বিশেষ পর্ব – বাঙালির কালী সাধনা

133

বাঙালির কালী সাধনার এক সুদীর্ঘ ও তাৎপর্যপূর্ণ ইতিহাস আছে। আজ আপনাদের সেই ইতিহাস ও পরম্পরা সম্পর্কে কিছু তথ্য দেবো ষোড়শ শতাব্দীর দিকে নবদ্বীপের একজন প্রসিদ্ধ পণ্ডিত দীপান্বিতা অমাবস্যায় শুধুমাত্র লক্ষ্মী পুজো অর্চনার বিধান দিয়েছিলেন তিনি কখনোই সেই দিন কালী পুজোর বিধান দেননি।তবু পরবর্তীতে দীপান্বিতা অমাবস্যা আর কালী পুজো সমার্থক হয়ে যায়।যদিও পাল সেন যুগেও মাতৃ শক্তির আরাধনার প্রমান পাওয়া যায় তবুও কালী বাঙালির ঘরের মেয়ে হয়ে উঠতে আরো কিছুটা সময় নেন।প্রাচীন কিছু পুঁথি থেকে গ্রাম বাংলার শ্মশানে সন্ন্যাসী ও ডাকাতদের কালী পুজোর ইতিহাস জানা যায়। পলাশী যুদ্ধ পরবর্তীতে ১৭৬৮ সালে প্রকাশিত কাশীনাথ এর একটি গ্রন্থ কালী সপর্যাস বিধি তে দীপান্বিতা অমাবস্যা কৃষ্ণপক্ষ তিথিতে কালী পুজো পালন করার উল্লেখ আছেতবে তখনকার সময় কালীপুজো বাংলারমানুষের কাছে খুব বেশি জনপ্রিয়তা লাভ করেনি। পুরানে কালীর জন্ম নিয়ে রয়েছে এক কাহিনী। মনে করা হয় যখন স্বর্গে অসুরের তান্ডব চলছে দেবতাদের স্বর্গরাজ্য দখলের উদ্দেশ্যে। ঠিক তখনই দেবতারা মিলে সৃষ্টি করেন দেবী দুর্গার, আর সেই অসুরের প্রধান ছিল রক্তবীজ সে ছিল দেবতাদের বর প্রাপ্ত।তার রক্তের ফোটা থেকে নতুন অসুর জন্মাতো।তার বধের জন্য মা দুর্গা তার দুটো ভ্রুর মাঝখান থেকে জন্ম দেন কালীর।তিনি ভয়ঙ্কর সেই রক্তবীজকে হত্যা করেন এবং তার প্রতিটি রক্ত বিন্দু পান করেন।সেদিক দিয়ে দেবী কালি একটি দানবীর রূপ। মহাভারতেও কালীর উল্লেখ রয়েছে, যেখানে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত পশুদের আত্মা বহন করেন যিনি সেই তিনি কালরাত্রি।এই কাল রাত্রি আর কালীকে অনেকেই এক করে দেখেন।তন্ত্র শাস্ত্রতে যেসব দেব-দেবীর পূজা করা হয় তাদের মধ্যে কালীপূজা অন্যতম। তিনি দশ মহাবিদ্যার অন্যতম।তবে শ্মশান বাসিনি ও তান্ত্রিক এবং দস্যুদল দ্বারা পূজিতা কালীকে যিনি বাংলার ঘরে ঘরে পৌঁছে দেন তিনি নবদ্বীপের সাধক কৃষ্ণানন্দ তিনি প্রথমকালী মূর্তি পূজার প্রচলন করেন। তিনি স্বপ্নে মায়ের নির্দেশ পেয়ে অলৌকিক ভাবে তার রূপ প্রত্যক্ষ করে ছিলেন।সেই থেকে শক্তি দেবী হিসেবে শ্যামা মা বা কালী মূর্তির আরাধনা করেন শাক্ত বাঙালিরা।পরবর্তীতে রামকৃষ্ণ রামপ্রসাদ বা বামা ক্ষেপার মতো সাধকরা মাতৃ শক্তির আরাধনা করে সিদ্ধি লাভ করেন।শোনা যায় গঙ্গা আগে পাঁচটি ধারায় বিভক্ত হয়ে মোহনায় পড়ত। আজকের মজে যাওয়া আদিগঙ্গা ছিল তাদের একটি। কালীগ্রাম ছিল তার তীরে সেই কালী গ্রামই পরবর্তীতে হয় কলকাতা। অর্থাৎ কলকাতার অস্তিত্ব দেবী কালীকে কেন্দ্র করে আবর্তীত হয়েছে।এই যে ফল হারিণী অমাবস্যা নিয়ে এতো কথা বললাম শাস্ত্র মতে এই তিথিতে মা কালী মানুষের সমস্ত খারাপ কর্মফলকে নিজের মধ্যে ধারণ করেন। তাই এই তিথিতে দেবীর পুজো করলে অশুভ কর্মফলের নাশ এবং শুভ ফল প্রাপ্তি হয়।এই দিন মা কালীর উদ্দেশে নিজের পছন্দের ফল রেখে মনস্কামনা জানাতে হয় এবং  সেই মনস্কামনা পূরণ না হওয়া পর্যন্ত সেই ফলটি অন্য কাউকে দান করতে বা খেতে নেই। একবছর পর ফলটি গঙ্গায় বিসর্জন করে সেই ফল গ্রহণ করা যেতে পারে। শব্দকল্পদ্রুমে বলা হয়েছে, ‘জ্যৈষ্ঠ-পঞ্চদশ্যাং বহুফলাদ্যুপহারৈঃ পূজনীয়া’ – অর্থাৎ জ্যৈষ্ঠমাসের অমাবস্যায় সাধক নানাবিধ ফলের উপহার সহযোগে দেবীর পুজো করবেন। এই দিন তারাপীঠেও তাই ফল ব্যবহার করা হয় পুজোয়।আজকের এখানেই শেষ করছি চলতে থাকবে কালী কথা। মন্দির রহস্য এবং দেবী মাহাত্ম নিয়ে আলোচনা। পড়তে থাকুন।ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।