কালী কথা – জেবনা কালী
পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক
বাংলার ইতিহাসে ডাকাতদের জীবনকাহিনি যেমন রোমাঞ্চকর তেমনই বহু ক্ষেত্রে লোকসংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে।কারন এককালে ডাকাতরাই বঙ্গে কালী পূজোর প্রচলন করে। আজও সেই পরম্পরা চলছে।
বর্ধমান এবং বীরভূম অঞ্চলের ইতিহাসে তেমনই এক কিংবদন্তি চরিত্র হলেন ডাকাত জেবনা ওরফে জীবন বাগদি।ছিয়াত্তরের মন্বন্তরের পর বাংলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে দস্যুদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছিল। অষ্টাদশ শতকের শেষভাগে বীরভূম ও বর্ধমান অঞ্চলে একাধিক সশস্ত্র দস্যুদলের অত্যাচারের কথা ইতিহাসে পাওয়া যায়। সেই সময় প্রায় দেড়শো জন সশস্ত্র অনুচর নিয়ে অজয় নদ পার হয়ে বীরভূমে প্রবেশ করেছিলেন ডাকাত জেবনা। তাঁর কর্মক্ষেত্র ছিল বর্তমান পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রাম অঞ্চলের লবণধার গ্রাম।
শোনা যায় জেবনা ছিলেন অত্যন্ত প্রভাবশালী ডাকাত সর্দার। রাজা-জমিদারদের সম্পদ লুট করে দরিদ্রদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার জন্যও তাঁর পরিচিতি ছিল। তাঁর প্রভাব বর্ধমানের বহু গ্রাম পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। বীরভূমের জয়দেব কেন্দুলির রাজবাড়িতে তাঁর দলের ভয়াবহ ডাকাতির ঘটনা ইতিহাসের বিবরণে উঠে এসেছে।
তবে জেবনার জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হল তাঁর শক্তিসাধনা ও কালীভক্তি। কথিত আছে, লবণধার গ্রামের জঙ্গলে তিনি মা কালীর আরাধনা করতেন। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সেই কালীপুজো আজও তার পুরোনো ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। কার্তিক মাসের অমাবস্যায় মশাল জ্বালিয়ে চার-পাঁচ ফুট উচ্চতার মাটির প্রতিমা নির্মাণ করে সেখানে পুজো করা হয়। এক কালে বলির প্রচলন ছিলো।
আজও পূজো উপলক্ষে বিশেষ ভোজ হয়।পাশাপাশি বিশেষ নৃত্য এবং খেলার আয়োজন
এই উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ।
জনশ্রুতি বা লোককথায় প্রচলিত আছে, একসময় গভীর জঙ্গলে ঘেরা এই ডাকাতের আস্তানায় শক্তির আরাধনা এবং নরবলির মতো প্রথাও প্রচলিত ছিল।সেসব আজ অতীত।ইংরেজ শাসনকালে শেষ পর্যন্ত জেবনা ধরা পড়েন এবং সিউড়ি জেলে বন্দি অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়।তার প্রতিষ্ঠিত কালী পূজো
আজও জেবনা কালী নামে প্রসিদ্ধ।
ইতিহাসের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া এমন বহু চরিত্র এবং বাংলার কালী মন্দিরের কথা নিয়ে চলতে
থাকবে কালী কথা। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।
