দূর্গা কথা – বর্ধমানের মুখোপাধ্যায় বাড়ির পুজো

78

বাংলার প্রায় প্রতি জেলায় আছে কিছু ঐতিহাসিক পুজো যার মধ্যে প্রায় বেশি ভাগই কোনো না কোনো অভিজাত বাড়ির পুজো। তেমনই বর্ধমানের সোঁয়াই গ্রামে মুখোপাধ্যায় বাড়ির প্রায় সাড়ে তিনশো বছরেরও বেশি পুরনো দুর্গাপুজোর নিজস্ব ইতিহাস আছে।সেই ইতিহাস জানাবো আজকের পর্বে।বর্ধমানের সোঁয়াই গ্রামের মুখোপাধ্যায় পরিবারের বাসুদেব মুখোপাধ্যায় আজ থেকে প্রায় সাড়ে তিনশো বছর আগে একদিন হঠাৎই স্বপ্নাদেশ পান। স্বপ্নাদেশে মা দুর্গা তাঁকে বলেন তিনি অপূজিত অবস্থায় ফরিদপুরে পড়ে আছেন। এই স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর আর সময় নষ্ট করেননি বাসুদেববাবু স্বপরিবারে সোজা চলে যান তাদের আদি বাস ভূমি ফরিদপুরে তাঁর পৈতৃক ভিটেয়। তারপর তাঁর পারিবারিক দুর্গার কাঠামো কাঁধে করে সোঁয়াই গ্রামে ফিরে আসেন।ফেরার পথে যখন প্রায় সোঁয়াই গ্রামের কাছে পৌঁছে গেছেন তাঁরা। সে সময়ে যে রাস্তা ধরে তাঁরা আসছিলেন সেই রাস্তার উল্টোদিক থেকে বর্ধমানের মহারাজা ভ্রমণ সেরে ফিরছিলেন। রাজা যে পথে যাবেন সেই পথ আগলে কারা এভাবে আসছে তা দেখতে রাজার পাইক, বরকন্দাজ ছোটে। তারা বাসুদেব মুখোপাধ্যায়কে রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়াতে বলে। কিন্তু বাসুদেববাবু জানিয়ে দেন মায়ের কাঠামো নিয়ে তাঁরা রাস্তা ছাড়বেন না। বরং রাজা সরে দাঁড়ান। মা যাবেন। শুরু হয় বাগ বিতন্ডা সব শুনে রাজা এবার স্বয়ং এগিয়ে আসেন। ধর্মপ্রাণা রাজা যেই শোনেন যে মা দুর্গার কাঠামো যাচ্ছে তিনি তৎক্ষণাৎ রাস্তা ছেড়ে সরে দাঁড়ান।শুধু তাই নয় নয়, এই পুজো যাতে ধুমধাম করে হতে পারে সেজন্য মুখোপাধ্যায় পরিবারকে প্রচুর জমি, পুকুর, সম্পত্তি দান করেন রাজা।হয়তো মহারাজা ব্রাহ্মণ সন্তানের ভক্তি ও প্রতিবাদী চরিত্র দেখে খুশি হয়ে ছিলেন।যায় হোক সে বছরই সেই কাঠামোয় মাটি লেপে তাতে রং করে প্রতিমাকে মৃন্ময়ী রূপ দেওয়া হয়। শুরু হয় পুজো। সেই যে পুজো শুরু হয়েছে তা আজও চলছে । এখনো চিরাচরিত রীতি মেনে, পুরনো পারিবারিক পুঁথি অনুসরণ করে হয় পুজো।মহানবমীতে পশু বলি হয়। সেই বলির পর মৃত এবং বলী প্রদত্ত পশুটি নিয়ে স্থানীয় আদিবাসীরা চলে যান। এটাই এখানকার রীতি। এই মুখোপাধ্যায় পরিবারে পুজোর তিন দিন একটি মহাপ্রদীপ প্রজ্বলিত থাকে। যা ঘি দিয়ে জ্বালিয়ে রাখা হয়। প্রদীপের দীপশিখা কখনও নিষ্প্রদীপ হয়না এই তিন দিনে। প্রতিদিন এই প্রদীপকে নিরন্তর জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব পড়ে পরিবারের এক এক জন সদস্যের ওপর।এই পুজোর বিসর্জনের রীতি ও একটু আলাদা প্রতি বছর বিসর্জনের পর তুলে আনা হয় মায়ের কাঠামো। রেখে দেওয়া হয় সযত্নে। পরের বছর ফের তাই দিয়েই নির্মাণ হয় নতুন প্রতিমা।ফিরে আসবো অন্য কোনো বনেদি বাড়ির দূর্গা পূজো নিয়ে আগামী পর্বে। থাকবে এমনই কোনো প্রাচীন দূর্গা পূজো সম্পর্কে ঐতিহাসিক কিছু তথ্য।থাকবে অলৌকিক কিছু ঘটনা। পড়তে থাকুন ।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।