Home Blog Page 11

শ্রী জগন্নাথদেবের বিভিন্ন বেশ

শ্রী জগন্নাথদেবের বিভিন্ন বেশ

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

পুরীর শ্রীজগন্নাথ মন্দিরে মহাপ্রভু জগন্নাথকে সারা বছর বিভিন্ন তিথি, উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান উপলক্ষে নানা রূপে সজ্জিত করা হয়। এই বিশেষ অলঙ্করণকে বলা হয় “বেশ”। মন্দির-পরম্পরায় প্রচলিত আছে যে, মহাপ্রভু বছরে মোট ৩২টি বিশেষ বেশ ধারণ করেন। প্রতিটি বেশের মধ্যেই লুকিয়ে রয়েছে ভগবানের এক একটি লীলা, তত্ত্ব ও ভক্তদের জন্য গভীর আধ্যাত্মিক শিক্ষা।
আগে আপনাদের গজ বেশ বা হাতি বেশ নিয়ে বলেছি আজ আরো কয়েকটি বেশ নিয়ে লিখবো।

পদ্মবেশ

অসংখ্য পদ্মফুল দিয়ে মহাপ্রভুকে সাজানো হয়। এটি ভক্তির পবিত্রতা ও নির্মলতার প্রতীক।

সোনাবেশ – রথযাত্রার পর বহুড়া যাত্রার পরদিন স্বর্ণালঙ্কারে মহাপ্রভু সজ্জিত হন। এটি ঐশ্বর্য ও সর্বশক্তিমান ঈশ্বরের মহিমা প্রকাশ করে।

রাজাধিরাজ বেশ-
রাজবেশে সজ্জিত হয়ে মহাপ্রভু জানান, তিনিই সমগ্র বিশ্বের অধিপতি।

রাধা-দামোদর বেশ – শ্রীকৃষ্ণ ও রাধার প্রেমলীলা স্মরণে এই বেশ ধারণ করা হয়।

লক্ষ্মী-নারায়ণ বেশ-
মহালক্ষ্মী ও নারায়ণের ঐশ্বর্যময় রূপের প্রতীক এই বেশ।

কালীয়দমন বেশ-
যমুনার কালীয় নাগকে দমন করার শ্রীকৃষ্ণের লীলা স্মরণে এই সাজ।

গজউদ্ধারণ বেশ- ভক্ত গজেন্দ্রকে রক্ষা করার সময়ে বিষ্ণুর করুণাময় রূপের প্রকাশ এই বেশ।

বনভোজি বেশ-
বৃন্দাবনের গোপবালকদের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের বনভোজন লীলার স্মৃতি বহন করে এই বেশ।

নাগার্জুন বেশ-
বিরল এই বেশ বিশেষ তিথিতে অনুষ্ঠিত হয় এবং মহাপ্রভুর বীর রূপ প্রকাশ করে।

গণেশ বেশ-
ভক্তদের মঙ্গল ও বিঘ্ননাশের প্রতীক হিসেবে এই বেশ পালিত হয়।

চাচেরী বেশ-
চন্দন, ফুল ও অলঙ্কারে সজ্জিত এই বেশ গ্রীষ্মকালের একটি বিশেষ আকর্ষণ।

প্রভু জগন্নাথের বিভিন্ন বেশ দর্শনের জন্য প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ ভক্ত সমবেত হন। মহাপ্রভুর প্রতিটি রূপ ভক্তের হৃদয়ে নতুন ভক্তি, আনন্দ ও ঈশ্বরপ্রেমের সঞ্চার করে।

আগামী সময়ে এই ধারাবাহিক উপস্থাপনায়
শ্রী জগন্নাথের আরো কিছু বেশ এবং
তাদের শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে
ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

প্রভু জগন্নাথের মহাপ্রসাদের মাহাত্ম্য

প্রভু জগন্নাথের মহাপ্রসাদের মাহাত্ম্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শ্রী জগন্নাথদেবের মহাপ্রসাদ কেবল একটি খাদ্য নয়, এটি ভগবানের কৃপা, আশীর্বাদ ও ভক্তির প্রতীক। যুগে যুগে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে মহাপ্রসাদের মাহাত্ম্য প্রকাশ পেয়েছে।

আজকে তেমনই একটি ঘটনা জানাবো।

 

একবার মায়া পুরের এক জগন্নাথ মন্দিরে স্নানযাত্রার সময় এক রিকশাচালক শ্রীজগন্নাথ মন্দির থেকে খিচুড়ি মহাপ্রসাদ গ্রহণ করেন। তিনি নিজের জন্য যেমন প্রসাদ নেন, তেমনি তাঁর একবন্ধুর জন্যও কিছু মহাপ্রসাদ নিয়ে যান। কিন্তু সেই বন্ধু প্রসাদের মাহাত্ম্য না বুঝে অবজ্ঞাভরে তা মাটিতে ফেলে দিয়ে বলেন তিন প্রসাদ গ্রহন করতে চান না।

 

সেই রাতেই এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে। স্বপ্নে তিনি দেখেন, শ্রীবলরাম অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে তাঁকে শাস্তি দিচ্ছেন। বলরাম বলেন, “আমার ভাই শ্রীজগন্নাথের মহাপ্রসাদকে তুমি অপমান করার সাহস পেলে? মহাপ্রসাদকে মাটিতে ফেলে দিলে কেন?” স্বপ্নে তিনি ভয়ে কাঁপতে থাকেন। সেখানে দেবী সুভদ্রাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি ঘটনাটি দেখে হাসছিলেন, আর শ্রীজগন্নাথদেবও উপস্থিত ছিলেন। তবে তিনি করুণাময় কণ্ঠে বললেন, “না, তাকে হত্যা করো না।”

 

পরদিন সকালে সেই ব্যক্তি গভীর অনুতাপ নিয়ে মন্দিরে এসে শ্রীজগন্নাথদেবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি নিজের ভুল স্বীকার করেন এবং মহাপ্রসাদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ও প্রসাদ গ্রহন করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন। তবে প্রসাদ শেষ হয়ে যাওয়ায় তাঁর সেই ইচ্ছে সেদিন পূর্ণ হয়নি।

 

কিন্তু প্রভু তাঁর আন্তরিক অনুশোচনা গ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর ওপর কৃপাদৃষ্টি

বর্ষণ করেন।

 

এমন আরো অনেক ঘটনা দিয়ে সাজানো

থাকবে আগামী দিনের পর্ব গুলি।

ফিরে আসবো যথা সময়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

প্রভু জগন্নাথের ক্রোধ

প্রভু জগন্নাথের ক্রোধ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

প্রভু জগন্নাথ শুধু দয়ালু এবং কোমল হৃদয় নয়। প্রয়োজনে তিনি কঠোর হতেও জানেন। আজ আপনাদের মায়া পুরের কাছের একটি জগন্নাথ মন্দিরের একটি অলৌকিক ঘটনা জানাবো যা থেকে এই বিষয়টি আরো স্পষ্ট হবে।

 

অনেক বছর আগে মায়া পুরের কাছে একটি জগন্নাথ মন্দির ভগ্নপ্রায় অবস্থায় ছিল, তখন গ্রামের এক কিশোর গরু চরাতে চরাতে মন্দিরের পাশ দিয়ে যেত। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল মন্দিরের ভাঙা ইট। একদিন খেলার ছলে সে একটি ইট লাঠি দিয়ে ভেঙে দূরে ছুড়ে ফেলে দেয়। বিষয়টিকে সে তেমন গুরুত্ব দেয়নি।

কিন্তু সেই রাতেই ঘটল আশ্চর্য ঘটনা। সারারাত সে ঘুমোতে পারল না। বারবার যেন একটি করুণ অথচ গম্ভীর কণ্ঠস্বর তার কানে ভেসে আসতে লাগল—

“আমার মন্দিরের ইট তুমি কেন বাইরে ফেলে দিলে?”

এই অলৌকিক আহ্বান তার হৃদয়কে গভীরভাবে নাড়া দিল। পরদিন সকালে সে ছুটে গিয়ে সেই ইটটি খুঁজে বের করল এবং যেখানে ছিল, সেখানে আবার যথাস্থানে রেখে দিল। তারপরই তার মনের অশান্তি দূর হল এবং সে শান্তি অনুভব করল।

 

প্রভু জগন্নাথের কৃপা ও মহিমা এমনই যে, তাঁর সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো বস্তুই তুচ্ছ নয়। এমনকি তাঁর মন্দিরের একটি ইটও তাঁর সম্পত্তি—যার প্রতি অসম্মান ভক্তের জীবনে অশান্তির কারণ হতে পারে।

 

এই ঘটনা আমাদের শেখায় শেখায় যে ভগবানের মন্দির, বিগ্রহ, প্রসাদ, তুলসী, ধ্বজা কিংবা মন্দিরের একটি ইট—সবই পবিত্র। ভক্তের কর্তব্য হলো সেগুলিকে শ্রদ্ধা ও ভক্তিভরে সম্মান করা। আমরা যাকে তুচ্ছ বলে ভাবি, ভগবানের কাছে

সেটিও মূল্যবান এবং যে ভক্ত ভগবানের প্রতিটি সম্পদকে সম্মান করে, তার জীবনেই নেমে আসে প্রকৃত শান্তি ও ঈশ্বরের কৃপা।

 

ফিরে আসবো আগমনী পর্বে জগন্নাথে সংক্রান্ত অন্য একটি অলৌকিক ঘটনা এবং ব্যাখ্যা

নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথ দেব এবং গণেশ ভট্ট

জগন্নাথ দেব এবং গণেশ ভট্ট

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

প্রভু জগন্নাথের বিখ্যাত গজ বেশের নেপথ্য একটি একটি বিশেষ ঘটনা আছে যে ঘটনার প্রধান চরিত্র ভক্ত গণেশ ভট্ট বা গণপতি ভট্ট।আজকের পর্বে

সেই অলৌকিক ঘটনা বা লীলা নিয়ে লিখবো।

 

পন্ডিত গণেশ ভট্ট ছিলেন পুরান এবং বিভিন্ন শাস্ত্রের বিশেষজ্ঞ। তিনি ছিলেন গণপতির উপাষক

তিনি শাস্ত্র পড়ে জানতে পেরে ছিলেনযে পুরীতে ভগবানের বামন অবতার বিরাজমান এবং রথে সেই বামন অবতারকে দর্শন করলে ব্রহ্মজ্ঞান হয়। আত্মার মুক্তি হয়। তিনি পুরীর উদ্দেশ্যে রওনা হলেন।

 

যথা সময়ে গণেশ ভট্ট পুরীতে পৌঁছলেন কিন্তু জগন্নাথদেব দর্শন করে তিনি সন্তুষ্ট হলেন না। তিনি মনে মনে তার আরাধ্য গণেশের রূপ কল্পনা করেছিলেন। কিন্তু জগন্নাথ দেবের রূপ সম্পূর্ণ ভিন্ন। তার মনের কথা বুঝতে পেরে প্রভু জগন্নাথ পুরীর রাজাকে আদেশ দেন যে তিনি যেনো আরো একবার গণেশ ভট্টকে নিয়ে আসেন।

 

তারপর পুরীর রাজা তাঁকে জহগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা দেখবার জন্য আহ্বান জানান। রাজার অনুরোধে স্নানযাত্রায় গিয়ে গণেশ ভট্ট আবিষ্কার করেন জগন্নাথ গণেশ রূপেই তাকে দেখা দিয়েছেন।মুগ্ধ হলেন গণেশ ভট্ট। নিজের আরাধ্য শ্রী গণেশকে তিনি খুঁজে পেলেন প্রভু জগন্নাথের মধ্যে।

 

এই ঘটনা থেকেও প্রমাণিত হয় ভক্তের মনে যদি ভক্তি অটুট থাকে এবং আস্থা থাকে ভগবান তার মনোস্কামনা পূর্ণ করেন। তার জন্য তিনি নিজের রূপ বদলাতেও দ্বিধা করেননা।

 

সেই ঘটনার পর থেকেই স্নান যাত্রায় জগন্নাথের বেশ হয় হাতিবেশ বা গজ বেশ।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে জগন্নাথ প্রসঙ্গে ধারাবাহিক আলোচনা নিয়ে। থাকবে আরো একটি অলৌকিক ঘটনার বর্ণনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথ এবং ভক্ত রঘুদাস

জগন্নাথ এবং ভক্ত রঘুদাস

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীতে জগন্নাথ দেবের প্রিয় ভক্ত ছিলেন রঘু দাস তিনি শুধু শুধু ভক্ত নন তিনি ছিলেন প্রভু জগন্নাথের সখা।ভক্ত রঘুর সাথে জগন্নাথের একটি লীলা নিয়ে আজ লিখবো।

 

পুরীতে ভক্ত রঘু দাস একসময় গুরুতর অসুখে পড়ল। তাঁর স্বাস্থ্য এতই ভেঙে গেল যে, তাঁর আর বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াবার শক্তি ছিলোনা।প্রায় মৃত্যু সজ্জায় রঘু দাস রোগ-পীড়ায় কাতর হয়ে ঘন ঘন অচৈতন্য হয়ে পড়ছিল। এ অবস্থায় তাঁর নিজেকে সাহায্য করার কোনও ক্ষমতা ছিল না।

তিনি একা থাকতেন এবং জগন্নাথ প্রেমেই দিন কাটাতেন।সঙ্গী সাথী তেমন ছিলোনা। তাই এই খবরও কেউ পায়নি।

 

সেসময় একদিন একটি ছোট বালক রঘু দাসের সেবা করতে এল। বালকটি রঘুর অসুস্থ্য দেহ, বিছানা, কুটির সবকিছু পরিষ্কার করল। তাঁর দেহ সে চন্দনে প্রলিপ্ত করল এবং ঘরে সুগন্ধিত দ্রব্য দিয়ে ঘরের দুর্গন্ধ দূর করে ঘরকে শুদ্ধ করলো।

তারপর শুরু হলো রোগীর সেবা।দ্রুত সুস্থ্য হলেন রঘুদাস।

 

বালকের পরিচয় জিগেস করলে বালক তাকে জগন্নাথ রূপে দর্শন দিলেন। অশ্রু সিক্ত নয়নে রঘু জগন্নাথকে বলল তোমার সেবা পেয়ে আমি ধন্য কিন্তু তুমি তো সহজেই আমার রোগ ভোগ দুর করতে পারতে তবে আমাকে সুস্থ করে দেওয়ার পরিবর্তে কেন তুমি আমার এমন সেবা সুশ্রসা করলে?

 

জগন্নাথ দেব উত্তরে বললেন কর্ম ফল সবার ভোগা উচিৎ, তোমার সকল প্রারব্ধ কর্ম নাশ করতেই আমি আমার শক্তি প্রয়োগ করে তোমাকে সুস্থ্য করিনি যাতে তুমি দেহান্তে আমার ধামে ফিরে আসতে পারো। তাছাড়া আমার ভক্তগণ যেমন আমার সেবা করে আনন্দ পায়, তেমনি আমিও আমার ভক্তগণের সেবা করে আনন্দ লাভ করি।

 

এই ঘটনা প্রমান করে যে জগন্নাথ প্রেমে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পন করতে পারলে জগন্নাথ তার সেবা করতে এবং নিজের সখার স্থান দিতে

দ্বিধা করেননা।শুধু তাই নয় নিজে হাতে ভক্তের সেবা করতে প্রকট হন জগতের নাথ।

 

ফিরে আসবো প্রভু জগন্নাথের অন্য

একটি লীলা সংক্রান্ত লেখা নিয়ে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথের অলৌকিক দর্শন

জগন্নাথের অলৌকিক দর্শন

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর শ্রীজগন্নাথধাম যুগে যুগে অসংখ্য অলৌকিক ঘটনার সাক্ষী। ভক্তদের বিশ্বাস, যিনি আন্তরিক ভক্তি ভরে প্রভুকে ডাকেন প্রভু জগন্নাথ কোনো না কোনোভাবে তাঁর কৃপা প্রকাশ করেন।

তবে আজকে পুরীর নয় মায়া পুরের রাজা পুর নামক স্থানের একটি জগন্নাথ মন্দিরের একটি অলৌকিক ঘটনা জানাবো।

 

একদিন কয়েকজন ছাত্র দূর-দূরান্ত থেকে শ্রীজগন্নাথদেবের দর্শনের উদ্দেশ্যে পুরীতে পৌঁছালেন। সারাদিনের পথচলার পর তাঁরা মন্দিরে প্রবেশ করলেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তখন মন্দিরের ভেতরে আলো ছিল খুবই কম। দূর থেকে দাঁড়িয়ে তাঁরা শ্রীজগন্নাথ, বলভদ্র ও সুভদ্রার বিগ্রহ স্পষ্টভাবে দেখতে পেলেন না।

ছাত্রদের মন ভেঙে গেল। এত দূর থেকে এসেও প্রভুর রূপ দর্শন করতে না পারার কষ্টে তাঁরা নীরবে প্রণাম করে ফিরে যেতে লাগলেন। তাঁদের মনে একটাই প্রার্থনা—“হে প্রভু, যদি আপনার কৃপা হয়, তবে একবার আপনার শ্রীমুখ দর্শনের সৌভাগ্য দিন।”ঠিক সেই সময় এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। হঠাৎ করেই শ্রীজগন্নাথের সম্মুখের প্রদীপের শিখা অস্বাভাবিকভাবে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে মন্দিরের গর্ভগৃহ আলোকিত হয়ে গেল। ছাত্ররা বিস্ময়ে ফিরে তাকিয়ে দেখলেন—প্রভুর দিব্য মূর্তি স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। তাঁরা আনন্দে, ভক্তিতে এবং আবেগে আপ্লুত হয়ে প্রভুকে প্রণাম করলেন।

 

এই ঘটনা প্রভু জগন্নাথের করুণার প্রকাশ বলে মনে করা হয় । যখন ভক্তের হৃদয়ে থাকে নিষ্কলুষ বিশ্বাস, তখন প্রভু নিজেই অন্ধকার দূর করে তাঁর দর্শনের পথ খুলে দেন। এখানে অন্ধকার শুধু মন্দিরের আলো-স্বল্পতার প্রতীক নয়, মানুষের অন্তরের অজ্ঞানতা ও সংশয়েরও প্রতীক। আর প্রদীপের উজ্জ্বল শিখা যেন ঈশ্বরের কৃপা, যা ভক্তির আলোয় জীবনের সব অন্ধকার দূর করে দেয়।

 

এমন বহু অলৌকিক ঘটনা আছে প্রভু জগন্নাথকে

কেন্দ্র করে। ধারাবাহিক আলোচনা চলবে। ফিরে আসবো আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

প্রভূ জগন্নাথের শাস্তি প্রদান

প্রভূ জগন্নাথের শাস্তি প্রদান

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

প্রভু জগন্নাথের লীলা শুধু শ্রী ক্ষেত্র পুরীতেই সীমাবদ্ধ নয়। তিনি সর্বত্র বিরাজমান। সর্বত্র তার লীলা চলছে। আজ আপনাদের মায়া পুরের কাছে রাজা পুরে একটি জগন্নাথ মন্দিরের এক অলৌকিক ঘটনা জানাবো।

 

এক গওয়ালা নিয়মিত জগন্নাথের সেবার জন্য দুধ নিয়ে আসতো। প্রথমদিকে সে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে খাঁটি দুধ দিত। কিন্তু লোভের বশবর্তী হয়ে একসময় সে দুধে জল মেশাতে শুরু করে। বাইরে থেকে দুধের কোনো পার্থক্য বোঝা যেত না, তাই সে ভাবল তার প্রতারণা কেউ ধরতে পারবে না।

কিন্তু যিনি সমগ্র জগতের অন্তর্যামী, তাঁর কাছ থেকে কিছুই গোপন থাকে না। ধীরে ধীরে সেই গোয়ালার সংসারে একের পর এক বিপদ নেমে এল। গরুগুলো অসুস্থ হতে লাগল, ব্যবসায় লোকসান হলো, আর পরিবারের শান্তিও নষ্ট হয়ে গেল। যতই চেষ্টা করুক, কোনোভাবেই সে দুর্দশা থেকে মুক্তি পাচ্ছিল না।আশ্চর্য ভাবে প্রতিদিন তার দুধ নষ্ট হয়ে যেতে লাগলো।

 

একদিন সে মন্দিরের পুরোহিতের কাছে গিয়ে সব বিস্তারিত ভাবে বললো। পুরোহিত জিগেস করলেন যে সে কি জগন্নাথের জন্য আনা দুধে জল দেয়। গওয়ালা নিজের দোষ স্বীকার করলো।পুরোহিত জানান এই অপরাধের জন্য প্রভু তাকে স্বাস্তি দিয়েছেন।গোয়ালা নিজের ভুল উপলব্ধি করল। সে মন্দিরে গিয়ে শ্রীজগন্নাথদেবের চরণে কাঁদতে কাঁদতে ক্ষমা প্রার্থনা করল এবং প্রতিজ্ঞা করল যে জীবনে আর কখনও ভেজাল দেবে না। এরপর থেকে সে সর্বদা খাঁটি দুধই নিবেদন করতে লাগল এবং সততার সঙ্গে ব্যবসা চালাতে শুরু করল।

কিছুদিনের মধ্যেই তার জীবনে আবার সুখ-সমৃদ্ধি ফিরে এল। গরুগুলো সুস্থ হয়ে উঠল, ব্যবসাও ভালো চলতে লাগল। সে বুঝতে পারল প্রভু তাকে ক্ষমা করেছেন।

 

জগন্নাথের যেমন তাঁর ভক্তদের অত্যন্ত স্নেহ করেন অন্যায় বা পাপ করলে তাদের শাস্তিও দেন সৎ পথে চালিত করেন।

 

ফিরে আসবো জগন্নাথ সংক্রান্ত

পরবর্তী পর্ব নিয়ে। আবার যথা সময়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথ মূর্তি রহস্য

জগন্নাথ মূর্তি রহস্য

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

এই মুহূর্তে পুরীতে জ্বর আক্রান্ত প্রভু জগন্নাথ বিশ্রাম নিচ্ছেন।আর কদিন পরেই রথযাত্রার দিন রাজকীয় রথে চড়ে ভক্তদের দর্শন দেবেন জগন্নাথ আমরা প্রত্যেকে নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছি যে জগন্নাথ মূর্তি একটু বিচিত্র এবং ব্যতিক্রমী।তাঁদের কারও হাত নেই। এমনকি চোখের পাতাও নেই।আরো অনেক রহস্য লুকিয়ে আছে প্রভু জগন্নাথের

মূর্তি তে|আজকের এই পর্বে জানবো সেই

সব রহস্য|

 

হিন্দু ধর্মের অন্যান্য দেবতাদের মূর্তি বা প্রতিমার সঙ্গে জগন্নাথের বিগ্রহের কিছু পার্থক্য রয়েছে। দেবতাদের বিগ্রহ সাধারণত আমরা সোনা, রুপো, তামা কিংবা বিভিন্নরকম ধাতু এমনকি মাটি দিয়েও তৈরি হয়। কিন্তু জগন্নাথের বিগ্রহ তৈরি হয় নিম কাঠ দিয়ে। বিগ্রহের আকারও বিচিত্র। চৌকো মাথা, বড় বড় চোখ এবং অসম্পূর্ণ হাত।

‘নব-কলেবর’ নামের রহস্যময় এক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে নিয়মিত নিদ্দিষ্ট সময়ের ব্যাবধানে দেবতার পুরোনো মূর্তি সরিয়ে নতুন মূর্তি বসানো হয় আর পুরোনো মূর্তির আত্মা বা ব্রহ্ম পদার্থ নতুন মূর্তিতে সঞ্চারিত হয় – এটাই পূজারীদের বিশ্বাস।

 

জগন্নাথ মন্দিরে ‘গর্ভগৃহ’ বা মূল কেন্দ্রস্থলে এই অতি গোপনীয় প্রথার সময়ে পুরোহিতদের চোখ আর হাত বাঁধা থাকে – যাতে নব কলেবর সংক্রান্ত কিছু রীতি নীতি গোপন থাকে চীর কালের জন্য। হয়তো প্রভুর তেমনই ইচ্ছে বা আদেশ।

 

প্রভু জগন্নাথের মূর্তিতে চোখের পাতা নেই|এর একটা কারন তিনি জগতের নাথ এবং তিনি সদা জাগ্রত|একটি মুহূর্তের জন্যও তিনি দেখা বন্ধ করেননা|তিনি পরম দয়ালু তাই প্রতি মুহূর্তে তার ভক্তদের উপর তার কৃপা দৃষ্টি নিক্ষেপিত হয়।

 

“যে গাছের কাঠ দিয়ে জগন্নাথের মূর্তি তৈরী হতে পারে, তার এগারোটা বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। ”

“যেমন গাছের গায়ে হাতির শুঁড় ও চোখের আকৃতি স্পষ্ট থাকতে হবে, গাছের সাথে সাপ জড়িয়ে থাকবে, উঁইয়ের ঢিপি থাকবে ইত্যাদি।”

প্রায় দুমাস ধরে কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে ওই গাছ খুঁজে বার করে তারপরে মহাযজ্ঞ এবং আরো অনুষ্ঠান করে শুরু হয় মূর্তি নির্মাণ।

 

জগন্নাথ দেবের হাত অসম্পূর্ণ। কারন তার মূর্তি তৈরীর সময়ে নিষেধ না মেনে খুলে দেয়া হয় নির্মাণ গৃহের দরজা যার ফলে অসম্পূর্ণ থেকে যায় মূর্তি নির্মাণ এবং সেই রূপেই পূজিত হন জগন্নাথ।

 

পুরী ধাম এবং জগন্নাথ মূর্তি নিয়ে রহস্যর শেষ নেই। ফিরে আসবো আরো অনেক তথ্য এবং ব্যাখ্যা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

জগন্নাথ দেব ও দেবী বিমলা

জগন্নাথ দেব ও দেবী বিমলা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

পীঠনির্ণয় তন্ত্রে উল্লেখ আছে দেবী বিমলা শ্রীমন্দিরের কত্রী।প্রভু জগন্নাথ তাঁর ভৈরব হিসেবে অবস্থান করেন।আবার তিনি দেবী মহামায়ার অংশ এবং এই স্থান একান্ন টি সতীপীঠের অন্যতম দেবী বিমলার মন্দির তাই প্রভু জগন্নাথকে নিয়ে জানা অসম্পূর্ণ থেকে যায় দেবী

বিমলাকে না জানলে।

পুরান মতে বিষ্ণু দর্শন হেতু মহাদেব একবার বৈকুণ্ঠে হাজির হন এবং নারায়নের প্রসাদ গ্রহন করেন সেই প্রসাদের কিছুটা তাঁর মুখে লেগে যায়। কৈলাসে ফিরে নারদকে দেখতে পান মহাদেব। মুখে লেগে থাকা অবশিষ্ট প্রসাদ নারদ চেয়ে নেন সেই সময় দেবী পার্বতীও সেখানে উপস্থিত হন। প্রসাদ পাওয়ার ইচ্ছে প্রকাশ করেন কিন্তু শিব তো অপারগ কারন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। ক্রোধান্নিতা পার্বতী হাজির হন নারায়ণের কাছে। সব শুনে নারায়ণ তাঁকে বলেন এবার থেকে পুরী ধামে তাঁর শক্তি রূপে অবস্থান করবেন দেবী।

এবং নারায়ণের প্রসাদ সবার আগে তাঁকে অর্পন করা হবে। যে প্রথা আজও এতটুকু বদল হয়নি। দেবী বিমলাকে অর্পন করার পরই জগন্নাথের প্রসাদ হয়ে ওঠে মহাপ্রসাদ।

আজও জগন্নাথের ভোগ সবার আগে সমর্পন করা হয় দেবী বিমলাকে । দেবীর পুজো হয় তন্ত্রমতে। মনে করা হয় দেবী বিমলার দর্শন না করা অবধি জগন্নাথ দর্শন সম্পূর্ণ হয় না।

শ্রীমন্দিরে চত্বরেই দেবী বিমলার মন্দির।

আবার পুরাণমতে সতীর ডান পায়ের কড়ে আঙুল পড়েছিল এই খানে তাই এটি সতী পীঠ।প্রতিটি সতী পীঠে একজন ভৈরব থাকেন। বিমলাদেবীর মন্দিরে আলাদা করে ভৈরব নেই কারন এখানে ভৈরব স্বয়ং জগন্নাথদেব।

অর্থাৎ জগন্নাথ মন্দির একই সাথে সনাতন ধর্মের চার ধামের এক ধাম আবার একান্ন শক্তি পীঠের অন্যতম পীঠ। সেদিক দিয়ে দেখতে গেলে বৈষ্ণব এবং শাক্ত মতবাদ মিলে একাকার হয়ে যায় এই

পরম তীর্থে।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে।রথ যাত্রা উপলক্ষে

ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে

এই উপস্থাপনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন ধন্যবাদ।

প্রভু জগন্নাথের ধনদৌলত

প্রভু জগন্নাথের ধনদৌলত

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

পুরীর জগন্নাথদেব শুধু তার আহারের বা ভোগের জন্য নয় তার অগাধ সম্পত্তির জন্যও বিখ্যাত। জগন্নাথের ধন দৌলতের তালিকায় রয়েছে

বহু মূল্য হীরে, মূল্যবান অনেক রত্ন, সোনার এবং রুপোর নানা রকম অলংকার।শুধু জগন্নাথ নন বলরাম এবং সুভদ্রার ও রয়েছে নিজস্ব রত্ন ভান্ডার।আজকের পর্বে প্রভু জগন্নাথের সেই বিপুল ধনভান্ডার নিয়ে লিখবো।

 

সাধারণত মন্দিরে ধন সম্পদের কথা উঠলে তিরুপতি বালাজি বা পদ্মনাভ মন্দিরের কথা ওঠে তবে জগন্নাথ ও কম যান না ধন দৌলতের দিক দিয়ে। পুরীর মন্দিরের অভ্যন্তরে কয়েকটি বিশেষ কক্ষে এই অতুল ঐশর্য রাখা আছে। সেখানে বাইরের কারুর প্রবেশের অধিকার নেই।বিশেষ

কারণে প্রবেশ করতে হলে লাগে বিশেষ রীতি নীতি। পালন করতে হয় কিছু শাস্ত্রীয় রীতি নীতি।

 

বিশেষ বিশেষ সময়ে প্রভুর মাথায় ব্রহ্মজ্যোতি হীরা শোভা পায়।সেই হীরের জ্যোতি কি কেউ খালি চোখে সইতে পারেনা।এছাড়া বলরামের মাথার নীলা বা সুভদ্রার মাথার মানিক, সবই রত্নভান্ডারে গচ্ছিত আছে।বিশেষ বিশেষ সময়ে প্রভুকে সোনার গয়নায় সাজানোর জন্য তার রত্ন ভান্ডার থেকে গহনা বের করে আনা হয় তবে তারও একটা নিদ্দিষ্ট পক্রিয়া আছে।

 

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সিংহদুয়ারের ঠিক সামনে ইমার মঠ। সেখান থেকে একাধিক বার উদ্ধার হয়েছে গুপ্তধন।২০১১-তে ও ২০২১-এ পরপর দু’বার এই মঠ থেকে পাওয়া যায় কয়েক কোটি টাকার সম্পদ।উদ্ধার হয় প্রায় ৫০০ রূপোর বাট।

 

জগন্নাথ শুধু ওড়িশা বা ভারত নয় সমগ্র জগতের নাথ। বহুবার বহু রাজা তার চরণে নিজের মূল্যবান ধন সম্পদ অর্পণ করেছেন। আবার জগন্নাথের ধন দৌলত লুট করার ও চেষ্টা হয়েছে বিদেশী শত্রুদের দ্বারা। তবে প্রায় প্রতিবার অলৌকিক উপায়ে রক্ষা পেয়েছে জগন্নাথের ধন দৌলত।

 

প্রভু জগন্নাথের সব চেয়ে মূল্যবান এবং আলোচিত সম্পদ হলো জগৎ বিখ্যাত কোহিনুর হীরা যা খাতায় কলমে জগন্নাথ দেবের সম্পত্তি হলেও তা আজও জগন্নাথ দেবের অধিকারে আসেনি। কারন কোহিনুরের মালিক মহারাজা রঞ্জিত সিংহ জগন্নাথ দেব কে কোহিনুর অর্পণ করার কথা ঘোষণা করলেও কোহিনুর জগন্নাথ চরণে অর্পণ করার আগেই তার মৃত্যু হয় এবং কোহিনুর চলে যায় ব্রিটিশ সরকারের হাতে।

তবে সমগ্র জগৎ সংসারের সম্পূর্ণ ঐশর্যর অধিকারী প্রভু জগন্নাথ তাই তার জাগতিক সম্পত্তি কি আছে কি নেই সেটা বড়ো কথা নয়। ভক্তের ভক্তি এবং সেবাই তার কাছে সব চেয়ে দামী এবং কাঙ্খিত।

 

আসন্ন রথ যাত্রা উপলক্ষে চলতে থাকবে জগন্নাথদেব এবং পুরী ধাম নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।