সাধক কথা – স্বামী প্রনবানন্দ সরস্বতী

33

আজ সাধক কথায় আলোচনা করবো দেশের অন্যতম বিখ্যাত ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধ যোগী পুরুষ স্বামী প্রনবানন্দ সরস্বতী কে নিয়ে|জানবো তার জীবন কাহিনী ও আধ্যাত্মিক কর্মকান্ড|ইংরেজির ১৮৯৬ সালে ২৯ জানুয়ারি একে মাঘী পূর্ণিমার দিন তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার মাদারীপুরে অত্যান্ত সাধারন এক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন বালক প্রনবানন্দ|পিতার নাম বিষ্ণুচরন ভূইঞা ও মাতা ও মাতা সারদা দেবী|কথিত আছে স্বয়ং বাবা মহাদেবের বরপুত্র ছিলেন প্রনবানন্দ|বাল্যকালে তার নাম ছিলো বিনোদ|ছোটো বেলা থেকেই ঈশ্বর চিন্তা ও আধ্যাত্মিকতায় গভীর আকর্ষণ ছিলো তার|মাত্র সতেরো বছর বয়সে স্বামী গম্ভীরনাথ এর কাছে দীক্ষা নেন তিনি|মাত্র ২০ বৎসর বয়সে সাধনায় সিদ্ধিলাভ করেন এবং ১৯২৪ সালে প্রয়াগে অর্দ্ধকুম্ভমেলায় স্বামী গোবিন্দানন্দ গিরির নিকট আনুষ্ঠানিক সন্ন্যাস গ্রহণ করেন ও হয়ে যানস্বামী প্রনবানন্দ|নানা দিক থেকে বর্ণময় ও তাৎপর্যপুর্ন ছিলো স্বামী প্রনবানন্দর আধ্যাত্মিক জীবন|একাধারে তিনি ছিলেন সন্যাসী, সমাজ সংস্কারক এবং স্বাধীনতার যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী এক বীর সন্ন্যাসী|একজন বিপ্লবী দলের সক্রিয় সদস্য হিসেবে 1914 সাল গ্রেপ্তার ও হয়ে ছিলেন স্বামী প্রনবানন্দ|সারা জীবন তিনি একাধিক প্রাচীন তীর্থ ক্ষেত্র সংস্কার করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন|তবে স্বামী প্রনবানন্দর সর্ব শ্রেষ্ঠ অবদান অবশ্যই ভারত সেবাশ্রম তৈরি|তিনি ভারত সেবাশ্রম সংঘ প্রতিষ্ঠা করেন 1917 সালে|বিশ্ব জুড়ে সমাজ সংস্কার, সেবা মূলক কর্ম সূচি ও সনাতন ধর্মের প্রচারে ভারত সেবাশ্রম আজ এক অতি পরিচিত নাম|সারাটা জীবন ধরে স্বামী প্রনবানন্দ সক্রিয় ছিলেন দেশের হিন্দু সমাজকে ঐক্য বদ্ধ করতে এবং সংকীর্ণ জাতপাতের বেড়া জাল থেকে সনাতন ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে|তিনি সকল রকম ধর্মীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ছিলেন|তিনি ব্যক্তি চরিত্র নির্মাণ, আদর্শ পরিবার গঠন যথাযত শিক্ষা ইত্যাদিকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন|তিনি বলেছিলেন – হিন্দুদের মধ্যে ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, চণ্ডাল আদির কোন ভেদ নেই|অর্থাৎ সব হিন্দু সমান, সবার সমান অধিকার এবং সবাইকে সমান চোখে দেখতে হবে|সনাতন ঐক্য ও বৈদিক সংস্কৃতি রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি হিন্দু মিলন মন্দির প্রতিষ্ঠা করেন যা নানা রকম জন কল্যাণ মূলক কাজে নিয়োজিত ছিলো|আশ্রমে বড়ো করে দোল পূর্ণিমা পালন হতো প্রতিবার দোলের দিন একবার আকাশে দেখা দিল ঘোর কৃষ্ণবর্ণ মেঘ। ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনায় আশ্রমের সকলেই উৎকণ্ঠিত হয়ে পড়লেন। এতবড় আয়োজন, এত লোক প্রসাদ পাবেন—ঝড় বৃষ্টি এলে সব যে পণ্ড হয়ে যাবে। প্রণবানন্দজি নির্দেশ দিলেন, সবাইকে তাড়াতাড়ি প্রসাদ দিয়ে দাও। কিন্তু এত লোককে আর কত তাড়াতাড়ি প্রসাদ দেওয়া সম্ভব ? তবু সবাইকে সারি দিয়ে বসিয়ে খিচুড়ি প্রসাদ দেওয়া আরম্ভ হল। যেই না প্রসাদ দেওয়া শুরু হল, অমনি চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল। ভরদুপুরেই নেমে এল সন্ধ্যা, শুরু হল আকাশ কাঁপানো মেঘগর্জন। সবাই বুঝলেন, আর শেষরক্ষা করা সম্ভব হবে না—যাবতীয় আয়োজন এবার পণ্ড হয়ে যাবে। কারণ, বৃষ্টি এলো বলে।পরিস্থিতি যখন আয়ত্তের বাইরে এক ভক্ত ছুটে গেলেন প্রণবানন্দজির কাছে, হাতজোড় করে আচার্যদেবকে বললেন, ‘মহারাজ এবার আপনি রক্ষা করুন। ধ্যানস্থ হয়ে গেলেন তিনি। তারপর আত্মগত স্বরে বললেন, ‘না, বৃষ্টি আসবে না।’তারপরই ঘটল সেই অবিশ্বাস্য ঘটনা। ঝেঁপে বৃষ্টি এল কিন্তু আশ্রমের পাশ দিয়ে যে খালটা বয়ে গেছে বৃষ্টি সেই খালের ওপারে এসে থমকে গেল। এপারে আর এল না। ওপার দিয়ে বৃষ্টিটা চলে গেল। অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন স্বামী প্রণবানন্দ|স্বামী প্রণবানন্দর জীবন এক আদর্শ স্বরূপ|নিজেকে সম্পূর্ণ রূপে তিনি উৎসর্গ করে ছিলেন দেশ সেবায় ও সনাতন ধর্ম রক্ষার কাজে|আজও তিনি ঘরে ঘরে পূজিত হন এক আদর্শ গুরু ও এক অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাধক হিসেবে|১৯৪১ সালে ৮ জানুয়ারি মাত্র ৪৫ বৎসর বয়সে তিনি দেহ ত্যাগ করেন|কিন্ত তিনি অমরত্ব লাভ করেছেন তার ত্যাগ, জন সেবা ও আদর্শের মাধ্যমে|.মহান এই গুরু ও সাধক কে প্রনাম জানিয়ে আজকের পর্ব এখানেই শেষ করছি|চলতে থাকবে সাধক কথা পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|