বন্দে মাতরম
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
সম্প্রতি বঙ্কিম চন্দ্র রচিত বন্দে মাতরম তার একশো পঞ্চাশ বছর পূর্ণ করলো। আজ আশিতম স্বাধীনতা দিবসে আসুন এই গানের ইতিহাস, তার প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীনতা সংগ্রামে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা সম্পর্কে জেনে নিই।

বাংলার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই গান একসময় কোটি কোটি ভারতবাসীর হৃদয়ে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলেছিল।দেশমাতৃকার বন্দনা থেকে জাতীয় চেতনার প্রতীক এই গান।
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে “বন্দে মাতরম” শুধু একটি গান নয়—এটি দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ ও মাতৃভূমির প্রতি গভীর শ্রদ্ধার এক অনন্য উপস্থাপনা।
“বন্দে মাতরম”-এর রচয়িতা ছিলেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়। গানটির প্রকাশ ঘটে ৭ নভেম্বর ১৮৭৫ সালে, বঙ্কিমচন্দ্র সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকায়। পরবর্তীকালে এটি তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘আনন্দমঠ’, যা ১৮৮২ সালে প্রকাশিত হয়, তার অন্তর্ভুক্ত হয়।
গানটির মূল ভাবনা ছিল দেশকে মাতৃরূপে এবং দেবীরূপে কল্পনা করে তাঁর বন্দনা করা।
স্বাধীনতা আন্দোলনের কালে উনিশ শতকের শেষভাগে গানটি ধীরে ধীরে জাতীয় চেতনার অন্যতম প্রধান প্রতীকে পরিণত হয়। দুবার সুর করা হয়। প্রথমে যদুনাথ ভট্টাচার্য পরে ১৮৯৬ সালে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের কলকাতা অধিবেশনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর “বন্দে মাতরম” গানটি পরিবেশন করেন সুর কিছুটা পাল্টে।এর ফলে গানটি বৃহত্তর জাতীয় পরিসরে বিশেষ পরিচিতি লাভ করে।
পরবর্তীতে ১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ-বিরোধী স্বদেশী আন্দোলনের সময় “বন্দে মাতরম” হয়ে ওঠে প্রতিবাদ ও দেশপ্রেমের এক শক্তিশালী কণ্ঠস্বর। মিছিল, সভা ও সমাবেশে মানুষ এই গান গেয়ে নিজেদের ঐক্য ও স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করত। ধীরে ধীরে “বন্দে মাতরম” স্বাধীনতার স্লোগান এবং আন্দোলনকারীদের এক অনুপ্রেরণাদায়ক মন্ত্রে পরিণত হয়।
বিতর্কও কিছু কম হয়নি এই গানকে নিয়ে ব্রিটিশ আমলে “বন্দে মাতরম” এবং ‘আনন্দমঠ’কে ঘিরে সরকারি নিষেধাজ্ঞা এবং দমনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। সম্প্রতি কিছু সাম্প্রদায়িক কারণেও গানটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করেছে। সে বিতর্ক আজ বাদই দিলাম তবে নিষেধাজ্ঞা বা বিতর্ক গানটির জনপ্রিয়তা কমাতে পারেনি বরং অনেকের কাছে এটি হয়ে ওঠে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে
প্রতিরোধের প্রতীক স্বরূপ।
স্বাধীনতার প্রাক্কালে “বন্দে মাতরম”-এর মর্যাদা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ১৯৩৭ সালে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটি জাতীয় সমাবেশে গানটির প্রথম দুটি স্তবক গাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এর মাধ্যমে গানটির ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক গুরুত্বকে বিশেষ স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
অবশেষে ২৪ জানুয়ারি ১৯৫০ সালে, স্বাধীন ভারতের সংবিধান সভা “জনগণমন”-কে জাতীয় সংগীত এবং “বন্দে মাতরম”-কে জাতীয় স্তোত্র হিসেবে গ্রহণ করে এবং উভয়কেই মর্যাদার দিক থেকে বিশেষ স্থান দেওয়া হয়।
বাঙালির আলাদা করে গর্ব হওয়া উচিৎ কারন সাহিত্য সম্রাট বঙ্গ সন্তান বঙ্কিমচন্দ্রের কলমে জন্ম নেওয়া “বন্দে মাতরম” দেশের ইতিহাসের অংশ হয়ে উঠেছে।
বন্দে মাতরম আমাদের শেখায় মাতৃভূমির প্রতি ভালোবাসা শুধু আবেগ নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে দায়িত্ব, সম্মান ও আত্মত্যাগের আদর্শ।
“বন্দে মাতরম” আজও ভারতীয় জাতীয় চেতনার এক অমর উচ্চারন মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এক চিরন্তন বন্দনা স্বরূপা।
সবাইকে স্বাধীনতা দিবসের শুভেচ্ছা।
বন্দে মাতরম। জয় হিন্দ।
