Home Blog Page 12

জগন্নাথদেবের ভোগ

জগন্নাথদেবের ভোগ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দির বিখ্যাত তার ভোগের জন্য কারন জগন্নাথ দেব ভোজন রসিক। তিনি খেতে ভালোবাসেন।

 

বলা হয় বিষ্ণু জগন্নাথ রূপে পুরীতে আসেন আহার গ্রহন করতে। পুরী ধামে গিয়ে তিনি ছাপ্পান্ন ভোগ গ্রহণ করেন।তাছাড়াও সারাদিনে নিয়ম করে তাকে নানা রকম সুস্বাদু খাবার দেয়া হয়।

 

জগন্নাথের ভোগে মূলত দুই ধরনের খাবার দেওয়া হয়। ভাত, ডাল, তরকারি, খিচুড়ি জাতীয় রান্না করা খাবার থাকে। আর থাকে খাজা, গজা, খই, মুড়কি জাতীয় শুকনো খাবার। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মোট ছয় বার ভোগ দেওয়া হয় জগন্নাথদেবকে। সব রান্নাই তৈরি হয় মন্দিরের নিজস্ব রন্ধনশালায়।সেই রান্নার আলাদা এবং অদ্ভুত কৌশল আছে। সে নিয়ে পরে কোনো সময়ে জানাবো।

 

সাধারণত সকাল সাত টায় নিদ্রা ত্যাগ করার পর জগন্নাথদেবকে প্রথম ভোগ দেওয়া হয়। এই ভোগকে বলা হয় ‘গোপালবল্লভা ভোগ’। এরপর জগন্নাথদেবের ভোগ হয় সকাল ১০টায়। যাকে বলা হয় ‘সকালা ধূপা’। তারপর থাকে রাজভোগ সকালের এই ভোগে থাকে কুড়ি রকমের পদ। সেগুলি হল, পিঠে-পুলি, বাদকান্তি, এন্ডুরি, মাঠা পুলি, দহি, অন্ন, হামসা কেলি, বড়া কান্তি, কাকাতুয়া ঝিলি ইত্যাদি যেগুলি ওড়িশার প্রাচীন পরম্পরা মেনে নির্মিত। আবার আদা পঁচেদি, বোঁদে ইত্যাদি মিষ্টিও থাকে

আর থাকে নানা রকম খিচুড়ি যেমন টাটা খিচুড়ি, নুখুরা খিচুড়ি, সানা খিচুড়ি, মেন্ধা মুন্ডিয়া, আধা আনিকা, তাইলে খিচুড়ি, সাগু ও দালা খিচুড়ি এবং কণিকা ভোগ যা আসলে একরকম পোলাও।

 

দুপুরের ভোগ মূলত অন্নভোগ। সেখানে থাকে ভাত, ডাল, শুক্তো, তরকারি ও পরমাণ্ণ। এছাড়াও থাকে ক্ষীর ও মালপোয়া। সন্ধেবেলায় দেওয়া হয় লেবু, দই দিয়ে মাখা পান্তাভাত। সঙ্গে খাজা, গজা এবং নানা ধরনের মিষ্টি। শয়নের আগে মধ্যরাতে ডাবের জল খেয়ে শুতে যান জগন্নাথ।

 

শুধু স্নান যাত্রার পর জ্বর থাকার এই কয়েকটি দিন বাদ দিয়ে সারা বছর চলতে থাকে এই জগন্নাথদেবের এই রাজকীয় আহার।

 

ফিরে আসবো প্রভু জগন্নাথ সংক্রান্ত আরো অনেক শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক বিষয় নিয়ে

আগামী পর্বগুলিতে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

প্রভু জগন্নাথের জ্বর এবং চিকিৎসা

প্রভু জগন্নাথের জ্বর এবং চিকিৎসা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

এবছরের মতো স্নান যাত্রা সমাপ্ত। এই মুহূর্তে জ্বরে ভুগছেন প্রভু জগন্নাথ।কারন প্রতি বছর স্নান যাত্রায় ১০৮ কলসি জল ঢেলে স্নান করানোর পরে জ্বর আসে জগন্নাথদেবের। এই সময় কি কি হয়

পুরীর মন্দিরে। কিভাবে জগন্নাথদেবের যত্ন নেয়া হয় এবং তার চিকিৎসা হয় সেইসব নিয়েই আজকের পর্ব।

 

জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রাকে এই সময়ে জ্বরের কারণে আলাদা রাখা হয়।এই সময়ে সাধারণ দর্শণার্থীদের সাথে সব রকম সাক্ষাৎ বন্ধ থাকে।

ঠিক ১৪ দিন এই অবস্থায় রাখা হয়। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানেও ভাইরাস আক্রান্ত রোগীকে

চোদ্দ দিন আলাদা রাখার পরামর্শ দেয় হয়। এই প্রথা বহু প্রাচীন কাল থেকে চলে আসছে জগন্নাথ মন্দিরে। আয়ুর্বেদ এবং কবিরাজি চিকিৎসা পদ্ধতি অনুসরণ করে এমন নিয়ম সৃষ্টি হয়েছে।

 

জগন্নাথদেব ভোজন রসিক তবে এই সময়ে ছাপ্পান্ন ভোগের পরিবর্তে এই সময় তাঁদের অসুখের উপযোগী সহজপাচ্য পুষ্টিকর খাবার ভোগ হিসেবে দেওয়া হয় এবং নিয়মিত আয়ুর্বেদ মতে তাঁদের চিকিত্‍সা চলে।প্রভুর শ্রী অঙ্গ মালিশ করে দেয়া হয় তাঁর কষ্ট লাঘবের জন্য।চিকিৎসা করেন নিদ্দিষ্ট একজন বৈদ্য যিনি রাজ বৈদ্যর মর্যাদা পান।

 

এই প্রক্রিয়াটি পুরীতে আনাসর নামে পরিচিত। এই সময়ে জগন্নাথের থাকার জন্য আলাদা কক্ষ আছে এবং সেই কক্ষটিও আনাসর কক্ষ

নামে পরিচিত।

 

জ্বরের সময়ে কি কি পথ্য এবং খাদ্য দেয়া হবে কি কি উপায়ে চিকিৎসা হবে তা খুব একটা প্রকাশ্যে আনা হয়না তবে প্রাচীন কিছু ওড়িয়া গ্রন্থে কিছু তথ্য লিপিবদ্ধ আছে। মূলত হাল্কা খিচুড়ি, মুগডাল, ঘোল পরিবেশন করা হয় এই সময়ে।ওষুধের মধ্যে তুলসী, আদা, দারুচিনি,মধু এবং কিছু কবিরাজি মিশ্রনের উল্লেখ পাওয়া যায়।

 

অদ্ভুত ভাবে এই সময়ে প্রভু জগন্নাথের দেহের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং তিনি সেরে উঠলে পুনরায় দেহের তাপমাত্রা স্বাভাবিক হয়ে যায়।

প্রভু সেরে উঠলে নেত্র উত্‍সব

পালন হবে সেদিন তাঁর নেত্র দান সম্পন্ন হবে।

তারপর রথযাত্রার চূড়ান্ত প্রস্তুতি শুরু হবে।

 

আবার জগন্নাথ দেব সংক্রান্ত বিশেষ

পর্ব নিয়ে ফিরে আসবো

আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

প্রভু জগন্নাথ এবং ভক্ত শালবেগ

প্রভু জগন্নাথ এবং ভক্ত শালবেগ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর জগন্নাথ দেব জগতের নাথ। সারাবছর তার মন্দিরে প্রবেশে অনেক বিধি নিষেধ আছে। সনাতন ধর্মের বাইরের কেউ তার মন্দিরে প্রবেশের অধিকার পায়না। তবে রথ যাত্রার সময় প্রভু নিজে বেরিয়ে আসেন মন্দির থেকে এবং জাতী ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে প্রভু তার ভক্তদের সাথে মিলিত হন।

তার অগণিত ভক্তদের মধ্যে একজন আছেন একটু ব্যতিক্রমী তার নাম শালবেগ আজ এই

বিশেষ ভক্ত নিয়ে লিখবো।

 

মুঘল বাদশাহ জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার গভর্নর ছিলেন জাহাঙ্গীর কুলি খান। এক হিন্দু ব্রাহ্মণ ঘরের মহিলাকে তিনি বিয়ে করেছিলেন। জগন্নাথের একনিষ্ঠ ভক্ত ছিলেন ওই মহিলা। তাদের সন্তান হলেন শালবেগ ধর্মে মুসলিম হলেও মায়ের প্রভাবে তিনি হয়ে উঠে ছিলেন জগন্নাথ দেবের পরম ভক্ত। কিন্তু পুরীর মন্দিরে অহিন্দুর প্রবেশ নিষিদ্ধ হওয়ায় তিনি কখনও জগন্নাথ দেবকে দর্শন করতে পারেননি।

 

ভক্ত সালবেগ বহু ভজন রচনা করেন এবং সর্বদা

ভক্তি রসে ডুবে থাকতেন। শোনা যায় একবার খুব

অসুস্থ্য হয়ে পড়েন এবং জগন্নাথের কৃপায়

পুনরায় সেরে ওঠেন।

 

মৃত্যুর আগে তিনি মন্দিরের কাছে একটি কুঁড়েঘর তৈরি করে সেখানেই জীবনের শেষ কটি দিন কাটিয়ে যান। প্রচলিত বিশ্বাস, শেষ শয্যায় ওই ভক্তের কান্না ঈশ্বরের হৃদয় স্পর্শ করে।তিনি শালবেগকে স্বপ্নে দেখা দিয়ে তাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে তিনি নিজে আসবেন তার সাথে দেখা করতে।

তারপর রথের দিন রথ সেই কুটিরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময়ে আচমকা রথের চাকা থেমে যায় এবং বহু চেষ্টায় রথের চাকা নড়ানো যায়নি। তারপর থেকে প্রতিবছর রথ যাত্রার সময়ে সেই

নিদ্দিষ্ট স্থানে রথ থামানো হয়।

 

এখন ওই স্থান একটি মাজারে পরিণত হয়েছে এবং প্রতি বছর রথযাত্রার সময় ওই মাজারের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ভক্তকে দর্শন দিয়ে যান প্রভু জগন্নাথ মুঘল আমল থেকে আজও এই প্রথা

চলে আসছে।

 

পুরীর মন্দির থেকে প্রায় দুশো মিটার দূরে অবস্থিত শালবেগ মাজার।জগন্নাথ ভক্তদের কাছে

এটিও একটিও বর্তমানে একটি দর্শনীয় স্থান।

 

প্রভু জগন্নাথের আরো এক লীলা নিয়ে

ফিরে আসবো আবার আগামী পর্বে।

যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি

জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি

জগন্নাথ দেবের মাসির বাড়ি

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আসন্ন স্নান যাত্রা উপলক্ষে শুরু করেছি প্রভু জগন্নাথকে নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা। আজকের পর্বে জগন্নাথদেবের মাসির বাড়ি বা গুন্ডিচা
মন্দির নিয়ে কিছু তথ্য আপনাদের জানাবো।

জগন্নাথ দেবের মাসি বা দেবী গুন্ডিচা সম্পর্ক
বহু কিংবদন্তী প্রচলিত আছে বহু প্রাচীন কাল থেকেই এবং বেশ কিছু লোকশ্রুতি ঘিরে রয়েছে পুরীর গুন্ডিচা মন্দিরকে।অনেকের মতে এই মন্দির আসলে স্থানীয় এক দেবীর। তাঁর নামই গুন্ডিচা। মনে করা হয়, তিনি দেবী দুর্গার রূপ।আদ্যা শক্তি মহামায়ার একটি রূপের প্রকাশ ঘটেছে গুন্ডিচা রূপে।

জনশ্রুতি আছে পুরীতে থাকা কালীন প্রতিবার রথের আগে নিয়ম করে গুন্ডিচা মন্দির পরিষ্কার করতেন চৈতন্য মহাপ্রভু। সেই রীতি বজায় রেখে এখনও পুরীর রথ যাত্রার সময়ে গৌড়ীয় মঠের সদস্যরা গুন্ডিচা মন্দির পরিস্কার করতে যান।

আবার স্থানীয়রা মনে করেন ওড়িয়া ভাষায় গুটিবসন্ত রোগকে ‘গুন্ডি’ বলা হয়। এই দেবী গুণ্ডিচা আসলে সেই রোগ নিরাময়ের দেবী।
অনেক টা আমাদের মা শীতলার ন্যায় গুন্ডিচা
দেবীও এক লৌকিক দেবী।

প্রভু জগন্নাথ বছরে সাতদিন কাটাতে আসেন এই দেবীর মন্দিরে এবং স্থানে বিশ্রাম করেন প্রভু সেই সময়ে একাধিক উৎসবের আয়োজন করা হয় গুন্ডিচা মন্দিরে।গোপীদের সঙ্গে লীলায় মত্ত হন জগন্নাথ তাই ছল করে দেবী লক্ষীকে জগন্নাথ মন্দিরে রেখে আসেন তিনি। তাই ফেরার সময়
স্ত্রী লক্ষ্মীর মানভঞ্জন করতে রস গোল্লা নিয়ে আসেন প্রভু জগন্নাথ।

শ্রী ক্ষেত্র পুরী এবং পুরীর রথ যাত্রার সাথে জড়িত অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্থান এই গুন্ডিচা মন্দির।যারা রথ যাত্রা উপলক্ষে পুরী ভ্রমনে যাবেন সেই সময় এই মন্দির অবশ্যই দর্শন করবেন।
মহা পুন্য লাভ হবে।

আসন্ন রথ যাত্রা উপলক্ষে চলতে থাকবে প্রভু জগন্নাথদেব সংক্রান্ত শাস্ত্রীয়, পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে লেখা।ফিরে আসবো
আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রা

জগন্নাথ দেবের স্নান যাত্রা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ জগন্নাথ দেব স্নান পূর্ণিমা। আজকের তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় প্রভু জগন্নাথের স্নান যাত্রা।
নানা দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ এই স্নান যাত্রা।

যেহেতু এই তিথিতে জগন্নাথ দেব স্নান করেন তাই এই পূর্ণিমা তিথি দেবস্নান পূর্ণিমা নামে পরিচিত।স্কন্দপুরাণ অনুসারে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন কাঠের দেবতাদের স্থাপন করেছিলেন তখন তিনি এই স্নান অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন। এই দিনটিকে ভগবান জগন্নাথের আবির্ভাব তিথি বলে মনে করা হয়।

জগন্নাথকে তাঁর আদি রূপ অর্থাৎ নীলমাধব রূপে পূজা করছিলেন বিশ্ববাসু নামে একজন সাভার প্রধান। আজও জগন্নাথের অঙ্গ সেবক দের সাথে মিলে সাভার জাতীর লোকেরা স্নান যাত্রার আয়োজন করেন।প্রথা মেনে স্নান যাত্রার আগের দিন জগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার মূর্তি আনুষ্ঠানিকভাবে গর্ভগৃহ থেকে স্নান-বেদীতে নিয়ে আসা হয়। পুরীর মন্দির চত্বরে এই বিশেষ প্যান্ডেলটিকে বলা হয় স্নান মন্ডপ।

বহু বছর ধরে অপরিবর্তিত ভাবে একই রীতি নীতি মেনে চলে আসছে স্নান যাত্রা যার পর্যায় গুলি এবং নাম গুলি আজ আরো একবার আপনাদের জানাবো।

স্নানের আগের দিন যখন দেবতাদের শোভাযাত্রায় নিয়ে যাওয়া হয়, তখন পুরো প্রক্রিয়াটিকে পাহান্দি বা পাহান্ডি বিজয় বলা হয়। স্নানের দিন মঙ্গলা আরতির পরে তামা ও সোনার একশত ত্রিশটি পাত্রে সোনা কুয়া নামক বিশেষ কূপ থেকে জল আনতে একটি আনুষ্ঠানিক শোভাযাত্রায় যায়। তারপর সেই জল চন্দন, আগুরু, ফুল, সুগন্ধি এবং ভেষজ ঔষধি দিয়ে শুদ্ধ করা হয়।
ভরা পাত্রগুলি ভোগ মন্ডপ থেকে স্নান বেদী পর্যন্ত
নিয়ে আসার রীতিকে বলা হয় ‘জলধিবাসা’
তারপর একশো আট কলস জলে স্নান করানো হয় জগন্নাথকে।

স্নান যাত্রার পরে, দেবতাদের পনের দিনের জন্য জনসাধারণের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দূরে রাখা হয় এবং এই সমস্ত দিনগুলিতে মন্দিরের দৈনন্দিন অনুষ্ঠান স্থগিত থাকে। এই অনুষ্ঠানের পরে তাকে এক পাক্ষিক দেখা যায় না। মন্দিরের ভিতরে রতন বেদী নামে একটি বিশেষ “অসুস্থ ঘরে” দেবতাদের রাখা হয়। এই সময়কে বলা হয় ‘অনাবাসর কাল’ অর্থাৎ উপাসনার অনুপযুক্ত সময়। ভগবান জগন্নাথকে স্নান করানোর পর তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং চৌদ্দ দিন বিশ্রামে থাকেন। তারপর রথযাত্রা পর্যন্ত তাকে বিশেষ যত্নে রাখা হয় এবং বৈদ্যরা তার সেবা সুশ্রসা করেন।শোনা যায় অলৌকিক ভাবে এই সময়ে প্রভু জগন্নাথের দেহের উষ্ণতাও বৃদ্ধি পায়

সুস্থ্য হয়ে রাজ বেসে সুসজ্জিত রথে প্রভু পথে নামেন তার ভক্তদের দর্শন দিতে।শাস্ত্র মতে স্নান যাত্রা এবং রথ যাত্রা এই দুই তিথিতে সবাই তাকে দর্শন করতে পারেন এবং এই সময়ে তার দর্শন পেলে জন্ম জন্মান্তরের পাপ খণ্ডন হয় এবং পরম পুন্য লাভ হয়।

আসন্ন রথ যাত্রা উপলক্ষে জগন্নাথ প্রসঙ্গে বিশেষ আধ্যাত্মিক আলোচনা নিয়ে ফিরে আসবো। চলতে
থাকবে এই শাস্ত্রীয় উপস্থাপনা।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথদেব এবং নৃসিংহ দেব

জগন্নাথদেব এবং নৃসিংহ দেব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর মন্দির বা জগন্নাথ দেবের সাথে নৃসিংহ দেবের রয়েছে গভীর সম্পর্ক। রয়েছে একাধিক প্রচলিত লোক কথা। আজ সেই সম্পর্কে লিখবো।

 

রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন নীলাচলে জগন্নাথদেবের মন্দির প্রতিষ্ঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন দেব ঋষি নারদ তাঁকে পরামর্শ দেন যে, প্রথমে ভগবান নৃসিংহদেবের পূজা ও প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাজা সেই নির্দেশ মেনে নীলাচলে নৃসিংহদেবের মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন এবং যজ্ঞ সম্পন্ন করেন।

এরপর যজ্ঞের শেষে নৃসিংহদেব রাজাকে দর্শন দিয়ে আশীর্বাদ করেন। তিনি জানান যে, তিনিই শীঘ্রই দারুব্রহ্ম জগন্নাথ রূপে নীলাচলে প্রকাশিত হবেন। অর্থাৎ, নৃসিংহ ও জগন্নাথ আলাদা দেবতা নন তাঁরা স্বয়ং ভগবানের দুটি ভিন্ন ভিন্ন রূপ।

একদিকে নৃসিংহ দেব যেমন ক্রোধী। উগ্র এবং শত্রু দমনকারি অন্য দিকে জগন্নাথ। সৌম। শান্ত এবং সদা দয়ালু।

 

একটি প্রচলিত কিংবদন্তী অনুসারে একবার পুরীর রাজা গজপতি শত্রুর চক্রান্তর স্বীকার হয়ে রাজ্য হারাতে বসে ছিলেন সেই সময় স্বয়ং নৃসিংহদেবের কৃপায় তিনি আবার নিজের প্রান ও রাজ্য ফিরে পান।

 

আজও শ্রীমন্দিরে নৃসিংহদেবের বিশেষ পূজা প্রচলিত, এবং জগন্নাথদেবের বহু আচার-অনুষ্ঠানের আগে নৃসিংহদেবকে স্মরণ করা হয়। নীলাচলের নৃসিংহ মন্দিরও এই ঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

 

আসলে ভগবান এক এবং অদ্বিতীয় তিনি ভক্তের কল্যাণের জন্য কখনও নৃসিংহ দেব আবার কখনও জগন্নাথ রূপে প্রকট হন।

 

ফিরে আসবো প্রভু জগন্নাথের সংক্রান্ত লেখা নিয়ে আগামী পর্ব গুলিতে পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথমন্দির এবং যম শীলা

জগন্নাথমন্দির এবং যম শীলা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আগামী ২৯ জুন প্রভু জগন্নাথের স্নান

যাত্রা উপলক্ষে আজ থেকে প্রভু জগন্নাথ এবং জগন্নাথ ধাম সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে ধারাবাহিক ভাবে লিখছি ।আজকের পর্বে জগন্নাথ মন্দিরের একটি রহস্য আপনাদের সামনে তুলে ধরবো।

 

পুরীর মন্দিরের সিঁড়ি হয়তো আপনারা অনেকেই দেখেছেন। এই সিঁড়ি দিয়ে উঠেই জগন্নাথ দেবের রত্নবেদী এবং বিগ্রহ দর্শন করা হয়।বলা হয় এই মন্দিরের সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে কখনোই পা দিতে নেই। জগন্নাথ মন্দিরের সিঁড়ির তৃতীয় ধাপকে ‘যম শিলা’ বলা হয়।

 

শাস্ত্র মতে জগন্নাথ মন্দিরে দর্শন করে ভক্তেরা মুক্তি পেয়ে যান।পাপ খণ্ডন হয়। গ্রহ দোষ নাশ হয়।মৃত্যুর পর তাঁদের আর স্বর্গ বা নরকবাস করতে হয় না। এই কারনে এক সময়ে যমলোক প্রায় শূন্য হওয়ার উপক্রম হয় তখন বেগতিক দেখে যমরাজ স্বয়ং জগন্নাথ মন্দিরে এসে প্রভু জগন্নাথের দর্শন করেন এবং তিনি জগন্নাথদেবকে এই সমস্যা সম্পর্কে বলেন এবং সব শুনে জগন্নাথদেব মন্দিরের মূল দরজার সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে মৃত্যুর দেবতা যমকে অবস্থান করতে বলেন।

 

সেই থেকে জগন্নাথ মন্দিরের সিঁড়ির তৃতীয় ধাপে বাস করেন স্বয়ং যম এবং সিঁড়ির তৃতীয় ধাপকে তাই ‘যম শিলা’ বলা হয়। জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রাকে দর্শনের পর এই সিঁড়িতে পা দিলেই দর্শনের যাবতীয় পূণ্য নষ্ট হবে এবং ওই ব্যক্তিকে মৃত্যুর পর যমলোক যেতে হবে।

 

এই ভাবে জগন্নাথ দেব ভক্ত যমের মনোস্কামনা পূরণ করেন এবং পাপ পুণ্যের ভারসাম্য রক্ষা করেন।জগন্নাথ মন্দিরের অসংখ্য রহস্যর মধ্যে এও এক বড় রহস্য।

 

এ থেকে আরো একটা বিষয় স্পষ্ট হয় যে জগন্নাথ প্রকৃত অর্থে জগতের নাথ। শুধু মানুষ নয় দেবতারাও বিপদে পরে তার স্মরণাপন্ন হন এবং কাউকেই তিনি খালি হাতে ফেরান না।

 

ফিরে আসবো প্রভু জগন্নাথ সংক্রান্ত

পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় বিষয় নিয়ে

আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

প্রভু জগন্নাথের গজবেশ এবং কালিয়া দমন বেশ

প্রভু জগন্নাথের গজবেশ এবং কালিয়া দমন বেশ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আসন্ন স্নান যাত্রা উপলক্ষে আজ থেকে প্রভু জগন্নাথকে নিয়ে লিখবো। ধারাবাহিক ভাবে।

প্রভু জগন্নাথের রাজ বেশ জগৎ বিখ্যাত। তবে তাছাড়াও নানা সময়ে নানা বেশে তিনি অবির্ভুত হন।আজ জগন্নাথ দেবের বিশেষ দুই বেশ গজ বেশ এবং কালিয়া দমন বেশ নিয়ে আজ লিখবো।

 

গজ বেশ বা হাতিবেশ রথযাত্রার আগে স্নান যাত্রার সময় দেখা যায় । এই সময়ে গণপতির বেশে জগন্নাথকে সাজানো হয় বলে নাম ‘হাতি বেশ’। এই গজ বেশের নেপথ্য একটি ঐতিহাসিক ঘটনা আছে|বহু শতক আগে পুরীর রাজার রাজদরবারে এসেছিলেন পণ্ডিত গণেশ ভট্ট। রাজা তাঁকে জহগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা দেখবার জন্য আহ্বান জানান। তবে তা দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলনা গনেশ ভট্টর। কারণ তাঁর আরাধ্য দেবতা গণপতি স্বয়ং তিনি আর কারুর প্রতি আগ্রহী নন । তবে রাজার অনুরোধে স্নানযাত্রায় গিয়ে গণেশ ভট্ট আবিষ্কার করেন জগন্নাথ গণেশ রূপেই তাকে দেখা দিয়েছেন।ভক্ত যে রূপে চান সেই রূপেই ভগবান ধরা দেন। জগন্নাথের মধ্যে সম্পূর্ণ ব্রম্ভান্ড বিরাজমান এই সত্য উপলব্ধি করে গণেশ ভট্ট জগন্নাথের ভক্ত হয়ে ওঠেন।সেই ঘটনার পর থেকেই স্নান যাত্রায় জগন্নাথের গজ বেশ বেশ হয়।

 

পুরীর জগন্নাদেবের বিভিন্ন বেশের মধ্যে অন্যতম হল কালিয়াদমন বেশ। ভাদ্র একাদশীর দিন পুরীর জগন্নাথকে সাজানো হয় এই বিশেষ বেশে। যেভাবে শ্রীকৃষ্ণ দুর্দমনীয় রাক্ষস কালিয়াকে হত্যা করেছিলেন সেই বেশেই এদিন সাজানো হয় জগন্নাথকে।শ্রী কৃষ্ণ এবং জগন্নাথ দেব এক এবং অভিন্ন। শ্রী কৃষ্ণ ব্রহ্ম পদার্থ রূপে জগন্নাথ মূর্তিতে বিরাজমান আবার অনেকের মতে জগন্নাথ দেব স্বয়ং বামন অবতার তাই কৃষ্ণ রূপে এই বিশেষ বেশে তার পুজো করার যথেষ্ট কারন আছে।

 

প্রভু জগন্নাথের মহিমা এবং প্রভুর নানা লীলা নিয়ে আবার ফিরে আসবো আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

দশহরা ও মা গঙ্গার পূজোর শুভেচ্ছা 

দশহরা ও মা গঙ্গার পূজোর শুভেচ্ছা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

গঙ্গার মর্তে আগমনের সময় নিয়ে মত পার্থক্য আছে অনেকে মনে করেন অক্ষয় তৃতীয়ায় মর্তে গঙ্গার আগমন হয় আবার কেউ কেউ বিশ্বাস করেন আজকের তিথিতে অর্থাৎ এই গঙ্গা দশহরা পূজোর দিন গঙ্গার আগমন হয় মর্তে।তাই আজ গঙ্গা দশহরায় মা গঙ্গার পূজো হয়।

রাজা ভগীরথ তার পূর্বপুরুষদের আত্মার শান্তির জন্য গঙ্গাকে মর্তে এনে ছিলেন। গঙ্গার প্রবল তেজে পৃথিবী যখন ধ্বংস হওয়ার উপক্রম হয় তখন শিব গঙ্গাকে তার জটায় আশ্রয় দেন। সেই থেকে শিবের জটায় গঙ্গার অবস্থান।

সনাতন ধর্মে গঙ্গা কোনো সাধারণ নদী নয়। গঙ্গা এক দেবী তার উৎপত্তি নিয়ে পুরানে নানা তথ্য পাওয়া যায়।

শাস্ত্র আমাদের বলে যে গঙ্গা সপ্তমীর দিনে মা গঙ্গা ব্রহ্মার কমন্ডল থেকে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

গঙ্গা সম্পর্কে শিবের স্ত্রী পার্বতীর বোন।

পুরানে দেবী গঙ্গার জন্ম নিয়ে অনেক জনপ্রিয় গল্প আছে। বামন পুরাণ অনুসারে, শ্রী হরি বিষ্ণু যখন তাঁর বামন রূপে তাঁর একটি পা আকাশের দিকে তুলেছিলেন, তখন ভগবান ব্রহ্মা তাঁর পা জল দিয়ে ধুয়ে তাঁর কমণ্ডলুতে ভরেছিলেন। এই পবিত্র জলের তেজ ও শক্তিতে ভগবান ব্রহ্মার কমণ্ডলে দেবী গঙ্গার জন্ম হয়েছিল। এর পর ব্রহ্মা তাকে হিমালয় রাজের হাতে তুলে দেন । সেই থেকে মা গঙ্গা এবং দেবী পার্বতীকে বোন হিসেবে গণ্য করা হয়।

রামায়ণ অনুসারে আরেকটি কাহিনি আছে যেখানে বলা হচ্ছে ব্রহ্মা হিমাবত সৃষ্টি করেছিলেন। তিনি পরে হিমালয়ের রাজা হন এবং মেরু কন্যা মেনকা বিয়ে করেন। বেশ কয়েক বছর পর, তারা একটি কন্যার আশীর্বাদ পেয়েছিলেন যার নাম তারা গঙ্গা রাখেন। কিছু বছর পর, তাদের আরেকটি কন্যা হয়েছিল যার নাম তারা পার্বতী রাখে এবং যাকে সতীর অবতার বলে

মনে করা হয়।

সনাতন ধর্মে বিশ্বাস করা হয় আজকের দিনে গঙ্গাস্নান করলে বা গঙ্গার উদ্দেশ্যে ফুল এবং

ফল নৈবেদ্য রূপে প্রদান করলে বহু জন্মের পাপ

খণ্ডন হয়।

সবাইকে জানাই দশহরা এবং গঙ্গা পূজোর

অনেক শুভেচ্ছা এবং অভিনন্দন।

অম্বুবাচি উৎসব 

অম্বুবাচি উৎসব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

অম্বুবাচি মানে যেমন একাধিক শাস্ত্রীয় বিধি নিষেধ তেমনই অম্বুবাচির শেষ মানে উৎসব এবং অম্বুবাচি মেলা।প্রায় সারা দেশ বিশেষ করে পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অম্বুবাচির এই কয়েকটা দিন কে নানা ভাবে পালন করা হয় তবে আসামে এটি সর্ব বৃহৎ উৎসব।কামাখ্যা মন্দিরের কাছে অনুষ্ঠিত অম্বুবাচী মেলা হল পূর্ব ভারতের অন্যতম বড় ধর্মসভা যা সনাতন ধর্মের মানুষদের এক বিরাট মিলন উৎসব।

 

দেবী কামাখ্যা মাতৃ শক্তিকে মূর্ত করে। অম্বুবাচি চলা কালীন মন্দিরের দরজা সকলের জন্য বন্ধ থাকে। অম্বুবাচির নিবৃত্তির পর আবার আনুষ্ঠানিক ভাবে দরজা খুলে দেওয়া হয় এবং সেই দিন মন্দির চত্বরে একটি বড় মেলা বসে।

 

পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির যেখানে অবস্থিত সেখানেই পতিত হয়েছিলো দেবীর যোনি তাই অম্বুবাচি উৎসব এই অঞ্চলের প্রধান উৎসব

তবে সারা ভারত, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ, বিহার এবং আসাম থেকে হাজার হাজার মানুষ

এই উৎসবটি দেখতে আসেন এবং দেবীর কাছ থেকে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন।

 

এই স্থানটি তন্ত্র সাধনার জন্যও খুব বিখ্যাত।

অম্বুবাচি উপলক্ষে বহু তন্ত্র সাধক আসেন এখানে।

আজও এখানে একটি গুপ্ত তান্ত্রিক সমাজ রয়েছে বলে মনে করা হয় এবং তাদের সমস্ত তান্ত্রিক আচার অনুষ্ঠান গোপনে পরিচালিত হয় কোন রূপ বাহ্যিক প্রদর্শন নেই অম্বুবাচি মেলায় তাদের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকেন বলে ধরে নেয়া হয়।

 

সেদিক দিয়ে দেখতেগেলে অম্বুবাচি উৎসব বা অম্বুবাচি মেলা আধ্যাত্মিক জগৎ বিশেষ করে তন্ত্র জগতের সব থেকে বড়ো মিলন উৎসব।

অ্যাম্বুবাচি উৎসব মাতৃ শক্তিকে কেন্দ্র করে আবর্তীত হয় যা সমগ্র সৃষ্টির মূল চালিকা

শক্তি বলে মনে করা হয়।

 

অম্বুবাচী সংক্রান্ত শাস্ত্রীয় উপস্থাপনা নিয়ে

আবার ফিরে আসবো আগামী দিনে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।