রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রসবোধ

354

আজ পঁচিশে বৈশাখ, সাধারণত এই দিনটায় আমরা বাঙালিরা গঙ্গা জলে গঙ্গা পুজো করে থাকি অর্থাৎ কবি গুরুর গান , কবিতা, নাটক ও তার অন্যান্য সৃষ্টির মাধ্যমে তাকে স্মরণ করি|গত বছর থেকে অবশ্য ছবিটা অনেকটাই আলাদা,প্রান ঘাতী ভাইরাসের তান্ডবে আমরা সবাই কম বেশি ঘর বন্দী তাই জোট বেঁধে উৎসব করে পঁচিশে বৈশাখ পালন সম্ভব নয়|কিন্তু এই দিনটা আলাদা আজ কবিগুরুকে আমার আমাদের মতো করে স্মরণ করবো শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাবো|গতকাল আমার আবৃতি করা দেবতার গ্রাস মুক্তি পেয়েছে আমার ইউটিউবে|আপনাদের প্রশংসাও পেয়েছি|আজ এই লেখার মাধ্যমে কবি গুরুর জীবনের একটি বিশেষ দিক, তার রসবোধ নিয়ে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ও মজার তথ্য আপনাদের সামনে রাখবো|

রবীন্দ্র নাথ ঠাকুর রচিত সাহিত্যের এক বিশাল জায়গাজুড়েই রয়েছে হাস্য-কৌতুক। তবে শুধু সাহিত্যেই নয়, ব্যক্তিগত জীবনেও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন হাস্যরসের নিপুণ কারিগর, একজন যথার্থ রসিক মানুষ|কবির জীবন কথায় , প্রত্যক্ষদর্শীদের জবানিতে এবং রবীন্দ্র গবেষকদের কলমে একাধিক বার উঠে এসেছে রসিক রবীন্দ্রনাথের একাধিক কান্ড কারখানা|

একবার চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় গেছেন শিলাইদহে জমিদার রবীন্দ্রনাথের কাছে লেখা আনতে। চারুচন্দ্র তখন ‘প্রবাসী’ পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। রবীন্দ্রনাথ তখন অবস্থান করছিলেন পদ্মার ওপারে বজরায়। নদীর ঘাট থেকে বজরা পর্যন্ত একটা তক্তার সাঁকো পেতে দেয়া হয়েছে।
চারুচন্দ্র পা টিপে টিপে নৌকায় উঠে আসছেন। বজরার ছাদ থেকে এ দৃশ্য দেখে রবীন্দ্রনাথ সাবধান করলেন চারুকে, ‘সাবধানে পা ফেলো। এ জোড়াসাঁকো নয়!’ তার এই মন্তব্য শুনে আশপাশের সবাই হেসে উঠে ছিলেন|

আরেকবারের ঘটনা, গুরুদেব তখন শান্তি নিকেতনে,শান্তিনিকেতনের ছেলেদের সাথে ফুটবল খেলছে অন্য এক প্রতিষ্ঠানের ছেলেরা। খেলা শেষে দেখা গেল শান্তিনিকেতনের ছেলেরা আট গোলে জিতেছে। তারাতো মহাখুশি। জানাতে গেল গুরুদেবকে। গুরুদেবও খুশি। মজা করে বললেন ‘জিতেছো ভাল। তাই বলে আট গোল দিতে হবে? ভদ্রতা বলেও তো একটা কথা আছে।’

রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজির ছিলো অত্যান্ত স্নেহের সম্পর্ক|রবীন্দ্রনাথকে গুরুদেব নাম গান্ধীজিই দিয়েছিলেন|একবার রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজী একসঙ্গে বসে সকালের নাশতা করছিলেন। গান্ধীজীকে দেওয়া হয়েছিল ওটসের পরিজ। কারণ গান্ধীজী লুচি পছন্দ করতেন না। তবে রবীন্দ্রনাথ খাচ্ছিলেন গরম গরম লুচি। গান্ধীজী তাই দেখে বলে উঠলেন, ‘গুরুদেব, তুমি জানো না যে তুমি বিষ খাচ্ছো।’ উত্তরে রবীন্দ্রনাথ বললেন, ‘বিষই হবে; তবে এর অ্যাকশন খুব ধীরে। কারণ, আমি বিগত ষাট বছর যাবৎ এই বিষ খাচ্ছি।’শুনে হেসে ফেললেন গান্ধীজি|

ব্যাক্তিগত জীবনে হাসিঠাট্টা করতে খুবই ভালো বাসতেন রবীন্দ্রনাথ যেমন একবার এক ভদ্রলোককে বললেন রবীন্দ্রনাথ, ‘আপনাকে আমি দণ্ড দেব।’ভীষণ বিব্রত হয়ে ভদ্রলোক জানতে চাইলেন, ‘কেন, আমি কি অপরাধ করেছি?’
রবীন্দ্রনাথ লোকটির বিব্রতভাব বুঝতে পেরে হাসি হাসি মুডে বললেন, ‘গতকাল আপনার লাঠি মানে দন্ডটি আমার এখানে ফেলে গিয়েছিলেন। এই নিন আপনার দণ্ড!’ বলে তার দিকে লাঠিটা বাড়িয়ে দিলেন|

আরেকটি মজার ঘটনা এখানে উল্লেখ করা যায় যা ঘটেছিলো কবির জাপান যাত্রার সময়ে ,এক
এক ভক্তগৃহে রবীন্দ্রনাথের নিমন্ত্রন ছিল। খেতে গিয়ে বুঝতে পারলেন তাঁরা যে ডিম দিয়েছেন তা পঁচা।এ নাকি জাপানের বিখ্যাত খাদ্য রবীন্দ্রনাথের সঙ্গিরা বিরক্ত। এ কেমন নিমন্ত্রন! কিন্তু সবাই দেখলেন রবীন্দ্রনাথের প্লেটে ডিম নেই। তিনি পঁচা ডিম খেয়ে ফেলেছেন! বাড়ি ফেরার পথে একজন জিজ্ঞাসা করলেন, গুরুদেব আস্ত একটা পঁচা ডিম আপনি কিভাবে খেয়ে ফেললেন? সবাইকে অবাক করে দিয়ে রবীন্দ্রনাথ বললেন “আরে খাইনি তো। দাড়ির ভিতর দিয়ে জোব্বার মধ্যে চালান করে বাম হাতে নিয়ে পকেটে রেখে দিয়েছি। এই যে সাথে করে নিয়ে এসেছি”

নবাগত কবি দের সাথে কবিগুরুর বিশেষ আন্তরিক সম্পর্ক ছিলো, অনেক তরুণ কবিই আসতেন কবিতা শোনাতে, অনেকেই চিঠি লিখতেন, একবার এক তরুণ কবি রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখে তার কবিতার এক লাইন পাঠালেন –
“কপালটা ভিজে যাবে দুই নয়নের জলে…” কবিতার এই চরণটি কেমন হয়েছে জানতে চাইলেন|কিন্তু রবীন্দ্রনাথ উত্তর দেন না।
একবার, দুইবার, তিনবার! শেষে কবি বিরক্ত হয়ে একটু কটুভাষায় রবীন্দ্রনাথকে চিঠি লিখলেন। শেষমেশ রবীন্দ্রনাথ বিরক্ত হয়ে উত্তর দিলেন;-
” পা দুটো বেঁধে রেখো তাল তমালের ডালে,
কপালটা ভিজে যাবে দুই নয়নের জলে।”

এমনই ছিলেন রবীন্দ্রনাথ|এমনই ছিলো তার রসবোধ যা নিয়ে লিখতে বসলে পাতার পর পাতা লিখলেও ঘটনা শেষ করা যায়না|তবুও কিছু ঘটনা আজ তুলে ধরলাম যা আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে|গুরুদেবকে তার জন্মদিনে প্রনাম ও শ্রদ্ধাঞ্জলি আজ এখানেই বিদায় নিচ্ছি|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|