সাধক কথা – শ্যামাচরন লাহিড়ী 

28

আজ সাধক কথায় বলবো যোগীরাজ শ্যামাচরন লাহিড়ীর কথা যিনি আধ্যাত্মিক জগতে লাহিড়ী মশাই নামেই বেশি পরিচিত|ব্রিটিশ ভারতবর্ষে 1895 সালে শ্যামাচরণ নদীয়া জেলার ঘুর্ণী গ্রামে একটি ব্রাহ্মণ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।পিতাগৌরমোহন লাহিড়ী ও মাতা শ্রীমতি মুক্তকেশী|তিনি ছিলেন কনিষ্ঠ পুত্র|শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন সাধক প্রকৃতির এবং প্রায়ই ধ্যানে বসে থাকতেন।মাত্র পাঁচ বছর বয়সে তিনি বাবার সাথে চলে আসেন বেনারসে|পরবর্তীতে ব্রিটিশ সরকারের হিসাব রক্ষকের চাকরিতে যোগ দিয়ে বদলি হয়ে হিমালয়ে যান শ্যামচরণ এবং এখানেই আসে তার জীবনের এক নাটকীয় পরিবর্তন|হিমালয়ে থাকা কালীন একদিন, পাহাড়ে চলার সময়,তিনি তাঁর গুরু কিংবদন্তী স্বরূপ মহাবতার বাবাজির দেখা পেলেন, যিনি ক্রিয়া যোগের কৌশলগুলো তাকে শিখিয়ে তাকে দীক্ষা দিলেন।দীক্ষার পরে কঠোর ভাবে ক্রিয়াযোগ পালন ও অনুশাসনের মধ্যমে ধীরে ধীরে শ্যামচরন হয়ে উঠলেন যোগীরাজ শ্যামা চরন লাহিড়ী|ক্রিয়া যোগ নিয়ে অনেকগুলি বই লিখলেন|অসংখ্য ভক্ত শিষ্য হলো তার যাদের তিনি ক্রিয়া যোগ শেখালেন|তবে গৃহত্যাগী সন্ন্যাসী না হয়ে তিনি ছিলেন গৃহি|সংসার, চাকরি এবং যোগ সাধনা একসাথে সমান তালে সামলেছেন এই মহান যোগী ও গুরু|মহাসাধক শ্যামাচরণ লাহিড়ির জীবন বহু অলৌকিক কাহিনিতে ভরপুর। সাধারণ বুদ্ধিতে যার কোনও ব্যাখ্যা মেলে না কিছুতেই|প্রচলিত সেই সব কিংবদন্তীর দুটি আজ আপনাদের বলবো|শ্যামাচরণ লাহিড়ির প্রিয় শিষ্য যুক্তেশ্বর একবার কাঁদতে কাঁদতে তাঁর গুরুর পায়ে আছাড় খেয়ে পড়লেন। শ্যামাচরণেরই আর এক শিষ্য রাম আর নেই। যুক্তেশ্বর বললেন, ‘গুরুদেব, ভয়ংকর কলেরায় রাম একটু আগেই মারা গেছে। আমি আপনার কাছে দুবার এসেছিলাম কিন্তু আপনি তখন যোগনিদ্রায় ছিলেন, আমি কিছু বলতে পারিনি।’চোখ মেলে তাকালেন শ্যামাচরণ লাহিড়ি। প্রশান্ত ’ যুক্তেশ্বর তখনও কাঁদছেন, কোনওক্রমে জানালেন, শহরের নামী দুজন ডাক্তার আপ্রাণ চেষ্টা করেও শেষ রক্ষা করতে পারেননি। তার শেষ ইচ্ছে ছিলো গুরু দেব কে একবার দর্শন করার|যোগীরাজ শ্যামাচরণ সব শুনে পাশে জ্বলতে থাকা প্রদীপটি থেকে এক চামচ রেড়ির তেল তুলে নিলেন। সেই তেল যুক্তেশ্বরকে দিয়ে বললেন, ‘আমি দেখতে পাচ্ছি রাম এখনও বেঁচে আছে! যাও, এক্ষুনি এই তেলটা নিয়ে যে ভাবে হোক ওর গালে দিয়ে দাও’।যুক্তেশ্বর তাই করলেন গুরুদেবের দেওয়া তেলটুকু ঢেলে দিলেন যুক্তেশ্বর। সকলকে স্তম্ভিত করে বরফের মতো ঠান্ডা মৃতদেহটি নড়ে উঠলো। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই উঠে বসল রাম। চার দিকে তাকিয়ে যুক্তেশ্বরকে বলল, ‘আমাকে এক্ষুনি গুরুদেবের কাছে নিয়ে চলো’।দ্বিতীয় একটি আশ্চর্য ঘটনার কথা বলি। একবার তাঁরই এক শিষ্যা অভয়া গুরুর সঙ্গে দেখা করতে হাওড়া থেকে বারাণসী আসছেন। মালপত্র নিয়ে ছুটতে ছুটতে হাওড়া স্টেশনে পৌঁছতেই দেখলেন, বারাণসী এক্সপ্রেস স্টেশন ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। হাউ হাউ করে কাঁদতে কাঁদতে স্টেশনেই বসে পড়লেন তিনি। আস্তে আস্তে প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে ট্রেন। চূড়ান্ত হতাশ অভয়া তখন অঝোরে কাঁদছেন আর গুরুদেব শ্যামাচরণ লাহিড়িকে স্মরণ করছেন।হটাৎ অভয়া দেখলেন, ট্রেন থেমে গিয়েছে।ড্রাইভার ও গার্ড ও অবাক তৎক্ষণাৎ মালপত্র নিয়ে দৌড় দিলেন তিনিও। অভয়া ট্রেনে ওঠামাত্র থেমে যাওয়া বারাণসী এক্সপ্রেস আবার গড়গড় করে চলতে শুরু করল।বারাণসী পৌঁছে অভয়া তাঁর গুরুদেবের কাছে গেলেন। পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করা মাত্র যোগীরাজ শ্যামাচরণ বললেন, ‘ট্রেন ধরতে গেলে একটু সময় হাতে নিয়ে বেরোতে হয় মা,অত বড়ো ট্রেনকে কি আটকে রাখা যায়?গুরুর অলৌকিক ক্ষমতায় দেখে অবাক হলেন শিষ্যা অভয়া|মহাসাধক শ্যামাচরণ লাহিড়ি কে প্রণাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের সাধক কথা|শ্রাবন মাস চলছে| ফিরে ফিরে আসবো শ্রাবন মাস ও শিব সংক্রান্ত নানা পৌরাণিক বিষয় নিয়ে|পড়তে থাকুন|ভালো থাকুন|ধন্যবাদ|