আজ পুরান কথার এই পর্বে গনেশের বিবাহ নিয়ে বলবো|বাংলার দুর্গোৎসবের সময়ে কলা বউ স্নান করানোর রীতি আছে|অনেকে মনে করেন এই কলা বউ গণেশের স্ত্রী|পুরান কিন্তু অন্য কথা বলছে|শিব পুরাণ অনুসারে প্রজাপতি ব্রহ্মার দুই কন্যা সিদ্ধি ও বুদ্ধির সঙ্গে বিয়ে হয় গণেশের। দুই স্ত্রীর সঙ্গেই গণেশের একজন করে সন্তানের জন্ম হয়। সিদ্ধির গর্ভে জন্মান ক্ষেম। আর বুদ্ধির সন্তানের নাম লাভ। তবে গণেশের দুই স্ত্রীর নাম নিয়ে কিন্তু মতভেদ রয়েছে। কোথাও গণেশের দুই বউয়ের নাম তুষ্টি ও পুষ্টি আবার কোনো শাস্ত্রে ঋদ্ধি ও বুদ্ধি। গনেশের জন্ম ও তার অদ্ভুত রূপ নিয়ে যেমন অনেক পৌরাণিক ঘটনা আছে তেমন তার বিবাহ নিয়েও পুরানে একটি ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় বিবাহ স্থির করার আগে মহেশ্বর কার্তিক ও গণেশ কে বললেন–তোমরা দুজনেই আমাদের কাছে সমান। আমরা ঠিক করেছি যে আগে পৃথিবী পরিক্রমা করে আসবে, তার আগে বিয়ে হবে।কার্তিক তার বাহন ময়ুরে চড়ে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করতে বেরিয়ে পড়লেন|বেগতিক দেখে বুদ্ধিমান গণেশ এক অদ্ভুত কান্ড করে ফেললেন|তিনি তার পিতা মাতা কেই সাত বার প্রদক্ষিণ করলেন ভক্তি সহকারে ও বললেন পুত্রের প্রধান তীর্থ পিতা-মাতার পাদপদ্ম। তেমনি স্বামীই পত্নীর পরম তীর্থক্ষেত্র। এখন আমি আপনাদের প্রদক্ষিণ করলাম। এতো পৃথিবী পরিক্রমা হল আর যদি না হয়ে থাকে তাহলে বেদবাক্যকে মিথ্যা বলতে হয়।যথারীতি এই উত্তরে প্রসন্ন হয়ে শিব ও পার্বতী তাদের প্ৰিয় পুত্র গনেশের বিবাহ আগে স্থির করেন ও যথা সময়ে গণেশের বিবাহ সম্পন্ন হয়|সিদ্ধিদাতা গণেশকে কেন্দ্র করে ঘটেছে একাধিক পৌরাণিক ঘটনা |আবার আগামী দিনে নতুন পুরান কথানিয়ে ফিরে আসবো|পড়তে থাকুন থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – পঞ্চকেদার সৃষ্টি
পুরান কথার আজকের পর্বে আলোচনা করবো পঞ্চকেদার নিয়ে|শিব ক্ষেত্র বলতেই প্রথমেই কাশি বা অমরনাথ বা কৈলাস মানস সরোবরে নাম মনে হলেও শৈব্য দের কাছে পাঁচটি শিব মন্দিরের আলাদা মাহাত্ম্য আছে|এই পাঁচটি শিবমন্দিরকে একত্রে পঞ্চ কেদার ও বলে|এগুলি হলো যথাক্রমে কেদার নাথ, তুঙ্গনাথ যা উত্তরাখণ্ড এর রুদ্রপ্রয়াগ জেলায় অবস্থিত পৃথিবীর সর্বোচ্চ শিব মন্দির, মদমহেশ্বর,রুদ্রনাথ যা পাঁচটি কেদারের মধ্যে সবচেয়ে দুর্গম রুদ্রনাথ। কল্পেশ্বর ,কল্পগঙ্গা নদীর তীরে কল্পেশ্বর মন্দির।এই পাঁচটি মন্দির বা পঞ্চকেদার কিভাবে সৃষ্টির হোলো তা নিয়ে মহাভারতে একটি সুন্দর ঘটনার উল্লেখ আছে|কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরবদের হত্যা করলেন পঞ্চ পাণ্ডব এবং স্বজন হত্যা ও ব্রাহ্মণ হত্যার মত গুরুতর পাপের ভাগী হলেন। যুদ্ধ শেষে শোকে দুক্ষে মর্মাহত পাঁচ ভাই বেড়িয়ে পড়লেন দেবাদিদেব মহাদেব-এর খোঁজে। উদ্দেশ্য তাঁর আশীর্বাদ নিয়ে কিছুটা হলেও মনের শান্তি ফিরে পাওয়া।প্রথমেই তাঁরা গেলেন শিবধাম কাশীতে যেখানে রয়েছে অসংখ্য শিব মন্দির|কাশীতে শিবের দেখা না পেয়ে বিমর্ষ পঞ্চপাণ্ডব গেলেন গাড়োয়াল হিমালয়ে। সেখানে গুপ্তকাশীর কাছাকাছি তাঁরা দেখলেন প্রকাণ্ড এক ষাঁড় ঘুরে বেড়াচ্ছে। পঞ্চপাণ্ডবদের অন্যতম ভীম দর্শনমাত্র চিনে ফেললেন যে এই ষাঁড়ের ছদ্মবেশে লুকিয়ে আছেন স্বয়ং মহাদেব|ওদিকে পাণ্ডবদের দেখেই শিব পালানোর চেষ্টা করলেন। ছুটে গিয়ে ভীম ষাঁড়টিকে জড়িয়ে ধরলেন। শিব তৎক্ষণাৎ অদৃশ্য হয়ে গেলেন মাটীর নীচে এবং ওই আত্মগোপনরত অবস্থায় ছদ্মবেশে বিভিন্ন জায়গায় শিব পঞ্চপাণ্ডবদের দর্শন দেন। কেদারনাথে ষাঁড়ের কুঁজ আবির্ভুত হয়। তুঙ্গনাথে বাহুদ্বয়, রুদ্রনাথ-এ মস্তক, নাভি ও পেট আবির্ভূত হয় মদমহেশ্বর-এ, চুল ও জটা কল্পেশর-এ। এভাবেই খণ্ডিতভাবে ছড়িয়ে পড়েছিল এই সকল জায়গায়। এরপর পাণ্ডব ভাইয়েরা এই পাঁচ জায়গাতেই শিবের মন্দির স্থাপন করলেন, যা বর্তমানে একত্রে পঞ্চ কেদার নামে হিন্দুদের পবিত্রতম তীর্থস্থান ও জগৎ প্রসিদ্ধ|চলবে পুরান কথা|আগামী পর্বে এমনই কোনো রোমাঞ্চকর পৌরাণিক ঘটনার সহজ ব্যাখ্যা নিয়ে ফিরে আসবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
জন্মদিনে কবিগুরুকে প্রণাম ও শ্রদ্ধার্ঘ্য
অগ্রজ কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে শ্রদ্ধাজানিয়ে একাধিক কবিতা লিখেছেন বাংলাকাব্য জগতের আরেক মহারথী জীবনানন্দ দাশ যার মধ্যে ঊষা’ পত্রিকায় প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে এই কবিতাটি আমার খুব প্ৰিয় -‘মানুষের মনে দীপ্তি আছেতাই রোজ নক্ষত্র ও সূর্য মধুর—এ রকম কথা যেন শোনা যেতো কোনো একদিন,আজ সেই বক্তা ঢের দূরচলে গেছে মনে হয় তবু;আমাদের আজকের ইতিহাস হিমেনিমজ্জিত হয়ে আছে বলেওরা ভাবে নীল হয়ে গিয়েছে অন্তিমেসৃষ্টির প্রথম নাদ—শিব ও সৌন্দর্য;তবুও মূল্য ফিরে আসেনতুন সময়তীরে সার্বভৌম সত্যের মতনমানুষের চেতনায় আশায় প্রয়াসে।’আজ পঁচিশে বৈশাখে কবিগুরুর চরনে আমার প্রণাম ও শ্রদ্ধার্ঘ্য রইলো|
পুরান কথা – হনুমানজি ও সিঁদুর
আমরা বিশ্বাস করি ভগবান হনুমানকে সিঁদুর দিয়ে পুজো দিলে তিনি সন্তুষ্ট হন এবং তাঁর ভক্তের মনস্কামনা পূর্ণ করেন এবং প্রতি মঙ্গলবার হনুমানজি-কে সিঁদুর দিয়ে পুজো দিলে গৃহস্থের মঙ্গল হয় এবং সংসারে সুখ-শান্তি বজায় থাকে।এই উপাচারের সাথে জড়িত আছে এক পৌরাণিক ঘটনা রামভক্ত হনুমান-কে সিঁদুর দান করার পিছনে একটি পৌরাণিক কাহিনী রয়েছে।পুরানে উল্লেখ আছে একদিন দেবী সীতাকে সিঁদুর পড়তে দেখে হনুমান সীতাকে জিজ্ঞেস করেন যে তিনি কেন সিঁদুর পড়ছেন, উত্তরে সীতা হনুমানকে জানিয়েছিলেন,ঈশ্বর রামের দীর্ঘায়ুর জন্যই সিথিতে সিঁদুর পড়েন তিনি।হনুমান তখন ভাবেন যদি সিঁদুরই তাঁর প্রভু রামের দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠি হয় তাহলে তিনিও সিঁদুর পড়বেন।তাই সীতার কথা শুনেই নিজের পুরো শরীরেই সিঁদুর মেখে নেন হনুমান।এখান থেকেই সূত্রপাত হয় তার সিঁদুর প্রীতির |গুরুর প্রতি শিষ্যের এমন ভালোবাসা ও ভক্তির কথা জানতে পেরে শ্রীরামচন্দ্র হনুমানকে আশীর্বাদ করেন যে, সবাই তাকে সিঁদুর দিয়ে পুজো করবে। আর সেই থেকে আজও ভগবান হনুমানকে সিঁদুর দান করে পুজো করা হয়।এরপর থেকেই হনুমান ভক্তরা মনে করেন, বীর হনুমানকে সিঁদুর দান করলে তিনি সেই সিঁদুর নিজের গায়ে মাখেন এবং ভক্তের সমস্ত ইচ্ছে পূরণ করে দেন।আপনারাও নিজ মনোস্কামনা জানিয়ে তার উদ্দেশ্যে সিঁদুর অর্পণ করতে পারেন|ভালো ফল পাবেন|এমন আরো অনেক পৌরাণিক ঘটনার ব্যাখ্যা পেতে পড়তে থাকুন পুরানকথা|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – প্রভু জগন্নাথ
চলছে জগন্নাথ দেবের চন্দন যাত্রা আর কদিন পরেই স্নান যাত্রা আর তারপর বহু প্রতিক্ষিত রথ যাত্রা,রথে চড়ে ভক্তদের দর্শন দেবেন জগতের জগন্নাথ-বলরাম-সুভদ্রা, গত বৃহস্পতিবার অত্যন্ত পবিত্র তিথিতে আমার গৃহ মন্দিরে শাস্ত্র মতে প্রতিষ্ঠিত হলেন জগন্নাথদেব|

আজ পুরান কথায় জানাবো জগন্নাথদেব সম্পর্কে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও তার ব্যাখ্যা|চন্দন যাত্রা চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে শুরু হয়ে ২১ দিন পর্যন্ত চলে। ভগবান শ্রীজগন্নাথদেব এই দিনে রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নকে চন্দনযাত্রা মহোৎসবটি পালন করার জন্য সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন।

ভগবানের অঙ্গলেপন এক ধরণের ভক্তিমূলক কর্ম এবং চন্দন হল সর্বশ্রেষ্ঠ প্রলেপন। যেহেতু ভারতে বৈশাখ মাস অত্যন্ত উষ্ণ থাকে, তাই চন্দনের শীতল গুণ ভগবানের আনন্দ প্রদান করে। জগন্নাথের দুই চক্ষু ব্যতীত সর্বাঙ্গে চন্দন লেপন করা হয়ে থাকে। এবং উৎসব-মূর্তি বা বিগ্রহগণকে নিয়ে শোভাযাত্রা করা হয় এবং মন্দির পুষ্করিণীতে নৌকাবিহার করা হয়ে থাকেদেবস্নানা পূর্ণিমা তিথিতে পালিত হয় মহাপ্রভু জগন্নাথদেবের স্নানের উৎসব স্নানযাত্রা কারন এই দিন জগন্নাথদেবের জন্মতিথি। স্নানযাত্রা আমাদের হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের খুবই পবিত্র উৎসব এবং এই স্নানযাত্রা উপলক্ষে জগন্নাথ, বলরাম, সুভদ্রা এবং মদনমোহনের বিগ্রহ শোভাযাত্রা সহকারে গর্ভগৃহ থেকে স্নানবেদীতে আনা হয় এবং এই সময়ে ভক্তদের দর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়|যদিও এবছর মহামারীর কারনে অনেক নিষেধাজ্ঞা জারি আছে, সর্বসাধারণের অংশগ্রহণ সেই ভাবে হবে না|এই স্নান যাত্রার ইতিহাস অতি প্রাচীন, স্কন্দপুরাণ মতে পুরীর মন্দির প্রতিষ্ঠার পর রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন এই অনুষ্ঠান প্রচলন করেন এই বিশেষ তিথিতে|স্নানযাত্রার দিন কূপের জল মন্ত্র দ্বারা শুদ্ধ করে ১০৮ কলস জলে বিগ্রহ স্নান করানো হয়। স্নানপর্বের পর বিগ্রহ সাজানো হয় গজবেশে। অনেকেই মনে করেন এই উৎসব কালে জগন্নাথ দর্শন করলে সব পাপ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়| স্নানযাত্রার পর শুরু হয় অনসর। এই অনসরকালে জগন্নাথদেব অসুস্থতার কারণে ভক্তগণের অন্তরালে গোপন স্থানে চিকিৎসাধীন থাকেন,তিনি গৃহবন্দি হন,রথযাত্রা পর্যন্ত বিশ্রাম নেন,এই সময়ে জগৎ রক্ষাকারী এই দেবতাকে কম্বল চাপা দিয়ে রাখা হয়।আর রথযাত্রার দিন আত্মপ্রকাশ করেন। রাজবেশে সামনে আসেন জগতের নাথ|হিন্দু ধর্মের অন্যান্য দেবতাদের মূর্তি বা প্রতিমার সঙ্গে জগন্নাথের বিগ্রহের কিছু পার্থক্য রয়েছে।

দেবতাদের বিগ্রহ সাধারণত আমরা সোনা, রুপো, তামা কিংবা বিভিন্নরকম ধাতু এমনকি মাটি দিয়েও তৈরি হয়। কিন্তু জগন্নাথের বিগ্রহ তৈরি হয় নিম কাঠ দিয়ে। বিগ্রহের আকারও বিচিত্র। চৌকো মাথা, বড় বড় চোখ এবং অসম্পূর্ণ হাত। জগন্নাথের এই অসম্পূর্ণ হাতের পিছনে চলতি অনেক গল্প রয়েছে। রয়েছে আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা এবং তাৎপর্য|প্রভু জগন্নাথের মূর্তিতে চোখের পাতা নেই|এর একটা কারন তিনি জগতের নাথ এবং তিনি সদা জাগ্রত|একটি মুহূর্তের জন্যও তিনি দেখা বন্ধ করেননা|তিনি পরম দয়ালু তাই প্রতি মুহূর্তে তার ভক্তদের উপর তার কৃপা দৃষ্টি নিক্ষেপিত হয়|

“যে গাছের কাঠ দিয়ে জগন্নাথের মূর্তি তৈরী হতে পারে, তার এগারোটা বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে। “”যেমন গাছের গায়ে হাতির শুঁড় ও চোখের আকৃতি স্পষ্ট থাকতে হবে, গাছের সাথে সাপ জড়িয়ে থাকবে, উঁইয়ের ঢিপি থাকবে ইত্যাদি।”প্রায় দুমাস ধরে কঠিন পরিশ্রমের মধ্যে দিয়ে ওই গাছ খুঁজে বার করে তারপরে মহাযজ্ঞ এবং আরো অনুষ্ঠান করে শুরু হয় মূর্তি নির্মাণ|চলবে পুরান কথা|দেখা হবে পরের পর্বে|পড়তে থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – লর্ড আয়াপ্পা
আপনারা জানেনা শিবের দুই ছেলে কার্তিক আর গণেশ কিন্তু অনেকেই হয়তো জানেন না মহাদেবের কিন্তু আরও এক পুত্রসন্তান রয়েছে, তিনি আয়াপ্পা, দক্ষিণ ভারতে অত্যন্ত জনপ্রিয়| বাবার মতোই তিনিও মহাগুণের অধিকারী|কার্তিক, গণেশের পরই শিবের পুত্রসন্তান হিসাবে মনে করা হয় আয়াপ্পাকে আজকের পুরান কথায় বলবো এই দেবতা আয়াপ্পার কথা|কথিত আছে, ভষ্মাসুরের হাত থেকে মহাদেবকে রক্ষা করতেই বিষ্ণু মোহিনীরূপ ধারণ করেন পরবর্তীতে এই মোহিনী অবতার ও শিবের মিলনের ফলে জন্মান আয়াপ্পা|ব্রহ্মাণ্ডপুরাণে দেবর্ষি নারদ শিবকে বিষ্ণুর মোহিনী রূপ সম্পর্কে বলেন যার দ্বারা তিনি অসুরদের সাথে ছলনা করেছেন। শিব এই কথা অবিশ্বাস করেন। শিব এবং তার স্ত্রী পার্বতী বিষ্ণুলোকে গমন করেন। শিব বিষ্ণুকে পুনরায় তার মোহিনী রূপ গ্রহণ করতে বলেন, যাতে শিব নিজে বিষ্ণুর এই রূপান্তরকে দেখতে পারেন। বিষ্ণু হাসেন, এবং তিনি পুনরায় ধ্যান করে মনোমুগ্ধকর মোহিনীরূপ লাভ করেন।মোহিনী রূপ দেখে শিব মুগ্ধ হন ও মোহিনীকে জীবন সঙ্গিনী রূপে পেতে ইচ্ছে প্রকাশ করে বসেন এবং ভক্ত ও ভগবানের এই লীলায় এক শিশুর জন্ম হয়|পরে মোহিনী অদৃশ্য হয়ে যান, এবং শিব পার্বতীকে নিয়ে নিজ বাসভূম কৈলাসে ফিরে আসেন|এই শিশুই পরবর্তীতে দক্ষিণ ভারতে আয়াপ্পা হিসেবে পূজিতা হন|এই ঘটনার অনেক রকম ব্যাখ্যা দেয়া হয়। অনেকে একে “লীলা” হিসেবে দেখেন এবং বলেন যে পরবর্তীতে শক্তিশালী অসুরদের বধ করার নিমিত্তে এই প্রক্রিয়ায় আয়াপ্পার জন্ম দেয়া হয়|বর্তমানে দক্ষিণ ভারতের সবরি মালা মন্দিরে বিরাজমান আয়াপ্পার কাছে মহিলাদের প্রবেশ অধিকার না থাকায় বিতর্কও হয়েছেন আইনি লড়াই ও হয়েছে তবে মহিলাদের লর্ড আয়াপ্পার তেজ থেকে রক্ষা করতে ওই সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিলো প্রাচীন কালে এর সাথে তাদের অশ্রদ্ধা ও অসম্মানের কোনো সম্পর্ক নেই|আবার পরের পর্বে এমনই কোনো পুরান কথা নিয়ে আসবো আপনাদের সামনে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরান কথা – মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র
মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র হয়তো অনেকেই শুনেছেন এই মহা মৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র কি এবং কেনো এত শক্তিশালী তা জানতে হলে জানতে হবে এক পৌরাণিক ঘটনা|শিবের পরম ভক্ত ছিলেন শ্রীখণ্ড ঋষি। তিনি ছিলেন নিঃসন্তান|সন্তানলাভের উদ্দেশ্য তিনি মহাদেবের আরাধনা শুরু করেন। শ্রীখণ্ডের প্রচণ্ড তপস্যায় খুশি হয়ে মহাদেব তাকে সন্তানসুখ দান করেন |কিন্তু এই আনন্দের সঙ্গে তাঁর জীবনে শোকও আসবে বলে জানান শিব। এরপর মার্কণ্ডেয় নামে শ্রীখণ্ডের একটি পুত্রসন্তান হয়। কিন্তু তাঁর ভাগ্য গণনা করে ঋষি দেখেন যে অসাধারণ প্রতিভাধর এই সন্তানের আয়ু মাত্র বারো বছর পর্যন্ত। মার্কণ্ডেয় ধীরে ধীরে বড় হতে লাগল। তাঁর মা ছেলের মৃত্যুর সময় এগিয়ে আসছে এই ভেবে সব সময় শোকে কাতর হয়ে থাকতেন।শ্রীখণ্ড তাঁর স্ত্রীকে এই বলে স্বান্তনা দেন, যে ভগবান মার্কণ্ডেয়কে তাঁদের কোলে দিয়েছেন, তিনিই তাঁকে রক্ষা করবেন।মাকে খুশি করার জন্য মার্কণ্ডেয় ঠিক করলেন যে মহাদেবের কাছ থেকে তাঁকে দীর্ঘ জীবনের বর লাভ করতে হবে। শিবের আরাধনার জন্য মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র রচনা করলেন মার্কণ্ডেয় এবং শিব মন্দিরে বসে টানা এই মন্ত্র পাঠ করতে লাগলেন তিনি।বারো বছর সম্পূর্ণ হলে যমদূতেরা তাঁকে নিতে এল। মার্কণ্ডেয়কে মহাকালের আরাধনা করতে দেখে তারা তাঁর ধ্যান ভঙ্গ করার সাহস পায় না এবং যমরাজের কাছে ফিরে যায়। তখন যমরাজ নিজে মার্কণ্ডেয়কে নিতে আসেন। যম মার্কণ্ডেয় টানতে টানতে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে তিনি শিবলিঙ্গকে জড়িয়ে ধরেন। তখন প্রচণ্ড আওয়াজ ও আলোর চ্ছটায় কেঁপে ওঠে মন্দির। শিবলিঙ্গ থেকে আত্মপ্রকাশ করেন স্বয়ং মহাদেব।যমের দিকে ত্রিশুল উঁচিয়ে তিনি জিজ্ঞেস করেন যে তাঁর ধ্যানে মগ্ন ভক্তকে তিনি টেনে নিয়ে যাওয়ার সাহস কোথা থেকে পান? মার্কণ্ডেয়কে এরপর দীর্ঘ জীবনের আশীর্বাদ দেন শিব। তখন যম জানান যে এরপর থেকে মহামৃত্যুঞ্জয় মন্ত্র যিনি জপ করবেন, তাঁকে অকালে মৃত্যু স্পর্শ করবে না।মহা মৃত্ত্যুঞ্জয় মন্ত্র তাই এতো শক্তিশালী ও প্রভাবশালী|চলবে পুরান কথা|আবার আগামী পর্বে এমন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|
পুরানকথা – অক্ষয় তৃতীয়া
আজ অক্ষয় তৃতীয়া মূলত তিনটি পৌরাণিক ঘটনার সাথে জড়িয়ে আছে আজকের পবিত্র তিথি|জানাবো সেই পৌরাণিক গুলি সম্পর্কে ও তাদের তাৎপর্য|প্রথমেই বলতে হয় ধন ও সম্পদের দেবতা কুবেরের কথা|কুবের হলেন দেবতাদের কোষাধক্ষ্য আবার সম্পর্কে তিনি রাবনের দূরসম্পর্কের ভাই|তাকে প্রতারিত করে লঙ্কা থেকে বিতাড়িত করেন রাবন এবং ছিনিয়ে নেন তার পুস্পক রথ, যে ব্যবহিত হয়েছিলো পরবর্তীতে রামায়নের সময়ে|অবশ্য কুবের হাল ছাড়েননি কঠোর তপস্যায় মহাদেবকে সন্তুষ্ট করে তিনি জগতের সমস্ত বৈভব ও ঐশ্বর্যর দেবতা হন|পুরাণ মতে, এক অক্ষয় তৃতীয়ার দিনেই কুবেরকে তাঁর অনন্ত বৈভব দান করেছিলেন স্বয়ং মহাদেব এবং দেব শিল্পী বিশ্বকর্মা কৈলাসের কাছে অলকায় কুবেরের প্রাসাদ তৈরি করে দেন যা অলোকাপুরী নামে খ্যাত|শুধু হিন্দু ধর্ম নয় বৌদ্ধ ধর্মেও ধন সম্পদের দেবতা হিসেবে পূজিত হন কুবের|দ্বিতীয় যে কারনে অক্ষয় তৃতীয়া তাৎপর্যপূর্ণ তাহলো এই দিনই মহাভারত রচনা শুরু হয়ে ছিলো ব্যসদেব এই চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতেই মহাভারতের শ্লোক উচ্চারণ শুরু করেন আর গণেশ তা লিখতে শুরু করেন।মূলত এই কারনেই যে কোনও কাজ আরম্ভের জন্য এই দিনটিই প্রশস্ত বলে মনে করা হয়|তৃতীয়ত বিষ্ণুর দশাবতারের ষষ্ঠ অবতার পরশুরামের জন্ম চান্দ্র বৈশাখ মাসের শুক্লা তৃতীয়া তিথিতে অর্থাৎ এই অক্ষয়তৃতীয়ার দিনে। এই কারণে দেশের কোনও কোনও জায়গায় দিনটি ‘পরশুরাম জয়ন্তী’ হিসেবেও পালিত হয়|আপনাদের সবাইকে অক্ষয় তৃতীয়ার শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন|চলবে পুরান কথা|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|নমস্কার|
পুরান কথা – শিব ও শঙ্কর
আজ সোমবার শাস্ত্র মতে শিবের বার |আচ্ছা শিব ও শঙ্কর কি একজন নাকি দুই ভিন্ন সত্ত্বা? আজকের পুরান কথার এই পর্বে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবো|জানবো পুরানে এই সম্পর্কে কি বলা আছে|শিবপুরাণ এবং শৈবাগম শাস্ত্র এই দুই গ্রন্থে এই বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা রয়েছে|এই বই দুইটি-তে বলা হয়েছে শিব নামটি-র সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শিবলিঙ্গের কথা। অন্যদিকে শঙ্কর নামটি হল ভগবানরূপে কল্পিত শিব-এর মানবরূপী পরিচয়। যার ফলে শিব পূজোয় যখন কল্পিত আচার পালন হয় সেখানে শিবকল্প ও শঙ্করকল্পের মধ্যে আচার-বিধির তফাৎ আসে। শিব ও শঙ্কর এই দুটি সবচেয়ে বেশি করে হিন্দু সমাজে ঘোরাফেরা করে। বিশেষ করে যারা ধর্মীয় ভাবাবেগকে দর্শন করে ঈশ্বর কল্পনায় মূর্ত হন তাদের কাছে শিব ও শঙ্কর নাম দুটি নিয়ে প্রবল ধাঁধা রয়ে গিয়েছে|শৈবাগম শাস্ত্র বলছে, শিব একটি পরমসত্তা। তিনি মহাজাগতিক চৈতন্য বা পরাচৈতন্যের প্রতিভূ। শিবলিঙ্গের অবয়ব সে সত্তা-কে স্মরণ করে। অন্যদিকে শঙ্কর হল শিবের একটি মানবায়িত রূপ। সেইসঙ্গে তিনি সুক্ষ্মদেহ সম্পন্ন এক সত্তা। তিনি ধ্যানরূপেণ পূজিত হন।শঙ্করের মাথায় অর্ধচন্দ্র, কন্ঠে সর্পাহার এবং জটায় গঙ্গাকে ধারণ করেছেন। শঙ্করেরর মূর্তিকল্পে যে যে বিষয়গুলির উপরে নজর দিতে হয় সেগুলি হল অর্ধচন্দ্র, যা মাথার জটার মধ্যে থাকে। এর অর্থ হল জ্ঞানের প্রতীক। হাতে থাকে ডমরু। এর অর্থ হল অদ্বৈত। গলায় থাকে সাপের কুন্ডল। এর মানে এটি হল কুলকুন্ডলিনীর প্রতীক। ত্রিশূল কখনও ত্রিগুণ, কখনও ত্রিকাল, কখনও বা সৃষ্টি-স্থিতি-লয়ের যে তিন তত্ত্ব আছে তাকে ব্যাখ্যা করে। গঙ্গা বিশুদ্ধতার প্রতীক। যা বিশুদ্ধ জ্ঞানকে সংযোগ করে। তৃতীয় নয়ন মানে হল ত্রিকাল দর্শন।শিব লিঙ্গ অর্থাৎ শক্তির আধার বা অফুরন্ত শক্তির প্রতীক রূপে পূজিত হন|দুই পুরাণ গ্রন্থে এমন কাহিনিও রয়েছে যেখানে বলা হয়েছে শিব ব্রক্ষ্মার মাধ্যমে সত্যযুগের সৃষ্টি করেছিলেন। এবং শঙ্কর-কে তিনি মানবরূপে নিয়ে এসেছিলেন কলিযুগে যাতে তিনি সৃষ্টি-কে সংহার করতে পারেন। সংক্ষেপে শিব হল দৈব্যভাবের প্রতীক। আর শঙ্কর মানে তার বিমূর্ত রূপকেই বোঝায়|চলবে পুরান কথা|আবার আগামী পর্বে এমন কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করবো|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|নমস্কার|
তীর্থক্ষেত্রে পন্ডিতজি – রামেশ্বরম
তীর্থ যাত্রার অভিজ্ঞতা বিশেষ করে দক্ষিন ভারত ভ্রমণ পর্ব অসম্পূর্ণ থেকে যাবে যদি আলাদা করে রামেশ্বরমের কথা না বলি|ভৌগোলিক ভাবে তামিলনাড়ুর উপকূলীয় শহর রামেশ্বরম যেখানে রয়েছে বহু পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন যার আধ্যাত্মিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য অপরিসীম|কথিত আছে সীতা উদ্ধারের পরে লঙ্কা থেকে ফিরে রামেশ্বরমে শিবের আরাধনা করেন রামচন্দ্র। রাবণকে বধ করে তিনি যে ব্রহ্মহত্যা করেছিলেন,সেই পাপ ধুয়ে যায় এই স্থানে|

রামেশ্বরম এ রয়েছে রামানাথস্বামী মন্দির যেখানে রয়েছে দুটি শিব লিঙ্গ|একটি রামের অনুরোধে ভগবান হনুমানের কাছ থেকে হিমালয় থেকে আনা হয়েছিল, এবং অন্যটি সীতা দ্বারা বালি থেকে তৈরি হয়েছিল|রামেশ্বরমে রয়েছে রাম সেতু যাকে রামায়নের সময়ে ভগবান রামের নির্মিত সেতুর অবশিষ্টাংশ বলে মনে করে। এমনকি 1480 সালে একটি ঘূর্ণিঝড় দ্বারা এটি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত সেতুতে হাঁটা সম্ভব ছিল নাসার উপগ্রহ চিত্রেও ধরা পরে এই অদ্ভুত সেতু|শুধু আধ্যাত্বিক নিদর্শন নয় রয়েছে প্রকৃতির অদ্ভুত সৌন্দর্য যা আপনি প্রাণ ভরে উপভোগ করতে পারেন|ধনুশকোডির কাছে আরিচামুনাই পাখি অভয়ারণ্য যেখানে শীত কালে উড়ে আসে ঝাঁক ঝাঁক পরিযায়ী পাখি|সাক্কারাকোট্টাই পাখি অভয়ারণ্য, মূল ভূখণ্ডের রামেশ্বরম থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে যেখানে দেখা মেলে বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক পাখি ও বন্য প্রাণের|রামেশ্বরমে রয়েছে ভারতের 11 তম রাষ্ট্রপতি, A.P.J. এর শৈশবের বাড়ি যা বর্তমানে একটি সংগ্রহ শালায় পরিণত হয়েছে|রামেশ্বরম এক অদ্ভুত অনুভূতি জাগিয়ে তোলে প্রতিটি পর্যটকের মনে|এখানে পুরান, ধর্ম, আধ্যাত্মিকতা, ইতিহাস ও প্রকৃতির অদ্ভুত মেলবন্ধন ঘটে যা বহুকাল মনে থেকে যায়|স্মরণীয় হয়ে আছে আমার রামেশ্বরম ভ্রমণ|আবার ফিরে আসবো অন্য তীর্থ ক্ষেত্র নিয়ে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|