Home Blog Page 21

দেবী অন্নপূর্না এবং কাশী ধাম

দেবী অন্নপূর্না এবং কাশী ধাম

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

আগামী ২৬ এ মার্চ মা অন্নপূর্ণার পূজা। আজ থেকে আগামী দুদিন দেবী অন্নপূর্ণা প্রসঙ্গে শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক আলোচনা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আলোচনা করবো।দিন প্রথম দিন দেবী অন্নপূর্ণার কাশী ধামের সম্পর্ক নিয়ে লিখবো।

 

কাশীকে শিবের নগরী বলা হলেও কাশী আসলে অন্নপূর্ণা দেবীর স্থান। কাশীর অধিস্টাত্রী দেবী হলেন অন্নপূর্ণা।পুরান মতে এক চৈত্র মাসের শুক্ল অষ্টমীতে দেবী অন্নপূর্ণা আবির্ভুতা হয়ে ছিলেন কাশীধামে|তার আবির্ভাব নিয়ে একটি পৌরাণিক ঘটনার উল্লেখ পাওয়া যায় শাস্ত্রে।

 

পুরাণ মতে দেবী পার্বতীর সঙ্গে একবার দেবাদিদেবের কোনো কারণনে গুরুতর মতবিরোধে দেখা দিলে দেবী কৈলাস ত্যাগ করেন। সাথে সাথে ভয়ানক মহামারি, খাদ্যাভাব দেখা দেয়।ভক্তগণকে এই বিপদ থেকে উদ্ধারের জন্য দেবাদিদেব ভিক্ষার ঝুলি নিজ কাঁধে তুলে নেন। কিন্তু দেবীর মায়ায় ভিক্ষারও অভাব ঘটে। তখন দেবাদিদেব শোনেন কাশীতে এক নারী সকলকে অন্ন দান করছেন। দেবীর লীলা বুঝতে পারেন মহাদেব। মহাদেব দেবীর কাছে ভিক্ষা গ্রহণ নিতে কাশীতে আসেন। দেবী তাকে অন্ন ভিক্ষা দেন। সেই অন্ন ভিক্ষা নিয়ে তার ভক্তদের খাদ্যাভাব থেকে রক্ষা করেন মহাদেব।

 

ঘটনাটি থেকে বোঝা যায়। দেবী আদ্যাশক্তি মহামায়ার আরেক রূপ দেবী অন্নপূর্ণা সুখ সমৃদ্ধি ও অন্নর দেবী। তার উপস্থিত থাকলেই সংসারে বা জগতে সুখ সমৃদ্ধি থাকে। তার অনুপস্থিতি ঘটলেই দেখা দেয় অশান্তি, অভাব এবং দারিদ্রতা।

 

দেবীর কাছে ভিক্ষা গ্রহণের পর মহাদেব দেবীর একটি মন্দির নির্মাণ করেন কাশীতে এবং সেই থেকে তিনি কাশীর অধিষ্টাত্রী দেবী।

পুরান মতে শিবের ত্রিশূলে অবস্থিত কাশী ধাম দেবী অন্নপূর্ণার আবাস তাই কেউ কাশীতে অভুক্ত অবস্থায় থাকেন না। কাশীতে সবার ভরণ পোষণের দায়িত্ব নিয়েছেন স্বয়ং মা অন্নপূর্ণা।

তিনি অন্নদাত্রী।তাই অন্নদাত্রী দেবী অন্নপূর্ণার আরেকনাম অন্নদা।

 

শাস্ত্র মতে কাশী শাস্বত এবং সর্বকালীন। কাশী মহা প্রলয়ের পরেও বিরাজমান থাকবে।স্ব মহিমায় কাশীধামে বিরাজ করবেন দেবী অন্নপূর্ণা।

কাশী ধামে যারা তীর্থ করতে যান বাবা কাল ভৈরব, বিশ্বনাথ এবং অন্নপূর্ণার দর্শন করলে তবেই কাশী যাত্রার সম্পূর্ণ ফল লাভ হয় বলে বিশ্বাস।

 

দেবী অন্নপূর্ণার পুজোর পর দরিদ্রকে অন্ন দান করলে জীবন থেকে সব অভাব দূর হয়।

দেবী অন্নপূর্ণা কতৃক মহাদেবকে অন্নদানের ছবি বা মূর্তি যে গৃহে থাকে সেই অন্নর অভাব হয়না বলেও শাস্ত্রে আছে।

 

আসন্ন অন্নপূর্ণা পূজো উপলক্ষে চলতে থাকবে এই বিশেষ ধারাবাহিক পর্বগুলি। ফিরে আসবো আগামী পর্বে দেবী অন্নপূর্ণা সংক্রান্ত আরো অনেক শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক আলোচনা নিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – বজ্রেশ্বর

শিব অবতার – বজ্রেশ্বর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

চৈত্র মাস শিবের মাস। চৈত্রর অবসান এবং বৈশাখের আগমন হয় নীল পুজোর মাধ্যমে যা শিবেরই রূপ। শিবের অনেক রূপ অনেক অবতার। সেই অবতারগুলি নিয়েই এই ধারাবাহিক আলোচনা। আজকের পর্বে লিখবো শিবের বজ্রেশ্বর অবতার

 

বজ্রেশ্বর হলেন ভগবান শিবের একটি উগ্র যোদ্ধা অবতার, যিনি অসুরদের পরাজিত করে ধর্ম রক্ষা করেন।

 

পুরাকালে যখন অসুররা দেবতা দের যজ্ঞ বেদী আক্রমণ করতেন তাদের যজ্ঞ বন্ধ করে দেবতাদের ক্ষমতা খর্ব করতে তখন বজ্রেশ্বর রূপে অবতীর্ণ হয়ে শিব অসুর নিধন করে দেবতাদের রক্ষা করেন। তাদের পূজো বজায় রাখেন।

 

তাই এই রূপে শিব মন্দের উপর ভালোর বিজয়ের বার্তা দেন এবং সনাতন ধর্মকে শক্তিশালী করেন।

 

এছাড়াও, তান্ত্রিক ঐতিহ্যে জগন্নাথদেবকেও বজ্রেশ্বর নামে অভিহিত করা হয়। ধার্মিকতার রক্ষক এবং দুষ্টের দমনকারী তিনি।

 

“বজ্র” অর্থ অটল, কঠিন ও অপ্রতিরোধ্য শক্তি।

“ঈশ্বর” অর্থ সর্বশক্তিমান প্রভু। তাই বজ্রেশ্বর মানে যিনি বজ্রের ন্যায় অপরাজেয় শক্তির অধিকারী।এই রূপে শিব বজ্রের মতো অদম্য শক্তি, অশুভ বিনাশ এবং ধর্মরক্ষা-র প্রতীক।এই রূপে শিবের দেহ থেকে তেজ ও বিদ্যুতের মতো জ্যোতি বিচ্ছুরিত হয় হাতে ত্রিশূল বা বজ্রশক্তির প্রতীক অস্ত্র। তিনি ক্রোধময় কিন্তু ন্যায়রক্ষাকারী

 

শাস্ত্র মতে “ওঁ বজ্রেশ্বরায় নমঃ” মন্ত্র জপের মাধ্যমে

শিবের অবতারের পূজো হয়।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী পর্বে আরো অনেক শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক বিষয় নিয়ে। আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – খান্ডবা

শিব অবতার – খান্ডবা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

খান্ডোবা হলেন ভগবান শিবের একটি জনপ্রিয় অবতার। আজকের পর্বে শিবের এই লৌকিক রূপ এবং বিশেষ অবতার নিয়ে লিখবো।

 

আধ্যাত্মিক দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে এই অবতার শিবের রক্ষাকারী এবং দুষ্টের দমনের রূপকে তুলে ধরে।

তাঁকে শিবের একটি রুদ্র বা উগ্র রূপ বলে গণ্য করা হয়, যিনি এক হাতে তলোয়ার এবং অন্য হাতে ডমরু বা ত্রিশূল ধারণ করেন।

 

লৌকিক বিশ্বাস অনুসারে মণি ও মল্ল নামক দুই রাক্ষসকে বধ করে পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য শিব খাণ্ডবা রূপে অবির্ভুত হন।যিনি মূলত ভারতের মহারাষ্ট্র ও উত্তর কর্ণাটক অঞ্চলে যোদ্ধা দেবতা হিসেবে পূজিত হন।তাঁর আরেক নাম ‘মার্তণ্ড ভৈরব’। খান্ডবা ঘোড়ায় চড়া বীর যোদ্ধা রূপে চিত্রিত হন।এই রূপেই তাকে পূজো করা হয়।

 

সারা ভারতে খান্ডবা মন্দির তেমন একটা চোখে পড়েনা তবে মহারাষ্ট্রের জেজুরি

মন্দির হলো খন্ডোবার প্রধান তীর্থস্থান।মণি-মল্লকে বধ করার পর তিনি মহারাষ্ট্রের দেউরি পাহাড়ে অধিষ্ঠান করেন বলেই বিশ্বাস করা হয়।তাঁর ভক্তরা তাঁকে শিব জ্ঞানে পূজা করে থাকে।শিব রাত্রি সহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তিথিতে বহু শিব ভক্ত এখনে এসে তাঁর পূজো করেন এবং কৃপা লাভ করেন।

 

খান্ডোবা শুধুমাত্র হিন্দু সম্প্রদায়ের কাছেই নন, বরং মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন জাতি, উপজাতি এবং অনেক ভিন্ন ধর্মের মানুষের কাছেও শ্রদ্ধেয় সেদিক দিয়ে বলা যায় এই দেবতা সামাজিক ঐক্যের প্রতীক।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী শিব অবতার নিয়ে। সমগ্র চৈত্র মাস জুড়ে চলতে থাকবে এই বিশেষ ধারাবাহিক লেখনী।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – হরিহর রূপ

শিব অবতার – হরিহর রূপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিব হলেন দেবতাদের আরাধ্যা দেবতা আর বিষ্ণু হলেন একমাত্র ভগবান। আবার অন্য একটি দৃষ্টি ভঙ্গি থেকে শিব হলেন ভক্ত এবং তার আরাধ্য হলেন স্বয়ং বিষ্ণু।আজ শিবের এমন একটি অবতারের কথা বলবো যেখানে ভক্ত আর ভগবানের মেল বন্ধন ঘটেছে।

এই অবতারটি হলো শিবের হরিহর অবতার।

 

ভক্তের প্রতি ভগবানের প্রেম এবং ভক্তি বোঝাতে শিব এই রূপে দেখা দিয়ে ছিলেন। এই রূপে ভক্ত শিব এবং ভগবান বিষ্ণু মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে।শাস্ত্র মতে এই রূপে অনেকটা অর্ধনারীশ্বরের মতো শিবের শরীরের একপাশে শিবের জটা এবং ত্রিনয়ন এবং অন্য পাশে বিষ্ণুর মুকুট ও প্রসন্ন মুখমণ্ডল থাকে।অর্থাৎ একই দেহে শিব এবং বিষ্ণু বিরাজ করেন।

 

পুরান অনুসারে শৈব ও বৈষ্ণব ভক্তদের মধ্যে যখন বিরোধ দেখা যায় এবং কে শ্রেষ্ঠ এই বিবাদ দেখা দেয় তখন এই বিতর্কের নিরসন করতে শিব হরিহর রূপে দেখা দেন।হরিহর রূপে শিব মহাবিশ্বে ভারসাম্য রক্ষা করেন। একই সাথে তিনি হয়ে ওঠেন পালন কর্তা এবং সংহারকর্তা।এখানে যিনি হরি তিনিই শিব।দুই সত্তা এক এবং অভিন্ন।

 

এটি একটি শৈব্য এবং বৈষ্ণব দর্শনের সম্মিলিত অবতারের বিশেষ।হরিহর অবতার পরম সত্যের একত্ব এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রতীক।হরিহর রূপে শিব শান্তি এবং মৈত্রীর বার্তা দেন।

 

ধারাবাহিক ভাবে চলতে থাকবে শিব অবতার নিয়ে শাস্ত্রীয় আলোচনা। ফিরে আসবো পরবর্তী শিব অবতার নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন।ধন্যবাদ।

শিব অবতার – কৃষ্ণদর্শন রূপ

শিব অবতার – কৃষ্ণদর্শন রূপ

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

সনাতন ধর্মে অবতার তত্ত্ব নিয়ে বলতে গেলে শ্রী বিষ্ণুর অবতার গুলি নিয়েই বেশি আলোচনা হয়। কারন তিনি সৃষ্টির পালন কর্তা এবং প্রতি যুগেই তিনি ভিন্ন ভিন্ন অবতারে ফিরে আসেন অধর্ম নাশ করে ধর্ম স্থাপন করতে। তবে সংহার কর্তা শিব ও একাধিক অবতারে অবতীর্ণ হয়েছেন। তার মধ্যে একটি বিশেষ অবতার কৃষ্ণ দর্শন অবতার।

আজকের পর্ব এই অবতার নিয়ে।

 

কৃষ্ণ দর্শন অবতার বিশেষ কারন শিব স্বয়ং পরম বৈষ্ণব এবং বৈষ্ণব ধর্মের একজন সংস্থাপক আচার্য্য।পুরান অনুসারে একবার কৈলাসে শিবকে পার্বতী প্রশ্ন করেছিলেন যে তিনি সদা কার ধ্যানে মগ্ন। শিব বলে ছিলেন তিনি তার আরাধ্যা শ্রী কৃষ্ণর ধ্যানে মগ্ন থাকেন।তাই কৃষ্ণ দর্শন অবতার ভক্তের ভগবান রূপে আত্ম প্রকাশ।

 

শাস্ত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুসারে ঋষি অঙ্গিরা যখন যজ্ঞের অবশিষ্ট সম্পদ নভাগকে দান করতে চান তখন শিব এই রূপে সেখানে উপস্থিত হয়ে যজ্ঞের গভীর রহস্য এবং ত্যাগের মহিমা বোঝান।

তিনি বলেন সমস্ত যজ্ঞের ফল নিষ্কাম ভাবে রুদ্র বা শিবের চরণে অর্পণ করা উচিত।সেই আজ্ঞা পালন করে নভাগ ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করেন।অর্থাৎ রাজা শ্রদ্ধাদেবের পুত্র নভাগকে মোক্ষলাভের পথ দেখাতে শিব এই রূপ ধারণ করেছিলেন।

 

প্রতিকী অর্থে এই অবতারটি সততা, বৈরাগ্য এবং ঈশ্বরের প্রতি সমর্পণের গুরুত্ব তুলে ধরে।শিব এই রূপে ভক্তকে সম্পূর্ণ রূপে ভগবানের চরণে স্মরণাগত হওয়ায় আদর্শে উদ্বুদ্ধ করেন।

যা মানুষকে জাগতিক মায়া

থেকে মুক্ত হতে উৎসাহিত করে।

 

ফিরে আসবো পরবর্তী শিব অবতার এবং সেই সংক্রান্ত পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা নিয়ে।

পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – সুরেশ্বর

শিব অবতার – সুরেশ্বর

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শাস্ত্রে উল্লেখিত শিবের অবতার গুলির মধ্যে সুরেশ্বর অবতার অন্যতম।সুরেশ্বর শব্দের অর্থ দেবতাদের প্রভু।সুরেশ্বর অবতারের আবির্ভাব হয় একটি বিশেষ কারণে। কেনো শিব ওই অবতার রূপে আবির্ভূত হলেন তা জানতে হলে একটি পৌরাণিক ঘটনা জানতে হবে।

 

ব্যাঘ্রপাদ ঋষির পুত্র উপমন্যু ছিলেন শিব ভক্ত । তাঁর কঠোর তপস্যা ও শিবের প্রতি একাগ্রতা পরীক্ষার জন্য শিব সুরেশ্বর রূপ ধারণ করেন এবং পার্বতী শচী মাতার রূপ ধারণ করেন । সুরেশ্বর রূপে শিব ইন্দ্রের ছদ্মবেশে শিব ভক্ত উপমন্যুকে শিবের নিন্দা করতে বলেন কিন্তু উপমন্যু তা প্রত্যাখ্যান করেন এবং শিবের প্রতি ভক্তিতে অবিচল থাকেন।

 

শিব পার্বতী উপমন্যুর অটল ভক্তিতে সন্তুষ্ট হন।তারপর শিব নিজের আসল রূপ প্রকাশ করেন এবং সুরেশ্বরকে বর দান করেন।

 

অর্থাৎ  এই অবতারে শিব ও পার্বতী

সম্মিলিত ভাবে ভক্তের ভক্তি এবং বিশ্বাস

পরীক্ষা করেন এবং ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে দেবাদিদেব তার ভক্তকে সর্বদা রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন।

 

শিব পুরাণে সুরেশ্বর অবতারের কথা বর্ণিত হয়েছে। শিব এই রূপে দেবতাদের রক্ষা কর্তা। যখনই অসুর বা অশুভ শক্তি দেবতাদের বিপদগ্রস্ত করে তখনই শিবসুরেশ্বর রূপে তাদের রক্ষা করার প্রতিশ্রুতি দেন।তাই সুরেস্বর দেবতাদের প্রভু তাদের আশ্রয়দাতা।

 

ফিরে আসবো শিবের পরবর্তী অবতার নিয়ে শাস্ত্রীয় এবং পৌরাণিক আলোচনা আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – বৃষভ অবতার

শিব অবতার – বৃষভ অবতার

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শাস্ত্র মতে শিবের উনিশটি অবতারের মধ্যে একটি বৃষভ অবতার।স্বভাবে এবং আকৃতিতে তেজি এবং শক্তিশালী হলেও এটি শিবের উগ্র রূপের থেকে ভিন্ন, শান্ত ও জ্ঞানী রূপ।আজকের পর্বে শিবের এই বিশেষ অবতার নিয়ে লিখবো।

 

বিভিন্ন শাস্ত্রে বৃষভ অবতার সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়।কিছু শাস্ত্র মতে বৃষভ নামে বিষ্ণুর এক অবতার আছে যাকে বৃষভদেব বলা হয় আবার এই পরিচয়ে এক জৈন তীর্থঙ্কর রয়েছেন তবে শিব পুরাণে মতে শিবের বৃষভ অবতার দেবাদিদেব মহাদেবের উনিশটি অবতারের অন্যতম।

 

একটি পুরান কাহিনী মতে একবার পাতাল লোকে বিষ্ণুর এক পুত্র জন্মায় ।পরবর্তীতে শ্রীবিষ্ণুর এই সন্তান যখন গোটা সৃষ্টি ধ্বংস করতে উদ্যত হয়। ব্রহ্মার অনুরোধে বৃষভ নামে ষাঁড়ের রূপ নিয়ে বিষ্ণুর এই সন্তানকে হত্যা করেন মহাদেব।অহংকার এবং অত্যাচারের অবসান ঘটাতে এই অবতারের আবির্ভাব হয়।

 

বিরাট আকার এবং নীল বর্ণের এই রূপ কুর্ম পুরান, লিঙ্গ পুরান এবং শিব পুরানে স্থান পায়। কোথাও উনিশটি আবার কোথাও আঠাশটি শিব পুরানের অন্যতম তিনি।

 

শিবপুরাণ অনুসারে শিবের এই অবতার হলো মহাদেবের একটি শান্ত ও দয়ালু রূপ। বৃষভ রূপে নিবৃত্তি বা ত্যাগের পথ প্রচারের জন্য অবতীর্ণ হন মহাদেব । বৃষভ অবতার শিবের অন্যতম কোমল ও সৎ রূপ হিসেবে পরিচিত। তবে এই রূপেও তিনি তার সংহার কার্য সম্পন্ন করে জগৎ রক্ষা করেছেন।অধর্ম নাশ করে ধর্ম স্থাপন করেছেন।

 

শাস্ত্রে আরো আছে যে দ্বাপর যুগের শেষে শিব বৃষভ রূপে অবতীর্ণ হন।এই অবতারের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ত্যাগের পথ প্রচার করা।পরাশর, গর্গ, ভার্গব এবং গিরিশ এই চার জন ঋষিকে শিবের বৃষভ অবতারের প্রধান শিষ্য রূপে ধরা হয়।

 

ফিরে আসবো শিবের পরবর্তী অবতারে কথা নিয়ে। থাকবে অনেক পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় তথ্য। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – দুর্বাশা

শিব অবতার – দুর্বাশা

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শাস্ত্রে যে উনিশজন শিব অবতারের উল্লেখ পাওয়া যায় তাদের মধ্যে একজন দুর্বাশা ঋষি।দুর্বাশা ছিলেন অত্রি ঋষি এবং অনসূয়ার পুত্র।

তার পিতামাতা নিষ্ঠার সাথে

শিবের তপস্যার পর শিবের অংশ হিসেবে দুর্বাশাকে অর্জন করেছিলেন।

 

শৈশব থেকেই তিনি অত্যন্ত রোগা এবং লম্বা ছিলেন।তিনি স্বভাবে শিবের রূদ্র রূপের প্রকাশ ঘটাতেন অর্থাৎ অত্যন্ত ক্রোধি ছিলেন দুর্বাশা।

 

অধর্ম নাশ করে ধর্ম স্থাপন করতেই শিবের দুর্বাশা রূপে আগমন তাই ধর্মের পথ থেকে বিচ্যুতদের প্রতি রুদ্র অগ্নিময় এবং ক্রোধী ছিলেন দুর্বাশা।

যারা ধর্মের পথ অনুসরণ করেন না বলে বিশ্বাস করতেন তাদের দ্রুত অভিশাপ দিতেন।

 

শিবের অবতার হিসেবে তিনি তাঁর দশ হাজার শিষ্যকে নিয়ন্ত্রণ ও শাসন করতে এবং তাদের প্রকৃত ধর্ম এবং সত্য শেখাতেন।

 

যখন শকুন্তলা দুর্বাশাকে অবহেলা করেন তখন তিনি ক্রুদ্ধ হয়ে তাকে অভিশাপ দিয়েছিলেন যে, তিনি যার কথা ভাবছেন এবং যার জন্য তিনি দুর্বাসাকে অবহেলা করেছেন, তিনি তাকে ভুলে যাবেন।এই অভিশাপের কারণেই রাজা দুষ্যন্ত শকুন্তলাকে ভুলে গিয়েছিলেন।

 

রাগী হলেও দুর্বাশা ছিলেন কোমল হৃদয় এবং সরল স্বভাবের একবার দুর্বাসা একবার ইন্দ্রকে তিনি একটি ফুলের মালা অর্পণ করেছিলেন।

ইন্দ্র তার ঐরাবতকে মালাটি পড়িয়ে দেন এবং ঐরাবত মালাটি তার পায়ের তলায় পিষে ফেলেন ভগবান ইন্দ্রের অহংকারে ক্রুদ্ধ হয়ে, ঋষি দুর্বাসা তাকে অভিশাপ দিলেন, যার ফলে তাকে সমস্ত ধন, গুণ এবং শক্তি চলে যায়। স্বর্গ রাজ্যও হাতছাড়া হয়।

 

আবার যারা ধর্মের এবং সত্যের পথে থাকতো তাদের তিনি পুরুস্কার এবং আশীর্বাদ দিতেন।

শিবের এই অবতার নানা দিক দিয়েই অভিনব এবং বৈচিত্র পূর্ণ।

 

ফিরে আসবো শিবের আরো একটি অবতারের কথা নিয়ে। আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – সদাশিব

শিব অবতার – সদাশিব

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিবের একাধিক রূদ্র বা তেজময় রূপ নিয়ে ইতিপূর্বে আলোচনা করেছি এই ধারাবাহিক শিব অবতার পর্বে। আজ শিবের একটি শান্ত এবং যোগী রূপ নিয়ে লিখবো। আজকের পর্বে শিবের সদাশিব রূপ।

 

ভারতের একাধিক প্রাচীন মন্দির বিশেষ করে এলিফ্যান্টা বা মাদুরাইয়ের মতো প্রাচীন ধর্মীয় স্থাপত্য গুলিতে শিবের এই শদাশিব মূর্তি দেখা যায়।এই রূপে সাধারণত শিবের পাঁচটি মাথা মাথা থাকে।পাঁচটি মাথা যথাক্রমে সৃষ্টি, পালন, সংহার, মায়া এবং মুক্তিকে নির্দেশ করে।

 

সদাশিব রূপটি হলো পুরাণে বর্ণিত শিবের সর্বোচ্চ, অতীন্দ্রিয় ও শাশ্বত রূপ, যিনি “অনন্ত শুভ” বা পরম সত্তার প্রতীক।এই রূপটি আধ্যাত্মিক জ্ঞান এবং আনন্দের সর্বোচ্চ অবস্থা বলে ধরা হয়।

এই অবতারে শিব সৃষ্টির সংহার কর্তা নন এখানে তিনি শান্ত এবং সৌম।সদাশিব রূপটি শিবের অসীম ও রূপাতীত দিককে উপস্থাপন করে।

 

আবার কোনো কোনো শাস্ত্রে বিশেষ করে যোগ এবং তন্ত্রে সদাশিবকে পরম চেতনা বলা হয়।

 

আসলে সদাশিব সাকার এবং নিরাকার এই দুই রূপের সমন্বয়। শিব যখন শান্ত এবং ধ্যানমগ্ন। সৃষ্টি এবং প্রলয়ের উর্ধে তখনই তিনি সদাশিব।

 

শাস্ত্র মতে শিবের সদাশিব রূপের পূজো করলে মন শান্ত হয়। আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি হয়। ভয় এবং নেতিবাচক শক্তি পরাস্ত হয়ে।

 

চৈত্র মাস জুড়ে চলতে থাকবে শিব সংক্রান্ত আলোচনা।ফিরে আসবো শিবের পরবর্তী

অবতার নিয়ে আলোচনায়। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।

শিব অবতার – হনুমান

শিব অবতার – হনুমান

 

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

 

শিবের মাস চৈত্র মাস উপলক্ষে শুরু করেছি শিব অবতার সংক্রান্ত ধারাবাহিক আলোচনা। আজ শিবের রূদ্র অবতার বজরংবলীকে নিয়ে লিখবো।

 

শাস্ত্রে যে উনিশ জন মুখ্য শিব অবতারের উল্লেখ আছে তার মধ্যে বজরংবলী নেই। তবে তিনি যে শিবের অবতার বা শিবের অংশ তা একাধিক শাস্ত্রে উল্লেখিত। তুলসীদাস রচিত হনূমান চালিসাতেও হনুমানকে শিবের অবতার রূপেই দেখা হয়।

 

শাস্ত্রে যে সাতজন চিরঞ্জিবীর উল্লেখ আছে তাদের মধ্যে অন্যতম হনুমান।ভগবান হনুমান ভগবান ইন্দ্রের বরপ্রদত্ত। বিশ্বাস করা হয়, হনুমান একমাত্র নিজের ইচ্ছেয় মৃত্যুবরণ করতে পারবেন।

 

পরম বৈষ্ণব শিব শ্রী রামের সেবা করার জন্যই হনূমান রূপে অবতীর্ণ হন। আবার নন্দীদেব রাবনকে একবার হনুমান দ্বারা ধসং হওয়ার অভিশাপ দিয়ে ছিলেন সেই অভিশাপ সত্যি হয়েছিলো শিবের এই অবতারের মাধ্যমে এমন ব্যাখ্যাও আছে।

 

শৈশব থেকেই শিবের তেজ এবং রূদ্র রূপ হনুমানের মধ্যে উপস্থিত ছিলো।

হনুমান যখন শিশু ছিলেন, তিনি সূর্যকে দেখেছিলেন এবং ভেবেছিলেন এটি একটি লাল ফল, তাই তিনি এটি খাওয়ার চেষ্টায় এর দিকে উড়ে গেলেন। ইন্দ্র যখন হনুমানকে আসতে দেখেন, তখন তিনি তাকে আঘাত করার জন্য তার বজ্র নিক্ষেপ করেন। আহত হন পবন পুত্র হনুমান। সেই ক্রোধে পবন দেব পৃথিবীতে বায়ু সঞ্চালন করতে অস্বীকার করেছিলেন। বায়ুর অভাবে জীবকুল যখন শেষ হয়ে যেতে বসে তখন সমস্ত দেবতারা হনুমানকে বর দেন।সমস্ত দেবতাদের বরে তিনি হয়ে ওঠেন অজেয়। অমর এবং অপ্রতিরোদ্ধ।

 

ভগবান শ্রী রামও বর দিয়েছেন হনুমানকে। সেই বর অনুযায়ী কলি যুগের শেষ হলে তবেই মুক্তি মিলবে হনুমানের।কলিতে যখন কল্কি অবতার রূপে ভগবান আসবেন তখন আবার দুষ্টের দমন এবং ধর্ম পুনরস্থাপন করতে হনুমানের সাহায্য প্রয়োজন হবে বলেও মনে করা হয়।

 

আবার সীতাদেবীর বর অনুযায়ী হনুমান চিরঞ্জীবী। তিনি অজর-অমর হওয়ার বর প্রাপ্ত। অর্থাত্‍‌ তিনি কখনও বৃদ্ধ হবেন না।তাঁর কখনও মৃত্যু হবে না। কথিত আছে, রামায়ণের সমস্ত চরিত্র মোক্ষ লাভ করে, কিন্তু হনুমান সব সময়ের জন্য পৃথিবীতে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, যত দিন মানুষের হৃদয়ে রাম জীবিত আছেন, তত দিন তিনি পৃথিবীতে থাকবেন।

 

হনূমান অষ্ট সিদ্ধি এবং নব নিধির দাতা। তার চরণে আশ্রয় নিলে সকল অনিষ্ট নাশ হয়। জ্যোতিষ শাস্ত্রে মনের করা হয়ে হনূমান যার সহায় শনিদেব তার ক্ষতি করেন না কারণ হনূমানের বীরত্বে সন্তুষ্ট হয়ে শনিদেব তাকে প্রতিশ্রুতি দেন যে তার ভক্তদের তিনি রেহাই দেবেন।

 

ফিরে আসবো পরের পর্বে। শিবের আরো একটি অবতারের কথা নিয়ে। পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।