গুরু কথা – শ্রী শ্রী ভবা পাগলা

6

ভবা পাগলা: ভক্তি, মাতৃসাধনা ও অলৌকিক আধ্যাত্মিক জীবনের এক অনন্য অধ্যায়

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার সাধক-ঐতিহ্যের ইতিহাসে এমন কিছু মহাপুরুষের নাম আজও গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়, যাঁদের জীবন ছিল একাধারে রহস্যময়, অলৌকিক এবং মানবকল্যাণে নিবেদিত। সেই বিরল সাধকদের অন্যতম হলেন ভবা পাগলা। তিনি ছিলেন মাতৃসাধক, শ্যামাসঙ্গীত রচয়িতা, আধ্যাত্মিক গুরু এবং অসংখ্য মানুষের কাছে এক জীবন্ত আশ্রয়। তাঁর গান, তাঁর বাণী এবং তাঁর জীবনদর্শন আজও লক্ষ লক্ষ ভক্তের হৃদয়ে সমানভাবে আলো জ্বেলে রেখেছে। বাহ্যিকভাবে তাঁকে অনেকেই “পাগল” বলে মনে করলেও, প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন ঈশ্বরপ্রেমে আত্মহারা এক বিরল সাধক। তাই মানুষের মুখে মুখে তাঁর নাম হয়ে ওঠে “ভবা পাগলা”।

ভবা পাগলার প্রকৃত নাম ছিল ভবেন্দ্র মোহন চৌধুরী (কিছু সূত্রে ভবেন্দ্রনাথ চৌধুরী নামও উল্লেখ করা হয়েছে)। তাঁর পিতার নাম ছিল গজেন্দ্র মোহন চৌধুরী। তিনি অবিভক্ত বাংলার ঢাকা জেলার আমতা অঞ্চলে (বর্তমানে বাংলাদেশে) উনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে, সাধারণভাবে ১৯০২ সালের দিকে জন্মগ্রহণ করেন বলে অধিকাংশ গবেষক মত প্রকাশ করেছেন, যদিও তাঁর জন্মসাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ধর্মভাব, সঙ্গীতের প্রতি গভীর আকর্ষণ এবং দেবী মহামায়ার প্রতি অসীম টান লক্ষ্য করা যেত। সাধারণ খেলাধুলার চেয়ে নির্জনে বসে ঈশ্বরচিন্তা, ভক্তিগান এবং ধ্যানেই তিনি বেশি আনন্দ পেতেন।

শৈশব থেকেই ভবা ছিলেন অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং হৃদয়বান। মানুষের দুঃখ-কষ্ট তাঁকে গভীরভাবে স্পর্শ করত। দরিদ্র, অসহায় কিংবা বিপদগ্রস্ত মানুষকে দেখলে তিনি নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সাহায্যের চেষ্টা করতেন। পার্থিব জীবনের প্রতি তাঁর আকর্ষণ খুব কম ছিল। সংসারের নানা নিয়ম, প্রতিষ্ঠা কিংবা অর্থসম্পদের চেয়ে তিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্যকেই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য বলে মনে করতেন। এই কারণেই সমাজের অনেকেই তাঁকে প্রথমদিকে অস্বাভাবিক বা পাগল বলে ভাবতেন। কিন্তু ধীরে ধীরে মানুষ উপলব্ধি করতে শুরু করে যে এই “পাগলামি” আসলে ছিল মাতৃভক্তির পরম উন্মাদনা।

কৈশোর ও যৌবনে তাঁর জীবনে বহু আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতার কথা ভক্তদের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে। বলা হয়, তিনি প্রায়ই মা কালীকে প্রত্যক্ষভাবে অনুভব করতেন এবং কখনও কখনও মাতৃভাবাবিষ্ট হয়ে দীর্ঘ সময় ধ্যানমগ্ন থাকতেন। তাঁর কাছে আসা বহু মানুষ দাবি করেছেন যে, তিনি মানুষের অন্তরের কথা বুঝতে পারতেন এবং অনেক সময় এমন কিছু ভবিষ্যদ্বাণী করতেন যা পরবর্তীকালে সত্য বলে প্রমাণিত হতো। যদিও এসব ঘটনার ঐতিহাসিক প্রমাণ সর্বত্র পাওয়া যায় না, তবুও তাঁর ভক্তদের কাছে এগুলো তাঁর আধ্যাত্মিক শক্তির প্রকাশ হিসেবে আজও সমাদৃত।

ভবা পাগলার জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল তাঁর রচিত ভক্তিগীতি। তিনি হাজারেরও বেশি শ্যামাসঙ্গীত ও আধ্যাত্মিক গান রচনা করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়। তাঁর গানের ভাষা ছিল সহজ, হৃদয়স্পর্শী এবং গভীর দর্শনে পূর্ণ। তিনি বিশ্বাস করতেন, ঈশ্বরকে পাওয়ার জন্য জটিল আচার-অনুষ্ঠানের প্রয়োজন নেই; দরকার কেবল নির্মল হৃদয়, অকৃত্রিম ভক্তি এবং মায়ের প্রতি নিঃস্বার্থ আত্মসমর্পণ। তাঁর গান শুনে অসংখ্য মানুষের জীবনে আধ্যাত্মিক পরিবর্তন এসেছে বলে ভক্তরা বিশ্বাস করেন। আজও তাঁর গান বাংলার বিভিন্ন মন্দির, আশ্রম এবং ভক্তসমাজে সমান জনপ্রিয়।

দেশভাগের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে আসেন এবং জীবনের একটি বড় অংশ কাটান এখানেই। তাঁর আশ্রমে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ ভিড় জমাতেন। কেউ আসতেন মানসিক শান্তির খোঁজে, কেউ পারিবারিক সমস্যার সমাধান চাইতে, আবার কেউ শুধুমাত্র তাঁর সান্নিধ্যে কয়েক মুহূর্ত কাটানোর জন্য। তিনি সকলকে সমান স্নেহে গ্রহণ করতেন। তাঁর কাছে ধনী-গরিব, জাত-পাত বা ধর্মের কোনো ভেদাভেদ ছিল না। তিনি বলতেন, মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে একজন মানুষ, আর সেই মানুষ যদি সত্য, প্রেম ও ভক্তির পথে চলে, তবে ঈশ্বর নিজেই তাকে পথ দেখান।

ভবা পাগলার জীবন ছিল অত্যন্ত সরল। তিনি কখনও বিলাসিতা বা প্রচারের প্রতি আকৃষ্ট হননি। সাধারণ পোশাক, সহজ জীবনযাপন এবং সর্বদা ঈশ্বরের নামস্মরণ—এই ছিল তাঁর জীবনের মূল বৈশিষ্ট্য। তিনি ভক্তদের শিখিয়েছিলেন যে অহংকার মানুষকে ঈশ্বর থেকে দূরে সরিয়ে দেয়, কিন্তু বিনয় ও ভালোবাসা মানুষকে ঈশ্বরের আরও কাছে নিয়ে যায়। তাঁর প্রতিটি আচরণে ছিল মায়ের প্রতি নিঃশর্ত বিশ্বাস এবং মানুষের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।

তাঁর জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে বহু অলৌকিক কাহিনি। অনেক ভক্তের বিশ্বাস, তাঁর আশীর্বাদে কঠিন রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করেছেন অনেকে, আবার অনেকের জীবনের জটিল সমস্যারও অপ্রত্যাশিত সমাধান হয়েছে। এসব ঘটনার সত্যতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে মতভেদ থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে কোনো দ্বিমত নেই—ভবা পাগলার ব্যক্তিত্ব মানুষের হৃদয়ে গভীর আস্থা, ভক্তি এবং আশার সঞ্চার করেছিল। তাঁর সামনে এসে বহু মানুষ এক অদ্ভুত মানসিক প্রশান্তি অনুভব করতেন।

জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ভক্তদের মধ্যে ঈশ্বরপ্রেম, মানবসেবা এবং মাতৃসাধনার বাণী প্রচার করে গিয়েছেন। দীর্ঘ আধ্যাত্মিক সাধনা ও অসংখ্য মানুষের হৃদয়ে আলো জ্বালিয়ে তিনি ১৯৮৪ সালে দেহত্যাগ করেন। তাঁর প্রয়াণে ভক্তসমাজ গভীর শোকাহত হলেও তাঁর শিক্ষা, তাঁর গান এবং তাঁর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার আজও সমানভাবে জীবন্ত। প্রতি বছর তাঁর স্মরণোৎসবে অসংখ্য ভক্ত সমবেত হয়ে তাঁর রচিত গান গেয়ে এবং তাঁর আদর্শ স্মরণ করে তাঁকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

আজকের ব্যস্ত, উদ্বেগময় এবং স্বার্থকেন্দ্রিক পৃথিবীতে ভবা পাগলার জীবন আমাদের এক অমূল্য শিক্ষা দেয়। তিনি দেখিয়েছেন, সত্যিকারের শক্তি অর্থ, ক্ষমতা বা খ্যাতিতে নয়; প্রকৃত শক্তি নিহিত আছে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, মানবসেবা, বিনয় এবং ঈশ্বরের প্রতি অটল বিশ্বাসে। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয়, যে মানুষ নিজের হৃদয়কে ভালোবাসা ও ভক্তিতে পূর্ণ করতে পারে, তার মধ্যেই ঈশ্বরের আবাস ঘটে। তাই ভবা পাগলা শুধুমাত্র একজন সাধক নন; তিনি বাংলার আধ্যাত্মিক ইতিহাসে এক চিরজাগ্রত আলোকবর্তিকা, যাঁর জীবন ও বাণী আগামী প্রজন্মকেও অনুপ্রাণিত করে যাবে।

 

এই মহান কালী সাধককে আমার শ্রদ্ধা এবং প্রনাম জানিয়ে শেষ করছি আজকের পর্ব। পরবর্তী গুরু কথায় অন্য এক গুরুকে নিয়ে

ফিরে আসবো।পড়তে থাকুন।

ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।