জমিদার বাড়ির দূর্গা পুজো – শোভা বাজার রাজবাড়ি

10

জমিদার বাড়ির দূর্গা পুজো

শোভা বাজার রাজবাড়ি

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

বাংলার দুর্গাপূজার নিজস্ব এক ইতিহাস এবং ঐতিহ্য আছে যা কয়েকশো বছরের পুরোনো|পলাশীর যুদ্ধ থেকে, স্বদেশী আন্দোলন, দেশ ভাগ থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ সবই এই ইতিহাসের অঙ্গ|দূর্গা পুজোকে কেন্দ্র করে শাস্ত্র এবং ধর্মীয় ভাবাবেগের পাশাপাশি এই ইতিহাসের ও এক আলাদা তাৎপর্য আছে এবং এই ঐতিহাসিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে শোভা বাজার রাজবাড়ির পূজোর গুরুত্ব অপরিসীম।আজকের পর্বে শোভাবাজার রাজ বাড়ির পুজো।

সেকালে বলা হতো দেবী মর্তে থাকাকালীন তার মনোরঞ্জনের জন্য এই বাড়িতেই আসতেন|এমন ভাবনার পেছনে অনেক কারন আছে|তবে আগে এই বাড়ি ও তার ইতিহাস সংক্ষেপে জেনে নেয়া দরকার|যদিও এই পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন বিজয় হরি দেব তবে এই পরিবারের স্বর্ণযুগ বলা হয় রাজা নবকৃষ্ণ দেবের সময় কে এবং তার আমলেই শুরু হয় এই দূর্গা পূজা|নব কৃষ্ণদেব ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সাধারণ কর্মচারী যিনি নিজের দক্ষতায় ও পরিশ্রমে কোম্পানির মুন্সী হয়ে ছিলেন|পলাশীর যুদ্ধে তিনি নানা ভাবে ক্লাইভ কে সাহায্য করেন ও পুরুস্কার স্বরূপ প্রচুর অর্থ লাভ করেন|

মূলত পলাশীর যুদ্ধ জয় কে স্মরণীয় করে রাখতেই নবকৃষ্ণ দেবে দূর্গা পুজো শুরু করেছিলেন তাছাড়াও তার উদেশ্য ছিলো ক্লাইভ কে খুশি করে নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা|এই উদ্দেশ্যে তিনি সফল হয়েছিলেন|তার দূর্গা পুজোয় অংশগ্রহণ করেছিলেন স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ|আজও অনেক জায়গায় এই পুজো কে গোরা দের পুজো বা কোম্পানির পুজো বলা হয়|

উদেশ্য যাই থাকুক নিষ্ঠা সহকারে পুজো করতেন নবকৃষ্ণ দেব|প্রচুর অর্থ ব্যায় হতো এই পরিবারের দূর্গা পুজোয়|বসতো গান বাজনার আসর, নাচ, কবি গানের ও ব্যবস্থা থাকতো|দূর্গা পুজো উপলক্ষে অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি, ভোলা ময়রার মতো কবিয়ালরা এখানে এসেছেন কবির লড়াই করতে আবার  গহরজান, মালকাজান, নুর বক্স প্রমুখ নামী নর্তকী এই বাড়িতে এসেছেন নাচ করতে|
সব মিলিয়ে এলাহী আয়োজন হতো শোভাবাজার রাজ বাড়ির দূর্গা পুজোয় আর এই কারণেই মনে করা হতো যে এটা মর্তে দেবী দুর্গার মনোরঞ্জনের স্থান|

পরবর্তীতে দুই শরিকের মধ্যে ভাগ হয়ে যায় সম্পত্তি তবে প্রথা মেনে নিষ্ঠা সহকারে আজও শোভাবাজর রাজবাড়ি তে দূর্গা পূজা হয়|উল্টো রথের দিন কাঠামো পুজো দিয়ে শুরু হয় দেবীমূর্তি তৈরির কাজ|শোভাবাজার রাজবাড়ির মাতৃমূর্তির বিশেষ এক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এছাড়া, এখানকার পুজোর উপাচারও বেশ চমকপ্রদ। সন্ধিপুজোতে কামানের গোলার শব্দে শুরু হত পুজো এবং শেষও হত একই ভাবে|মা দুর্গা এই বাড়িতে বৈষ্ণবী হিসেবে পূজিতা হন। তাই শোভাবাজার রাজবাড়ির পুজোয় অন্নভোগ থাকে না। গোটা ফল, গোটা আনাজ, শুকনো চাল, কচুরি, খাজা, গজা, মতিচুর-সহ নানা ধরনের মিষ্টি দেবীকে উত্সর্গ করা হয়|বর্তমানে এখানে বলী প্রথা নেই|এবাড়ির পুজোয়|প্রতিমার সামনে একটা বড় হাড়িতে জল রাখা হয়। সেই জলে দেবীর পায়ের প্রতিবম্বের ছবি দেখে সবাই প্রণাম করে। একে দর্পণ বিসর্জন বলা হয়|তারপর প্রথা মেনে দশমীর দিনই হয় বিসর্জন|আগে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর রীতি থাকলেও সরকারি নিয়মে তা এখন বন্ধ|

আজকের পর্বে এইটুকুই|ফিরবো পরের পর্বে।
অন্য এক রাজ বাড়ির পূজো নিয়ে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।