবী ভীষণদর্শনা|দেবীর তিন হাতে অস্ত্র | এক হাতে ভক্তদের প্রতি বরাভয়।

অর্থাৎ একই সাথে দেবী ক্রোধন্বিতা আবার দয়াশীলা।

 

দেবীর কালরাত্রি রূপের আরাধনায় কেটে যায় সব সংকট| শাক্ত শাস্ত্রানুযায়ী একজন প্রকৃত সাধকের

মন কাল রাত্রির আবির্ভাবের রাতে সম্পূর্ণভাবে মাতা কালরাত্রির স্বরূপে বিলীন হয়ে যায় যদি তার সাধনা শাস্ত্র সম্মত এবং ত্রুটি মুক্ত হয়।

 

শাস্ত্র মতে দেবীর সাক্ষাৎ পেলে সাধক মহাপুণ্যের ভাগী হন। তাঁর সমস্ত পাপ ও বাধাবিঘ্ন নাশ হয় এবং তিনি অক্ষয় পুণ্যধাম প্রাপ্ত হন।দেবী কালরাত্রি দুষ্টের দমন করেন, অশুভ গ্রহের বাধা দূর করেন এবং ভক্তদের আগুন, জল, হিংস্র জন্তু জানোয়ার, শত্রু ও রাত্রির ভয় থেকে মুক্ত করেন।দেবী কালরাত্রির উপাসনা করলেই দৈত্য, দানব, রাক্ষস, ভূত ও প্রেত পালিয়ে যায়।কালরাত্রির রূপ ভয়ংকর হলেও তিনি শুভফলের দেবী।তার অপর নাম শুভঙ্করী।

 

চলছে নব রাত্রি।এখনো দেবীর কয়েকটি রূপের বর্ণনা বাকি আছে আগামী পর্বে ফিরবো দেবীর পরবর্তী রূপ নিয়ে|পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নব রাত্রি – দেবী কাত্যায়নী

নব রাত্রি – দেবী কাত্যায়নী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ নব রাত্রির ষষ্ঠ রাত। আজ পুজো করা হয় দেবী কাত্যায়নীর। আজকের পর্বে জানবো দেবী দুর্গার কাত্যায়নী রূপ সম্পর্কে।জানাবো তার রূপের মাহাত্ম এবং ব্যাখ্যা।

 

একটি ব্যাখ্যাঅনুসারে ঋষি কাত্যায়ন প্রথম দেবী দুর্গাকে পূজা করেছিলেন বলে তার নাম অনুসারে দেবীর নাম হয় ‘কাত্যায়নী’।আবার অনেকে বলেন ঋষি কাত্যায়ন দেবী দুর্গাকে কন্যারূপে লাভ করার জন্য তপস্যা করেছিলেন। তাঁর তপস্যায় তুষ্ট হয়ে দেবী দুর্গা কাত্যায়নের কন্যা রূপে জন্মগ্রহণ করে ‘কাত্যায়নী’ নামে পরিচিতা হন।

 

দেবী কাত্যায়নী চতুর্ভুজা–তাঁর ডানদিকের দুটি হাত বর ও অভয়মুদ্রা প্রদর্শন করে, বাঁ দিকের দুই হাতে পদ্ম ও খড়্গ। দেবী সিংহবাহিনী। তাঁর গায়ের রং সোনার মতো উজ্জ্বল।তন্ত্রসার-এর ধ্যানমন্ত্রে তাঁকে বর্ণনা করা হয়েছে দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনী রূপে। আবার হরিবংশ গ্রন্থের বর্ণনা অনুযায়ী, তিনি অষ্টাদশভুজা।পতঞ্জলির মহাভাষ্য ও কৃষ্ণযজুর্বেদীয় তৈত্তিরীয় আরণ্যক-এ কাত্যায়নীর উল্লেখ রয়েছে। দেবীর মাহাত্ম বর্ণিত হয়েছে মার্কণ্ডেয় পুরাণ-এর অন্তর্গত শ্রীশ্রীচণ্ডী, দেবীভাগবত পুরাণ, কালিকা পুরাণ এবং বামন পুরানে।

 

শাস্ত্রে উল্লেখ আছে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণা চতুর্দশীর দিন দেবী কাত্যায়নীর জন্ম। তারপর শুক্লা সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীর দিন ঋষি কাত্যায়নের পূজা গ্রহণ করে দশমীর দিন তিনি যুদ্ধ খেত্রে অসুররাজকে বধ করেছিলেন।

 

গৃহস্তরা দেবী কাত্যায়নীর পূজা করলে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ–এই চার ফল লাভ করে এবং তার সমস্ত রোগ-শোক-ভয়এবং জন্ম-জন্মান্তরের পাপ দুর হয় ।

 

ভাগবত পুরাণ-এ আছে, বৃন্দাবনের গোপীগণ কৃষ্ণকে পতিরূপে পাওয়ার জন্য সারা মাঘ মাস জুড়ে কাত্যায়নী ব্রত পালন করেছিলেন। তাই মনোমত স্বামী প্রার্থনায় এক মাস ধরে কাত্যায়নী ব্রত পালনেরও প্রথা রয়েছে।

 

কাশীর আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরের গর্ভগৃহের একটি কুলুঙ্গিতে দেবী কাত্যায়নীর মূর্তি প্রতিষ্ঠিত।স্বামী বিবেকানন্দের মা ভুবনেশ্বরী দেবী এই আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরে মানত করেই স্বামীজিকে পুত্ররূপে লাভ করেছিলেন বলে জনশ্রুতি আছে|আত্মাবীরেশ্বর মন্দিরে অষ্টভূজা মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি রয়েছে|মূর্তিটি কষ্টিপাথরে নির্মিত, উচ্চতা এক হাত।আত্মাবীরেশ্বর শিবই দেবী কাত্যায়নীর ভৈরব।নবরাত্রির ষষ্ঠ দিনে এখানে

প্রচুর ভক্তসমাগম হয়।

 

নব রাত্রি উপলক্ষে চলবে ধারাবাহিক ভাবে দেবীর নয়টি রূপ নিয়ে আলোচনা|আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে|দেবীর পরবর্তী রূপ নিয়ে|পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নবরাত্রি – দেবী স্কন্দ মাতা

নবরাত্রি – দেবী স্কন্দ মাতা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

চলছে নব রাত্রি।আজ নবরাত্রির পঞ্চম দিনে দেবী স্কন্দ মাতার পূজাকরা হয়।আজ দেবী স্কন্দ মাতার মাহাত্ম এবং দেবীর স্বরূপ ব্যাখ্যা করবো।

 

শিব এবং দেবী পার্বতীর পুত্র কার্তিকের আরেক নাম স্কন্দ তাই স্কন্দমাতা পার্বতীজির অপর নাম। দেবী স্কন্দমাতা শিশু স্কন্দকে কোলে নিয়ে থাকেন।

দেবী চতুর্ভুজা এক হাতে তিনি স্কন্দকে ধরে রেখেছে। যেখানে অন্য দুটি হাতে তিনি দুটি পদ্ম ধারণ করেন এবং তার চতুর্থ হাতটি আশীর্বাদ দেয়ার জন্য ব্যাবহিত হয়|

 

পুরাণ অনুযায়ী দেবী স্কন্দমাতা আগুনের দেবী।তিনি স্বেত বর্ণের দেবী। দেবী একটি পদ্মের উপর বিরাজ করছেন।তিনি তার ভক্তদের অমূল্য জ্ঞান দান করেন।

 

যারা নবরাত্রির পঞ্চম দিনে বাড়িতে স্কন্দমাতার পুজো করবেন তারপর প্রথমে গঙ্গাজল দিয়ে গৃহ শুদ্ধ করুন। একটি রৌপ্য, তামা বা মাটির পাত্রে নারকেল রেখে তার পাশে একটি কলস স্থাপন করুন তাতে সাতটি সিন্দুর বিন্দু স্থাপন করুন।পুজোর সময়ে নীল বর্ণের পোশাক পড়বেন এবং ভোগে কলা অবশ্যই রাখবেন।

 

তারপর বৈদিক ও সপ্তশতী মন্ত্রের মাধ্যমে ষোড়শপচার সহ দেবীর ধ্যান করুন।

তারপর পুজোর সময় মাতৃদেবীর এই মন্ত্রটি এগারো বার জপ করা উচিত-

 

“যা দেবী সর্বভূতেষু মা স্কন্দমাতা রূপেন সংস্থা।নমস্তস্য নমস্তস্য নমস্তস্য নমো নমঃ ”

 

স্কন্দমাতার এই মন্ত্রটি জপ করলে আপনার বাড়িতেও সুখ শান্তি ও সমৃদ্ধি বিরাজ করবে।

সন্তান ভাগ্য ভালো হবে।দেবীর পুজোর পর প্রসাদ শিশুদের মধ্যে বিলিয়ে দিন এতে দেবী সন্তুষ্ট হবেন এবং কৃপা করবেন।

 

 

দেবীর পরবর্তী রূপ এবং তাঁর শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নবরাত্রি – দেবী কুষ্মান্ডা

নবরাত্রি – দেবী কুষ্মান্ডা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

নব রাত্রি উপলক্ষে পূজিতা দেবী দুর্গার চতুর্থ রূপ হলো কুষ্মাণ্ডা রূপ এই রূপে দেবী পূজিতা হন আজ অর্থাৎ নব রাত্রির চতুর্থ রাত্রে।আজকের পর্বে দেবীর এই রূপ নিয়ে লিখবো।জানাবো এই রূপের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।

 

দেবীর এই নাম এর যুক্তি সম্মত নিদ্দিষ্ট শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা আছে ‘কু’ শব্দের অর্থ কুৎসিত এবং ‘উষ্মা’ শব্দের অর্থ ‘তাপ’; ‘কুষ্মা’ শব্দের একত্রিত অর্থ কুৎসিত বা তাপ কে হরণ করেন যিনি। কুষ্মান্ডা রূপে দেবী জগতের সকল দুঃখ কষ্ট বা কিছু আপাত দৃষ্টিতে কুৎসিত সব কিছুকে গ্রাস করে নিজের উদরে ধারণ করেন তাই তার নাম ‘কুষ্মাণ্ডা’।

 

মহাপ্রলয়ের পরে যখন সর্বত্র শুধু নিশ্ছিদ্র অন্ধকার ছেয়ে রয়েছে, তখন এই দেবী কুষ্মাণ্ডা নব রূপে ব্রহ্মাণ্ড সৃষ্টি করেছিলেন|

দেবী অষ্টভুজা” নামেও পরিচিতা আবার দেবীকে “কৃষ্ণমাণ্ড” নামেও ডাকা হয়|

দেবী সিংহবাহিনী ও ত্রিনয়নী দেবীর হাতে থাকে সুদর্শনচক্র, ধনুর্বাণ, রক্তপদ্ম, কমণ্ডলু, অমৃত কলস ও জপমালা|

 

কাশীতে দেবী কুষ্মাণ্ডার মন্দির বিখ্যাত রয়েছে এবং কাশীতে তিনি দুর্গা রূপেই পূজিতা হন।

তিনি কাশীর দক্ষিণ দিকের রক্ষয়িত্রী। কাশীখণ্ড তে উল্লেখ রয়েছে, অসি নদীর সঙ্গমস্থলে কুষ্মাণ্ডার অধিষ্ঠান।

 

শাস্ত্র মতে দেবীর কুষ্মান্ডা রূপের আরাধনায় বৈভব, সুখ সমৃদ্ধি ও যশ এবং খ্যাতি বাড়ে

বলে মনে করা হয়|মনে করা হয়, দেবী কুষ্মাণ্ডা অল্প পূজাতেই সন্তুষ্ট হন। তার পূজায় কুষ্মাণ্ড বা কুমড়ো বলি দেওয়ার রীতি প্রচলিত আছে।

 

আপনারাও নবরাত্রির এই পবিত্র পবিত্র তিথিতে দেবীকে স্মরণ করে প্রনাম করুন এবং শুদ্ধ দেহ এবং শুদ্ধ চিত্তে মনোস্কামনা জানান। আপনার মনোস্কামনা দেবীর আশীর্বাদে পূর্ন হবে।

 

ফিরেআসবো আগামী পর্বে দেবীর পরবর্তী রুপ নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনায়।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নবরাত্রি – দেবী চন্দ্র ঘন্টা

নবরাত্রি – দেবী চন্দ্র ঘন্টা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

নব রাত্রি উপলক্ষে দেবীর প্রথম ও দ্বিতীয় রুপ নিয়ে আগে লিখেছি আজ দেবীর তৃতীয় রুপ

নিয়ে লিখবো।

 

নবরাত্রিতে তৃতীয় দিনে পূজিতা হন নব দুর্গার তৃতীয় রূপ অর্থাৎ চন্দ্র ঘন্টা|পুরান অনুসারে শিব পার্বতীর বিবাহের সময় হঠাৎ তারকাসুর প্রেত পিশাচ দৈত দানব সহ আক্রমণ করে বসে তখন দেবী পার্বতী এক দশ ভুজা রুপী মঙ্গলময়ী দেবী রূপে চন্দ্র সম বিশাল শুভ ঘণ্টা বাজিয়ে সকল অশুভ শক্তি কে নিরস্ত্র করেন।দেবীর এই রূপ চন্দ্র ঘন্টা নামে পরিচিত|

 

দেবীর আবির্ভাব সম্পর্কে আরো একটি ব্যাখ্যা প্রচলিত আছে যেখানে মনে করা হয় শিব

বিবাহ কালে চন্ড রূপ ধারণ করলে তাকে দেখে মেনকা সহ উপস্থিত অথিতিরা ভীত হয়ে পড়েন তখন দেবী পার্বতী শিবের এই রূপের প্রত্যুত্তরে চন্দ্রঘণ্টা রূপ ধারণ করেন। দেবীর এই রনমূর্তি দেখে শিব তার নিজের চন্ড রূপ ত্যাগ করে বিবাহের জন্যে নিজের সৌম ও শান্ত রূপে ফিরে আসেন|

 

দেবী চন্দ্রঘন্টা তৃতীয় নয়ন দ্বারা সমৃদ্ধ যা শুধুমাত্র যুদ্ধের সময় খোলে।দেবীর মস্তকে অর্ধচন্দ্র থাকে , তাই দেবীকে চন্দ্রঘণ্টা নামে ডাকা হয় । দেবীর শরীরের রং স্বর্ণের মতো উজ্জ্বল । এই দেবী দশভুজা । দেবীর হাতে কমণ্ডলু , তরোয়াল , গদা , ত্রিশূল , ধনুর্বাণ , পদ্ম , জপ মালা থাকে| দেবীর বাহন সিংহ যা তেজ এবং পরাক্রমের প্রতীক আবার একই সঙ্গে দেবীর প্রতি সম্পূর্ণ স্মরনাগতি বা পূর্ন সমর্পনকে প্রকাশিত করে।

 

নব রাত্রির তৃতীয় দিনে দেবী চন্দ্র ঘন্টাকে মনে মনের স্মরণ করুন এবং দেবীকে প্রনাম জানিয়ে দেবীর উদ্দেশ্যে একটি প্রদীপ ঘি বা তিলের তেল দিয়ে জ্বালান এবং দেবীর কাছে প্রার্থনা করুন। সংসারের মঙ্গল হবে।

 

আগামী দিনের পর্বে দেবীর চতুর্থ রূপ নিয়ে ফিরে আসবো। নব রাত্রি উপলক্ষে চলতে থাকববে এই ধারাবাহিক আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নবরাত্রি – দেবী ব্রহ্মচারিনী

নবরাত্রি – দেবী ব্রহ্মচারিনী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

নব রাত্রির দ্বিতীয় দিনে ব্রহ্মচারিনীর বেশে

ধরা দেন মা অর্থাৎ দেবীর দ্বিতীয় রূপটি হলো ব্রহ্মচারিনী।

 

এখানে ‘ব্রহ্ম’ শব্দের অর্থ হল তপস্যা। ব্রহ্মচারিণী অর্থাৎ তপস্বীনি|ভগবান শঙ্করকে পতিরূপে লাভ করার জন্য দেবী পার্বতী কঠিন তপস্যা করেন। সেই কঠিন তপস্যার জন্য তাকে তপশ্চারিনী বা ব্রহ্মচারিণী বলা হয়। দেবীর এই রূপের পুজো হয় নবরাত্রির দ্বিতীয় দিনে।

 

দেবীর তপস্যা সার্থক হয় এবং বিবাহ হয় শিব ও পার্বতীর। বিবাহের পরে জন্ম নেন তাঁদের সন্তান কার্তিক বা ষড়ানন যিনি দেব সেনাপতি হন এবং বধ করেন তারকাসুরকে।

 

দেবীর ব্রহ্মচারিণীর রূপ জ্যোতিতে পূর্ণ, অতি মহিমামণ্ডিত কিন্তু স্নিগ্ধ এবং শান্ত।তিনি ডান হাতে জপের মালা এবং বাঁ হাতে কমণ্ডলু ধারণ করে আছেন। প্রেম, আনুগত্য, প্রজ্ঞা এবং জ্ঞানের প্রতীক হিসেবেও তিনি পরিচিত। সাদা রঙ দেবীর প্রিয় তাই দেবী ব্রহ্মচারিনীর পুজোয় স্বেত চন্দন ও সাদা ফুল ব্যাবহার হয়|

 

শাস্ত্রে আছে এই রূপের পূজায় বৃদ্ধি পায় মনোসংযোগ এবং সব ভয় সংশয় ও মানসিক দুর্বলতা দূর হয়|এছাড়া এই দেবীর আশীর্বাদে বিবাহিত জীবন সুখের হয় এবং সন্তান ভাগ্য ভালো হয় তাছাড়া দেবী পরম শান্তি এবং জ্ঞান দান করেন।

 

জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে দেবী ব্রহ্মচারিণী মঙ্গল গ্রহ শাসন করেন। যাদের মঙ্গল সংক্রান্ত কোনো গ্রহ দোষ আছে তারা দেবীর এই রূপের পুজো করলে ভালো ফল পাবেন।

 

পরবর্তী পর্বে দেবীর তৃতীয় রূপ এবং তার শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে ফিরে আসবো যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

নবরাত্রি – দেবী শৈলপুত্রী

নবরাত্রি – দেবী শৈলপুত্রী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

নবরাত্রি উপলক্ষে আজ

থেকে শুরু করছি দেবীর নয়টি রূপ নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা।আজ লিখবো

দেবীর প্রথম রূপ শৈল পুত্রী নিয়ে|

 

নবরাত্রি উৎসবের প্রথমদিনের পুজো হয় দেবী শৈলপুত্রীর।দেবী শৈলপুত্রীর আবির্ভাব হয়েছিলো একটি বিশেষ উদ্দেশ্যে।প্রজাপতি দক্ষএকবার বিরাট যজ্ঞ করেন ।তার যজ্ঞে সতী কে নিমন্ত্রণ করা হয়নি । সতী পিতৃ গৃহে যাবার জন্য অস্থির হলেন কিন্তু ভগবান শঙ্কর সাবধান করলেন যে কোন কারনে তিনি উমার উপর রেগে আছেন । কিন্তু সতীর মন মানল না তখন মহাদেব অনুমতি দিলেন যাবার জন্য । কিন্তু পিতৃ গৃহে গিয়ে পৌঁছে দেখলেন কেউ তাকে সেরকম স্নেহ ভরে কাছে ডাকছে না । একমাত্র মা জড়িয়ে ধরলেন । স্বয়ং দক্ষ তাকে নানা খারাপ কথা বললেন । তখন রাগে দুঃখে যজ্ঞাগ্নির সাহায্যে নিজে কে ভস্মীভূত করলেন ।সতীর এই পরিনতির সংবাদ শুনে শিব ও তার অনুগামীরা প্রচন্ড ক্রোধে দক্ষের যজ্ঞ ধ্বংস করলেন এবং দক্ষকে উচিৎ শিক্ষা দিলেন।

 

কিন্তু শিব আর পার্বতী এক এবং অভিন্ন তাই শিবের সঙ্গে পুনরায় মিলিত হতে সতীর পুনর্জন্ম হলো শৈলরাজ হিমালয়ের কন্যা রুপে।শৈলরাজ হিমালয়ের কন্যা হবার জন্য দেবীর এক নাম হয় শৈলপুত্রী এবং এই জন্মেই তিনিই পার্বতী রূপে শিবের অর্ধাঙ্গিনী হলেন|

 

 

দেবী শৈলপুত্রী সম্পর্কে বর্ণনা আছে কালিকা পুরাণে।দেবী শৈলপুত্রী আসলে প্রকৃতির দেবী। শৈলপুত্রীর বাহন বৃষ । এঁনার দক্ষিণ হস্তে ত্রিশূল আর বাম হস্তে কমল আছে তাই দেবীর অপর নাম শুলধারিনি|আবার তাকে দেবী হৈমবতী

বলেও ডাকা হয়।

 

শাস্ত্র অনুযায়ী ব্রহ্মার শক্তির প্রতীক হলেন দেবী শৈলপুত্রী কারন একবার দেব ও অসুরের যুদ্ধে ব্রহ্মা দেবতাদের জয়ী করেছিলেন। কিন্তু ব্রহ্মার শক্তি ভুলে দেবতারা জয়ের গৌরব নিজেরাই নিতে উদ্যত হলেন। ব্রহ্মদেব তখন নিজে এলেন দেবতাদের দর্পচূর্ণ করতে। তিনি একখণ্ড তৃণ রাখলেন দেবতাদের সম্মুখে। কিন্তু দেবতারা আশ্চর্য হয়ে দেখলেন, অগ্নি সেই তৃণখণ্ডটি দহন করতে বা বায়ু তা একচুল পরিমাণ স্থানান্তরিত করতে অসমর্থ হলেন। তখন ইন্দ্র এলেন সেই অনন্ত শক্তির উৎসকে জানতে। সেই মুহূর্তে ব্রহ্মশক্তি শৈলপুত্রীর রূপ ধারন করে দেবরাজ ইন্দ্র কে দেখা দিলেন।এই রূপেরই পুজো হয়। নবরাত্রির সূচনা লগ্নে।

 

নব রাত্রি উপলক্ষে ধারাবাহিক ভাবে চলবে এই আলোচনা|আগামী পর্বে দেবীর পরবর্তী রূপ

নিয়ে লিখবো । পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দেবী পক্ষের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

দেবী পক্ষের আধ্যাত্মিক তাৎপর্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আজ মহালয়া অর্থাৎ পিতৃ পক্ষের অবসান এবং দেবী পক্ষের সূচনা। আজকের এই বিশেষ পর্বে আপনাদের জানাবো মহালয়া বা দেবী পক্ষের সূচনার আধ্যাত্মিক তাৎপর্য এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা।

 

মহাভারতে উল্লেখ আছে যে কর্ণের মৃত্যুর পরে তার আত্মা স্বর্গে গমন করলে তিনি জানতে পারেন যে পিতৃ পুরুষের আশীর্বাদ থেকে তিনি বঞ্চিত কারন পিতৃপুরুষের আত্মার উদ্দেশ্যে কোনোদিনো কোনো খাদ্য দান করেননি।তাদের কাছে প্রার্থনা করেননি তাই তার পুন্য সঞ্চয় অসম্পূর্ণ।

তার উত্তরে কর্ণ বলেন, তিনি যেহেতু তার পিতৃপুরুষ সম্পর্কে অবহিত ছিলেন না। তাই তিনি অসহায় এবং অজ্ঞানতা বসত এই অন্যায় করে ফেলেছেন।তারপর কারণে কর্ণকে ষোলো দিনের জন্য মর্ত্যে গিয়ে পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়। সেই সময়

কালকে পিতৃপক্ষ বলা হয়।

 

এই তিথিতে তর্পন একটি শাস্ত্রীয় বিধি।

একটি শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা অনুসারে জীবিত ব্যক্তির পূর্বের তিন পুরুষ পর্যন্ত পিতৃলোকে বাস করেন। এই লোক স্বর্গ ও মর্ত্যের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত। পিতৃ পক্ষে এই আত্মারা উত্তর পুরুষের তর্পনের মাধ্যমে চীরমুক্তি লাভ করে এবং পরম ব্রহ্মর সাথে বিলীন হয়।

 

জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুসারে অনুযায়ী আবার সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়।এই সময় পূর্বপুরুষগণ আত্মা রূপে পিতৃলোক পরিত্যাগ করে তাদের উত্তরপুরুষদের গৃহে বা আশেপাশে অবস্থান করেন। এর পর সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করলে, তারা পুনরায় পিতৃলোকে ফিরে যান এবং দেবী পক্ষের সূচনা হয়।

 

যেহেতু মহালয়া মৃত্যু ও শোকের সাথে সংযুক্ত তাই শুভ মহালয়া বলা যায় কিনা তা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবে যেহেতু এই তিথিতে পিতৃ পক্ষের অবসান হয়ে দেবী পক্ষের সূচনা হয় তাই আসন্ন দেবী পক্ষের শুভেচ্ছা এবং শারদৎসবের আগাম শুভেচ্ছা দেয়াই যায়।

 

আবার যাদের জন্মছকে পিতৃ দোষ আছে তারা এই সময়ে গ্রহ দোষ খণ্ডন করালে পিতৃ দোষ থেকে স্থায়ী ভাবে রেহাই পেতে পারেন।

 

শুরু হচ্ছে নব রাত্রি ফিরে আসবো আগামী পর্বে নবরাত্রি উপলক্ষে বিশেষ ধারাবাহিক লেখনী নিয়ে।পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

সেনগুপ্ত বাড়ির দূর্গা পুজো

সেনগুপ্ত বাড়ির দূর্গা পুজো

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

ঝাড়গ্রামের বনেদি জমিদার পরিবার সেনগুপ্ত পরিবার। তাদের দূর্গাপুজোর ইতিহাস বেশ সমৃদ্ধ এবং বর্নময়। আজকের পর্বে এই প্রাচীন দুর্গাপূজা নিয়ে লিখবো।

দেশভাগের পরে সেনগুপ্ত বাড়ির বংশধররা ঝাড়গ্রামে এসে জমিদারি কিনে বসবাস শুরু করেন। তখন থেকেই ধুমধাম করে শুরু হয় দুর্গাপুজো। এই জমিদার বংশের অন্যতম প্রান পুরুষ রামগতি সেনগুপ্ত ছিলেন বেশ ধনি এবং প্রভাব শালী তাঁর সময় থেকে বাড়ির দুর্গাপুজোর জাঁকজমকের শুরু। সেই জাঁকজমক আজ ম্লান হলেও চলছে সেই প্রবাহমান ঐতিহ্য।

এই বাড়ির পুজোয় একচালার মূর্তি তৈরি হয়। দুর্গার ডানদিকে লক্ষ্মী ও কার্তিক আর দুর্গার বাঁ পাশে সরস্বতী ও গণেশ থাকেন। মূর্তির পাশাপাশি পুজোর বেশ কিছু বিশেষত্ব আছে যেমন কাঁচা ভোগ এবং শত্রু বলীর রীতি।

নবাবী আমলে মারাঠা বর্গীরা যখন বাংলার জমিদার বাড়ি গুলিকে নিশানা করছে তখন অত্যন্ত গোপনে পুজোর আয়োজন করা হতো। এমনকি ভোগ রান্না করা হতো না।সেই থেকেই কাঁচা ভোগ নিবেদনের রীতি আরম্ভ হয়।
এই বাড়িতে নবমীর দিন ‘শত্রু’ বলি’ দেওয়া হয়।
অর্থাৎ প্রতীকী অর্থে বলীর আয়োজন। এও এক বিশেষত্ব।

কাঁচা ভোগে থাকে আলু ,ফুলকপি, বেগুন, মুলো, কাঁচকলার মতো অন্তত পাঁচ রকম কাঁচা আনাজ।
আর শত্রু বলিতে কচুপাতার উপরে চালের গুঁড়ি দিয়ে তৈরি করা হয় মানুষের অবয়ব। তারপর সেই অবয়বকে বলি দেয়া হয় অশুভ শক্তির প্রতিক রূপে।

আজও সব রীতি নীতি বজায় রাখা হয়ে। পুজোর সময় নতুন করে সেজে ওঠে বাড়ির চন্ডী মণ্ডপ। পাড়া প্রতিবেশী সবাই যোগ দেন এই বাড়ির সেনগুপ্ত বাড়ির পুজোয়।

ফিরে আসবো এরকম একটি বনেদি বাড়ির দূর্গা পুজোর বর্ণময় ইতিহাস এবং ঐতিহ্য নিয়ে। পড়তে থাকুন। ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।