পুরান কথা – সূর্যদেব ও মহাদেবের শাস্তি

7

পুরান কথা – সূর্যদেব ও মহাদেবের শাস্তি

পন্ডিতজি ভৃগুশ্রী জাতক

আজ পুরান কথায় আপনাদের সূর্য দেব এবং দেবাদিদে মহাদেবকে নিয়ে একটি পৌরাণিক ঘটনা জানাবো।

অসুররাজ সুকেশী ছিলেন ভগবান শিবের একনিষ্ঠ ভক্ত। তাঁর ভক্তিতে সন্তুষ্ট হয়ে দেবাদিদেব মহাদেব তাঁকে এক অপূর্ব আকাশপুরী দান করেন। সেই নগরী ছিল স্বর্গের মতোই মনোমুগ্ধকর—মেঘের উপর ভাসমান, অপরূপ সৌন্দর্যে ভরা। সেখানে দিন-রাত পাখির কলতান শোনা যেত এবং নগরীর ঐশ্বর্য ছিল কল্পনারও অতীত।

একদিন সুকেশী ঋষি-মুনিদের সান্নিধ্যে এসে তাঁদের কাছে ধর্ম ও মুক্তির পথ সম্পর্কে জানতে চাইলেন। ঋষিরা তাঁকে বোঝালেন—জীবনের প্রকৃত উন্নতি বাইরের শক্তিতে নয়, নিজেকে সংযত করা এবং পরম সত্যের কাছে আত্মসমর্পণের মধ্যে।তাঁরা ধর্মের বিভিন্ন গুণের কথা বললেন—
দান, ক্ষমা, সংযম, দয়া, শুচিতা, তপস্যা, সত্য, অহিংসা, ধৈর্য এবং অন্যের সম্পদ গ্রহণ না করা।
এই শিক্ষা সুকেশী এবং তাঁর অনুসারীদের মধ্যে পরিবর্তন আনল। তারা বুঝতে শুরু করল যে প্রকৃত মহত্ত্ব অন্যকে পরাজিত করার মধ্যে নয়; বরং নিজের অহংকারকে জয় করার মধ্যেই প্রকৃত বিজয়।অসুর হলেও এই জ্ঞান তাকে একপ্রকার দেবত্বে উন্নীত করলো।তার মধ্যে কিছুটা অহংকার ও জন্ম নিলো।

এদিকে একসময় সুকেশীর আকাশপুরী এতটাই বিশাল ও দীপ্তিমান হয়ে উঠল যে তার আলো সূর্যের দীপ্তিকেও ম্লান করে দিতে লাগল। ধীরে ধীরে সুকেশীর মনে এমন এক ধারণা জন্ম নিল যে তাঁর নগরীর শক্তি ও জ্যোতি যেন সূর্যের চেয়েও বেশি। সূর্য দেবতা এই ঘটনায় অপমানিত বোধ করলেন। আর যখন সুকেশীর নগরীর শক্তি ও অহংকার সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন প্রকৃতির ভারসাম্যও যেন নষ্ট হতে শুরু করল। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছল যে সূর্য নিজেই আকাশ থেকে পতিত হতে শুরু করলেন।সূর্যের পতন মানে শুধু একজন দেবতার পতন নয়—এর অর্থ ছিল সমগ্র সৃষ্টির বিপর্যয়। সূর্যের আলো ও তাপ ছাড়া পৃথিবীতে জীবনের অস্তিত্বই বিপন্ন হয়ে পড়ত। দেবতা, ঋষি ও সকলেই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়লেন।

অবশেষে সুকেশী উপলব্ধি করলেন তাঁর ভুল। তিনি আবার ভগবান শিবের শরণ নিলেন। সূর্যদেবও নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করলেন। তখন বোঝা গেল—কেউই পরম সত্যের ঊর্ধ্বে নয়।
সুকেশী বুঝলেন, শিবের আশীর্বাদে পাওয়া শক্তিকে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য ব্যবহার করা উচিত নয়। যে শক্তি ঈশ্বরের কাছ থেকে পাওয়া, সেই শক্তির জন্য অহংকার করা আসলে নিজের অজ্ঞতাকেই প্রকাশ করে।
ভগবান শিব শেষ পর্যন্ত করুণা করলেন। তাঁর কৃপায় সূর্য আবার আকাশে নিজের অবস্থান ফিরে পেলেন এবং সুকেশীর আকাশপুরীও পুনরায় তার স্থানে ফিরে গেল।

আসলে দেবাদিদেব মহাদেব এই লীলা করেছিলেন তার ভক্তর মন থেকে অহংকার দুর করতে। সূর্যর পতন তাঁর ইচ্ছেতেই হয়েছে। আবার সূর্য তাঁর ইচ্ছেতেই পুনরায় নিজের স্থানে ফিরে যায়।
মহাদেব এই শাস্তির মাধ্যমে তাঁর অসুর ভক্ত এবং সূর্য দুজনকেই শিক্ষা দেন যে কেউই প্রকৃতি এবং ঈশ্বরের নিয়ম লঙ্ঘন করতে পারেন না।
ভক্তি মানুষকে শক্তি দেয় এবং বিনয় সেই শক্তিকে সঠিক পথে পরিচালিত করে।

ফিরে আসবো পরের পুরান কথা
নিয়ে আগামী পর্বে। পড়তে থাকুন।
ভালো থাকুন। ধন্যবাদ।