Home Blog Page 13

অম্বুবাচী ও কামরূপ কামাখ্যা

অম্বুবাচী ও কামরূপ কামাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুর শ্রী জাতক

 

প্রতি বছর অম্বুবাচী উপলক্ষে আসামের কামাখ্যায় দেশের সর্ব বৃহৎ উৎসবটি আয়োজন করা হয় যা অম্বুবাচী মেলা নামে প্রসিদ্ধ।আজ জানবো শক্তি পীঠ কামাখ্যা ও তার সাথে জড়িয়ে থাকা অম্বুবাচী সংক্রান্ত নানা প্রথা, কিংবদন্তি ও তার আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা।

 

কামরূপ হচ্ছে তীর্থচূড়ামণি। তীর্থচূড়ামনির অর্থ হলো সব তীর্থের মধ্যে সেরা তীর্থ স্থান। যেখানে সতীর যোনি মন্ডল পতিত হয়েছিল সেই জায়গাটাকে বলে কুব্জিকাপীঠ। আজও বিশ্বাস করা হয় যে যোনিরূপ যে প্রস্তরখণ্ডে মা কামাক্ষা অবস্থান করছেন সেই শিলা স্পর্শ করলে মানুষ সকল পাপ তাপ থেকে রক্ষা পায়।

 

পুরান অনুসারে স্বয়ং কাম দেব এই সতী পীঠ আবিষ্কার করেন এবং দেবীর পুজো করে শাপমুক্ত হন এবং নিজের হারানো রূপ যৌবন ফিরে পান।

তার নামে স্থানটির নাম হয় কামরুপ।

শাস্ত্র মতে যেহেতু দেবী সতীর গৰ্ভ ও যোনি পতিত হয়েছিল এই স্থানে এই কারণে এই দেবীকে অনেকে উর্বরতার দেবী বা রক্ত ক্ষরণ কারী দেবীও বলে থাকেন তাই স্বাভাবিক ভাবেই অম্বুবাচী যা দেবীর ঋতু মতি হওয়ার উৎসব এই স্থানে সর্বাধিক গুরুত্ব সহকারে পালন হয়|

 

অম্বুবাচির সময়ে বিশেষ কিছু প্রথা পালন করা হয় এখানে।অম্বুবাচীর দিন থেকে পরবর্তী তিন দিন দেবীর মন্দির বন্ধ থাকে|এই সময় দেবীর দর্শন নিষিদ্ধ|এই সময়ে একটি লাল কাপড় দিয়ে

দেবীকে ঢেকে রাখা হয় ভক্তরা মন্দিরের বাইরে থেকে দেবীকে প্রনাম করেন ও নিজের মনোস্কামনা ব্যক্ত করেন|শোনা যায় নিয়ম অমান্য করে এই সময়ে মন্দিরে ঢুকলে অপুরণীয় ক্ষতি হয়।সে চেষ্টাও অবশ্য কেউ করেন না।

 

অম্বুবাচীর চতুর্থ দিন থেকে দেবীর স্নান এর পর তার দর্শন ও স্বাভাবিক পূজা প্রক্রিয়া পুনরায় আরম্ভ হয়|এই পরম্পরা অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে যুগ যুগ ধরে পালিত হয়ে আসছে|অম্বুবাচী নিবৃত্তির পর দেবীর রক্ত বস্ত্র ভক্ত দের মধ্যে দান করা হয়, প্রচলিত বিশ্বাস মতে এই রক্ত বস্ত্র লাভ করলে জীবনের অনেক সমস্যা দুর হয় ও বহু মনোস্কামনা পূর্ন হয়|

 

অম্বুবাচি নিবৃত্তির পর নব গ্রহের প্রতিকারের জন্য অনেকেই এই স্থান নির্বাচন করেন এবং দশ মহা বিদ্যার পূজো দিতে আসেন ।তাছাড়া তন্ত্র মন্ত্র এবং নানা বিধ গুপ্ত বিদ্যার জন্য কামাখ্যা চিরকাল বিখ্যাত।

 

আপাতত চলত থাকবে অম্বুবাচি নিয়ে

ধারাবাহিক লেখা।ফিরে আসবো

আগামী পর্বে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

বিশ্ব যোগ দিবসের শুভেচ্ছা

বিশ্ব যোগ দিবসের শুভেচ্ছা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

গোটা বিশ্বকে ভারতের দেয়া অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপহার হলো যোগ।আজ সেই উপহারকে স্বীকৃতি দেয়ার দিন।আজ ২১ জুন বিশ্ব যোগ দিবস। ভারতের যোগের ইতিহাসে কয়েক হাজার বছরের প্রাচীন হলেও এই যোগ দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি এসেছেন মাত্র কয়েক বছর আগেই|

 

যোগ হল প্রাচীন ভারতে উদ্ভূত শারীরিক ও মানসিক ব্যায়াম এবং আধ্যাত্মিক অনুশীলন প্রথা। এর মধ্যে দিয়ে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা বজায় থাকে। যোগের গুরুত্ব আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান ও স্বীকার করে নিয়েছে। যুগ যুগ ধরে ভারতের যোগ গুরুরা বিশ্ব কে যোগ শিখিয়েছেন এবং আজ তাদের ও শ্রদ্ধা জানানোর দিন।

 

২০১৪ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর রাষ্ট্রসংঘে ভাষণ দেওয়ার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২১ জুন তারিখটিকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস হিসেবে ঘোষণা করার প্রস্তাব দেন। সেই বছরই ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ ২১ জুন তারিখটিকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবস বলে ঘোষণা করে।

 

একাধিক প্রাচীন শাস্ত্রে উল্লেখ আছে আজকের দিনে আদি যোগী তাঁর সবচেয়ে নিষ্ঠাবান সাত জন শিষ্যকে প্রথম দেখেন যাঁরা আলোকপাতের পথ প্রদর্শন না করা পর্যন্ত তাঁকে ছেড়ে না যাওয়ার জন্য দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। এরপর পরবর্তী পূর্ণিমাতে আদি যোগী ওই শিষ্যদের যোগিক ক্রিয়া পদ্ধতি শেখাতে শুরু করেন। এটাই ছিলো প্রথাগত যোগ শিক্ষার সূচনা লগ্ন|

 

আধ্যাত্মিক ভাবে যোগ মানে আত্মার সাথে পরমাত্মার মিলন যার একটি মাধ্যম এই যোগ আসন বা ধ্যান।সুস্থ্য শরীর ও মন পেতে যোগের কোনো বিকল্প নেই।

 

নিয়মিত যোগ অভ্যাস গড়ে তুলুন এবং সুস্থ থাকুন|আপনাদের সবাইকে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের অনেক শুভেচ্ছা জানাই।

জামাই ষষ্ঠীর ধর্মীয় ব্যাখ্যা 

জামাই ষষ্ঠীর ধর্মীয় ব্যাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

জামাই ষষ্টি বাঙালির বারো মাসে তেরো পার্বনের এক অন্যতম পার্বন|আজকের দিন টায় জামাই রা তাদের শশুর বাড়িতে যান নতুন পোশাকে সেজে উপহার নিয়ে, আবার শশুর বাড়ির পক্ষ থেকেও জামাইকে আপ্যায়ন করা হয় উপহার দিয়ে। তবে এই জামাই ষষ্ঠীর একটি আধ্যাত্মিক দিক আছে, ধর্মীয় ব্যাখ্যা আছে। আজ সেই নিয়েই লিখবো।

 

জামাই ষষ্ঠী বাংলার লৌকিক দেবী মা ষষ্ঠীর সাথে গভীর ভাবে সংযুক্ত।জামাই ষষ্টি নিয়ে একটি লোককাহিনী অনুসারে একবার এক গৃহবধূ নিজে মাছ চুরি করে খেয়ে দোষ দিয়েছিলেন বিড়ালের উপর। ফলে তাঁর সন্তান হারিয়ে যায়। তাঁর পাপের ফলেই এই ঘটনা ঘটে বলে মনে করা হয়। তখন সেই মহিলা বনে গিয়ে ষষ্ঠীদেবীর আরাধনা শুরু করেন৷ দেবী তুষ্ট হন৷ ফলে বনেই তিনি নিজের সন্তানকে ফিরে পান। এই জন্যই ষষ্ঠীদেবীর অপর নাম অরণ্যষষ্ঠী। এদিকে মাছ চুরি করে খাওয়ার জন্য শ্বশুর-শাশুড়ি ওই বধূর পিতৃগৃহে যাওয়া বন্ধ করে দেন। এই অবস্থায় মেয়েকে দেখার জন্য ব্যাকুল মা-বাবা একবার ষষ্ঠীপুজোর দিন জামাইকে সাদরে নিমন্ত্রণ জানান। জামাইষষ্ঠী পুজোর দিনে সস্ত্রীক উপস্থিত হলে আনন্দের বন্যা বয়ে যায় বাড়িতে।ষষ্ঠীপুজো রূপান্তরিত হয় জামাইষষ্ঠীতে।অর্থাৎ এই তিথি আসলে মেয়ে জামাইয়ের কল্যানে মা ষষ্ঠীর আরাধনার দিন।

 

সঠিক ভাবে সূচনা কাল বলা মুশকিল তবে মনে করা হয় বৈদিক যুগ থেকেই জামাইষষ্ঠী পালন

হয়ে আসছে। প্রতিবছর জ্যৈষ্ঠ মাসের ষষ্ঠী তিথিতে প্রথম প্রহরে ষষ্ঠী পুজার আয়োজন করা হয়। ষষ্ঠীর প্রতিমা কিংবা আঁকা ছবিতে পুজা নিবেদন করা হয়। কেউ কেউ ঘট স্থাপন করেও এই পুজো করে থাকেন।

 

বাঙালি হিন্দুসমাজে এ উৎসবের সামাজিক গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিশেষত যে পরিবারে সদ্য বিবাহিতা কন্যা রয়েছে সেই পরিবারে এই পার্বণটি ঘটা করে পালন করা হয়। পুজোর সময় পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের জন্য পৃথক মালসার মধ্যে নতুন বস্ত্র, ফলফলাদি, পান-সুপারি, ধান-দূর্বা ও তালের পাখা রাখা হয়। ভক্তরা উপোস রেখে মায়ের পূজা করেন। মালসা থেকে নতুন বস্ত্র পরিধান করে ফল মিষ্টি খেতে হয়।আরো অনেক রীতি নীতি আছে এবং বলা বাহুল্য স্থান ভেদে এই রীতি নীতি

বা উপাচারগুলি আলাদা আলাদা। তবে উদ্দেশ্য একই গৃহের কল্যাণ। মেয়ে জামাইয়ের কল্যাণ।

 

আনন্দে কাটান জামাই ষষ্টি।

অনেক শুভেচ্ছা রইলো। শাস্ত্রীয় নানা বিষয়

নিয়ে লেখা চলতে থাকবে।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শক্তিপীঠ কামাখ্যা

শক্তিপীঠ কামাখ্যা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শক্তিপীঠ বা একান্ন পীঠ নিয়ে আগেও বহুবার লিখেছি তবে এই অম্বুবাচির বিশেষ সময়ে কামাখ্যা পীঠ নিয়ে কথা না লিখলেই নয় কারন অম্বুবাচি কামাখ্যা মন্দিরের প্রধান উৎসব। অম্বু বাচির সময়ে দেশ বিদেশথেকে মাতৃ সাধক এবং তীর্থযাত্রীরা এখানে আসেন।

 

বলা হয় একসময় এ জায়গায় কেউ গেলে আর ফিরে আসত না। এখনো উচ্চ মার্গের তন্ত্র সাধনার জন্য বেছে নেওয়া হয় কামাখ্যা মন্দিরকেই। কামরূপ কামাখ্যার আশপাশের অরণ্য আর নির্জন পথে নাকি ঘুরে বেড়ায় ভালো-মন্দ আত্মারা। এমনকি এক কালে বৈদেশিক শত্রুরা বিশ্বাস করতো কামরূপ-কামাখ্যার অলৌকিক ক্ষমতা সম্পন্ন মায়াবী নারীরা পুরুষদের মন্ত্রবলে ভেড়া বানিয়ে রাখতো|তাই অনেকেই এই পথ মাড়াতে চাইতো না সহজে এমনকি বহু বিদেশী আক্রমকারীও কামাখ্যা অঞ্চলকে এড়িয়ে যেতো বলে শোনা যায়।

 

পীঠ নির্ণয় তন্ত্র মতে সিদ্ধ পীঠ কামরূপে মায়ের মাতৃ যোনি পতিত হয়েছিল।কামাখ্যাকে বলা হয় তীর্থচূড়ামণি। তীর্থচূড়ামনির অর্থ হলো সব তীর্থের মধ্যে সেরা তীর্থ স্থান।

 

মহাভারতের যুগে এই স্থনের নাম ছিল প্রাগজ্যোতিষ।আবার পুরান অনুসারে এই স্থানে নরকাসুর এবং দেবী কামাখ্যাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন বশিষ্ট দেব এবং এই স্থানেই শিবের অভিশাপে নিজ রূপ হারিয়ে পুনরায় নিজের স্বরূপ ফিরে পেয়েছিলেন কামদেব।

 

যেখানে সতীর যোনি মন্ডল পতিত হয়েছিল সেই জায়গাটাকে বলে কুব্জিকাপীঠ।কথিত আছে যোনিরূপ যে প্রস্তরখণ্ডে মা কামাক্ষা অবস্থান করছেন সেই শিলা স্পর্শ করলে মানুষ মুক্তিলাভ করে। কালিকাপুরাণে বলা হয়েছে সতীর অঙ্গ পতিত হওয়ার পর এই উচ্চ পর্বত মহামায়ার শ্রী অঙ্গের ভার সহ্য করতে না পেরে কেঁপে উঠেছিলো এবং নিচের দিকের কিছুটা পাতালে প্রবেশ কোরেছিলো।রঙ ও পরিবর্তন হয়।

আজও সেই অবস্থাতেই আছে।

 

নাগারা স্থাপত্যশৈলীর মন্দিরে গর্ভগৃহ ছাড়াও তিনটি মণ্ডপ সম্বলিত কক্ষ রয়েছে যেগুলোর স্থানীয় নাম চলন্ত, পঞ্চরত্ন এবং নাটমন্দির।

এই মন্দির চত্বরে দশমহাবিদ্যার মন্দিরও বিদ্যমান।

দেবীর ভৈরব একজন নয় নয়জন।তাই মনে করা হয় সুদূর অতীতে কোনো এক সময়ে হয়তো এখানে নয়টি শক্তিপীঠ ছিলো। যদিও এখন একটি শক্তিপীঠ ই জনসমক্ষে অবস্থিত।

 

কামাখ্যা পীঠ এবং অম্বুবাচি সংক্রান্ত আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং তথ্য নিয়ে

ফিরে আসবো আবার পরবর্তী

সময়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

অম্বুবাচির প্রকৃত অর্থ

অম্বুবাচির প্রকৃত অর্থ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

অম্বুবাচি নিয়ে আলোচনায় শুরুতে শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা জানিয়েছি আজ জানাবো অম্বুবাচির প্রকৃত বা অন্তর নিহিত অর্থ।

 

পুরানে পৃথিবীকে নানা রূপে দেখানো হয়েছে।

শাস্ত্র মতে তিনি কশ্যপ প্রজাপতির কন্যা ভূদেবী। আবার রামায়ণে তিনি সীতার মা। অন্য একটি পৌরাণিক ব্যাখ্যা অনুসারে দ্বাপরযুগে কৃষ্ণের স্ত্রী সত্যভামা রূপে এই ভুদেবী জন্মেছিলেন।আবার বরাহ অবতারে এই বসুন্ধরাকেই অতল সাগর থেকে রক্ষা করেছিলেন স্বয়ং বিষ্ণু।

আষাঢ় মাসে বর্ষার আগে অম্বুবাচীতে

ঋতুমতী হন পৃথিবী।

 

এই সময়ে কৃষকরা কৃষি কাজ থেকে বিরত থাকেন ও ধরিত্রী কে বিশ্রাম দেন|আবার অম্বুবাচী

উপলক্ষে উড়িষ্যায় ভূদেবীর বিশেষ পূজা মেলা ও উৎসবের আয়োজন করা হয় ও ব্যাপক জন সমাগম হয়|ভূদেবী কে উড়িষ্যায় স্বয়ং জগন্নাথ দেবের স্ত্রী হিসেবে কল্পনা করা হয় এবং তার ঋতুমতী হওয়ার সময় কাল কে চারদিনের রজ উৎসব হিসেবে পালন করা হয়|চারদিনের এই উৎসব কে চারটি আলাদা পর্যায় উদযাপন করা হয় প্রথম দিনকে বলা হয় পহিলি রজ। দ্বিতীয় দিন মিথুন সংক্রান্তি| তৃতীয় দিন ভূদহ বা বাসি রজ এবং চতুর্থ দিন বসুমতী স্নান।

 

দেবী কালীর ভূমি বাংলাও কোনো কালে পিছিয়ে ছিলোনা এই শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান পালনে অম্বুবাচী উপলক্ষে গ্রামবাংলার বিধবা মহিলারা তিন দিন ধরে ব্রত রাখেন|দেশ তথা বাংলার প্রায় সব গুলো শক্তি পীঠেই নিষ্ঠার সাথে অম্বুবাচী পালন হয় ও সেই উপলক্ষে বিশেষ উৎসব এবং কোথাও কোথাও মেলার আয়োজন করা হয়।

 

সনাতন ধর্মে চন্দ্র সূর্য বায়ু পর্বত বা গঙ্গা যেমন দেবতা বা দেবী রূপে পূজিত হন তেমনই প্রকৃতি

এখানে দেবীর মর্যাদা পায়। যে প্রকৃতি আমাদের খাদ্য দেয় অক্সিজেন দেয় জল দেয় সেই প্রকৃতিকে মাতৃ শক্তি রূপে পুজো করা এবং তার জীবনের একটি বিশেষ পর্যায়কে সন্মান জানানোই অম্বুবাচির প্রকৃত উদ্দেশ্য।

 

অর্থাৎ বৃহৎ অর্থে বা অন্তর্নিহিত অর্থ অনুযায়ী

পৃথিবীকে দেবী রূপে পূজো করা এবং

তার উর্বরতা শক্তিকে শ্রদ্ধা জানানো হয়

এই অম্বুবাচিতে।

 

ফিরে আসবো আগামী পর্বে

ধারাবাহিক ভাবে চলবে অম্বুবাচি

নিয়ে লেখা ।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

অম্বুবাচীর শাস্ত্রীয় বিধি নিষেধ

অম্বুবাচীর শাস্ত্রীয় বিধি নিষেধ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

অম্বুবাচী নিয়ে লেখা শুরু করেছি আগেই। আজকের পর্বে জানাবো অম্বুবাচী সংক্রান্ত নানা শাস্ত্রীয় বিধি নিষেধ এবং সেগুলির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য।

 

আসলে এই বিশেষ সময় ধরিত্রী যেহেতু ঋতুমতী হয় তাই লৌকিক আচার বা প্রথা গুলিকে সাময়িক ভাবে স্থগিত রাখা হয় এর পেছনে আছে বা বিশ্বাস, শ্রদ্ধা এবং হাজার হাজার বছরের প্রাচীন পরম্পরা সাথে শাস্ত্রীয় বিধান|যদিও চতুর্থ দিন অম্বুবাচির নিভৃতির পর থেকে শুভ কাজে আর কোনো রকম বাধা থাকেনা।

 

শাস্ত্র মতে অম্বুবাচীর প্রথম তিন দিন কৃষি কাজ ছাড়াও আরো অনেককিছুই করা নিষেধ। এই সময় কোনো শুভ বা মাঙ্গলিক কাজের সূচনা করা হয়না যেমন বিবাহ,অন্নপ্রাসন গৃহ প্রবেশ বা মন্দিরের স্বাভাবিক পূজাঅর্চনা ইত্যাদি।

 

শাস্ত্র মতে আমাদের দৈনন্দিন জীবনেও কয়েকটি বিধি নিষেধ এই অম্বুবাচী চলাকালীন মেনে চলা শ্রেয় যেমন আদি শক্তির বিভিন্ন রূপকে যারা পূজা করেন অর্থাৎ কালী, চন্ডি, দূর্গা জগদ্ধাত্রী ইত্যাদি তারা দেবীমূর্তি কে একটি লাল কাপড়ে ঢেকে রাখতে পারেন।এই সময় দেবী মূর্তিকে স্পর্শ করা বা মন্ত্রউচ্চারণ করা উচিৎ নয়|

 

যারা দীক্ষিত তারা গুরু পূজা করতে পারেন এছাড়া জপ চলতে পারে তাতে কোনো দোষ নেই|গৃহী রা এই সময় কয়েকটি নিয়ম মেনে চললে গৃহের কল্যাণ হয় যেমন নতুন বৃক্ষ রোপন না করা বা দাম্পত্য জীবনে সংযম এবং শুদ্ধতা বজায় রাখা ইত্যাদি।

 

গ্রাম বাংলার বহু স্থানে সাধারণত বিধবা মহিলারা অম্বুবাচী চলা কালীন আগুন জ্বালিয়ে খাবার রান্না করেন না|যারা ব্রহ্মচর্য পালন করেন তাদের এই সময় আমিষ খাবার বর্জন করে মূলত ফল মুল খেয়ে থাকতে হয়|এই কটাদিন বেদ পাঠ করা যায়না এবং উপনয়ন অনুষ্ঠান করা যায়না|

 

অম্বুবাচীর আগের দিনটিকে বলা হয় ‘অম্বুবাচী প্রবৃত্তি’। তিন দিনের পরের দিনটিকে বলা হয় ‘অম্বুবাচী নিবৃত্তি’ যার পর আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সূচনা হয় ধীরে ধীরে|

 

অম্বুবাচী নিবৃত্তির সময় তন্ত্র সাধনা এবং শাস্ত্র মতে গ্রহ দোষ খণ্ডনের উপযুক্ত সময় বলে ধরা হয়।তাই এই সময়ে কামাখ্যা পিঠে বহু তন্ত্র সাধকের আগমন হয়। সে সব নিয়েও লিখবো

আগামী পর্ব গুলিতে ধারাবাহিক ভাবে।

থাকবে আরো অনেক কিছু।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

অম্বুবাচির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

অম্বুবাচির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

প্রকৃতির নিয়ম অনুসারে চলে এসেছে বর্ষাঋতু।
তিথি অনুসারে যথা সময়ে শুরু হচ্ছেঅম্বুবাচি। অম্বুবাচির এই পবিত্র সময়ে ঋতুমতি হবেন ধরিত্রী। মাতৃ শক্তির এবং একই সাথে সৃষ্টি শক্তির প্রতীক মা কামাখ্যার মন্দিরে বসবে অম্বুবাচি মেলা। এই কটাদিন এই অম্বুবাচি নিয়ে নানা দৃষ্টি কোন
থেকে আলোচনা করবো।আজকের পর্বে এই অম্বুবাচির শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা জানাবো।

বিভিন্ন শাস্ত্রে আলাদা আলাদা ভাবে অম্বুবাচিকে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। যদিও আসল কথা একই।
সংস্কৃত শব্দ “অম্ব ” মানে জল আর “বাচি” মানে আরম্ভ বা সূচনা৷

জ্যোতিষ শাস্ত্র মতে রাশি চক্রের ২৭টি নক্ষত্রের মধ্যে সূর্য যখন আদ্রা নক্ষত্রে প্রবেশ করে সেই
তিন দিন কুড়ি দন্ড সময়টাই “অম্বুবাচি ” ৷

প্রাকৃতিক ভাবে প্রচন্ড গরমের পর এই সময় বর্ষার জলে ভিজে পৃথিবী হয় সিক্ত ও বীজ ধারনের উপযোগী ৷এই সময় মনে করা হয় মা বসুমতী ঋতুমতী হয়েছেন ৷ তার জীবন চক্রের এই বিশেষ সময় কালকে অম্বুবাচি হিসেবে পালন করা হয়।

রজঃস্বলা নারী যেমন এই সময় অনেক কাজ করেন না তেমনই প্রকৃতির ক্ষেত্রে এই সময়ে বিশেষ কিছু রীতি নীতি পালন করা হয়।
এই দিনগুলিতে চাষিরা কৃষিকাজ বন্ধ রাখেন ৷ সাধারণত সন্ন্যাসী , যোগী এবং বিধবা মহিলারা এই তিন দিন রান্না করা ও আমিষ খাবার খান না।

শাস্ত্রে আছে –
“ত্বমেব প্রকৃতিদেবী ত্বমেব পৃথিবী জলম্ ৷
ত্বমেব জগতাং মাতা ত্বমেব চ জগন্ময়ী ৷’’
অর্থাৎ পৃথিবী হলেন ধরিত্রী মাতা।বরাহ অবতারে সলীল সমাধি থেকে মাতা ধরিত্রীকে উদ্ধার করেছিলেন বিষ্ণু।আজ বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মহাবিশ্বে সত্যি এমন গ্রহ পাওয়া গেছে যেখানে বাস্তবেই পৃথিবীকে জলমগ্ন করে রাখা যায়
অর্থাৎ শাস্ত্রর বাস্তবতা প্রমাণিত।

সনাতন ধর্ম এবং সংস্কৃতিতে নারী ও ধরিত্রী এই দুই উর্বরতা এবং সৃষ্টি শক্তির আধার তাই মাতৃ শক্তির এই স্বাভাবিক পর্যায়টি অত্যন্ত পবিত্র সময় রূপে দেখা হয় এবং অম্বুবাচির নিবৃত্তির সময়টি
দেশের নানা প্রান্তে উৎসব রূপে পালিত হয় ।
সেই প্রসঙ্গে আরো বিস্তারিত আলোচনা করবো
ধারাবাহিক ভাবে।

ফিরে আসবো আগামী পর্বে। অম্বুবাচি সংক্রান্ত নানা তথ্য এবং ব্যাখ্যা নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেবতা – কালু রায়

লৌকিক দেবতা – কালু রায়

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

দক্ষিণ বঙ্গ বা বিশেষ করে সুন্দরবন অঞ্চলে একাধিক লৌকিক দেব দেবীর পূজো হয়ে আসছে বহু প্রাচীনকাল থেকে।যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের কথা আপনাদের আগেও বলেছি।এই অঞ্চলের আরো এক প্রসিদ্ধ লৌকিক দেবতা হলেন বাবা কালু রায়।

 

দক্ষিণরায় যেমন বাঘের দেবতা কালু রায় তেমনই কুমিরের দেবতা।সুন্দরবন মানেই জলে কুমির এবং বাঘ। দুদিকেই বিপদ। বাঘের হাত থেকে বাঁচতে মানুষ যেমন বন বিবি বা দক্ষিণ রায়ের পূজো দিতো তেমনই কুমিরের হাত থেকে রক্ষা পাবার বিশ্বাসে কালু রায়ের পুজো দেওয়া হয়।

 

মূলত মৎসজীবি জেলেরা, কাঠুরেরা বা মধু ভাঙতে যাওয়া মানুষেরা কালু রায়ের পূজো দিতো।একটি জনশ্রুতি অনুযায়ী একবার দক্ষিণরায় এবং বড়খাঁ গাজী নামে আরেক লৌকিক দেবতার ভীষণ যুদ্ধ লেগেছিলো। সেই যুদ্ধ থামিয়ে শান্তি স্থাপন করতে আবির্ভাব হয় কালু রায়ের।

 

কিছু দক্ষিণ রায়ের মন্দিরে একই সাথে কালু রায়েরও পূজো হয়। আবার কোথাও গোলাকার প্রস্তরখন্ড এই দেবতার প্রতীকরূপে স্থাপন করে পূজো দিতে দেখা যায়।খুব কম কিছু স্থানে কালু রায়ের মূর্তি দেখা যায়। মূর্তিতে হাতে টাঙ্গি তরোয়াল এবং পিঠে তির ধনুক নিয়ে যোদ্ধার সাজে বিরাজ করেন কালু রায়।

 

কালুরায়ের মন্দির সেভাবে দেখা যায় না, গাছের তলাতেই তার পূজা হয়। মন্দির খুব কম সংখ্যকেই আছে। বছরে একবার বড় করে কালু রায়ের পূজো এবং বাৎসরিক উৎসব হয়। নৈবেদ্য রূপে ফলমূল, কলা, আতপচাল দেওয়া হয়।জাতি ধর্ম বর্ন নির্বিশেষে সবাই এই উৎসবে মেতে ওঠেন।

 

ফিরে আসবো আগামী আগামী পর্বে। থাকবে শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক নানা বিষয়

নিয়ে উপস্থাপনা । পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – মা ষষ্ঠী

লৌকিক দেব দেবী – মা ষষ্ঠী

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলায় বারো মাসে যে তেরো পার্বন অনুষ্ঠিত হয় তার মধ্যে একাধিক ষষ্ঠী ব্রতর উল্লেখ পাওয়া যায়। যেমন জামাই ষষ্ঠী, শীতল ষষ্ঠী ইত্যাদি।এই ষষ্ঠী শুধু একটি তিথি নয় ষষ্ঠী একজন দেবীও বটে।

দেবী ষষ্ঠীর উল্লেখ কিছু পুরানে

থাকলেও লৌকিক দেবী রূপেই তিনি পূজিতা হন।

 

পুরাণ অনুসারে দেবী নন ব্রহ্মার মানস কন্যা এবং লৌকিক দেবী রূপে তিনি মূলত প্রজজনের দেবী, সন্তানদায়িনী। দেবীর আশীর্বাদে সন্তান প্রাপ্তি হয় সংসারে সুখ এবং সমৃদ্ধি আসে।

 

অনেকের কাছেই দেবী ষষ্ঠী আসলে দেবী দুর্গার একটি লৌকিক রূপ। দেবী এখানে উগ্র বা ক্রোধন্মত্তা নন তিনি শান্ত এবং স্নিগ্ধ।দেবী দুর্গাই ষষ্ঠী রূপে গৃহে গৃহে বাস করেন এবং এজন্য তাকে তিনি গৃহদেবীও বলা হয়।

 

বাংলায় লৌকিক দেবী হিসাবে পূজিত ষষ্ঠী দেবীর যে রূপ আমারা পাই সেখানে তিনি দ্বিভূজা।

তাঁর কোলে থাকে শিশু এবং দেবী বাহন বিড়াল।

 

বহু গৃহস্ত বাড়িতে মায়ের বাহন রূপে বিড়ালদের সযত্নে লালন পালন করা হয়ে থাকে এবং বিশ্বাস করা হয় বাহনের অবহেলা হলে দেবী রুষ্ট হন তাতে গৃহের অকল্যাণ হয়।

 

কোথাও মূর্তি রূপে কোথাও আবার ষষ্ঠী রূপে শিলাখন্ডকে পুজো করার চল রয়েছে।

বাংলার বহু স্থানে।পরিবারের মঙ্গল কামনায়, বিশেষ করে সন্তান ভাগ্য প্রসন্ন হয়ার জন্য ষষ্ঠী ব্রত পালন পালন করা হয়।

 

ফিরে আসবো লৌকিক দেব দেবীর পরবর্তী পর্ব নিয়ে আগামী দিনে। ধারাবাহিক লেখা চলতে থাকবে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

লৌকিক দেব দেবী – ধর্মঠাকুর

লৌকিক দেব দেবী – ধর্মঠাকুর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

বাংলার অন্যতম প্রসিদ্ধ লৌকিক দেবতা হলেন ধর্ম ঠাকুর। মূলত দক্ষিণ বঙ্গের আঞ্চলিক দেবতা এই ধর্ম ঠাকুর।আজকের পর্বে ধর্ম ঠাকুরের তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করবো।

 

আসলে ধর্ম ঠাকুর হলেন যমের একটি লৌকিক রূপ তাঁকে ধর্মরাজ ও বলা হয়।তিনি ন্যায়, সুবিচার এবং নৈতিকতার দেবতা। তিনি অন্যায় করলে শাস্তি দেন আবার যারা ভালো কাজ করেন তাদেরকে কৃপা করে ধন্য করেন।

 

ধর্ম ঠাকুরকে কোথাও শীলা খন্ড রূপে আবার কোথাও সুপুরুষ এক দেবতা রূপে পূজো করা হয় এবং তাঁর বাহন হিসাবে আছে ঘোড়া স্থান পায়।

 

এক সময় সুন্দরবন লাগোয়া দক্ষিণ ২৪ পরগনার বিভিন্ন জায়গাতেও ধর্ম ঠাকুরের পুজো প্রচলিত ছিলো। বহু ধর্ম ঠাকুরের স্থান আজ ভগ্ন প্রায় তবে তাদের মধ্যে কিছু স্থান আজও জাগ্রত। আজও স্বমহিমায় বিরাজ করছেন ধর্ম ঠাকুর।তেমনই এক স্থান দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার জয়নগর।সেখানে সুপ্রাচীন ধর্ম ঠাকুরের মন্দির আছে এবং জৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে ধর্ম ঠাকুরের বিশেষ

পুজো হয়।

 

অন্যন্য লৌকিক দেব দেবীদের ন্যায় ধর্ম ঠাকুরের পূজোতেও জাতি, ধর্ম, বর্ন নির্বিশেষে সমাজের সব শ্রেণির মানুষই মেতে ওঠেন।জয়নগর থানা এলাকার দক্ষিণ বারাসতে ধর্ম ঠাকুর মন্দির বেশ বিখ্যাত এখানে অসংখ্য মানুষ পুজো দিতে আসেন।

 

ফিরে আসবো আগামী দিনে। থাকবে

আরো একটি নতুন পর্ব। আরো অনেক তথ্য

এবং ব্যাখ্যা। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।