শিব চতুর্দশী – বেদনিধির গল্প

121

শিব পুরানের নবম অধ্যায়ে উল্লেখিত বেদ নিধির গল্প আজকের পর্বে আপনাদের বলবো|অবন্তীনগরে সদাচারী এক ব্রাহ্মণ ছিলেন। সর্বশাস্ত্রে পণ্ডিত, নানান শুভকর্মে রত তিনি। পতিধর্মপরায়ণা তার স্ত্রী। তাদের ছিল দুই-পুত্র সুনিধি ও বেদনিধি, জ্যেষ্ঠ সুনিধি ছিল পিতা-মাতার মতই শাস্ত্রজ্ঞানী, সদাচারী পিতা-মাতার বশবর্তী। কিন্তু কনিষ্ঠ বেদনিধি ছিলেন দুশ্চরিত্র ও দুরাচারী|একবার তার বাবাকে রাজার দেয়া একটি উপহার চুরি করে সে এক নর্তকীকে দেয় এবং ধরা পড়ে বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়|প্রথমে সেই নর্তকীর কাছে সে আশ্রয় চায় কিন্তু কোথাও আশ্রয় না-পেয়ে বেদনিধি এবার দু’চোখে অন্ধকার দেখতে লাগল। কী করবে ভেবে না পেয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরতে লাগল। নগর ছাড়িয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল অনেক অনেক দূরের লোকালয়ে। দিন কেটে রাত হল। হেঁটে হেঁটে অবসন্ন তো হলই, খিদেয়ও অস্থির হয়ে উঠল সে। অথচ সঙ্গে কানাকড়ি নেই, এ-রাজ্যে ভিক্ষা করা মানা, চুরি করবার সুযোগটিও নেই।এমন সময় হঠাৎ পুজোর নৈবেদ্য নিয়ে ঢাক বাজিয়ে একদল মেয়ে-পুরুষকে মন্দিরের দিকে যেতে দেখল সে। তাদের হাতের নৈবেদ্য দেখে অস্থির খিদে চনচন করে উঠল। সুযোগ পেলে সেগুলোই খাবার প্রত্যাশা নিয়ে সে তাদের পিছু নিল।মন্দির প্রাঙ্গণ আলোয়-ফুলে সেজে রয়েছে। আজ মহা শিবরাত্রির পুজো। সারারাত ধরে পুজোর জন্য বিকেল থেকেই শুরু হয়েছে ভক্তকুলের ভিড়। রাজপ্রহরীদের প্রহরাও রয়েছে। মন্ত্র আর পূজারীর ‘ববম ববম’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠছে চারিদিক। শুরু হয়ে গেছে প্রহরে প্রহরে পুজো।সারাদিনের অনাহারে ক্লিষ্ট বেদনিধি প্রাঙ্গণের একটি কোণায় খাবারের অপেক্ষায় চোখের পাতাজোড়া ঠায় খুলে বসে রইল। প্রহরের পর প্রহর কাটতে লাগল। খিদের পরত চড়তে চড়তে ধৈর্যের বাঁধও তার ভাঙতে লাগল। সুযোগ পেলেই এবার সে চুরি করবে, ছিনিয়ে খাবে!সুযোগ এল তৃতীয় প্রহরের পর। ভক্তেরা পুজো করে যে-যেখানে পারল মন্দিরের প্রাঙ্গণে শুয়ে পড়ল। তারা আর জেগে থাকতে পারছিল না। ভাবল, এখন তো শুয়ে পড়া যাক, চার প্রহরে উঠে না-হয় আবার পুজো দেবে। তারা ঘুমিয়ে পড়তে প্রহরীরাও নিজেদের মধ্যে গল্পগুজবে মত্ত হয়ে অন্যমনস্ক হল। সেই সুযোগে ক্ষুধার্ত বেদনিধি অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়াল। পা টিপে টিপে হাজির হল গিয়ে গর্ভগৃহের মধ্যে। দেখল, সলতে পুড়তে পুড়তে দীপ প্রায় নিভে এসেছে, নৈবেদ্যগুলোও ভালো করে দেখা যাচ্ছে না। শিবলিঙ্গের গায়েও অন্ধকারের ছায়া পড়েছে। সে নিজের কাপড় ছিঁড়ে সলতে পাকিয়ে দীপে সংযোগ করতেই দীপালোক উজ্জ্বল হল। শিবলিঙ্গের গায়ের অন্ধকার দূর হল, নৈবেদ্যের সাজানো থালাগুলিও স্পষ্ট দেখা যেতে লাগল। তখন সে চুপি চুপি শব্দ না-করে একটি থালা তুলে গর্ভগৃহের বাইরে বেরিয়ে এল। কিন্তু, চুপিসাড়ে প্রাঙ্গণ থেকে বেরোতে গিয়ে অন্ধকারে শুয়ে থাকা এক ভক্তের গায়ে তার পা পড়ে গেল। অমনি ভক্তটি ধড়মড় করে জেগে উঠে ‘চোর’, ‘চোর’-বলে চেঁচিয়ে উঠল। বেগতিক বুঝে বেদনিধি ছুটে পালাতে গেল। কিন্তু, পারল না। ভক্তের চিৎকারে সচকিত হয়ে উঠল প্রহরীরাও। তাদের ছোঁড়া বল্লম সোজা তার পিঠে এসে বিঁধল। এবং বেদনিধি মারা গেল।বেদনিধি মারা যেতেই তার আত্মাটি নিয়ে যেতে একইসঙ্গে হাজির হল যমদূত এবং শিবদূতেরা।শিবদূতেরা বললন, শিবরাত্রিতে দীপ দিয়ে সমস্ত রাত জাগন্ত ও উপবাসী থেকে মন্দিরে অবস্থান করে ওর সমস্ত পাপ নষ্ট হয়েছে। এর স্থান এখন শিবলোকে। একে আমরাই নিয়ে যাবো! শেষে ধর্মরাজ বললেন, শিবদূতেরা ঠিকই বলেছে, লোকটা মহাপাপিষ্ঠ হয়েও শিবরাত্রিতে অজান্তে উপবাস, রাত্রিজাগরণ ও দীপদান করে পূর্ণব্রতের পুণ্য লাভ করে পবিত্র হয়ে উঠেছে। শিবরাত্রি ব্রতের এমনই মাহাত্ম্য। তাই বলা হয়, শিবরাত্রি ব্রতের চেয়ে মহান ব্রত আর কিছু হয় না। তোমরা শান্ত হও, এখন আমি দেবাদিদেবের ইচ্ছেয় বেদনিধিকে জীবনদান করব।শুধু নতুন জীবন লাভ নয়|শিব কৃপায় বেদ নিধি বাকি জীবন রাজা হয়ে কাটিয়েছিলেন|আপনারাও চাইলে শিব চতুর্দশী তিথিকে কাজে লাগাতে পারেন শাস্ত্র মতে গ্রহের প্রতিকার বা মনোস্কামনা পূরণের জন্য|ফিরে আসবো পরের পর্বে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|